চট্টগ্রাম সোমবার, ০৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৩

১০ ডিসেম্বর, ২০২২ | ১১:৫৬ পূর্বাহ্ণ

নরোত্তম বনিক, সন্দ্বীপ

রাজাকারদের কাছে আমরা ছিলাম আতঙ্ক

সন্দ্বীপ উপজেলার সারিকাইত ইউনিয়নের হারাধন মজুমদারের ছেলে রণধীর মজুমদার তড়িৎ। নবম শ্রেণী পর্যন্ত সাউথ সন্দ্বীপ হাইস্কুলে লেখাপড়া করে দশম শ্রেণিতে নোয়াখালী বোনের বাড়িতে চলে যান। সেখানে রামগতি উচ্চ বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণিতে ভর্তি হবার কিছুদিন পর মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে তিনি বাড়িতে চলে আসেন।

 

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি পূর্বকোণকে বলেন, দেশের টানে ১৯৭১ সালে সন্দ্বীপ উপজেলার মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক আজিজ ডাক্তারের সাথে আলোচনা করে পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২৫ জুলাই রাতে বাড়ি থেকে পালিয়ে সাউথ সন্দ্বীপ হাইস্কুলের মাঠে আসি। রাতের অন্ধকারে আমরা ১শ জন পায়ে হেঁটে গাছুয়া ঘাটে আসি। ভোররাতে ঘাট থেকে বড় নৌকায় করে সাগর পাড়ি দিই। দুপুর নাগাদ মিরসরাই মিয়াজান ঘাটে পৌঁছি। সেখানে একটা চায়ের দোকানে খাওয়া-দাওয়া সেরে নিই। এরমধ্যে শহরের বিভিন্ন স্থান থেকে মুক্তিকামী যুবকেরা জড়ো হতে থাকে।

 

একদলে প্রায় ৪০০ জন যুবক একত্রিত হয়ে রাতে আমরা একটা গাইড নিয়ে রাতের অন্ধকারে শুভপুর দিয়ে বর্ডার পার হয়ে ভারত আসি। গাইডের সাথে আমরা ভারতের আমলীঘাট হয়ে শ্রীনগর রাস্তায় উঠি। রাস্তা থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর গাড়ি করে মনু বাজার পৌঁছি। সেখানে সিটি কলেজের সাবেক জিএস খালেকুজ্জামানের কাছে নাম রেজিস্ট্রেশন করাই। তিনি একটা টোকেন দেন। সেটি নিয়ে আরো তিন কিলোমিটার হেঁটে হরিণা ইয়ুথ ক্যাম্পে আসি।

 

ক্যাম্পে এসে দেখা হয় মাইটভাঙ্গার মাস্টার হাফিজুর রহমানের সাথে। ক্যাম্পের রওশন আরা ব্যারাকে আমি সিট পাই। সেখানে ৪/৫ দিন থাকার পর আমাদের পাহাড়ের ভিতর ক্যাপ্টেন এনামের নেতৃত্বে ১৭ দিন প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এরপর বগাপা ট্রেনিং সেন্টারে ভারতীয় সেনাবাহিনী ২১ দিনের প্রশিক্ষণ দেয়। প্রশিক্ষণ শেষে আমরা হরিণা আর্মি ক্যাম্পে ফিরে আসি। সেখানে কিছুদিন থাকার পর অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি আমরা কাশেম ভাইয়ের নেতৃত্বে ১১৩ জনের মুক্তিযোদ্ধা টিম সন্দ্বীপ আসি।

 

সন্দ্বীপে আমি সাবেক ডিসি আমিন রসুল ভাইয়ের অধীনে শিবের হাট সাউথ সন্দ্বীপ হাইস্কুলের বিল্ডিংয়ের দ্বিতীয় তলায় ক্যাম্পে আসি। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে সন্দ্বীপ এসে জাহিদুর রহমান মোক্তারকে গুলি করে হত্যা করে ও কয়েকটি বাড়িতে আগুন দেয়। হানাদার বাহিনী সন্দ্বীপ দু’দিন থেকে চলে যায়। স›দ্বীপে ছিল রাজাকার এবং মিলিশিয়া বাহিনী। তারা বিভিন্ন বাড়ি ঘরে আগুন দেয় ও লুটপাট করে। আমি আসার দু’দিন পর হাই স্কুলের মাঠে ৪ জন রাজাকারকে ধরে এনে প্রকাশ্যে গুলি করা হয়।

 

এরপর শিবের হাট থেকে ন্যায়ামস্তি ইউনিয়নে (বর্তমানে ভাসানচর) প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্যাম্পে আসি। রাজাকার ফয়েজ উল্লা চেয়ারম্যানকে মুক্তিযোদ্ধারা গুলি করে মারা হয়। সবকিছু মিলিয়ে আমরা সন্দ্বীপে দেশ বিরোধী রাজাকার ও তাদের অনুসারীদের কাছে আতঙ্ক ছিলাম। এরপর থানা আক্রমণ করে দখল করা হয়। ৫ ডিসেম্বর আবার সাউথ সন্দ্বীপ হাইস্কুলের ক্যাম্পে আসি। এরমধ্যে আমাদের বিজয় হয়। আমরা স্বাধীন দেশের পতাকা পাই।

 

দেশ স্বাধীন হওয়ার অনেক পর আমি সরকারি চাকরিতে যোগদান করি। স্বাধীন দেশের পাশাপাশি বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সম্মান ও স্বীকৃতি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ পাওয়া।

পূর্বকোণ/আর

 

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট