ইসলামের দৃষ্টিতে সবার বাবা এক আদম (আ.) । সবার মা এক হাওয়া (আ:)। আদম ও হাওয়া থেকে সবা্ইকে সৃষ্টির পর বিভিন্ন গোত্রে ভাগ করেছেন পরিচয় দেওয়ার জন্য। অমুক বংশের গর্ব করার জন্য নয়। আল্লাহর কাছে কোন বংশের দাম নেই। সুন্দর,কালো,ধনী, গরীব ভেদাভেদ নেই। সব সমান। আল্লাহর নিকট দামি শুধু তাকওয়াবান। যার কাছে তাকওয়া বা আল্লাহর ভয় বেশি এবং যিনি আল্লাহর ব্যাপারে সচেতন তিনি বেশি মর্যাদাবান।পৃথিবীতে আল্লাহর সথে সম্পর্ক তৈরীর অন্যতম মাধ্যম হলো তকওয়া। এর মাধ্যমে একজন মুমিন আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরী করতে পারে। তাই আল কোরআনে আড়াইশ’ বারের বেশি এসেছে তাকওয়া শব্দটি। কারণ আল্লাহর ভয় মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট। এই বৈশিষ্ট অর্জন ছাড়া দুনিয়া ও আখেরাতে মুমিন কখনো সফলতা লাভ করতে পারে না। আল্লাহপাক কোরআনে বলেন, ‘হে, মানুষ আমি তোমাদের এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদের বিভ্ন্নি জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমার পরস্পরে পরিচিত হও।নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে সেই সর্বাধিক মর্যাদাবান, যে সর্বাধিক তাকওয়ার অধিকারী। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সব কিছুর খবর রাখেন।’ (হুজরাত:১৩)
তাকওয়া বা আল্লাহর ভয়টা কি? আমরা খলিফা ওমর (রা) এর সময়ের একটি ঘটনা থেকে ধারণা নিতে পারি। ওই সময় এক গোয়ালা পরিবার দুধ বিক্রি করে জীবণ যাপন করতেন। মেয়ে একদিন দুধ কম পাওয়ার কথা জানালো মা-কে। মা তা শুনে মেয়েকে বললেন, পানি মিশিয়ে দিতে। মেয়ে পাল্টা মাকে বললেন,এটা জানতে পারলে খলিফা ওমর (রা) কঠিন শাস্তি দেবেন।মা বললেন,ওমর (রা) জানবেন কিভাবে? কন্যা তখন বললেন,খলিফা ওমর (রা.)না দেখুক,আল্লাহপাক-তো সবকিছু দেখছেন। কেয়ামতের দিন জিজ্ঞাসিত হলে তখন কি জবাব দেব।
বাস্তবে,মা মেয়েকে পরীক্ষা করছিলেন,মন্দ কাজে উৎসাহিত করছিলেন না।সবকিছু তাদের ঘরের বাইরে থেকে শুনছিলেন খলিফা ওমর (রা)।পরে তিনি গোয়ালিনীর কন্যাকে পুত্রবধূ করলেন।ওই কন্যার মাঝে তাকওয়া বা আল্লাহ ভীতি থাকার কারণে মন্দ কাজ করতে পারেননি।আল্লাহপাক তাঁর তাকওয়া পছন্দ করেছেন।
হযরত আলী (রা:)বলেন,চারটি জিনিসের সমষ্টির নাম হলো তাকওয়া।
এক-আল্লাহর ভয়।
দুই-কোরআন,সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করা।
তিন-অল্প আয়ের উপর সন্তুষ্ট থাকা।
চার-মৃত্যু আসার আগে,মৃত্যুর জন্য তৈরী থাকা।
রাসুল (সা:)বলেন,“তোমাদের সুন্দর চেহারার দিকে আল্লা্হ দেখেন না।কলব বা অন্তরের ভেতর কি আছে,তা দেখেন আল্লাহ।ভাল আমল করলে আল্লাহর কাছে দামি।আমলের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করবেন আল্লাহ।সে জন্য যুগে যুগে নবী-রাসুল পাঠিয়েছেন আমলকে সুন্দর করার জন্য”।
আল্লাহপাক বলেন,“তোমাদের আমল সুন্দর হলে দেশের পরিস্থিতি আমি সুন্দর করে দেব।অসুন্দর হলে দূর্যোগপূর্ণ অবস্থা চাপিয়ে দেব।আমল তখন ঠিক হবে,যখন শরীরের সব অঙ্গ–প্রত্যঙ্গ ঠিক হবে।শরীরের প্রধান ‘অন্তর’ তখন ঠিক হবে”।আল্লাহর হুকুম এবং রাসুল (সা:)তরিকা অনুযায়ী হলে দেখা,শোনা,বলা,চলা-ফেরা সবই আমল হিসাবে আল্লাহর নিকট পছন্দনীয় হবে।
মুমিন জীবনের মূলভিত্তি তাকওয়া।যে ব্যাক্তি আল্লাহকে যথার্থভাবে ভয় করেন আল্লাহ তার সকল বিষয় সমাধান করে দেন।আল্লাহ বলেন,‘যে আল্লাহকে ভয় করে আল্লাহ তার মুক্তির পথ বের করে দেন এবং এমন সূত্রে তাকে রিযিক দেন যার কল্পনা সে করেনি’।(তালাক:২-৩)।আল্লাহপাক আরো বলেন, ঈমানদারগণ! তোমার আল্লাহকে ভয় কর, যেরূপ ভয় করা উচিত।আর মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না’।(আল ইমরান:১০২)
এসব আয়াত থেকে বুঝা যায়,আল্লাহকে সত্যিকার অর্থে ভয় করতে হবে। আর আল্লাহকে যিনি ভয় করবেন আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন, তার রিযিকের ব্যবস্থা করবেন এবং তাকে মর্যাদা দান করবেন। যিনি আল্লাহকে ভয় করেন তিনি আল্লাহর কাছে অধিক সম্মানিত। সূরা আনফাল’র ২৯ আয়াতে আল্লাহ বলেন,‘হে ঈমানদারগণ! তোমার যদি আল্লাহকে ভয় করে চল,তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভাল-মন্দর মধ্যে পার্থক্য করার মানদণ্ড দান করবেন। তোমাদের পাপ মিটিয়ে দিবেন। কারণ আল্লাহ বড় অনুগ্রহশীল’।তাকওয়া মানুষকে ভাল-মন্দ,ন্যায়-অন্যায় পার্থক্য করে চলার মানসিকতা তৈরী করে দেয়। আর তাকওয়া মানুষের জীবিকার নিশ্চয়তা দেয়।কেবল তাকওয়ার মাধ্যমে সম্মান লাভ সম্ভব। সুখ-শান্তি, নিরাপদে জীবন যাপনের জন্য তাকওয়াই বড় মাধ্যম।
রাসূল (সা.)বলেছেন,‘যার কর্ম তাকে পিছে সরিয়েছে,তার বংশ মর্যাদা তাকে আগে বাড়াতে পারে না’।তাকওয়া মুমিনের একমাত্র সম্বল।যা মানুষকে সম্মানিত করে।তাই তাকওয়াবানদের আল্লাহ ও তাঁর রাসূল(সা.)সবচেয়ে সম্মানিত বলেছেন।
প্রতিবছর রমজান এসে আমাদের তাকওয়ার বার্তা দিয়ে যায়।তাকওয়া অর্জনের সঙ্গে আল্লাহর ভালোবাসার সম্পর্ক রয়েছে।আল্লাহর ভয়ে সব ধরনের অন্যায়,অত্যাচার,পাপাচার বর্জন করে কোরআন,সুন্নাহ’র নিয়ম মোতাবেক জীবন পরিচালিত করতে হবে।তাহলেই আল্লাহকে সন্ত্তষ্ট রাখা যাবে।কোরআনে আল্লাহপাক ঘোষণা করেন,”হে যারা ঈমান এনেছ তোমাদের ওপর রোযা ফরজ করা হয়েছে যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর ফরজ করা হয়েছিল। যাতে করে তোমরা তাক্ওয়া অবলম্বন করতে পার”।(সূরা বাকারা:১৮৩)।
সব নবীদের ঈমাম রাসুল করিম (সা:)।ওই নবীর উম্মত আমরা।যে নবী কেয়ামতের ময়দানেও উম্মতের জন্য সুপারিশ করবেন।আল্লাহর সামনে সেজদায় পড়বেন।প্রিয় নবীর সুপারিশ কবুল হবে সেদিন।আল্লাহপাক আমাদের তাকওয়াবান হয়ে নেক আমল করার তৌফিক দান করুন।আমিন
লেখক: ব্যুরো প্রধান, বাংলাভিশন, চট্টগ্রাম।
পূর্বকোণ/জেইউ