চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ০৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২৩

২ ডিসেম্বর, ২০২২ | ১১:৪৯ পূর্বাহ্ণ

মিনারুল হক, বান্দরবান

সংঘাত লেগেই আছে বান্দরবানে

শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের ২৫ বছর পূর্তি পালিত হচ্ছে পাহাড়ে। সরকারি দল আওয়ামী লীগ চুক্তির অধিকাংশ বিষয় বাস্তবায়নের দাবি করে বর্ণাঢ্য আয়োজনে চুক্তি স্বাক্ষরের উৎসব পালন করলেও জনসংহতি সমিতি এ দাবি অস্বীকার করে আসছে।

 

মামলা হামলার ভয়ে জনসংহতি সমিতির অধিকাংশ নেতা এখন এলাকা ছাড়া। নেতারা এলাকায় না থাকলেও তাদের সশস্ত্র গ্রুপের চাঁদাবাজি সন্ত্রাসী তৎপরতা বন্ধ নেই। দুর্গম এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংগঠনটির সশস্ত্র গ্রুপ এখনো নানা কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে গত দশ বছরে গজিয়ে উঠেছে বান্দরবানে অনেক সশস্ত্র সংগঠন। এগুলোর মধ্যে জনসংহতি সমিতির সংস্কার গ্রুপ, ইউনাইটেড পিপল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ), ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক, মগ লিবারেশন পার্টি ও সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত কুকি চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট বা কেএনএফ।

 

বান্দরবানের জনসংহতি সমিতি ও অন্যান্য সংগঠনের আধিপত্যের কারণে ইউপিডিএফ’র তৎপরতা নেই বললেই চলে। এছাড়া বাঘমারা বাজারে জনসংহতি সমিতির সংস্কার গ্রুপের ছয় নেতাকে গুলি করে হত্যার পর এ সংগঠনটিরও অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। বর্তমানে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করছে জনসংহতি সমিতি (সন্তু), মগ লিবারেশন পার্টি, কুকি চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট কেএনএফ ও ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক। এই চারটি সংগঠনের আধিপত্য লড়াই ও ব্যাপক চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ এলাকার সাধারণ লোকজন।

 

গত পাঁচ বছরে জনসংহতি সমিতি, মগ লিবারেশন পার্টি ও জনসংহতি সমিতির সংস্কার গ্রুপের মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বদ্বে অর্ধশত লোক নিহত হয়েছে। এদের মধ্যে উভয় দলের নেতাকর্মী সমর্থক ও সাধারণ লোকজন রয়েছে। আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে খুন হয়েছে সরকারি দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীও। সশস্ত্র এ সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে গিয়ে আহত হয়েছে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরাও। সাম্প্রতিক সময়ে গজিয়ে ওঠা কুকি চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের বিরুদ্ধে জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগে বান্দরবানে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে নিরাপত্তা বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান চলছে। এই অভিযানে জঙ্গি ছাড়াও আটক হয়েছে কেএনএফ সদস্য।

 

সন্ত্রাসী বাহিনীগুলোর কর্মকাণ্ডে এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্য পর্যটন শিল্পে অস্থিরতা বিরাজ করছে। পর্যটকদের উপর অপ্রীতিকর ঘটতে পারে এই আশঙ্কায় ও রুমা ও রোয়াংছড়ি উপজেলায় পর্যটকদের যাতায়াত বন্ধ রয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো এখন জেলা শহরে এসে চাঁদাবাজি করছে। সব ধরনের ব্যবসায়ীদের সংগঠনগুলোকে চাঁদা দিয়ে ব্যবসা চালাতে হচ্ছে। আগে শুধু জনসংহতি সমিতি থাকলেও এখন আরও বেশ কয়েকটি সংগঠনকে চাঁদা দিতে হচ্ছে। অন্যদিকে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে হামলার আশঙ্কায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী থেকে শুরু করে আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর নেতাকর্মী সমর্থকরা দুর্গম এলাকা ছেড়ে এখন জেলা শহরে এসে বসবাস করছে।

 

শান্তি চুক্তির পর জেএসএস ভেঙে গঠিত হয়েছে ইউপিডিএফ। ২০০৫ সালের দিকে জেএসএস আরেক দফা ভেঙে গঠিত হয় জেএসএস সংস্কার (এমএন লারমা)। ২০১৯ সালের দিকে শুধুমাত্র বান্দরবান জেলায় হঠাৎ গড়ে তোলা হয় মগ লিবারেশন পার্টি নামে আরেকটি সশস্ত্র সংগঠন। ২০২০ সালের দিকে ইউপিডিএফ ভেঙে গঠিত হয়েছে ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)। এসব দলের হাতে রয়েছে সর্বাধুনিক বিদেশি ভারী অস্ত্র ও গোলাবারুদ। আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজির দ্বদ্বে গত তিন বছরে বান্দরবানে এই পাঁচ সশস্ত্র সংগঠনের ভ্রাতৃঘাতি সংঘাতে জড়িয়ে নিহত হয়েছে ২০ জনেরও অধিক।

 

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালের ৭ মে মগ লিবারেশন পার্টির সদস্যরা জনসংহতি সমিতির কর্মী বিনয় তঞ্চঙ্গ্যাকে গুলি করে হত্যা করে। অপহরণ করা হয় ফোলাধন তঞ্চঙ্গ্যা নামের অপর কর্মীকে। এখনও তার কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। ৯ মে জনসংহতি সমিতির সমর্থক জয় মনি তঞ্চঙ্গ্যাকে গুলি চালিয়ে হত্যা করে। ১৯ মে জেএসএস সদস্যরা রাজবিলায় আওয়ামী লীগের সমর্থক ক্য চিং থোয়াই মারমাকে (২৭) অপহরণের পর গুলি চালিয়ে হত্যা করে। ২২ মে রাতে জেএসএস এর সদস্যরা আওয়ামী লীগ নেতা চথোয়াইমং মারমাকে বালাঘাটার চড়ুইপাড়া এলাকা থেকে অপহরণের পর হত্যা করে। ২৫ জুন রোয়াংছড়িতে আওয়ামী লীগ কর্মী অংসিচিং মারমাকে গুলি করে হত্যা করে হত্যা করা হয়।

 

২২ জুলাই রোয়াংছড়ির শামুকঝিড়ি এলাকায় জেএসএস সদস্যরা তারাছা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মংমং থোয়াই মারমাকে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে। ২০২০ সালের ৭ এপ্রিল জেএসএস মুল দলের সদস্যরা রোয়াংছড়ি উপজেলার কানাইজোপাড়ায় জেএসএস সংস্কাপন্থী এমএন লারমা গ্রুপের ৬ নেতাকে ব্রাশফায়ারে হত্যা করে। ১৫ মে জেএসএস সদস্যরা রুমা উপজেলার গালেগ্যা ইউনিয়নের দুই বোট চালককে অপহরণের পর লাশ গুম করে। ২ জুলাই রুয়াল লুল থাং বমকে (৩০) বান্দরবান সদর ইউনিয়নের হেব্রনপাড়া থেকে অপহরণ করা হয়। এখনও তাদের সন্ধান পাওয়া যায়নি। ৬ জুলাই গুংগা জলি ত্রিপুরা (৪১) নামে এক যুবককে কুহালংয়ের ১নং এলাকা থেকে জেএসএস সদস্যরা অপহরণ করে।

 

১ সেপ্টেম্বর বান্দরবানের বাঘমারায় জেএসএস সদস্যেদর গুলিতে নিহত হয় মংসিং উ মারমা। ১৫ অক্টোবর বৃহস্পতিবার রোয়াংছড়ির নতুন পাড়ায় সাবেক মেম্বার ছাউপ্রু (৫০) মারমাকে গুলি করে হত্যা করেছে মগ লিবারেশন পার্টির সদস্যরা। ২০২১ সালের ১৮ জুন বান্দরবান জেলার রোয়াংছড়িতে মসজিদের ইমাম নওমুসলিম মো. ওমর ফারুককে (৫০) ঘরে ঢুকে গুলি করে হত্যা করে জেএসএস সদস্যরা। একই বছরের ১৯ জুলাই বান্দরবান সদরের ক্যামলং পাড়ায় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা ও পল্লী চিকিৎসক অংক্য থোয়াইকে (৪২) অপহরণের পর হত্যা করে জেএসএস সদস্যরা।

 

২৩ নভেম্বর রোয়াংছড়ির তালুকদার পাড়ার উথোয়াইনু মারমাকে গুলি করে হত্যা করে জেএসএস সদস্যরা। সর্বশেষ গত ১৩ ডিসেম্বর বান্দরবান সদরের ডলু পাড়া নিজ বাসা থেকে জেএসএস’র সদর উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক পুশেথোয়াই মারমাকে মগ লিবারেশন পার্টির সদস্যরা অপহরণের পর গুলি করে হত্যার পর লাশ আমতলী এলাকায় মাটির নিচে পুঁতে ফেলে। এসব সংঘাতে এখন অস্থির হয়ে উঠেছে পুরো বান্দরবান।

 

পূর্বকোণ/আর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট