চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ২৩ মে, ২০২৪

জরাজীর্ণ জিন্দাপীরের মসজিদটি জিন্দা দেখতে চান সবাই

নাসির উদ্দিন

৫ মে, ২০২৪ | ৫:৩৭ অপরাহ্ণ

মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব ছিলেন জিন্দাপীর। তিনি অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ একজন মুঘল বাদশাহ ছিলেন।কোরআন শরীফ নকল এবং টুপি সেলাই করে জীবিকা নির্বাহ করতেন ।একজন বাদশাহ হিসেবে তিনি কোন ভাতা নিতেন না।সারাজীবন মানুষের কল্যাণে কাজ করে গেছেন এই মুঘল সম্রাট।ধর্মপরায়ণ এই মুঘল বাদশাহ তাঁর শাসনামলে গড়ে তুলেন দৃষ্টিনন্দন অনেক মসজিদসহ নানা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান।
এরই ধারাবাহিকতায় সম্রাট আরঙ্গজেবের নির্দেশে শায়েস্তা খাঁ ১৬৬৭ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রামের পাহাড় চূড়ায় একটি মসজিদ নির্মাণ করেন।মুঘল স্থাপত্য শৈলীতে নির্মিত এটি ৩৫৭ বছরের ঐতিহ্যবাহী মসজিদ। ভারতের দিল্লি জামে মসজিদের আদলে বড় বড় পাথর ব্যবহার করে নির্মিত বলে এই মসজিদকে ‘পাথরের মসজিদ’ও বলা হয়।আবার অনেকে বলেন, জিন্দা পীরের মসজিদ। তা কালক্রমে আজ আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ নামে পরিচিত।
তখন বাংলার সুবেদার ছিলেন শায়েস্তা খাঁ। তাঁর পুত্র ছিলেন বুজুর্গ উমেদ খাঁ।এই মসজিদটিতে আরাকান মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের আস্তানা ছিলো।পরে বৃটিশরা অস্ত্রাগার হিসেবে ব্যবহার করে। তারা কিল্লা বা আন্দর কেল্লায় পরিণত করেছিল।তাদের হাত থেকে মসজিদটি উদ্ধারের জন্য সুবেদার শায়েস্তা খাঁ তাঁর পুত্র উমেদ খাঁ-কে নির্দেশ দিলেন।১৬৬৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৭শে জানুয়ারি উমেদ খাঁ এই আন্দরকিল্লার অন্দরে বা ভিতরে প্রবেশ করলে এর নাম হয়ে যায় “আন্দরকিল্লা”।তিনি ১৩ হাজার সৈন্য নিয়ে যুদ্ধের মাধ্যমে মসজিদটি উদ্ধার করেন। চট্টগ্রাম বিজয়ের স্মৃতি ধরে রাখতে সম্রাট আওরঙ্গজেবের নির্দেশে শায়েস্তা খাঁ ১৬৬৭ খ্রিষ্টাব্দে এখানে নির্মাণ করেন “আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ”।
অত:পর ১৭৬১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৮৫৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ৯৪ বছর বৃটিশ সরকার মসজিদটিকে গোলাবারুদের গুদামে পরিণত করে রেখেছিল। পরবর্তিতে জমিদার হামিদুল্লাহ খাঁসহ মুসলমানদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মসজিদটি পুনরুদ্ধার হয়।
মোগল স্থাপত্যরীতিতে এই মসজিদ সমতল ভূমি থেকে ৪০ ফুট ওপরে পাহাড়চূড়ায় নির্মিত হয়েছে। মসজিদের পশ্চিমের দেয়াল পোড়ামাটির ইটে তৈরি, বাকি তিনটি দেয়াল পাথরের। ছাদের মধ্যে একটি বড় গম্বুজ ও দুটি ছোট গম্বুজ। চারটি অষ্টভুজাকৃতি বুরুজের মধ্যে পেছন দিকের দুটি এখনো টিকে আছে। মসজিদের মূল ফটকের পর সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠলে চোখে পড়বে অনিন্দ্যসুন্দর স্থাপত্যে গড়া মসজিদের মূল ভবন, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে মোগল শাসকদের অন্যতম গর্বের ইতিহাস চট্টগ্রাম বিজয়ের ঘটনা।
নির্মাণের পর থেকেই ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের পীঠস্থান হয়ে ওঠে এই মসজিদ। মসজিদটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১৪জন আওলাদে রাসুল খতিবের দায়িত্ব পালন করেন।ফলে অল্পদিনের মধ্যেই এই মসজিদ জনপ্রিয় হয়ে পড়ে।প্রতি জুম্মায় চট্টগ্রাম ও এর আশেপাশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকেও মুসল্লিরা এসে নামাজ আদায় করেন।পবিত্র মাহে রমজানের শেষ জুমায় কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকেও মানুষের সমাগমের নজির আছে। রোজা,ফিতরা এবং ঈদের চাঁদ দেখা প্রশ্নে এই মসজিদের ফয়সালা চট্টগ্রামের সর্বস্তরের জনগণ মেনে চলত অবধারিতভাবে।
১৯৮৬ সালে ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে মসজিদটি পরিচালনার দায়িত্ব দেয় সরকার।সর্বোচ্চ ৩০ হাজারের মতো মুসল্লি এখানে নামাজ আদায় করতে পারেন।কিন্তু ৩৫৭ বছরের ঐতিহ্যবাহী মসজিদটি আজ জরাজীর্ণ। ইতোমধ্যে দ্বিতীয় তলা্য় নামাজ আদায় বন্ধ রয়েছে। দেয়ালের পলেস্তরা খসে পড়ে বের হয়েছে জং ধরা লোহার রড। যে কোন সময় ভেঙ্গে পড়তে পারে দুতলার ছাদ। এর প্রভাবে পানি পড়ে নীচ তলায়ও। তাই প্রশান্তির মসজিদে নামাজ পড়তে এসে অশান্তি বাড়ছে মুসল্লিদের।
এখানে নামাজ আদায় করতে এসে অনেকে আত্নার প্রশান্তি অনুভব করেন। নামাজে যে প্রশান্তি আছে তা একমাত্র নামাজিই বুঝতে পারেন। তাই অনেকে প্রশান্তি খুঁজতে দূর দূরান্তে হলেও পছন্দের মসজিদে ছুটে যান। ৫০ বছর ধরে এই মসজিদের মুসল্লি বেলায়েত হোসেনসহ অনেকেই। তারা মুসল্লি পরিষদ গঠন করে খেমদত করেন মসজিদের। এখন মসজিদটির জারাজীর্ণ অবস্থা নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করে তারা বললেন, মসজিদটি পুন: নির্মাণের একটি প্রকল্প দিীর্ঘদিন যাবত ফাইলবন্দি। সরকারি না হয়ে এটি নাগরিকদের হলে অনেক আগেই সংস্কার হতো । দ্রুত মসজিদটির সংস্কার কাজের জন্য সরকারের হস্তক্ষেপ চান তারা।
মসজিদের পেশ ঈমামের দায়িত্ব পালন করছেন মাওলানা মোহাম্মদ মহিবুল্লা হিল বাকী।বায়তুল মোকাররমের সাবেক এই পেশ ইমাম বললেন, এটি বুজুর্গ মসিজিদও বটে।এখানে নামাজ পড়লে মুসল্লিদের মনে প্রশান্তি আসে।অনেক মসজিদে সেটা পাওয়া যায় না।যে মসজিদটি যতবেশি তাকওয়ার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই মসজিদে নামাজ পড়তে ততবেশি আধ্যাত্নিকতা ও তাকওয়ার তৃপ্তি বেশি হয়। এই মসজিদটি প্রতিষ্টার পেছনে আধ্যাত্মিকতা ও তাকওয়ার বিষয় ছিল তাই এখানে সালাত আদায়ে তৃপ্তি মেলে।অন্য মসজিদ যখন বন্ধ থাকে তখনও এই মসজিদে সারাক্ষন নামাজি থাকে। একইসাথে এই মসজিদ ঐক্যের বার্তা দেয় বিধায় সব মত-পথের মানুষের এটি কেন্দ্রবিন্দু। দ্বীনি বিষয়ে কোন সমস্যা হলে সমাধানের জন্য সবাই এখানে দ্বারস্থ হন বললেন, পেশ ঈমাম।
মসজিদটি পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পরিচালক বোরহান উদ্দিন মো. আবু আহসান বলেছেন,মসজিদটি মানানীয় প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনার নজরে রয়েছে।স্থাপত্য অধিদপ্তরে নকশা প্রণয়নের কাজ চলছে। নকশা চূড়ান্ত হলে পুনঃনির্মাণ কাজ শুরু হবে।দেশে ৫৬৪টি মডেল মসজিদ হচ্ছে সরকারি অর্থায়নে।৩০০ মডেল মসজিদের কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।
ইতিহাসের নানা স্রোত বয়ে গেলেও মানুষের কাছে কখনো এই মসজিদের আবেদন কমেনি। পবিত্র রমজানে হাজারো রোজাদারের জন্য ইফতারির আয়োজন করে মসজিদ কর্তৃপক্ষ। মসজিদের খতিব ছৈয়দ মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন তাহের জাবেরী আল-মাদানীর ব্যক্তিগত উদ্যোগে এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশনের তত্ত্বাবধানে এ ইফতার আয়োজনে সহযোগিতা করছে মুসল্লি পরিষদ।
মুঘল স্থাপত্যশৈলীর নয়নাভিরাম আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ আজ জরাজীর্ণ।দূরবস্থার কারণে দু’তলায় নামাজ পড়া বন্ধ মুসল্লিদের। অথচ মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের দূর্গে ১৩ হা্জার মোঘল সৈন্যের যুদ্ধ জয়ের স্মারক এই মসজিদ।অস্ত্রাগার হিসেবে ৯৪বছর বৃটিশদের দখলে থাকা মসজিদটির পুনঃনির্মাণ কাজ দ্রুত শুরু করার আহবান মুসল্লিদের।জিন্দাপীরের মসজিদটি জিন্দা দেখতে চান সবাই।

লেখক: ব্যুরোচিফ, বাংলাভিশন চট্টগ্রাম

পূর্বকোণ/এএইচ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট