
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো- আমরা কেমন শিক্ষা ব্যবস্থা চাই। শিক্ষা যদি কেবল পরীক্ষার ফল, সনদ আর চাকরির লাইনে দাঁড়ানোর উপায় হয়ে ওঠে, তাহলে তা সমাজকে এগিয়ে নিতে পারে না। শিক্ষা তখন মানুষের ভেতরে চিন্তা, মূল্যবোধ, দক্ষতা ও নেতৃত্ব তৈরির শক্তি হারিয়ে ফেলে।
রাষ্ট্র মেরামতের প্রস্তাব হিসেবে বিএনপি ৩১ দফা রূপরেখা প্রকাশ করেছে। বিএনপির ২৪ নম্বর দফায় বলা হয়েছে- ‘বর্তমানে শিক্ষাক্ষেত্রে বিরাজমান নৈরাজ্য দূর করে নিম্ন ও মধ্য পর্যায়ে চাহিদাভিত্তিক শিক্ষা এবং উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষাকে প্রাধান্য দেওয়া হবে। গবেষণায় বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করা হবে। একই মানের শিক্ষা ও মাতৃভাষায় শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। ভবিষ্যতের নেতৃত্ব গড়ে তুলতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ছাত্র সংসদে নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে। যোগ্য, দক্ষ ও মানবিক জনগোষ্ঠী গড়ে তোলার লক্ষে জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫% অর্থ বরাদ্দ করা হবে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সংগতিপূর্ণভাবে ক্রমান্বয়ে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট খাতে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হবে। দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টির লক্ষ্যে শিক্ষা প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণসহ সংশ্লিষ্ট সকল খাতকে ঢেলে সাজানো হবে। শিক্ষা, শিল্প, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং উৎপাদানখাতে গবেষণা ও উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। ক্রীড়া উন্নয়ন ও জাতীয় সংস্কৃতির বিকাশে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। অনৈতিক আকাশ সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন রোধ করা হবে।’
এই দফা যে বিষয়টি পরিষ্কার করেছে, তা হলো শিক্ষাকে হতে হবে চাহিদাভিত্তিক, জ্ঞানভিত্তিক ও মানবিক। এ কথা অস্বীকারের উপায় নেই, বর্তমান বাস্তবতায় বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এক ধরনের নৈরাজ্যের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। পাঠ্যক্রমের ঘন ঘন পরিবর্তন, পরীক্ষানির্ভরতা, কোচিং ও বাণিজ্যিক শিক্ষার দাপট, গবেষণার অবহেলা এবং শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে গভীর বিচ্ছিন্নতা- সব মিলিয়ে শিক্ষা আজ সমাজের অগ্রগতির বদলে অনেক সময় বিভ্রান্তির উৎস হয়ে উঠছে। এই প্রেক্ষাপটে ২৪ নম্বর দফা শিক্ষাকে নতুন করে ভাবার একটি কাঠামো হাজির করে।
শিক্ষাবিষয়ক এই দফায় প্রথম জোর দেওয়া হয়েছে নিম্ন ও মধ্য পর্যায়ের শিক্ষাকে চাহিদাভিত্তিক করার ওপর। এটি কোনো সাধারণ নির্দেশ নয়; এটি শিক্ষাকে জীবনের সঙ্গে সংযুক্ত করার একটি দার্শনিক আহ্বান। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাকে শুধু বই মুখস্থ বা পরীক্ষার প্রস্তুতি মনে করলে আমরা মানুষকে একটি যান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ করি। কিন্তু শিক্ষা মানে কেবল তথ্য সংগ্রহ নয়; শিক্ষা মানে মানুষের মনের দরজা খুলে দেওয়া, চিন্তা ও বিবেচনার শক্তি বিকাশ করা, দায়িত্ববোধ ও নৈতিক জ্ঞান সঞ্চার করা।
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার লক্ষ্য হওয়া উচিত শিক্ষার্থীর জীবন-সংযোজিত চেতনা গঠন। গণিত, বিজ্ঞান, ভাষা ও প্রযুক্তি শেখানো হবে কেবল পরীক্ষার জন্য নয়, বরং সৃষ্টিশীল সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, যুক্তি বিশ্লেষণ এবং বাস্তব জীবনের জটিলতায় সমাধান খুঁজে বের করার দক্ষতা অর্জনের জন্য। সেই সঙ্গে নৈতিকতা, সহনশীলতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও নাগরিক দায়িত্ববোধ শেখানো হবে—যাতে শিশুর মনে শুধুমাত্র জ্ঞান নয়, সচেতনতা ও মানবিক মূল্যবোধও জন্মায়।
এক কথায়, শিক্ষার লক্ষ্য হবে মানুষকে কেবল ‘জ্ঞানী’ নয়, নৈতিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা, যারা সমাজে সচেতন ও সৃজনশীলভাবে অংশগ্রহণ করতে সক্ষম।
অন্যদিকে, উচ্চ শিক্ষায় জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা ও গবেষণার অগ্রাধিকার একটি জাতির স্থায়ী অগ্রগতির মূল ভিত্তি। বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা দীর্ঘদিন ধরে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে অবহেলিত। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা ডিগ্রি, পদোন্নতি বা রুটিনের চাপের মধ্যে আটকে গবেষণাকে আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছেন। এটাই শিক্ষার সবচেয়ে বিপজ্জনক সংকট- জ্ঞান উৎপাদনের প্রতি উদাসীনতা।
গবেষণা মানে কেবল নতুন তথ্য আবিষ্কার নয়; গবেষণা মানে চিন্তার স্বাধীনতা, বিশ্লেষণ ক্ষমতা ও সমস্যার অন্তর্দৃষ্টি অর্জন। কোনো দেশ যদি জ্ঞান উৎপাদনে অবহেলা করে, সে দেশের অর্থনীতি, প্রযুক্তি, শিল্প ও সামাজিক কাঠামো দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই হয় না। বিএনপির ২৪ নম্বর দফা স্পষ্ট করে—শিক্ষার মূল কেন্দ্রবিন্দু হবে জ্ঞান উৎপাদন ও গবেষণা, যা দেশের স্থায়ী উন্নয়ন ও নেতৃত্ব গঠনের ভিত্তি।
একই সঙ্গে বলা হয়েছে, একই মানের শিক্ষা ও মাতৃভাষায় শিক্ষার অগ্রাধিকার। বাস্তবে শহর-গ্রাম, ইংরেজি মাধ্যম-বাংলা মাধ্যম, সরকারি-বেসরকারি শিক্ষার মধ্যে যে বৈষম্য তৈরি হয়েছে, তা সমাজকে বিভক্ত করছে। শিক্ষা যদি সমান মানের না হয়, তাহলে সুযোগও সমান হয় না। মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা চিন্তার গভীরতা ও সৃজনশীলতা বাড়ায়- এই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সত্যকে নীতিগতভাবে গ্রহণ করার কথাই এখানে বলা হয়েছে।
এই দফার আরেকটি গভীর তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন পুনরায় চালুর প্রস্তাব। শিক্ষা কখনোই কেবল পাঠ্যসূচি, সিলেবাস বা শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালে আবদ্ধ কোনো বিষয় নয়। প্রকৃত শিক্ষা সেই প্রক্রিয়া, যার ভেতর দিয়ে মানুষ নিজের কথা বলতে শেখে, ভিন্নমতকে সহ্য করতে শেখে, নেতৃত্ব নিতে ও দায়িত্ব বহন করতে শেখে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলো গণতন্ত্রের প্রথম পাঠশালা। সেখানে যদি মতপ্রকাশের সুযোগ না থাকে, যদি নেতৃত্বের চর্চা না হয়, তবে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব কাগজে-কলমে শিক্ষিত হলেও চিন্তা ও চরিত্রে অপূর্ণ থেকে যায়।
দীর্ঘদিন ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ থাকার ফলে শিক্ষাঙ্গনে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা কেবল সাংগঠনিক নয়- এটি এক ধরনের গণতান্ত্রিক অনুশীলনের বিচ্ছিন্নতা। নেতৃত্ব তখন স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় গড়ে ওঠে না; বরং বিকৃত পথে জন্ম নেয়। ছাত্র সংসদ নির্বাচন মানে কেবল ভোট নয়, এটি মতভেদ, বিতর্ক, সমঝোতা ও দায়িত্বশীলতার শিক্ষা। ভবিষ্যতের রাষ্ট্রনায়ক, নীতিনির্ধারক ও জননেতাদের যদি গণতন্ত্রের সঙ্গে পরিচয় করাতে হয়, তবে সেই অনুশীলন শুরু হতে হবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেই। বিএনপির এই দফা শিক্ষাকে আবার তার স্বাভাবিক রাজনৈতিক ও নাগরিক চরিত্রে ফিরিয়ে আনার এক গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও এই রূপরেখা একটি সুস্পষ্ট দর্শনের প্রতিফলন। জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়ার প্রস্তাব কোনো অলীক স্বপ্ন নয়; এটি মানবসভ্যতার পরীক্ষিত বাস্তবতা। ইতিহাস বলে, যেসব দেশ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, তারাই দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পেরেছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য- এই দুটি খাত আসলে রাষ্ট্রের ‘মানব পুঁজি’ নির্মাণের ভিত্তি। সেখানে বিনিয়োগ না করে কেবল অবকাঠামো বা প্রবৃদ্ধির হিসাব দেখানো আত্মপ্রবঞ্চনা ছাড়া কিছু নয়।
এই দফায় শিক্ষা প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের ওপর যে জোর দেওয়া হয়েছে, তা শিক্ষা ও অর্থনীতির মধ্যকার ঐতিহাসিক বিচ্ছিন্নতা দূর করার প্রয়াস। শিক্ষা যদি শিল্প, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উৎপাদন খাতের সঙ্গে যুক্ত না হয়, তবে তা বেকার ডিগ্রিধারীর সারি বাড়ায় মাত্র। দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির অর্থ হলো—এমন মানুষ গড়ে তোলা, যারা জ্ঞানকে উৎপাদনে রূপান্তর করতে পারে, চিন্তাকে কাজে লাগাতে পারে এবং অর্থনীতির সঙ্গে সৃজনশীলভাবে যুক্ত হতে পারে। কর্মসংস্থান তখন রাষ্ট্রের দান নয়, বরং শিক্ষার স্বাভাবিক ফল হয়ে ওঠে।
সব মিলিয়ে, ছাত্র সংসদ থেকে বাজেট বরাদ্দ—এই অংশগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শিক্ষা কোনো বিচ্ছিন্ন সামাজিক খাত নয়। এটি গণতন্ত্র, অর্থনীতি ও মানবিক উন্নয়নের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি সামগ্রিক প্রকল্প। শিক্ষা যদি সত্যিই বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে চায়, তবে তাকে হতে হবে চিন্তাশীল নাগরিক, দক্ষ মানবসম্পদ ও গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব তৈরির প্রধান ক্ষেত্র—আর ঠিক সেই দিকেই ইঙ্গিত করে বিএনপির এই দফা।
এছাড়া ক্রীড়া উন্নয়ন, জাতীয় সংস্কৃতির বিকাশ এবং অনৈতিক আকাশ সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন রোধ—এই বিষয়গুলো শিক্ষাকে কেবল পাঠ্যক্রমে সীমাবদ্ধ না রেখে সামগ্রিক সাংস্কৃতিক বিকাশের সঙ্গে যুক্ত করে। সুস্থ সংস্কৃতি ছাড়া সুস্থ শিক্ষা সম্ভব নয়।
সব মিলিয়ে বিএনপির ৩১ দফার ২৪ নম্বর দফা একটি এমন শিক্ষা দর্শনের কথা বলে, যেখানে শিক্ষা হবে মানুষ গড়ার প্রকল্প—শুধু চাকরির প্রস্তুতি নয়। বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে হলে প্রয়োজন এমন শিক্ষা, যা দক্ষ, মানবিক, চিন্তাশীল ও দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরি করবে। প্রশ্ন এখন একটাই—রাষ্ট্র কি সেই শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে প্রস্তুত?
লেখক: সংবাদ বিশ্লেষক ও সাবেক সহকারী অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট
পূর্বকোণ/পিআর