চট্টগ্রাম বুধবার, ০৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৩

সর্বশেষ:

১৫ জানুয়ারি, ২০২৩ | ১২:৫৬ অপরাহ্ণ

ইসলাম জিগার, রাঙ্গুনিয়া

পোড়াবাড়িতে শুধু দেয়াল, শ্মশানের পাশে আহাজারি ও কান্নার শব্দ

আহাজারি থামছে না রাঙ্গুনিয়ায় একই পরিবারের পাঁচজনের আগুনে পুড়ে অঙ্গার হয়ে মৃত্যুবরণ করা স্বজনদের। বিশেষ করে গৃহকর্তা খোকন বসাকের স্ত্রী লাকি দে’র মা চিনু দে এবং খোকনের দুই বোন অঞ্জনা শীল ও ঋণী দেব এর কান্না কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না।

নিজের মেয়ে ও আদরের দুই নাতি-নাতনিকে হারিয়ে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন চিনু দে। শনিবার (গতকাল) সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তাকে শ্মশানখোলার পাশ থেকে ঘরে ফেরানো যায়নি। বয়স্কজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করা নিজের শাশুড়ির লাশ ঘরে রেখেই নিজের মেয়ে ও নাতিদের মৃত্যুর খবরে ছুটে এসেছিলেন তিনি। লাকি দে’র দুইবোন মনি দে ও ঝর্ণা দে’সহ স্বজনরা প্রানপণ চেষ্টা করেও মাকে ঘরে ফেরাতে পারছেন না।

শনিবার (গতকাল) দুপুরে গিয়ে দেখা যায়, রান্নাঘরের হাঁড়ি পাতিল সব কিছু ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, পোড়া গন্ধ চারদিকে। নেই বলতে কোনো কিছুই অবশিষ্ট নেই পোড়া বাড়িতে। আধাপাকা ঘরের চারটি কক্ষে ঘরের আসবাবপত্র কিছুই নেই। আলমারির নতুন কাপড় চোপড়ও পুড়ে গেছে। আছে শুধু পাশের বাড়ির উঠোনে ও শ্বশানখোলার পাশে আহাজারি আর কান্নার শব্দ।

বৃহস্পতিবার (১২ জানুয়ারি) দিবাগত রাত ২টার দিকে রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পারুয়া ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ড মহাজনপাড়ার খোকন বসাকের বসতঘরে ভয়াবহ আগুনে পুড়ে মারা যায় খোকনের বাবা কাঙ্গাল বসাক (৭০), মা ললিতা বসাক (৬০), স্ত্রী লাকী দে (৩২), ছেলে সৌরভ বসাক (১২) ও মেয়ে শায়ন্তী বসাক (৬)। অগ্নিদগ্ধ খোকন বসাক (৪২) এর শরীরের ২০ শতাংশ পুড়ে যায়। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন এন্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে ভর্তি খোকন বসাকের অবস্থাও শঙ্কামুক্ত নয় বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। ঘটনার পরপর শুক্রবার ভোররাতে অগ্নিদগ্ধ খোকনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

 

যন্ত্রণায় কাতর খোকনকে দিনভর জানানো হয়নি পরিবারের আর কেউ বেঁচে নেই সেই কথা। শুক্রবার বিকেলে জন্মদাতা বাবা-মা, প্রিয়তম স্ত্রী ও আদরের দুই সন্তানের লাশ পোস্টমর্টেম করার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেলের মর্গে নিয়ে যাবার পর স্বজনরা তাকে মর্মান্তিক এই খবরটি জানান। এরপর থেকেই অনেকটা নির্বাক সব হারানো খোকন বসাক।

শুক্রবার (১৩ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় ময়নাতদন্ত শেষে স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন শ্মশানে আগুনে অঙ্গার হয়ে মৃত্যুবরণ করা একই পরিবারের দুই শিশুসহ পাঁচজনকে একসঙ্গে সৎকার করা হয়েছে। এসময় মৃতদের স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। শনিবারও (গতকাল) পারুয়ার মহাজন পাড়ায় গিয়ে দেখা যায় স্বজনদের আহাজারি যেন থামছেই না। শ্মশানের ছাই ভস্মের পাশে বসেই অঝোরে কাঁদছিলেন কাঙ্গাল বসাকের দুই মেয়ে অঞ্জনা শীল ও ঋণী দেব। ঘটনার সময় তারা ছিলেন শ্বশুরবাড়িতে। খবর পেয়ে তারা শুক্রবার সকালে ছুটে আসেন।

অঞ্জনা শীল বলেন, ‘আজ বেঁচে থাকলে আমার ভাতিজি শায়ন্তী বসাক সাত বছরে পা দিতো। তার জন্মদিন উপলক্ষে শুক্রবারের মধ্যে আমরা যাতে চলে আসি সেজন্য বাবা তাগাদা দিয়েছিলেন। আমরাও দুপুরের দিকে আসবো বলে প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। আমরা এসেছি ঠিকই, কিন্তু আমরা আসার আগেই তারা চিরদিনের জন্য চলে গেলো। একসঙ্গে আমার বাবা-মাসহ সবাইকে হারাবো তা ভাবতেও পারিনি। আমার মা-বাবা অসুস্থ ছিলেন। এই শোক আমরা কীভাবে সামলাবো !’

এদিকে বৃহস্পতিবার রাতে বয়স্কজনিত রোগে মারা যান চিনু দে’র শাশুড়ি। শুক্রবার ভোরে সৎকারের প্রস্তুতি চলছিল। এমন সময় মেয়ে লাকি দে’র শ্বাশুর বাড়িতে আগুনে দুর্ঘটনা ও পুড়ে মারা যাওয়ার খবর পেয়ে ছুটে আসেন চিনু দে (৬৫)।

 

পূর্বকোণ/এএস

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট