
দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচনী রাজনীতিতে এগিয়ে রয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এবারও সংসদ নির্বাচনে তার ব্যতিক্রম হয়নি। চট্টগ্রামের ১৬ সংসদীয় আসনে অতীতের মতো ব্যবসায়ী প্রার্থীদের দৌরাত্ম্য বজায় রয়েছে। বিএনপি ও জামায়াতসহ রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনয়ননে ব্যবসায়ী প্রার্থীরা প্রাধান্য পেয়েছে। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর ৩১ প্রার্থীর মধ্যে ২৫ প্রার্থীই কোটিপতি। তবে বিএনপি ও সাবেক সংসদ সদস্য মোস্তফা কামাল পাশা পেশায় মাছ চাষি ও সমাজসেবী।
চট্টগ্রামের ১৬টি সংসদীয় আসনে ১৪৩ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দেন। এরমধ্যে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ে ৪২ জনের মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। তবে বাতিল হওয়া মনোনয়নের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ রয়েছে। গতকাল পর্যন্ত ভোটের মাঠে বৈধ প্রার্থী রয়েছেন ১০১ জন। এরমধ্যে ৯৯ জন প্রার্থীর হলফনামা বিশ্লেষণ করেছে পূর্বকোণ।
চট্টগ্রামের ৯৯ জন প্রার্থীর মধ্যে রাজনীতিবিদ প্রার্থী রয়েছেন চারজন। এর মধ্যে তিন জন হচ্ছেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্কসবাদী) প্রার্থী। তারা হলেন, চট্টগ্রাম-৯ (বাকলিয়া-কোতোয়ালী) আসনের প্রার্থী মো. শফি উদ্দিন কবির। তিনি হলফনামায় পেশা লিখেছেন ‘রাজনীতি’। আগের পেশা ছিল আইনজীবী। তার শিক্ষাগত যোগ্যতা এমএসএস (অর্থনীতি), এলএলবি। তার স্ত্রী ইন্দ্রানী ভট্টাচার্যের পেশাও রাজনীতি বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। তার সুনির্দিষ্ট আয় নেই। তবে অন্যান্য খাতে তার বার্ষিক আয় সাড়ে তিন লাখ টাকা। চট্টগ্রাম-১০ আসনেও রাজনীতিবিদ প্রার্থী হলেন একই দলের আসমা আকতার। তার শিক্ষাগত যোগ্যতা বিএসএস, বি-এড। বর্তমান পেশা রাজনীতি। পূর্বের পেশা ছিল চাকরি। তার বার্ষিক আয় সাড়ে তিন লাখ টাকা। আরেক জন হলেন চট্টগ্রাম-১১ আসনের প্রার্থী দীপা মজুমদার। তার শিক্ষাগত যোগ্যতা মাস্টার্স। বর্তমান পেশা রাজনীতি। আগের পেশা ছিল গৃহ শিক্ষক। ব্যাংক আমানত ও অন্যান্য খাত থেকে তার বার্ষিক আয় তিন লাখ ৭২ হাজার ৪৬০ টাকা। চট্টগ্রাম-১১ আসনের প্রার্থী নিজামুল হক আলকাদেরীও পেশায় রাজনীতি বলে উল্লেখ করেছেন। নিজামুল বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) প্রার্থী। স্বশিক্ষিত এ প্রার্থীর আয় নেই। তবে আয়ের অন্যান্য উৎস হিসেবে লিখেছেন রাজনৈতিক কাজে প্রাপ্ত সম্মানী। সম্মানী কত তা লিখেননি। অস্থাবর সম্পদের মধ্যে তার কাছে নগদ রয়েছে ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
অর্ধেকই ব্যবসায়ী ও ধনাঢ্য প্রার্থী:
প্রার্থীদের মধ্যে অর্ধেকই ব্যবসায়ী। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ বড় দলগুলোর বেশির ভাগই কোটিপতি ব্যবসায়ী। চট্টগ্রামের প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে ধনাঢ্য ও বিত্তশালী প্রার্থী হচ্ছেন চট্টগ্রাম-৪ আসনের বিএনপি প্রার্থী মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরী। তার বার্ষিক আয় ৪৮ লাখ ৪২ হাজার ৫৪৩ টাকা। তার কাছে অস্থাবর সম্পদ রয়েছে ২৬ কোটি ১৬ লাখ ৭৭ হাজার টাকার। স্ত্রীর কাছে রয়েছে ১২ কোটি ৩২ লাখ ১২ হাজার ৫শ টাকার। মেয়ের কাছে আছে ৪ কোটি ৬৬ লাখ ৩২ হাজার টাকার। আসলাম চৌধুরীর কাছে থাকা স্থাবর সম্পদের বর্তমান আনুমানিক মূল্য ৪৩০ কোটি ৭৮ লাখ ৩০ হাজার টাকা। স্ত্রীর কাছে রয়েছে ৬ কোটি ১০ লাখ ৯১ হাজার ৪শ টাকার। তার কাছে ঋণের পরিমাণও বেশি। ৫টি ব্যাংকের তার কাছে ৩৪৫ কোটি ৫১ লাখ ৬৩ হাজার ২৬৯ টাকার ঋণ রয়েছে বলে হলফনামায় উল্লেখ করেছেন তিনি।
ধনাঢ্য ব্যবসায়ীদের ভিড়ে ব্যতিক্রম পেশার প্রার্থী রয়েছে বিএনপিতে। চট্টগ্রাম-৩ (স›দ্বীপ) আসনের প্রার্থী মোস্তফা কামাল পাশা পেশায় নিজ পুকুরে মাছ চাষ ও সমাজসেবা। তার বার্ষিক আয় ৮ লাখ ৬২ হাজার ৮শ টাকা। এরমধ্যে মাছ চাষ থেকে আয় করেন ২ লাখ ১৬ হাজার টাকা। আর বাড়ি ভাড়া থেকে পান ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৮শ টাকা। তার অস্থাবর সম্পদ রয়েছে ৭৮ লাখ ৮৭ হাজার ২২ টাকার। স্থাবর সম্পদ রয়েছে ৬ কোটি টাকার।
চট্টগ্রামের ১৬ আসনের ৯৯ প্রার্থীর হলফনামা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ব্যবসায়ী প্রার্থী রয়েছেন ৪৯ জন। যা ৪৯ দশমিক ৪৯ শতাংশ। এছাড়া চাকরিজীবী প্রার্থী আছেন ১৩ জন। আইনজীবী আছেন ১২ জন। শিক্ষক রয়েছেন ৯ জন। চিকিৎসক চারজন। রাজনীতি চারজন। গৃহ সম্পত্তি, কৃষি ও হাদিয়া থেকে আয় করেন দুইজন। মাছ চাষ থেকে আয় করেন একজন। মসজিদের ইমাম, খতিব, দলিল লেখক, ইসলামী বক্তা ও জমিদারসহ অন্যান্য পেশা থেকে আয় করেন ৭ প্রার্থী।
চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনের বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির চেয়ারম্যান শাহজাদা সৈয়দ সাইফুদ্দিন আহমেদ আয় করেন গৃহ সম্পত্তি, কৃষি, ব্যবসা ও হাদিয়া থেকে। তার বার্ষিক আয় ১৬ লাখ ৪১ হাজার টাকা। তার অস্থাবর সম্পদের অর্জনকালীন মূল্য তিন কোটি ৪৬ লাখ ৮৪ হাজার ৩৩৮ টাকা। তার স্থাবর সম্পদের বর্তমান আনুমানিক মূল্য ৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এই আসনে একই দলের আরেক প্রার্থী মো. ওসমান আলীর পেশাও গৃহ সম্পত্তি, কৃষি, ব্যবসা ও হাদিয়া থেকে। অন্যান্য খাতে তার বার্ষিক আয় ৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা। তার অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ৭০ লাখ ৪০ হাজার টাকা। তবে তার কোনো স্থাবর সম্পদ নেই।
চট্টগ্রাম-১১ আসনের বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাত ব্যবসায়ী। তার বার্ষিক আয় এক কোটি ৫৯ লাখ ৬৩ হাজার ৪২৪ টাকা। তার অস্থাবর সম্পত্তির বর্তমানে আনুমানিক মূল্য ১২ কোটি ১০ লাখ ২০ হাজার টাকা। স্ত্রীর বর্তমান সম্পদের আনুমানিক মূল্য ৪ কোটি ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
চট্টগ্রাম-১০ আসনে বিএনপি প্রার্থী সাঈদ আল নোমানের বার্ষিক আয় এক কোটি ২ লাখ ৮১ হাজার ৩৫০ টাকা। পেশায় ব্যবসায়ী। কিন্তু ব্যবসা থেকে আয় উল্লেখ করেননি তিনি। তবে ব্যবসা থেকে তার স্ত্রীর আয় ১২ লাখ ৩৭ হাজার ৫শ টাকা। সাঈদ নোমানের অস্থাবর সম্পদের বর্তমান আনুমানিক মূল্য ২৩ কোটি ৯৩ লাখ ৯৫ হাজার ১৬ টাকা। স্ত্রীর অস্থাবর সম্পদের বর্তমান আনুমানিক মূল্য তিন কোটি ৬০ লাখ টাকা। সাঈদ নোমানের স্থাবর সম্পদের বর্তমান আনুমানিক মূল্য ১০ কোটি ৮৩ লাখ ২০ হাজার ৯৩২ টাকা।
চট্টগ্রাম-১৪ আসনের প্রার্থী জসিম উদ্দিন আহমেদ পেশায় ব্যবসায়ী। তার বার্ষিক আয় দুই কোটি ৪২ লাখ ৪৫ হাজার ৭৩৬ টাকা। তার অস্থাবর সম্পদের বর্তমান মূল্য দেখিয়েছেন, ১৫ কোটি ৯২ লাখ ৭৯ হাজার ৯৬৩ টাকা। জসিমের স্থাবর সম্পদের মূল্য ২৪ কোটি ৬৮ লাখ ৫৭ হাজার ৫৫০ টাকা।
পিছিয়ে নেই জামায়াতের প্রার্থীরাও:
১৬ আসনের মধ্যে ১৪ আসনে দলীয় প্রার্থী রয়েছে জামায়াতে ইসলামীর। এরমধ্যে বেশির ভাগই ব্যবসায়ী ও চিকিৎসক।
চট্টগ্রাম-১৫ আসনে জামায়াতের প্রার্থী ও সাবেক সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী পেশায় ব্যবসায়ী। তার বার্ষিক আয় ১১ লাখ ৬৮ হাজার ৫৬১ টাকা। তার হাতে নগদ ১ কোটি ৩৪ লাখ ৩৭ হাজার ২৫২ টাকা রয়েছে, মামলা আছে ৭১টি। তার কাছে ১ কোটি ৯৫ লাখ টাকার অস্থাবর সম্পদ রয়েছে।
চট্টগ্রাম-৭ আসনের জামায়াত প্রার্থী ডা. এটিএম রেজাউল করিম পেশায় চিকিৎসক। তার বার্ষিক আয় ৩৮ লাখ ৭২ হাজার ৫০৭ টাকা। এছাড়া অস্থাবর সম্পদ রয়েছে ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকার। স্ত্রীরও রয়েছে ১ কোটি টাকার অস্থাবর সম্পদ। স্থাবর সম্পদ রয়েছে ১ কোটি ২০ লাখ টাকার। স্ত্রীর রয়েছে ১ কোটি ৪৪ লাখ টাকার।
চট্টগ্রাম-১২ আসনের প্রার্থী ডা. ফরিদুল আলম পেশায় চিকিৎসক। তার অস্থাবর সম্পদের বর্তমান মূল্য দেখিয়েছেন. ৭ কোটি ১৫ লাখ টাকা। তার স্ত্রী সুলতানা বাদশাজাদী পেশায় ব্যবসায়ী। স্ত্রীর রয়েছে ২ কোটি টাকার সম্পদ। ফরিদুলের ৫ কোটি টাকার স্থাবর সম্পদ রয়েছে।
চট্টগ্রাম-৮ আসনের ডা. আবু নাছেরের বার্ষিক আয় ৪৮ লাখ ৬৪ হাজার ৫৩৪ টাকা। তার স্ত্রীর বার্ষিক আয় ১৪ লাখ ৫৬ হাজার ৩৭৪ টাকা। এই প্রার্থীর অস্থাবর সম্পদ রয়েছে ১ কোটি ৩২ লাখ ২ হাজার ১০১ টাকার। স্ত্রীর রয়েছে ১ কোটি ১৭ লাখ ২৬ হাজার ৮০৩ টাকার। স্থাবর সম্পদ রয়েছে ১ কোটি ২৭ লাখ ৭৪ হাজার ৮৫০ টাকার।
পূর্বকোণ/ইবনুর