চট্টগ্রাম বুধবার, ০১ এপ্রিল, ২০২৬

সর্বশেষ:

আটরশি পীর ও তাঁর দরবার

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

আহমদুল ইসলাম চৌধুরী

৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ | ১:০১ পূর্বাহ্ণ

বস্তুতঃ বিশ্বে তরিক্বত জগৎ তথা সুফি তত্ত্ব নিয়ে রেয়াজত তথা আধ্যাত্মিক সাধনা নিয়ে বহু লেখালেখি রয়েছে। বিশ্বব্যাপী বহু পীর সাহেব তাদের সন্তান বা মুরীদকে কঠোর রেয়াজতে নিয়োজিত রাখার কথা কথিত রয়েছে। তরিক্বতে রেয়াজত করাটা খুবই স্বাভাবিক ছিল। আমাদের দেশে ব্রিটিশ আমল পেরিয়ে পাকিস্তান আমলেও তরিক্বতে রেয়াজতে কামালিয়ত অর্জনে আলোকিত হওয়ার রেওয়াজ ছিল। সাথে সাথে দুনিয়ার যাবৎ ভোগ-বিলাস, আরাম- আয়েশ, শান শওকত পরিহার করার মাধ্যমে স্বর্গীয় ছোঁয়া তথা নিবিড় আধ্যাত্মিকতার পরিবেশ বিরাজ করত। কিন্তু বর্তমানকালে তরিক্বত জগৎ বলতে ভোগ বিলাস,আরাম আয়েশের,শান শওকতের।

একালে পীরের কাছে মুরীদের মূল্যায়ন ধ্যান আধ্যাত্মিক যোগ্যতা সর্বোপরি বুজুর্গী দিয়ে নয়, বরং অর্থ-সম্পদ পার্থিব মান মর্যাদা দিয়ে। ফলশ্রুতিতে আল্লাহওয়ালা ব্যক্তিবর্গ ধর্মীয় জ্ঞানে গভীরতম ব্যক্তিবর্গ তরিক্বত জগৎ থেকে দূরে সরে আছে বলতে পারা যায়। তার বিপরীতে নব্য ধনী ধর্মীয় বিষয়ে অজ্ঞ-মূর্খ ব্যক্তিদেরই বর্তমানে পীরের দরবারে আনাগোনা অত্যধিক পরিলক্ষিত হয় একালে।প্রকৃত তাসাউফ তথা সুফিজম হল কঠোর রেয়াজতের মাধ্যমে দুনিয়া বিমুখ হয়ে রিয়া তথা লোক দেখানো পরিহার করে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা।

দেশে দুনিয়া ও প্রচার বিমুখ যোগ্য পীর সাহেব যে নেই তা কিন্তু নয়। তবে এ সংখ্যা খুবই নগণ্য বলা চলে।
বস্তুতঃ বাংলাদেশ পেরিয়ে ভারতবর্ষে আটরশি বিশ্ব জাকের মঞ্জিলের বিশালত্ব এ কালে ভাববার বিষয়। ১৯৮০ দশকের প্রথম দিকে পর পর দু’বার তথায় যাওয়া হয়েছিল। এ দু’বারই ঐ দরবারের হযরত পীর সাহেব কেবলার মোলাকাত হয়। এ মহান পীর সাহেব ২০০১ খ্রিস্টাব্দের ৩০ এপ্রিল দিবাগত রাত ঢাকার বনানীতে প্রায় ৯০ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। পর দিন ১ মে বাদ আছর বিশ্ব জাকের মঞ্জিলে জানাযা শেষে তারই প্রতিষ্ঠিত তরিক্বতের দরবারে শায়িত করা হয়। তার দুই সহধর্মীনির সংসারে তিনি দুই পুত্র তিন কন্যা সন্তান রেখে যান।

প্রায় ৬০ একর এরিয়া নিয়ে শক্ত মজবুত বাউন্ডারী দ্বারা এ দরবারের মূল এরিয়া। বৃহত্তর এরিয়া প্রায় ৬ শত একর এরিয়া জুড়ে। চারতলা বিশিষ্ট বিশাল হাসপাতাল রয়েছে, সাথে এম্বুলেন্স, ঔষধপত্রসহ যাবতীয় সুযোগ সুবিধা সমেত। ৭/৮ জন ডাক্তার ও নার্স দায়িত্বপালনরত। পীরের দরবারে ছওয়াবের নিয়তে বাৎসরিক ঘুরে ঘুরে সহ¯্র জাকের রয়েছে স্বেচ্ছাসেবী খাদেম হিসেবে। তৎমধ্যে একটি গ্রুপ শুধু মাত্র পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতায় নিয়োজিত রয়েছে পালাক্রমে। শুক্রবার এবং বন্ধের দিন বাদে দৈনিক ৩/৪ হাজার জাকের তথা সেবক দু’বেলা খাবার খায়। শুক্রবার ও ছুটির দিন গুলিতে এ সংখ্যা বেড়ে ৪/৫ হাজার ছেড়ে যায়।
মাজার এরিয়ায় প্রায় ১৫০ ফুট লম্বা ৮/১০ টি দালান রয়েছে। যেগুলো বিশ্ব জাকের মঞ্জিল পরিচালনায় বিভিন্ন অফিস দপ্তর। দরবার এরিয়ার একদিকে ৩/৪ তলা বিশিষ্ট প্রায় ১৫০/২০০ ফুট লম্বাকৃতির দু’টি দালান। যা কামিল মাদরাসা হিসেবে পাঠদানরত। এখানকার ছাত্ররা ফ্রি খাবে। এখানে রয়েছে তিনটি হ্যালিপ্যাড, পোস্ট অফিস, ব্যাংক। নিয়মিত রান্নার জন্য রয়েছে ৫/৬ শত চুলা,স্থায়ী টয়লেট রয়েছে ৬/৭ শত, ৫টি উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন জেনারেটর রয়েছে। তৎমধ্যে একটি জেনারেটরের ক্ষমতা ১ মেগাওয়াট। এখানে মহিলাগণের কঠোর পর্দার ব্যবস্থা রয়েছে বলে ব্যবস্থাপনার পক্ষ থেকে বারে বারে দাবি করা হয়।
সরকারী, আধা-সরকারী, স্বায়ত্তশায়িত বৈদেশিক ও এন জিও গুলোর মাধ্যমে কোন প্রকার সাহায্য তথায় নেই। যাবতীয় আনজাম লক্ষ কোটি জাকের ও ভক্তদের দানে হচ্ছে। ৪ দিনব্যাপী বাৎসরিক ওরশ মাহফিলে ৭০ লক্ষ জাকের ভক্ত শরীক হয় বলে তাদের দাবী। ঐ সময় ১০-১২ বর্গ কিলোমিটারে বিশাল এরিয়া নিয়ে জাকের ও ভক্তের পদচারণায় মুখরিত থাকে। ঐ সময় অসংখ্য জেনারেটর নেয়া হয় ঢাকা থেকে। নির্মাণ করা হয় হাজার হাজার অস্থায়ী শৌচাগার। ঢাকা থেকে শত শত ট্রাকে ওরশ মাহফিলের মালামাল পৌঁছানো হয়।

৪ দিনব্যাপী বাৎসরিক ওরশে ৩ হাজারের অধিক গরু ও মহিষ, ৭ হাজারের অধিক ছাগল জবেহ করা হয়। তার অতিরিক্ত উট, দুব্বা, হরিণ, গয়াল, পাহাড়ী গরুও থাকে। এখানে বাৎসরিক ৭/৮টি মাহফিল হয়।
এখানকার জামে মসজিদ ৫ শত কোটি টাকা ব্যয় সাপেক্ষ। দেশের মধ্যে এটা একটি বিশাল দৃষ্টিনন্দন মসজিদ।
মরহুম হযরত পীর ছাহেবের মাজার নাকি নির্মিত হবে হাজার কোটি টাকা ব্যয় সাপেক্ষে।

মরহুম পীর ছাহেব তার দেয়া মাজার যেয়ারতের নির্দেশনা হল: ১.মাজারে সেজদাহ করবে না, ইহা হারাম ও শিরক। ২.মাজারে বিলাপ বা খেদোক্তি করবে না, উচ্চস্বরে ক্রন্দন করবে না। ৩. মাজারে আলোকসজ্জা করবে না, তবে যেয়ারতের সুবিধার্থে একটু দূরে উঁচুতে এক বা একাধিক বৈদ্যুতিক আলো প্রজ্জলিত করতে পার বা অন্যভাবে আলোর ব্যবস্থা করেত পারে। ৪.মাজারে পুষ্পমাল্য প্রদান করবে না। ৫.মাজারকে ফুলশয্যার বাসর রাতের ঘরের মত সাজাবে না। ৬. মাজারে মোমবাতি বা আতশবাতি জ্বালাবে না। ৭.মাজারে গিলাপ বা ছাদরে আচ্ছাদিত করবে না। ৮.শরীয়তের খেলাপ হয় এমন কাজ করবে না।
এখানে রয়েছে স্থায়ীভাবে শতাধিক মাইক দৈনন্দিন যিকির মাহফিলসহ নানান ঘোষণার জন্য। আছে উট, দুব্বা, গরু, ছাগল ইত্যাদির জন্য হাসপাতাল, সে অনুপাতে ডাক্তার, সেবক।

গত ২০০৮ খ্রিস্টাব্দের ২৩ মার্চ রবিবার পুনঃ যেয়ারতের পাশাপাশি অতিথি হয়ে চট্টগ্রাম থেকে সন্ধ্যার পর এ বিশ্ব জাকের মঞ্জিলে পৌঁছতে সক্ষম হই। সাথে কয়েকজন সহযাত্রী তথা যেয়ারতকারী। ভিভিআইপি আতিথেয়তা বাংলাদেশের জমিনে তরিক্বতের জংশনে যে সম্ভব তা এখানে এসে উপলদ্ধি করলাম। এখানে রয়েছে ভিভিআইপিদের জন্য সেন্ট্রাল শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বিশাল ব্লক। সে অনুপাতে প্রধান খাদেমের নেতৃত্বে ২০/২৫ জনের খাদেম গ্রুপ। বিশাল বিশাল বৈঠকখানা, ডাইনিং রুম, একাধিক শয়ন কক্ষ। সব কিছুতে মনে হয় পাঁচতারকামানকে ছাড়িয়ে যাবে। রাতের খাবার, সকালের নাস্তায় ১০/১২ আইটেমের রাজসিক আতিথেয়তা দেশে তরিক্বতের দরবারে হওয়াটা ভাববার বিষয়।
তাদের সিস্টেম, খাওয়ার টেবিলে খাবার প্ল্যাট ও গ্লাস থাকবে মাত্র। ভাত তরকারী পানির জগ খাদমগণের হাতে হাতে থাকবে। প্রধান খাদেমমহ আমাদেরকে আতিথেয়তার জন্য ৫/৬ জন খাদেম অতি আন্তরিকতার ভিতর সজাগ দৃষ্টিতে আতিথেয়তা দেন।

বস্তুতঃ বিশ্ব জাকের মঞ্জিল ফরিদপুর জেলা সদর থেকে ১৫/২০ কি.মি হতে পারে। দেশের উত্তরবঙ্গে ও দক্ষিণ বঙ্গে বৃহত্তর ফরিদপুরসহ, বৃহত্তর বরিশাল ও বৃহত্তর ময়মনসিংহসহ রংপুর,রাজশাহী ও বরিশাল বিভাগ একাধিক দিয়ে অনেকটা পিছিয়ে। তবে বরিশাল বিভাগে ছারছীনা ও চরমোনাই কঠোর শরীয়তের ভিতর তরিক্বতকে ধরে রেখেছে। কিন্তু বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও বৃহত্তর ফরিদপুরসহ দেশের ঐ দিককার তরিক্বতের জংশনে শরীয়ত খুবই দুর্বল। চট্টগ্রাম অতঃপর সিলেট এরপর নোয়াখালী ও কুমিল্লায় যেভাবে বড় বড় মাদ্রাসা, আলেম ওলামার ব্যাপকতা তাতে তরিক্বতে শরীয়তের প্রভাব অনায়াসে বুঝা যায়।
বিশ্ব জাকের মঞ্জিলের মহান পীর হযরত শাহ সুফি খাজা হাসমত উল্লাহ (রহ.)। তাঁর পীর হচ্ছেন এনায়েতপুর দরবারে হযরত খাজা ইউনুচ আলী (রহ.)। তাঁর পীর হচ্ছেন কলকাতা পাক সার্কাস গোবরা (১) কবরস্থানের উত্তরপাশে শায়িত হযরত সৈয়দ ওয়াজেদ আলী (রহ.)। তাঁর পীর হচ্ছেন কলকাতা মানিকতলায় শায়িত হযরত সৈয়দ ফতেহ আলী ওয়াইসী (রহ.)।
মহান আল্লাহ পাক বিশ্ব জাকের মঞ্জিলে তরিক্বতের খেদমত করতে গিয়ে শরীয়তে কঠোর থাকতে মরহুম হযরত পীর ছাহেব কেবলার সন্তান-সন্ততীদের তাওফিক দান করুক। আমিন॥ (সমাপ্ত)

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট