চট্টগ্রাম রবিবার, ১১ জানুয়ারি, ২০২৬

সর্বশেষ:

স্মৃতির দর্পণে বেগম খালেদা জিয়া ও আমার বিমানযাত্রা

স্মৃতির দর্পণে বেগম খালেদা জিয়া ও আমার বিমানযাত্রা

ডা. মোহাম্মদ মহিউদ্দিন

১ জানুয়ারি, ২০২৬ | ১১:৫২ পূর্বাহ্ণ

১৯৯১ সালের ১৩ অক্টোবরের সেই রাতের কথা আজও আমার মনে স্পষ্টভাবে ভাসে। সেদিন ঢাকা থেকে জেদ্দা হয়ে জিম্বাবুয়ের রাজধানী হারারের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ বিমানের একটি বিশেষ ফ্লাইট যাত্রা করেছিল। সেই বিমানে ছিলেন তৎকালীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তাঁর সফরসঙ্গী হিসেবে ছিলেন তৎকালীন সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) ক্যামেরাম্যান ও সাংবাদিকরা। বেগম খালেদা জিয়া জিম্বাবুয়ে গিয়েছিলেন জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে অংশগ্রহণ করতে।

 

সে সময় বাংলাদেশ থেকে আফ্রিকায় যেতে হলে বহু স্টপেজে থেমে থেমে যেতে হতো। আমি তখন সদ্য পাশ করা একজন ডাক্তার। চাকরির সন্ধানে দক্ষিণ আফ্রিকায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। আমার কয়েকজন বন্ধু ইতোমধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়ে চিকিৎসক হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন। তাঁদের সহায়তায় আমার জন্য দক্ষিণ আফ্রিকার ভিসার ব্যবস্থা করা হয়। এখন শুধু একটি উপযুক্ত ফ্লাইট খুঁজে বের করাই ছিল আমার লক্ষ্য।

 

ঠিক সেই সময় কাকতালীয়ভাবে বাংলাদেশ বিমানের পক্ষ থেকে পত্রিকায় একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়- ঢাকা থেকে হারারে গমনকারী এই বিশেষ ফ্লাইটে কোনো সাধারণ নাগরিক যদি জিম্বাবুয়ে যেতে চান, তাহলে তিনি টিকিট কিনতে পারবেন। বিষয়টি আমার কাছে এক সুবর্ণ সুযোগ বলে মনে হয়। কারণ এই ফ্লাইটে চড়লে সরাসরি আফ্রিকায় পৌঁছানো সম্ভব। আমি দ্রæত চট্টগ্রামের বাংলাদেশ বিমানের অফিস থেকে টিকিট কেটে ফেলি।

 

 

১৩ অক্টোবর নির্ধারিত সময়ে ঢাকায় এসে ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করে বিমানে ওঠি। বিমানে উঠে বুঝতে পারি, আমি সেখানে একমাত্র সাধারণ যাত্রী। বাকি সবাই, সম্ভবত মোট ত্রিশজনের মতো, ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী, বিটিভির ক্যামেরা ক্রু ও সাংবাদিকরা, এবং বাংলাদেশ বিমানের পাইলট, ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার ও কেবিন ক্রুর সদস্যরা।

 

জেদ্দায় দীর্ঘ ট্রানজিটের সময় বিমানের ভেতরেই আমার পরিচয় হয় বাংলাদেশ বিমানের একজন ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ভদ্র, আন্তরিক ও সৌজন্যবোধসম্পন্ন। তিনি আমাকে একটি কাবাকম্পাস উপহার দেন। বিদেশ বিভুঁইয়ে থাকলেও সেই কম্পাসটি আজও আমার কাছে যত্ন করে সংরক্ষিত আছে। ২০২০ সালে কানাডায় আসার পর আবার তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ হয়। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ বিমানের একজন অবসরপ্রাপ্ত ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার।

 

ঢাকা থেকে প্রথমে আমাদের ফ্লাইট জেদ্দায় পৌঁছায়। সেখানে প্রায় ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টার মতো ট্রানজিট ছিল। আমার কাছে সৌদি আরবের ভিসা না থাকায় আমাকে বিমানের ভেতরেই থাকতে হয়। এ সময় প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সফরসঙ্গীরা উমরাহ পালনের জন্য বাইরে যান এবং পরে আবার বিমানে ফিরে আসেন।

 

এরপর শুরু হয় আমাদের যাত্রার দ্বিতীয় ধাপ, জেদ্দা থেকে সরাসরি হারারে। এই দীর্ঘ ও ঐতিহাসিক ফ্লাইটটি আমার জীবনের এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা হয়ে আছে। একজন সাধারণ বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে শুধু একটি টিকিট কেটে দেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একই বিমানে বিদেশযাত্রা- আর সেটিও আমার জীবনের প্রথম আন্তর্জাতিক সফর, এই অভিজ্ঞতা সত্যিই অনন্য।

 

হারারে বিমানবন্দরে অবতরণের পর প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সফরসঙ্গীরা সে সময় জিম্বাবুয়ের একমাত্র পাঁচতারকা হোটেল মনোমোটাপা হোটেলে চলে যান। আমি সবার শেষে বিমান থেকে নামি। ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করে আমি এক পরিচিতজনের বাসায় যাই। তিনি ছিলেন স্থপতি জনাব নূরুজ্জামান, যিনি সে সময় জিম্বাবুয়ে সরকারের ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্টে একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তাঁর সঙ্গে প্রেসিডেন্ট রবার্ট মুগাবে ও তাঁর স্ত্রী স্যালি মুগাবের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল বলে জানা যায়। বুয়েট থেকে শিক্ষাপ্রাপ্ত এই খ্যাতিমান স্থপতি জনাব নূরুজ্জামান সে সময় বহু বাংলাদেশি স্থপতি ও প্রকৌশলীকে জিম্বাবুয়েতে কাজের সুযোগ পেতে সহায়তা করেছিলেন।

 

পরদিন বাংলাদেশ হাইকমিশনের উদ্যোগে হারারেতে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিয়ে হাইকমিশনের বাসভবনে একটি ছোট সমাবেশের আয়োজন করা হয়। সেখানে প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া উপস্থিত ছিলেন এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। সেখানেই প্রথমবারের মতো খুব কাছ থেকে তাঁকে দেখার সুযোগ হয় আমার।

 

একজন প্রধানমন্ত্রীর কথাবার্তা ও আচরণে যে শালীনতা, প্রজ্ঞা ও মর্যাদা থাকা উচিত, বেগম খালেদা জিয়ার মধ্যে সেগুলোরই প্রতিফলন দেখেছি। তাঁর কথা বলার ভঙ্গি, চলাফেরা ও উপস্থিতিতে ছিল এক ধরনের স্বাভাবিক এলিগ্যান্স, কোথাও বিন্দুমাত্র তাচ্ছিল্যের ভাব ছিল না। সৌভাগ্যবশত সেই সভায় আমিও উপস্থিত ছিলাম। আজ প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর পরও সেই স্মৃতিগুলো আমি গভীরভাবে লালন করি। সেটিই ছিল আমার জীবনের প্রথম বিদেশযাত্রা। যদিও বিমানে তাঁর সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগ হয়নি, তবুও একই বিমানে দেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যাত্রা করার অভিজ্ঞতা আমার জীবনের এক অনন্য অধ্যায় হয়ে আছে।

 

আজ তিনি পরপারে যাত্রা করেছেন। আমরা তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করি। আল্লাহ তাআলা তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন, এই প্রার্থনাই করি। পাশাপাশি এই প্রত্যাশাও রাখি, বাংলাদেশ যেন একটি শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে এগিয়ে যায় এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলে।

 

লেখক: রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, সেইন্ট জন রিজিওনাল হসপিটাল, নিউ ব্রান্সউইক। এসিস্টেন্ট প্রফেসর, ডালহাউসি ইউনিভার্সিটি, কানাডা।

 

পূর্বকোণ/ইবনুর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট