চট্টগ্রাম রবিবার, ১১ জানুয়ারি, ২০২৬

সর্বশেষ:

সোমালিল্যান্ড ঘিরে ইসরায়েলের নতুন ষড়যন্ত্র

সোমালিল্যান্ড ঘিরে ইসরায়েলের নতুন ষড়যন্ত্র

আবসার মাহফুজ

৩০ ডিসেম্বর, ২০২৫ | ৪:১৬ অপরাহ্ণ

সোমালিয়া নামটা শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে জলদস্যু, দুর্ভিক্ষ, গৃহযুদ্ধ ও সন্ত্রাসবাদের গল্প। বছরের পর বছর ধরে ব্যর্থ দেশের তালিকার শীর্ষে থাকা এই দেশটি যেন শুধু ধ্বংস আর অরাজকতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্বের কাছে। অথচ এই একই সোমালিয়ার ভেতরেই লুকিয়ে আছে আরেক ভিন্ন চিত্র। এই দেশের মধ্যেই রয়েছে এমন এক অঞ্চল, যেখানে টানা ত্রিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলছে শান্তি, নিয়মিত গণতান্ত্রিক নির্বাচন ও নারীর নিরাপত্তা। এমনকি এই অঞ্চলটির আছে নিজস্ব মুদ্রা, পাসপোর্ট, সেনাবাহিনী ও সরকার। এই স্থানটি হলো একটি স্বঘোষিত স্বাধীন রাষ্ট্র সোমালিল্যান্ড। যদিও বাস্তবে সোমালিল্যান্ড কার্যত একটা স্বাধীন রাষ্ট্রের মতোই কাজ করছে, কিন্তু আন্তর্জাতিকভাবে অন্য দেশগুলো এটাকে এখনো ‘স্বাধীন রাষ্ট্র’ হিসেবে মেনে নেয়নি।

 

তবে দিনকয়েক আগে মধ্যপ্রাচ্যের বিষফোঁড়াখ্যাত ইসরায়েল সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ইসরায়েলের পক্ষ থেকে সোমালিল্যান্ডকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্তটি সাম্প্রতিক সময়ের বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে এক গভীর তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। এটি কেবল একটি কূটনৈতিক স্বীকৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে লোহিত সাগরের নিরাপত্তা, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত, ইরান-সমর্থিত হুথি শক্তির উত্থান, আফ্রিকার হর্ন অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতিগুলোর চ্যালেঞ্জ। তিন দশকের বেশি সময় ধরে কার্যত একটি রাষ্ট্র হিসেবে পরিচালিত হলেও সোমালিল্যান্ড এতদিন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত ছিল। সেই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটালেও ইসরায়েলের এই পদক্ষেপ নতুন করে আঞ্চলিক উত্তেজনা ও বৈশ্বিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

 

উল্লেখ্য, ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে সোমালিয়ার গৃহযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সোমালিল্যান্ড নিজেকে স্বাধীন ঘোষণা করে। এরপর থেকে তারা নিজস্ব প্রশাসন, সংসদ, বিচারব্যবস্থা, সশস্ত্র বাহিনী, মুদ্রা ও পাসপোর্ট ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। বিশে^র রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে সিয়াদ বারের সরকার পতনের পর পুরো সোমালি রাষ্ট্র ভেঙে পড়ে। দেশে আইনশৃঙ্খলার অভাব, গৃহযুদ্ধ আর বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। তখনই সোমালিল্যান্ডের জনগণ নিজেদের আলাদা পরিচয় ঘোষণা করে। তারা নিজেদের সীমানা, সরকার ও প্রশাসন গঠন করে, একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে কার্যত পথচলা শুরু করে। সোমালিল্যান্ডে পতাকা তোলার প্রথম অনুষ্ঠানটি হয়েছিল ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দের ১৮ মে, যা আজও স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালিত হয়। তবে, আফ্রিকার অনেক অঞ্চলে যেখানে রাষ্ট্রীয় কাঠামো দুর্বল, সেখানে সোমালিল্যান্ড তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ও কার্যকর শাসনব্যবস্থা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। তবুও আফ্রিকান ইউনিয়ন ও জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলো সোমালিয়ার আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রশ্নে অনড় অবস্থানে থাকায় তারা কোনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায়নি। ইসরায়েলের স্বীকৃতি সেই দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক নীরবতা ভেঙে দিয়েছে, কিন্তু একইসঙ্গে আফ্রিকান রাজনীতির এক সংবেদনশীল স্নায়ুতে আঘাত করেছে।

 

প্রশ্ন হচ্ছে, যেখানে ত্রিমবছর ধরে আফ্রিকান ইউনিয়নসহ পৃথিবীর কোনো দেশই সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেয়নি, সেখানে অবৈধ এবং ঘৃণিত রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত ইসরায়েল কেনো স্বীকৃতি দিয়ে দিলো? ইসরায়েল কেন এই মুহূর্তে সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দিল- এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে কেবল কূটনৈতিক সৌজন্যের বাইরে তাকাতে হয়। লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদেব প্রণালি বর্তমানে বৈশ্বিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সামুদ্রিক বাণিজ্য এই পথ দিয়ে পরিচালিত হয়। ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে থেকে ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা এই অঞ্চলে ইসরায়েল-সম্পর্কিত বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা শুরু করলে লোহিত সাগর নতুন করে সামরিক উত্তেজনার কেন্দ্রে পরিণত হয়। এই প্রেক্ষাপটে সোমালিল্যান্ডের ভৌগোলিক অবস্থান ইসরায়েলের কাছে অসাধারণ কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে।

 

বিশ্ব মানচিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়, সোমালিল্যান্ড এডেন উপসাগরের তীরে অবস্থিত, ইয়েমেনের ঠিক বিপরীতে এবং বাব আল-মানদেব প্রণালির একেবারে কাছাকাছি। এখান থেকে হুথিদের প্রধান ঘাঁটি হোদেইদাহর দূরত্ব মাত্র কয়েকশ কিলোমিটার। ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে ‘ফরোয়ার্ড ডিফেন্স’ বা সম্মুখপ্রতিরক্ষা নীতিতে বিশ্বাসী, যার মূল কথা হলো শত্রুকে নিজ ভূখণ্ডের কাছাকাছি আসার আগেই দূরবর্তী অঞ্চলে প্রতিহত করা। সোমালিল্যান্ডে কূটনৈতিক ও সম্ভাব্য সামরিক উপস্থিতি ইসরায়েলকে হুথিদের গতিবিধি, ইরান থেকে আসা অস্ত্র সরবরাহ এবং লোহিত সাগরের নিরাপত্তার ওপর নজরদারি করার একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম দিতে পারে।
এই স্বীকৃতির মাধ্যমে সোমালিল্যান্ডের বন্দরনগরী বারবেরা ইসরায়েলের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের অর্থায়নে উন্নত এই বন্দর ভবিষ্যতে ইসরায়েলি নৌ টহল, ড্রোন অভিযান কিংবা গোয়েন্দা কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পারে। এটি শুধু ইরান ও হুথিদের মোকাবিলায় সহায়ক নয়, বরং লোহিত সাগরে ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিস্তারের পথও প্রশস্ত করে। এই অঞ্চলে ইসরায়েলের উপস্থিতি তুরস্কের ক্রমবর্ধমান সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবের প্রতিক্রিয়াও বটে। তুরস্ক ইতোমধ্যে সোমালিয়ার মোগাদিশুতে বড় সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছে এবং গুরুত্বপূর্ণ বন্দরগুলোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ইসরায়েল মনে করে, সোমালিল্যান্ডের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক হর্ন অব আফ্রিকায় তুরস্কের একচেটিয়া প্রভাবের ভারসাম্য রক্ষা করবে।

 

নিরাপত্তার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও সম্পদসংক্রান্ত স্বার্থও এই স্বীকৃতির পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে। সোমালিল্যান্ডে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল, গ্যাস ও বিরল খনিজের সম্ভাবনা রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। আধুনিক প্রযুক্তি ও অস্ত্রশিল্পে ব্যবহৃত এসব কাঁচামাল ইসরায়েলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় সোমালিল্যান্ড ইসরায়েলি বিনিয়োগের জন্য একটি আকর্ষণীয় ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে। এর পাশাপাশি কৃষি, পানিশোধন, উন্নত সেচব্যবস্থা ও সাইবার নিরাপত্তা খাতে ইসরায়েলের প্রযুক্তিগত সহায়তার প্রতিশ্রুতি সোমালিল্যান্ডের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।

 

তবে এই স্বীকৃতিকে ঘিরে সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়গুলোর একটি হলো গাজা থেকে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের আফ্রিকায় পুনর্বাসনের সম্ভাব্য পরিকল্পনা। সোমালিয়া ও কয়েকটি আরবদেশের অভিযোগ, সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেওয়ার পেছনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের একটি গোপন পরিকল্পনা রয়েছে, যার আওতায় ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক সোমালিল্যান্ডে স্থানান্তর করা হতে পারে। যদিও এই বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বা প্রমাণ নেই, তবুও এই আশঙ্কা আরববিশ্ব ও আফ্রিকান দেশগুলোর ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। যদি এমন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়, তবে তা আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন এবং নতুন মানবিক সংকটের জন্ম দিতে পারে।

 

তবে ইসরায়েলের এই পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র ও তাৎক্ষণিকভাবে হয়েছে। আফ্রিকান ইউনিয়ন সোমালিল্যান্ডকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার যেকোনো উদ্যোগ প্রত্যাখ্যান করেছে এবং সোমালিয়ার আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। সৌদি আরব, মিসর, কুয়েত, কাতার, জর্ডানসহ বহু আরব দেশ একে আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থি ও বিভেদমূলক পদক্ষেপ বলে আখ্যায়িত করেছে। তুরস্ক ও মিসর এটিকে লোহিত সাগরের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক ভারসাম্যের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে। যুক্তরাষ্ট্রও এখনো সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেয়নি, যা ইসরায়েলের এই সিদ্ধান্তকে আরও একক ও বিতর্কিত করে তুলেছে।

 

সবচেয়ে উদ্বেগজনক প্রতিক্রিয়া এসেছে সশস্ত্র গোষ্ঠী আল-শাবাবের পক্ষ থেকে। তারা এই স্বীকৃতিকে মুসলিম ভূখণ্ডে ইসরায়েলি সম্প্রসারণের প্রমাণ হিসেবে দেখছে এবং এর বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধের হুমকি দিয়েছে। এর ফলে এতদিন তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকা সোমালিল্যান্ড নতুন করে হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক সোমালিল্যান্ডের জন্য যেমন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দরজা খুলতে পারে, তেমনি তা নিরাপত্তাঝুঁকিও বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।

 

সব মিলিয়ে বলা যায়, সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দিয়ে ইসরায়েল একটি বড় কৌশলগত জুয়া খেলেছে। এটি ইরান ও হুথিশক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ইসরায়েলের অবস্থানকে শক্তিশালী করতে পারে এবং লোহিত সাগরে তাদের প্রভাব বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। একইসঙ্গে এটি আফ্রিকার হর্ন অঞ্চলে নতুন ক্ষমতার সমীকরণ তৈরি করছে। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্ন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং মানবিক উদ্বেগের দিক থেকে গভীর বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ভবিষ্যতে যদি অন্যরাষ্ট্রগুলো ইসরায়েলের পথ অনুসরণ করে সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেয়, তবে আফ্রিকার রাজনৈতিক মানচিত্রে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। আর যদি তা না হয়, তবে এই স্বীকৃতি হয়তো ইতিহাসে একটি সাহসী কিন্তু একাকী ও ঝুঁকিপূর্ণ কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

পূর্বকোণ/পিআর 

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট