চট্টগ্রাম রবিবার, ১১ জানুয়ারি, ২০২৬

সর্বশেষ:

ভেনেজুয়েলায় মাদকবিরোধী অভিযানের নামে মার্কিন আগ্রাসন : ‘সবকিছুই তেলের জন্য’

ভেনেজুয়েলায় মাদকবিরোধী অভিযানের নামে মার্কিন আগ্রাসন : ‘সবকিছুই তেলের জন্য’

আবসার মাহফুজ

৮ জানুয়ারি, ২০২৬ | ৩:২১ অপরাহ্ণ

ভেনেজুয়েলার ইতিহাসে গত শনিবারের সকালটি শুধু একটি সরকারের পতনের খবর নয়, বরং একটি জাতির সার্বভৌম অস্তিত্বের ওপর নগ্ন সামরিক শক্তি প্রয়োগের ঘোষণাও। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, এক শ্বাসরুদ্ধকর বিশেষ অভিযানে ভেনেজুয়েলার নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে মার্কিন মুল্লুকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। গত শনিবার ভোরে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে অভিযান চালিয়ে প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে তুলে আনে মার্কিন সেনাবাহিনীর ডেল্টা ফোর্স। সঙ্গে আনা হয় মাদুরোর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকেও। রবিবারের সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, তাঁকে নিউইয়র্ক শহরের ব্রæকলিনে অবস্থিত মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টারে (এমডিসি) রাখা হয়েছে। লাতিন আমেরিকার দেশটির রাজধানী কারাকাস থেকে তুলে আনার পর তাঁকে প্রায় ২ হাজার ১০০ মাইল পাড়ি দিয়ে এই আটক কেন্দ্রে নেওয়া হয়। আগামী সপ্তাহে ম্যানহাটনের ফেডারেল আদালতে মাদক ও অস্ত্রের মামলায় আইনি লড়াইয়ের মুখোমুখি হওয়ার আগে মাদুরোকে এই কেন্দ্রে রাখা হবে বলে জানা গেছে। তবে ফ্লোরেস এখন কোথায় আছেন, সেই বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলার মাত্র ১২ ঘণ্টা আগে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো কারাকাসে চীনা বিশেষ দূত কিউ জিয়াওকির নেতৃত্বাধীন এক উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের সাথে বৈঠক করেন। মিরাফ্লোরেস প্রাসাদে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে দুই দেশের ‘কৌশলগত অংশীদারিত্ব’ জোরদার এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা হয়। মাদুরো একে ‘ভ্রাতৃত্বপূর্ণ’ বৈঠক হিসেবে বর্ণনা করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবি শেয়ার করেছিলেন। তবে এর কিছু সময় পরই যুক্তরাষ্ট্রের স্পেশাল ফোর্সের অভিযানে তিনি সস্ত্রীক বন্দি হন। কারাকাসসহ ভেনেজুয়েলার বিভিন্ন জায়গায় ৩ জানুয়ারি ভোরে ‘বড় পরিসরে’ হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী। যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় এদিন ভোর ৪টা ২১ মিনিটে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রæথ সোশ্যালে দেওয়া এক বার্তায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প লেখেন, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে ধরতে এক ‘দুঃসাহসিক অভিযান’ চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সেনাবাহিনীর ডেল্টা ফোর্সসহ মার্কিন এলিট সেনারা মাদুরোর ‘সেফ হাউস’ বা নিরাপদ আবাসস্থল থেকে তাঁকে ও তাঁর স্ত্রীকে তুলে আনেন। এর পর থেকে মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীর হদিস পাওয়া যাচ্ছিল না। প্রায় ৭ ঘণ্টা পর ট্রাম্প নিজে ‘আটক’ মাদুরোর ছবি ট্রæথ সোশ্যালে প্রকাশ করেন। ছবিতে দেখা যায়, মাদুরোর চোখ বাঁধা ও হাতে হাতকড়া। পরনে ধূসর রঙের নরম কাপড়ের তৈরি ট্রাউজার-জ্যাকেট। বলা হয়, ছবিটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস আইডবিøউও জিমায় তোলা। সেদিন ভোরেই কারাকাস থেকে যুক্তরাষ্ট্রের হেলিকপ্টারে নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে উড়িয়ে নেওয়া হয়। গন্তব্য ছিল মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস আইডবিøউও জিমা। ক্যারিবীয় সাগরের কোনো এক অজানা জায়গায় যুদ্ধজাহাজটি অবস্থান করছিল। এরপর যুদ্ধজাহাজটি মাদুরোকে কিউবার গুয়ানতানামো বে মার্কিন নৌঘাঁটিতে নিয়ে যায়। সেখান থেকে উড়োজাহাজে করে মাদুরোকে নেওয়া হয় নিউইয়র্কে।

উল্লেখ্য, ভেনেজুয়েলার নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে সস্ত্রীক গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া ও বিচারের মুখোমুখি করার এমন ঘটনা লাতিন আমেরিকার জন্য নতুন কিছু নয়। এটি সেই পুরোনো গল্পের আরেক অধ্যায়, যেখানে ওয়াশিংটন নিজেকে বিশ্বের নৈতিক অভিভাবক ঘোষণা করে, আর অন্য রাষ্ট্রের আকাশে বোমারু বিমান পাঠিয়ে বলে- ‘এটি তোমাদের মুক্তির জন্য’। আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিশ্লেষকরা বলছেন- ভেনেজুয়েলায় যা ঘটছে, তা কোনো বিচ্ছিন্ন ‘মাদকবিরোধী অভিযান’ নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের সাম্রাজ্যবাদী হস্তক্ষেপের ধারাবাহিকতা, যার শিকড় মনরো ডকট্রিন থেকে শুরু করে ঠাÐা যুদ্ধ, আর আজকের ‘গণতন্ত্র রপ্তানি’ প্রকল্প পর্যন্ত বিস্তৃত। এ কথা ঠিক যে, নিকোলাস মাদুরো একজন বিতর্কিত শাসক। তার নির্বাচনের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, বিরোধী রাজনীতি সংকুচিত হয়েছে, অর্থনীতি ভয়াবহ দুরবস্থায় পড়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো- এই ব্যর্থতা ও স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা কি যুক্তরাষ্ট্রকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে অপহরণ করার নৈতিক বা আইনি অধিকার দেয়? যদি দেয়, তবে সেই নীতি কি শুধু ভেনেজুয়েলার জন্য, নাকি বিশ্বের যেকোনো ‘অপছন্দের’ সরকারের জন্য প্রযোজ্য? যুক্তরাষ্ট্র বলছে, মাদুরো একজন ‘নারকো-টেররিস্ট’। এই শব্দটি খুব পরিচিত। কখনো সাদ্দাম হোসেন ছিলেন ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্রের মালিক’, কখনো মুয়াম্মার গাদ্দাফি ছিলেন ‘নিজ জনগণের হত্যাকারী’, কখনো আফগানিস্তান ছিল ‘সন্ত্রাসবাদের আশ্রয়স্থল’। প্রতিবারই অভিযোগের ভাষা বদলেছে, কিন্তু ফলাফল একই থেকেছে- রাষ্ট্র ধ্বংস, সমাজ ভাঙন, আর কোটি কোটি সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ। ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে এই অভিযোগ আরও প্রশ্নবিদ্ধ। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন জরিপে দেখা যাচ্ছে, মার্কিন নাগরিকদের মাত্র একটি ক্ষুদ্র অংশ ভেনেজুয়েলাকে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি মনে করে। প্রায় ৭০ শতাংশ মার্কিন

তাহলে প্রশ্ন আসে, কেন ভেনেজুয়েলা? উত্তরটি খুব জটিল নয়। ভেনেজুয়েলায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত তেলভাÐার রয়েছে, প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ব্যারেল। এই সম্পদ শুধু অর্থনৈতিক নয়, ভূ-রাজনৈতিক শক্তির উৎস। যুক্তরাষ্ট্র বহুদিন ধরেই লাতিন আমেরিকাকে তার ‘ব্যাকইয়ার্ড’ হিসেবে দেখে এসেছে। কিন্তু ভেনেজুয়েলার তেল দীর্ঘদিন ওয়াশিংটনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল। হুগো চাভেজের সময় থেকে শুরু করে মাদুরো পর্যন্ত, এই সম্পদ রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে- যা মার্কিন কর্পোরেট স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। এই কারণেই নিষেধাজ্ঞা এসেছে। এই কারণেই পিডিভিএসএ ধ্বংসের মুখে পড়েছে। এই কারণেই ভেনেজুয়েলাকে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। তারপর সেই নিষেধাজ্ঞার ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক বিপর্যয়কে দেখিয়ে বলা হয়েছে- দেখো, সমাজতন্ত্র ব্যর্থ, সরকার অদক্ষ, তাই ‘মুক্তি’ দরকার। এটি একটি পরিকল্পিত চক্র: প্রথমে শ্বাসরোধ, তারপর সেই শ্বাসকষ্টকেই আগ্রাসনের অজুহাত বানানো। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি অন্তত ২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি রাজস্ব হারিয়েছে। এই ক্ষতি কোনো বিমূর্ত সংখ্যার বিষয় নয়। এর অর্থ- ওষুধের অভাব, বিদ্যুতের ঘাটতি, খাদ্যসংকট, গণহারে দেশত্যাগ। তারপর সেই মানবিক সংকটের দা

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো সা¤প্রতিক মাসগুলোতে বারবার অভিযোগ করে আসছেন, ট্রাম্প প্রশাসন তার সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্র করছে এবং দেশটির বিপুল তেলসম্পদের দখল নিতে চাচ্ছে। এমন প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে। তিনি বলেছেন, ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি ‘সমর্থন’ দিতে যুক্তরাষ্ট্রের তেল কোম্পানিগুলো সেখানে প্রবেশ করবে। তেলবাজার বিশ্লেষক ও লিপো অয়েল অ্যাসোসিয়েটসের প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু লিপোর মতে, ট্রাম্পের এই মন্তব্য থেকেই স্পষ্ট হয়- ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ মূলত ‘তেলকেন্দ্রিক’। আল জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘ট্রাম্পের বক্তব্য ইঙ্গিত দিচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক অভিযান আসলে ‘সবকিছুই তেল ঘিরে’। মাদক পাচারের অভিযোগ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন লিপো। তার ভাষায়, ‘ভেনেজুয়েলা দিয়ে ঠিক কতটা মাদক প্রবেশ করছে, তা নিয়ে বড়ধরনের বিতর্ক রয়েছে। কোকেনের ক্ষেত্রে এটা কি আসছে কলম্বিয়া বা মেক্সিকো দিয়ে, নাকি ফেন্টানিল তৈরির রাসায়নিক সরবরাহ করছে চীন, সেটাও স্পষ্ট নয়।’ ভেনেজুয়েলার তেল খাতের বাস্তব অবস্থা তুলে ধরে লিপো বলেন, এই খাত টিকিয়ে রাখতে বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগ প্রয়োজন। তিনি জানান, প্রায় ৩০ বছর আগে ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন দৈনিক ৩০ লাখ ব্যারেলের বেশি ছিল। বর্তমানে তা নেমে এসেছে এক মিলিয়ন ব্যারেলেরও নিচে। তার মতে, ‘তেল উৎপাদন স্থাপনা ও অবকাঠামোর অবস্থা এতটাই নাজুক যে উৎপাদন ধরে রাখতেই বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রয়োজন। তবুও আমরা দেখছি, উৎপাদন ক্রমাগত কমছে।’ এই বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের সামনে বড় প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। লিপোর ভাষায়, ‘প্রথম প্রশ্ন হলো- ভেনেজুয়েলায় কে এই বিপুল অর্থ বিনিয়োগ কæত তা করা হবে? বিশেষ করে যখন একটি দীর্ঘসময় ধরে মাটিতে আসলে কারা ক্ষমতায় থাকবে, তা নিয়েই অনিশ্চয়তা রয়েছে।’

এখন মাদুরো আটক হওয়ার পর পশ্চিমা মিডিয়ার একটি অংশ একে ‘নতুন ভোর’ হিসেবে দেখাতে চাইছে। কিন্তু লাতিন আমেরিকার ইতিহাস জানলে এই আশাবাদ খুব দ্রুতই ভেঙে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে ক্ষমতায় আসা সরকারগুলো খুব কম ক্ষেত্রেই স্থিতিশীল বা গণতান্ত্রিক হয়েছে। বরং তারা হয়েছে দুর্বল, বিদেশি স্বার্থনির্ভর, এবং নিজ জনগণের কাছে অবিশ্বাসযোগ্য। ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেত্রী মারিয়া করিনা মাচাদো বেসরকারিকরণের কথা বলছেন। এটি শুনতে আকর্ষণীয় লাগতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এর অর্থ কী? এর অর্থ হলো- ভেনেজুয়েলার তেল আবার বহুজাতিক কোম্পানির হাতে যাবে, লাভ যাবে বিদেশে, আর দেশীয় শ্রম ও প্রযুক্তি আরও দুর্বল হবে। লাতিন আমেরিকার বহু দেশে এই মডেল প্রয়োগ হয়েছে, এবং প্রায় প্রতিবারই ফল হয়েছে বৈষম্য ও অস্থিরতা। আরেকটি ভয়াবহ আশঙ্কা হলো সহিংসতা। মাদুরো কেবল একজন ব্যক্তি নন; তিনি ‘চ্যাভিসমো’ নামের একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের প্রতিনিধি। এই আন্দোলনের শেকড় ভেনেজুয়েলার দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে গভীর। যদি এই জনগোষ্ঠী মনে করে যে তাদের নেতা বিদেশি শক্তির হাতে অপসারিত হয়েছেন, তবে সেই ক্ষোভ সহজেই সশস্ত্র প্রতিরোধে রূপ নিতে পারে। বিশেষজ্ঞরা ইতোমধ্যে গৃহযুদ্ধের আশঙ্কাæত একটি ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’-এর দিকে এগোতে পারে। লিবিয়া এই পথের এক জীবন্ত উদাহরণ, যেখানে ‘মানবিক হস্তক্ষেপ’ শেষপর্যন্ত একটি স্থায়ী বিশৃঙ্খলার জন্ম দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াগুলোও এই দ্বদ্বকে আরও স্পষ্ট করে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন একদিকে মাদুরোর বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ করছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক আইন মানার আহŸান জানাচ্ছে, যা কার্যত একটি ক‚টনৈতিক দ্বিচারিতা। রাশিয়া, চীন, ইরান স্পষ্টভাবে এই হামলাকে আগ্রাসন বলছে। লাতিন আমেরিকার প্রতিবেশীরা আতঙ্কিত শরণার্থী স্রোত নিয়ে। অর্থাৎ, ভেনেজুয়েলা এখন একটি বৈশ্বিক শক্তি প্রতিযোগিতার ময়দানে পরিণত হয়েছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি শেষপর্যন্ত এসে দাঁড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সদিচ্ছার ওপর। তারা কি সত্যিই ভেনেজুয়েলার গণতন্ত্র চায়? যদি তাই হতো, তবে কেন তারা বারবার এমন পথ বেছে নেয়, যা গণতন্ত্রের মৌলিক নীতির- সার্বভৌমত্ব, আত্মনিয়ন্ত্রণ, আন্তর্জাতিক আইন, সবকিছুকেই লঙ্ঘন করে? কেন তারা নির্বাচন, সংলাপ, আঞ্চলিক মধ্যস্থতার পথ এড়িয়ে যায়? সম্ভবত কারণটি খুব সরল- গণতন্ত্র এখানে মুখোশ, আসল লক্ষ্য নিয়ন্ত্রণ। তেল, ভূ-রাজনীতি, এবং প্রতিদ্বদ্বী শক্তি রাশিয়া ও চীনের প্রভাব ঠেকানো- এই তিনটি বাস্তব কারণই ভেনেজুয়েলাকে আজকের এই রক্তক্ষয়ী সন্ধিক্ষণে এনে দাঁড় করিয়েছে।

ভেনেজুয়েলার জনগণের সামনে এখন কোনো সহজ বিকল্প নেই। মাদুরোর পতন যদি সত্যিই ঘটে থাকে, সেটি মুক্তির নিশ্চয়তা দেয় না। বরং এটি হয়তো একটি দীর্ঘ, অনিশ্চিত এবং সহিংস অধ্যায়ের শুরু। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, বিদেশি বোমা দিয়ে গণতন্ত্র আসে না, অপহরণ করে রাষ্ট্র গড়া যায় না। ভেনেজুয়েলা আজ যে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, সেটি আসলে পুরো বৈশ্বিক দক্ষিণের প্রশ্ন- শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো কি চিরকাল দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর ভাগ্য নির্ধারণ করবে? নাকি কোনো একদিন সার্বভৌমত্ব শুধু কাগজে নয়, বাস্তব রাজনীতিতেও অর্থবহ হয়ে উঠবে? এই প্রশ্নের উত্তর ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে, কিন্তু তার প্রতিধ্বনি শোনা যাবে অনেক দূর পর্যন্ত।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট