চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ২৮ মে, ২০২৪

সর্বশেষ:

মানুষ এবং জ্বিন কবরের আযাব শুনতে পায় না কেন ?

৫ মে, ২০২৩ | ১২:৫৬ অপরাহ্ণ

দুনিয়ার জীবন আখিরাতের কর্মক্ষেত্র। একদিন সাঙ্গ হবে জীবন। কবর হবে পরকালের প্রথম ঘাঁটি। যে ব্যক্তি ভালো আমল করবে এবং দয়াময় আল্লাহতায়ালার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য প্রস্তুতি নেবে, কবর তার জন্য বন্ধুত্ব ও আনন্দের ঘর। আর যে ব্যক্তি খারাপ আমল করবে এবং আল্লাহর আনুগত্যের ক্ষেত্রে ত্রুটি করবে, কবর তার জন্য ভীতি ও অন্ধকারের ঘর।
মহানবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘কবর পরকালের প্রথম ঘাঁটি। কেউ যদি এখান থেকে মুক্তি পায়, তাহলে পরবর্তী ঘাঁটিগুলো তার জন্য সহজ হবে। আর যদি কেউ কবর থেকে মুক্তি না পায়, তাহলে পরবর্তী ঘাঁটিগুলো তার জন্য আরও কঠিন হবে।’ (তিরমিজি : ২৩০৮)
কোনো ব্যক্তি যখন মারা যায়, তখন সে বরজখে প্রবেশ করে এবং পুনরুত্থান পর্যন্ত সেখানে থাকবে। ইরশাদ হয়েছে, ‘এরপর যখন তাদের কারও মৃত্যু আসবে, তখন সে বলবে, হে আমার রব! আমাকে ফিরিয়ে দাও। যাতে আমি যেগুলো রেখে এসেছি, সেগুলোর ব্যাপারে নেক আমল করতে পারি। কখনও নয়। এটি একটি কথার কথা, সে তা বলবে। আর মানুষের পশ্চাতে রয়েছে বরজখ-পুনরুত্থান পর্যন্ত।’ -সুরা মুমিনুন : ৯৯-১০০

কবর আজাব সত্য, কোন সন্দেহ নেই। হজরত আয়েশা (রা) এর নিকট এক মহিলা কবর আজাব প্রসঙ্গে জানতে চাইল, আয়েশা (রা) এর কবর আজাব সম্পর্কে ধারণা ছিল না। নবী আসার পর তাঁর কাছে জিজ্ঞেস করলেন কবর আযাব সম্পর্কে। তখন তিনি বলেন, কবর আযাব অবশ্যই সত্য। এরপর থেকে নবী (আ) প্রত্যেকদিন নামাজের পর কবর আযাব থেকে ফানাহ চাইতেন। তিনি চাওয়ার উদ্দেশ্য হলো উম্মতকে শিক্ষা দেওয়া। তারা যেন কবর আযাব থেকে ফানাহ চায়। কারণ কবর আযাবের কথা কোরআন এবং অসংখ্য হাদীসে এসেছে।
মানুষ যখন মৃত্যূর নিকটবর্তি হয় আজরাঈল ফেরেশতা আসেন। মুমিন হলে বলে, হে প্রশান্তময় আত্না আল্লাহর নিকট তোমাকে যেতে হবে। তখন মুমিনের রুহ খুশী হয়ে যায় । যাওয়ার জন্য পাগল হয়ে যায়। গ্লাস থেকে পানি পড়ার মতো সহজে রুহ আজরাঈল ফেরেশতা কবজ করেন । অত:পর রুহ নিয়ে ফেরেশতারা আসমানের দিকে যাবেন। আসমানের দরজা তার জন্য খুলে দেয়া হবে। সাত আসমান পার হলে আল্লাহ বলবেন, তোমরা কার রুহ নিয়ে এসেছ? নেকাকার বান্দার রুহ নিয়ে হাজির হয়েছি। তার রুহ লিপিবদ্ধ করে শরীরের মধ্যে ফিরিয়ে দাও। কারণ তার জন্য কিছু ফেরেশতা অপেক্ষা করছে। আবার ফেরেশেতারা রুহ দুনিয়ার মধ্যে এসে তার শরীরের মধ্যে ফেরত দেবেন।
মুমিনের হাদিয়া হলো মৃত্যু। যারা আল্লাহর সাক্ষাতকে পছন্দ করে। আল্লাহও তাদের সাক্ষাতকে পছন্দ করে। মানুষ মৃত্যুকে ভালবাসে না। কিন্তু যখন রহমতের ফেরেশতা আসে রুহ কব্জ করার জন্য, তখন সে আর দুনিয়াতে থাকতে চায় না। মৃত্যুকে ভালবাসে। আমাকে আল্লাহর সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে নাও। রহমতের ফেরেশতা এলে দুনিয়ার নেয়ামত জাহান্নাম মনে হবে। কারণ তাঁর চোখের সামনে ভেসে আসে জান্নাতের অসংখ্য নেয়ামত। তা দেখে নিজের মধ্যে পরকালের বাসিন্দা হবার সাধ জাগে।
ঈমানাদরের রুহ কব্জ কররা সময় ফেরেশেতা সালাম দেয়। ঈমানাদর দ্রুত রুহ বের করার জন্য আগ্রহী হবে। রুহ বের হতে পিঁপড়ার কামড়ের মতো অনুভূতি হবে। জাহান্নামীদের রুহ আজাবের ফেরেশতা দেখার পর বের হইতে চাইবে না। শরীরের মধ্যে ঘুরা ফেরা শুরু করবে। তখন রুহকে টেনে হেঁচড়ে বের করা হবে। জীবন্ত প্রাণী থেকে চামড়া টেনে তুলে ফেলার মতো কষ্ট হবে।
কবরে প্রত্যেক মানুষকে ‘মুনকার-নাকির’ ফেরেশতার তিনটি প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে । যা ‘সওয়াল জওয়াব’ নামে পরিচিত। কবরে শায়িত করার পর তাকে সর্বপ্রথম জিজ্ঞাসা করা হবে-
১.মান রাব্বুকা (তোমার প্রতিপালক কে?) (মুমিন হলে) উওর: রাব্বি আল্লাহ্ (আমার রব আল্লাহ)।
২.মান দীনুকা (তোমার ধর্ম কী ছিল) (মুমিন হলে) উত্তর: দীনি আল ইসলাম (আমার ধর্ম ইসলাম)।
৩. মহানবী (সা.) কে দেখিয়ে বলা হবে ‘মান হাযার রাজুল? (এ ব্যক্তিটি কে?) (মুমিন হলে) উত্তর: হাযা রাসুলুল্লাহ্ (তিনি আল্লাহর রাসুল)
দুনিয়ায় আরবি ভাষা না বুঝলেও কবরের মধ্যে আরবি ভাষা বুঝার তৌফিক দেবেন আল্লাহ। কারণ মানুষের জন্মগত ভাষা আরবি। কেউ যদি কোন ভাষার সংমিশ্রনে না আসে না শুনে তাহলে সে আরবিতে কথা বলার ক্ষমতা লাভ করবে।
মৃত্যুর পর সব আমলনামা বন্ধ হয়ে যায়। তিন প্রকার আমলের সওয়াব মুত্যুর পরও যাবে। সদকায়ে যারিয়া, মৃত্যুরপরও অনেকদিন পর্যন্ত চালু থাকে। মসজিদের মধ্যে পাখা দিলেন। মসজিদ-মাদরাসা নির্মাণে শরীক হলেন। সমজা কল্যাণ মূলক কাজ। রাস্তা-ঘাট, ব্রিজ নির্মাণ। মৃত ব্যাক্তির ভাল কাজের অনুসারী যতদিন থাকবে ততদিন তার আমলনামায় সওয়াব যাবে। দ্বিন, জ্ঞান, শিক্ষাদান-কোরাআন শিক্ষা দিলেন। নেককার সন্তান দুনিয়ায় রেখে গেলেন। নেককার সন্তান প্রতিদিন আপনার জন্য দোয়া করে। এই দোয়ার কারণে আমলনামায় সওয়াব যাবে।
বেনামাজি, আল্লাহকে না চেনা, তার আদেশ অমান্য করা এবং গোনাহের কাজে লিপ্ত হওয়া কবরের আজাবের অন্যতম কারণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) কুৎসাকারী ও পরনিন্দুক, অপবিত্র, মিথ্যুক, ব্যভিচারী এবং সুদখোরদের সম্পর্কে কবরের আজাব ভোগের কথা বলেছেন। এ ছাড়া অনেকের কথা রাসুলুল্লাহ (সা.) উল্লেখ করেছেন।
বান্দাকে যখন কবরে রাখা হয়এবং তাকে রেখে সাথীরা চলে আসতে থাকে, তখন সে তাদের জুতার শব্ধ শুনতে পায়। এ সময় দু’জন ফেরেশেতা এসে তাকে তুলে বসান। অত:পর তারা প্রশ্ন করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) সম্পর্কে তুমি কি বলতে? তখন সে বলবে আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি তিনি আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল। তখন তাকে বলা হবে , জাহান্নামে তোমার অবস্থানের জায়গা দেখে নাও; যার পরিবর্তে আল্লাহ পাক তোমার জন্য জান্নাতে জায়গা নির্ধারিত করে রেখেছেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, তখন সে দুটি জায়গা একই সময় দেখতে পাবে। আর যারা কাফের মোনাফেক তারা বলবে, আমি জানি না। অন্য লোকেরা যা বলতো আমিও তাই বলতাম। তখন তাকে বলা হবে, না তুমি নিজে জেনেছ, না শিখেছ। তারপর তার দুই কানের মধ্যবর্তি স্থানে লোহার মুগুর দিয়ে জোরে আঘাত করা হয়, এতে সে বিকট চিৎকার করে উঠে। মানুষ এবং জ্বিন ছাড়া সকলেই শুনতে পায়। (বোখারী:১১৭২)
মানুষ এবং জ্বিন যদি কবর আযাব শুনতে পায় পৃথিবীর মধ্যে কেউ আর খারাপ থাকবে না। সব ঈমানদার হয়ে যাবে। কবরের সে আযাবের কারণে । আর কেউ অমুসলিম থাকবে না। গুনাহগার থাকবে না। সবাই নবীদের তো নিষ্পাপ হয়ে যাবে। তখন ঈমান বিল গায়েব হবে না। আল্লাহ চান, না দেখে ঈমান আনুক, না শুনে ঈমান আনুক । ঈমান বিল গায়েব হলে আল্লাহ মহান পুরষ্কার দিবেন। কিন্তু দেখলে সবাই তওবা করে ভাল হয়ে যেতে চায়। এই কারনে পরীক্ষা করার জন্য আল্লাহ পাক কবর আযাবের চিৎকার মানুষ-জ্বিন থেকে বধির করে রেখেছেন।
মৃত্যুর পর মরদেহকে যেখানেই রাখা হোক না কেন কিংবা যেভাবেই রাখা হোক না কেন, সে কবরের অধিবাসী হয়ে যায়। বদকার হলে তার ওপর আজাব শুরু হয়ে যায়। আর নেককার হলে তার জন্য জান্নাতের আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করা হয়। কবর মূলত কোনো গর্তের নাম নয়। বরং লাশকে যেখানেই দাফন করা হবে সেটাই তার কবর। আজাব হয় রুহের ওপর। আর দেহ সে আজাবের কষ্ট ভোগ করতে থাকে। তাই দেহ জ্বলেপুড়ে ছাই হয়ে গেলেও রুহের ওপর কবরের আজাব হতে কোনো বাধা নেই। আর কবরের আজাব হওয়ার জন্য লাশ অবিকৃত অবস্থায় বাকি থাকা জরুরি নয়। বরং আল্লাহতায়ালা যেমন প্রথমে অত্যন্ত সহজভাবে দেহ সৃষ্টি করেছেন তেমনি লাশের বর্তমান দেহ জ্বলেপুড়ে ভস্ম হয়ে গেলেও ওই ব্যক্তির দেহকে পুনরায় নতুনভাবে সৃষ্টি করে শাস্তি দেবেন।
মহানবী (সা.) বলেন, কবর আযাব থেকে বাঁচতে চাইলে প্রত্যেকদিন নামাজ আদায় কর, রোযা রাখ, যাকাত আদায় কর এবং ইসলামের হুকুম আহকাম মেনে চল। কবরের মধ্যে নামাজ পাহারা দেবে মাথার দিক দিয়ে, রোযা পাহারা দিবে ডানদিক দিয়ে, যাকাত পাহারা দিবে বাম দিক দিয়ে, অন্যান্য আমলগুলো পায়ের দিকদিয়ে পাহারা দিবে। আযাবের ফেরেশতা যখন আসতে চাইবে তখন শরীরের সব দিক দিয়ে এভাবে বাধা দিবে।
রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন; ‘কোরআন শরিফে ৩০ আয়াতবিশিষ্ট একটি সুরা আছে, যা তার তিলাওয়াতকারীকে ক্ষমা করে না দেওয়া পর্যন্ত তার জন্য সুপারিশ করতেই থাকবে। সুরাটি হলো মুলক।
আল্লাহ পাক আমাদের সকলকে কবর আযাব থেকে বাঁচার জন্য তৌফিক দান করুন। আমিন।

লেখক: ব্যুরোচিফ, বাংলাভিশন, চট্টগ্রাম

পূর্বকোণ/এএইচ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট