চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ৩১ জানুয়ারি, ২০২৩

সর্বশেষ:

২৪ জানুয়ারি, ২০২৩ | ১০:৩৮ পূর্বাহ্ণ

মোহাম্মদ আলী, মহেশখালী থেকে ফিরে

কর্মহারাদের পাশে নেই কেউ

একদিকে চলছে দেশি-বিদেশি অর্থায়নে প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকার বিভিন্ন প্রকল্পের কর্মযজ্ঞ। অন্যদিকে চলছে এ কর্মযজ্ঞকে ঘিরে পেশা হারানো মানুষের হাহাকার। বংশ পরম্পরায় কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করা মানুষগুলোর এখন চরম বেকারত্বে দিন কাটছে। বঙ্গোপসাগর উপকূলীয় উপজেলা মহেশখালীর মাতারবাড়ি ও ধলঘাট ইউনিয়নের চিত্র এটি।

 

 

পেশা হারিয়ে চরম অনিশ্চিয়তার মধ্যে আছেন এ দুই ইউনিয়নের ১০ হাজার বাসিন্দা। তিন বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য ২৬০০ একর লবণ ও চিংড়ি ঘেরের জমি অধিগ্রহণের কারণে এ সমস্যা তৈরি হয়েছে। পরিবার-পরিজনের ভরণ-পোষণ চালাতে গিয়ে অনেকে টানাপোড়নের মধ্যে পড়েছেন। কক্সবাজার জেলার মহেশখালীর এ দুই ইউনিয়নের জমি অধিগ্রহণকৃত এলাকা ঘুরে এ চিত্র পাওয়া গেছে।

 

 

সরকারি প্রতিষ্ঠান ‘কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড’ (সিপিজিসিবিএল) মাতারবাড়ি বিদ্যুৎ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। একইসাথে নির্মাণ করা হচ্ছে গভীর সমুদ্র বন্দরও। এজন্য ২০১৪ সালে মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ি ও ধলঘাট ইউনিয়নের ১৪১৪ একর ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়।

 

 

এদিকে মাতারবাড়ি ইউনিয়নের সর্ব উত্তরে ৬০০ মেগাওয়াটের আরো একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে ১২০০ একর। এ নিয়ে সরকারি দুটি প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ হয় প্রায় ২৬০০ একর। প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে এসব জমিতে হতো লবণ মাট ও চিংড়ি ঘের। সর্বশেষ অধিগ্রহণকৃত ১২০০ একর ভূমির প্রকল্পটির পশ্চিম পাশে বঙ্গোপসাগর এবং উত্তর-পূর্বে কোহেলিয়া নদী। সিঙ্গাপুরের অর্থায়নে প্রকল্পটির জন্য এসব জমি অধিগ্রহণ করা হয়।

 

 

স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকারি উন্নয়ন কর্মযজ্ঞে দ্বীপের সামগ্রিক চিত্র পাল্টে গেলেও ভাগ্য বদলায়নি এক সময়ে এসব জমিতে কাজ করা প্রায় ১০ হাজার শ্রমিকের। তারা স্থানীয় বাসিন্দা, এসব জমিতে লবণ মাট ও চিংড়ি ঘেরে কাজ করতেন। কিন্তু লবণ মাট ও চিংড়ি ঘেরে জমি অধিগ্রহণ হওয়ায় পেশা হারিয়ে ফেলেন এসব শ্রমিক। তাতে অনিশ্চিত হয়ে পড়ে তাদের ভবিষ্যৎ। এখন পরিবার-পরিজন নিয়ে কষ্টে জীবন কাটাচ্ছেন তারা।

 

 

স্থানীয়রা জানায়, মাতারবাড়ি ও ধলঘাট ইউনিয়ন বাসিন্দাদের আগে প্রধান পেশা ছিল চিংড়ি ঘের ও লবণ মাট তৈরি। আগে এসব জমি বছরের অর্ধেক সময় চিংড়ি ঘের এবং অবশিষ্ট সময় লবণ মাঠ হিসেবে ব্যবহার হতো।

 

 

এ প্রসঙ্গে মাতারবাড়ি ৪নং ওয়ার্ডের সাবেক মেম্বার হাজি বশির আহমদ বলেন, ‘মাতারবাড়ি ইউনিয়নে মোট জমির পরিমাণ প্রায় ১০ হাজার একর। এরমধ্যে ২ হাজার একর জমিতে ধানসহ বিভিন্ন ফসলের চাষাবাদ করা হয়। অবশিষ্ট ৮ হাজার একর জমিতে চাষ হয় লবণ ও চিংড়ি। কিন্তু জমি অধিগ্রহণের কারণে প্রায় ১০ হাজার মানুষ কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েছেন। এসব মানুষ লবণ ও চিংড়ি চাষ, মালামাল লোড-আনলোড, বিপণন ও পোনা আহরণের সাথে জড়িত ছিল।

 

 

পেশা হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েন ধলঘাট ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের মহুরীঘোনা গ্রামের বাসিন্দা আলী আজগর (৬০)। চিংড়ি ঘের করে পরিবার-পরিজনের ভরণপোষণ চালাতেন তিনি। মা, স্ত্রী ও ৬ ছেলেসহ ৮ সদস্যের পরিবার নিয়ে তার এক সময় সুখের সংসার ছিল। ছেলেদের কিছু কিছু লেখাপড়াও করিয়েছেন। কিন্তু কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য জমি অধিগ্রহণের কারণে তিনি জীবিকা হারান। বেকারত্বের কারণে তার সংসারে এখন টানাপোড়েন লেগেই রয়েছে।’

 

 

আলী আজগরের মতো একই কথা বললেন, একই এলাকার বাসিন্দা আমান উল্লাহ (৩৬)। পেশায় তিনি লবণ চাষি ছিলেন। লবণের চাষ করে তিনি স্ত্রী, তিন ছেলে ও এক কন্যা সন্তান নিয়ে সংসার চালাতেন। কিন্তু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য জমি অধিগ্রহণ হওয়ায় কর্মহীন হয়ে পড়েন তিনি।

 

 

দৈনিক পূর্বকোণকে তিনি বলেন, ‘৬ কানি জমি বর্গা নিয়ে লবণ চাষ করতাম। লবণ বিক্রি করে সারাবছর সংসার চলতো। কিন্তু কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য চাষকৃত জমি অধিগ্রহণ হয়ে যাওয়ায় এখন আমি সম্পূর্ণ বেকার। বর্তমানে দিন মজুরি কাজ করে সংসার চালাচ্ছি। কিন্তু প্রতিদিন কাজ না পাওয়ায় সংসারে টানাপোড়েন লেগেই রয়েছে।’

 

 

জানতে চাইলে ভূমিহীন জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা প্রকল্পের মহেশখালীর সভাপতি মাওলানা মোহাম্মদ মহসীন দৈনিক পূর্বকোণকে বলেন, ‘বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও গভীর সমুদ্র বন্দরের জন্য জমি অধিগ্রহণ হওয়ায় মহেশখালীর মাতারবাড়ি ও ধলঘাট ইউনিয়নের কমপক্ষে ১০ হাজার মানুষ পেশা হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েন। এসব মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থানের কোন ব্যবস্থা না হওয়ায় তারা জীবন ও জীবিকা নিয়ে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছেন।’

 

পূর্বকোণ/আরএ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট