চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ৩১ জানুয়ারি, ২০২৩

সর্বশেষ:

২ ডিসেম্বর, ২০২২ | ১০:৫৩ পূর্বাহ্ণ

মেজর (অব.) মোহাম্মদ এমদাদুল ইসলাম

শান্তি ও অগ্রগতির দ্বার অবারিত করার এক ঐতিহাসিক দলিল

আমাদের পার্বত্যাঞ্চল, খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি-বান্দরবান সবুজে শ্যামলে নৈঃস্বর্গের এক লীলাভূমির নাম। এখানে আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায়। মেঘেরা ঝরিয়ে যায় ভালবাসার জল। এ জল ঝর্ণা হয়ে কলকলিয়ে আঁকাবাঁকা পথ বেয়ে মিশেছে কাপ্তাই হ্রদে।

 

পার্বত্য চট্টগ্রামের উত্তরে ভারতের ত্রিপুরা, পূর্বে মিজোরাম, পূর্ব দক্ষিণে মিয়ানমার এবং বন্দর নগরী চট্টগ্রামের দক্ষিণ পূর্বে পার্বত্য চট্টগ্রামের অবস্থান। ৫,০৯৫ বর্গমাইল এলাকাজুড়ে এর বিস্তৃতি, এটি বাংলাদেশের প্রায় এক দশমাংশ। পার্বত্য এই অঞ্চল প্রায় পুরাটাই পাহাড় ঢাকা। উত্তর থেকে দক্ষিণের পাহাড় শ্রেণী তুলনামূলকভাবে খাড়া। পার্বত্য চট্টগ্রামের উত্তারাঞ্চল তথা খাগড়াছড়ি থেকে দক্ষিণমুখি হয়ে বয়ে গেছে তিনটি নদী যথাক্রমে চেঙ্গি, মাইনি এবং কাচালং। এই তিন নদীকে ঘিরে তিন উপত্যকা চেঙ্গি, মাইনি এবং কাচালং। দক্ষিণে তথা বান্দরবানকে ঘিরে তিন নদী যথাক্রমে সাঙ্গু, মাতামুহুরি আর রাইকিয়াং এবং এদের ঘিরে তিন উপত্যকা। মধ্যে রাঙামাটি, বুকে ধরে আছে বিপুল জলরাশির মানুষ সৃষ্ট কাপ্তাই হ্রদ। এ হ্রদ প্রায় ৩৫০ বর্গমাইল বিস্তৃত।

 

পার্বত্য চট্টগ্রামে সংরক্ষিত বনভূমি রয়েছে প্রায় ১৪০০ বর্গমাইল জুড়ে। এই সংরক্ষিত বনভূমির মধ্যে কাচালং, সাঙ্গু, রাইকিয়াং এবং মাতামুহুরি অঞ্চল অন্যতম। সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রাম মোট ৩৬৫টি মৌজা নিয়ে গঠিত। প্রতিটি মৌজায় রয়েছেন একজন হেডম্যান। কয়েকটি পাড়া নিয়ে একটি মৌজা। প্রতিটি পাড়া একজন কারবারির শাসনাধীন।

 

প্রকৃতির অর্পূব লীলাভূমি পার্বত্য চট্টগ্রাম ১৮৬০ সালে বৃহত্তর চট্টগ্রাম থেকে আলাদা হয়ে স্বতন্ত্র জেলার মর্যাদা লাভ করে। পরবর্তীতে প্রশাসনিক সুবিধার্থে পার্বত্য চট্টগ্রামকে তিনটি সার্কেলে বিভক্ত করা হয়। ১৮৮১ সালের এই প্রশাসনিক পদক্ষেপে তিনটি র্সাকেলকে যথাক্রমে চাকমা, বোমাং এবং মঙ সার্কেল হিসাবে নামকরণ করা হয়। চাকমা সার্কেলের সদর দপ্তর করা হয় রাঙামাটিতে, এর আয়তন ২৪২১ বর্গমাইল। বোমাং সার্কেলের সদর দপ্তর করা হয় বান্দরবানে, এর আয়তন ২০৬৪ বর্গমাইল এবং মঙ সার্কেলের সদর দপ্তর করা হয় মানিকছড়িতে এর আয়তন ৬৫৩ বর্গমাইল।

 

১৯৮৩ সালে এই তিনটি সার্কেল চাকমা, বোমাং ও মং সার্কেলকে তিনটি পার্বত্য জেলা যথাক্রমে রাঙামাটি, বান্দরবান এবং খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা হিসাবে ঘোষণা করা হয়। রাঙামাটি জেলার অধীনে উপজেলা ১০টি খাগড়াছড়ির অধীনে উপজেলা ৮টি এবং বান্দরবান জেলার অধীনে উপজেলা রয়েছে ৭টি। ৬ মার্চ ১৯৮৯ সালে বলবৎকৃত স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন কর্তৃক তিনটি পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ এবং জেলা প্রশাসক দ্বারা শাসিত হচ্ছে।

 

আমাদের প্রতি প্রকৃতির অপার দান পার্বত্য চট্টগ্রাম পাক-ভারত স্বাধীনতা লগ্ন থেকে নানা ধরনের আঞ্চলিক বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে। এ বিতর্ক সত্তরের দশকে এসে ভূ-রাজনীতির নানা কূটচালে জড়িয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামকে সশস্ত্র সংঘাতের মুখে ঠেলে দেয়। দীর্ঘ দু’দশকেরও বেশি সময় পার্বত্য চট্টগ্রামে বয়ে যায় সংঘাত সংঘর্ষের ঝড়ো হাওয়া। অপার সম্ভাবনার পার্বত্য চট্টগ্রাম হন্তারক সময়ের যাতাকলে পিষ্ঠ হতে থাকে ক্রমাগত।

 

১৯৮১ সালের মে মাসে শেখ হাসিনা দেশে ফিরেন। স্বজন হারানো শত প্রতিকূলতার বিষবাস্পকে নীলকন্ঠ হয়ে তিনি নিজের মাঝে ধারণ করেন। ঘাত-প্রতিঘাতময় দীর্ঘ সময় পাড়ি দিয়ে ১৯৯৬ সালে তিনি সরকার গঠন করেন।

 

সরকার গঠনের পরপরই শেখ হাসিনা তার অগ্রাধিকার তালিকায় স্থান দেন পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি স্থাপনকে। দীর্ঘ দু-দশকেরও বেশি সময় ধরে পাহাড়ের সংঘাত সংঘর্ষের পাগলা ঘোড়ার লাগাম শেখ হাসিনা শক্ত হাতে টেনে ধরেন। ক্ষমতা গ্রহণের দ্রুততম সময়ে তিনি তার অদম্য সাহস, বিচক্ষণতা আর দূরদর্শিতায় ২ ডিসেম্বর ১৯৯৭ শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর নিশ্চিত করেন। চুক্তি অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সশস্ত্র শাখা শান্তিবাহিনী তাদের অস্ত্র সমর্পণ করে শান্তি প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে।

 

এরই ফলশ্রুতিতে সংঘাতের, রক্তক্ষরণের জনপদ পার্বত্য চট্টগ্রাম ক্রমে শান্তির সুবাতাসে আন্দোলিত হয়। অস্ত্রের ঝনঝনানির পরিবর্তে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মহোৎসবের প্রাণচাঞ্চল্যে মুখরিত হয়ে উঠে। শুরু হয় যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন। এ যোগাযোগ ব্যবস্থা পার্বত্য চট্টগ্রামের এক সার্বিক উন্নয়নে বয়ে আনে আমূল পরিবর্তন। যোগাযোগ ব্যবস্থার এ উন্নয়নের পথ বেয়ে বর্তমানে বাংলাদেশের যেকোন নাগরিক চট্টগ্রাম থেকে উত্তরের ফটিকছড়ি-খাগড়াছড়ি-বাঘাইহাট হয়ে অপরূপ সাজেকের নৈঃস্বর্গিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন। চট্টগ্রাম থেকে সোজা পূর্বের পথ ধরে রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, ঘাঘড়া, মানিকছড়ি হয়ে রাঙামাটি, অবলীলায় এখান থেকে পর্যটক মাত্রই চলে যেতে পারবেন সুবলং মাইনীর রূপ দর্শনে মুগ্ধতায় আপ্লুত হতে।

 

চট্টগ্রাম থেকে দক্ষিণে কক্সবাজারের পথ ধরে চলে গেলে কেরানিহাট হয়ে বান্দরবান। বান্দরবান হয়ে দক্ষিণে চিম্বুক আরো পরে নীলগিরি মেঘেদের সাথে গলাগলি, আরো দক্ষিণে চলে গেলে থানচি রূপের অপূর্ব পসরা বিছিয়ে আছে।

 

কাপ্তাই হ্রদ। রাঙামাটি থেকে এ হ্রদে জলযান ভাসিয়ে আপনি উত্তরে শিশকমুখ -মারিশ্যা যেতে পারেন প্রকৃতির কোলে স্নাত হতে হতে। রাঙামাটি থেকে দক্ষিণে কাপ্তাই। হ্রদের বুকে মেঘেদের প্রতিচ্ছবি আর দু’পাশে আকাশে হেলান দিয়ে শুয়ে থাকা পাহাড় শ্রেণী। নৈঃস্বর্গের এই লীলাভূমি তার অপার মোহন সৌন্দের্যে বিস্ময়ে বিমুগ্ধ করে রাখছে পর্যটকদের। সড়ক পথে পার্বত্য চট্টগ্রাম এখন উত্তর থেকে দক্ষিণে সরাসরি সংযুক্ত। উত্তরের সাজেক থেকে আপনি যাত্রা করলে, বাঘাইহাট, দিঘিনালা, খাগড়াছড়ি, মহালছড়ি, মানিকছড়ি ঘাঘড়া হয়ে কাপ্তাই। কাপ্তাই থেকে নির্বিঘ্নে আপনি পৌঁছাতে পারেন বান্দরবান। এসব পথের দৃশ্য স্বর্গীয়। এ যোগাযোগ সম্ভব হয়েছে শান্তি চুক্তির ফলস্বরূপ।

 

শান্তিচুক্তির ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব : পার্বত্য চুক্তির ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব অপরিসিম। এ চুক্তির ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম পরাশক্তি সমূহের “বাফার অঞ্চল” হওয়ার বিপদ থেকে রক্ষা পেয়েছে। এক সময় ভারতীয় পূর্বাঞ্চলীয় সাত রাজ্যকে ঘিরে পার্বত্য চট্টগ্রাম পরাশক্তিসমূহের বিচরণ ক্ষেত্র হিসেবে পরিগণিত হওয়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল।

 

শান্তিচুক্তির অর্থনৈতিক দিক : এ চুক্তি স্বাক্ষরের ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম এখন অর্থনৈতিক প্রাণচাঞ্চল্যের অন্যতম এক পীঠস্থানে পরিণত হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন ফল বিশষ করে আম আনারস কাঠাল তরমুজ সারাদেশের প্রয়োজন মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের অবারিত পর্যটন সম্ভাবনা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নবযুগের সূচনা করতে চলেছে।

 

শান্তিচুক্তির সামরিক গুরুত্ব : এ চুক্তি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে “নিজদেশে যুদ্বরত” অপবাদ থেকে পরিত্রাণ দিয়েছে। ফলে স্বগৌরবে সামরিক বাহিনী বহির্বিশ্বে শান্তি স্থাপনে কাজ করে যাওয়ার অবকাশ পেয়েছে।

 

চুক্তির এপিট ওপিট : চুক্তির মোট ৭২টি ধারার ৪৮টি সম্পূর্ণ এবং ১৫টি আংশিক বাস্তবায়িত, এটি সরকারি ভাষ্য। জনসংহতি সমিতির ভাষ্য চুক্তির ২৫টি বাস্তবায়িত ১৮টি আংশিক ২৯টি সম্পূর্ণ অবাস্তবায়িত।

 

চুক্তির সবচেয়ে র্স্পশকাতর দিক ভূমি বিরোধ। ১৯৯৯ সালে এ প্রসঙ্গে কমিশন গঠিত হলেও এখানে দৃশ্যমান অগ্রগতি এখনও অপরিলক্ষিত। চুক্তি অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ গঠিত হয়। বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ তিন জেলা তথা তিন সার্কেল তথা তিন স্থানীয় পরিষদের সমন্বয়ক হিসাবে কাজ করে যাচ্ছে।

 

পূনশ্চ : পার্বত্য চট্টগ্রামে এখনও কাঙ্ক্ষিত শান্তি বিরাজিত নয়। আন্তঃকোন্দল এখনও মাঝে মাঝে পাহাড়ে রক্ত ঝরায়। এ সত্য মেনে নিয়েও একথা নিঃসংকোচে বলা যায় ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত শান্তিচুক্তি পার্বত্য শান্তির এক অবারিত বাতাবরণ সৃষ্টি করেছে। এ শান্তি চুক্তির নিঃশঙ্ক রূপকার শেখ হাসিনা ইতিহাসে তিমির হননের নেত্রী হিসেবে আগামীর ইতিহাসে দেদীপ্যমান থাকবেন।

লেখক : সামরিক বিশ্লেষক, সাবেক কূটনীতিক এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য।

পূর্বকোণ/আর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট