চট্টগ্রাম সোমবার, ০৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৩

২৪ ডিসেম্বর, ২০২২ | ২:২১ অপরাহ্ণ

পালাবদলের পথ-পরিক্রমায় বাংলাদেশের শিল্পখাত

নানা চড়াই উৎরাই পাড়ি দিয়ে আজকের পর্যায়ে পৌঁছেছে বাংলাদেশ। সামাজিক, রাজনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তনের সাথে সাথে দিনে দিনে পাল্টে গেছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামো। মধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় উঠে এসেছে এদেশ। এটা আরোপিত ভাবে নয়, স্বাভাবিক নিয়মেই ঘটেছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে ধীরে ধীরে নানা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অর্থনীতিতে অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। কৃষিনির্ভর অর্থনীতি ছিল একসময়ে এ অঞ্চলে।

 

কিন্তু সেই কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে ক্রমশ বেরিয়ে এসে শিল্প ও সেবাখাতমুখী হয়েছে আমাদের অর্থনীতি। বাংলাদেশেও একটি ছোটখাটো শিল্পবিপ্লব হয়েছে। এখানে শিল্পখাতের অবদান কয়েকগুণ বেড়েছে। এখন আর আমাদের অর্থনীতিতে কৃষির একচ্ছত্র দাপট নেই আগের মত। পালাবদলের পথপরিক্রমায় বাংলাদেশের শিল্পখাত দেশের অর্থনীতির চাকা ঘোরাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। তিনদশক আগে বিদেশ থেকে পরিশোধিত সয়াবিন এনে এ দেশে সরাসরি বাজারজাত করা হতো।

 

আমদানি বাণিজ্য থেকে বেরিয়ে আশির দশকের শেষে পরিশোধন কারখানায় বিনিয়োগ শুরু করেন এদেশের উদ্যোক্তারা। নব্বই দশকজুড়ে চলতে থাকে এই বিনিয়োগ। বন্ধ হয়ে যায় সরাসরি আমদানি করে সয়াবিন বাজারজাতের বাণিজ্য। চাহিদা বাড়তে থাকায় নতুন শতকে সয়াবিন তেল উৎপাদনের কারখানায় বিনিয়োগে এগিয়ে আসেন বেশ কয়েকজন উদ্যোক্তা। এখন দেশেই মূল কাঁচামাল সয়াবীজ থেকে সয়াবিন তেল উৎপাদিত হচ্ছে চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশ।

 

প্রাণিখাদ্য সয়া কেকে উৎপাদন সক্ষমতাও পৌঁছেছে স্বয়ংসম্পূর্ণ পর্যায়ে। বাংলাদেশে উৎপাদিত সয়াবিন ও সয়া কেক এখন রপ্তানি হচ্ছে বিদেশেও। গত একদশকে শিল্পখাতের পরিবর্তনের নিয়মিত কোনো না কোনো প্রস্তুত পণ্য বা মধ্যবর্তী কাঁচামাল আমদানি কমে গেছে। যেমন, অপরিশোধিত সয়াবিন তেল আমদানি কমে যাওয়ার নেপথ্যে দেশে সয়াবিন বীজ থেকে তেল ও সয়া কেক তৈরির কারখানা গড়ে ওঠাটাই প্রধান কারণ।

 

একইভাবে কাচ, সিরামিকস, বিলেট, ইলেক্ট্রনিকস পণ্য, অটোমোবাইল খাতে প্রস্তুত পণ্যের আমদানি কমে যাওয়ার কারণও তাই। শুধু ভোগ্যপণ্যই নয়, আমদানি বাণিজ্য থেকে বেরিয়ে এমন অনেক খাতে শিল্পায়নে পালাবদল ঘটাচ্ছেন দেশীয় উদ্যোক্তারা। কোনো কোনো খাতে মৌলিক শিল্প গড়ার পথে ধাপ কমে আসছে। কোনো কোনো খাতে মূল কাঁচামাল ব্যবহার করে শিল্পকারখানা চালু হয়েছে। উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ পরিকল্পনায়ও স্থান পাচ্ছে এখন মৌলিক শিল্প।

 

এ দেশে সরকারি খাতে শিল্পের ইতিহাস অনেক পুরোনো। সার, কাগজকল, সিমেন্ট, জ্বালানি, পাটকল ও চিনিকলের মতো মৌলিক শিল্পকারখানা দিয়ে এ দেশে সরকারি খাতে মৌলিক শিল্পের যাত্রা শুরু হয়েছে বহু আগেই। আর সাড়ে তিনদশক আগে কারখানা গড়তে সরকারি বিধিনিষেধ তুলে দেওয়ার পরই শুরু হয় বেসরকারি খাতে শিল্পায়ন। শুরুটা হয়েছিল মধ্যবর্তী কাঁচামাল আমদানি করে প্রস্তুত পণ্য তৈরির কারখানা এবং যন্ত্রাংশ সংযোজন করে প্রস্তুত পণ্য তৈরির কারখানার মাধ্যমে। দুই-তিন দশক আগে দেশে চাহিদা ছিল খুবই কম। ফলে বেসরকারি খাতে বড় কারখানা তেমন হয়নি। শিল্পগ্রুপগুলোর সক্ষমতাও ছিল কম।

 

বড় শিল্প গড়ার পথে গ্যাস-বিদ্যুৎ, অবকাঠামো ও আর্থিক সুবিধারও সে সময় খুব বেশি প্রসার হয়নি। এ অবস্থা পাল্টে যায় বিংশ শতকে এসে। এসব সুবিধা প্রসারের পাশাপাশি একদশক ধরে ক্রমবর্ধমান ভোক্তা চাহিদা উদ্যোক্তাদের বড় কারখানায় বিনিয়োগে উৎসাহিত করছে। তাতে শিল্পগ্রুপগুলোর সক্ষমতাও বেড়েছে। দেশে বড় বাজার তৈরি হওয়ায় এখন মৌলিক শিল্পের কারখানার সংখ্যা বাড়ছে। আমদানিতে প্রস্তুত পণ্য ও মধ্যবর্তী কাঁচামালের জায়গা ধীরে ধীরে দখল করে নিচ্ছে মূল কাঁচামাল।

 

মৌলিক কাঁচামাল ব্যবহার করে পণ্য উৎপাদনের পথে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। শিল্পায়নের মূলপর্বে যেতে অনেক খাতে ধাপ কমে আসছে। অনেক খাতে মূলপর্বে পথচলা শুরু হয়েছে আমাদের। শিল্পায়নের জন্য যেসব সুবিধা দরকার, তা থাকলে আগামী একদশকে মৌলিক শিল্পায়নে গতি আসবে। প্রাকৃতিক উৎস থেকে পাওয়া কাঁচামাল ব্যবহার করে পণ্য উৎপাদনের কারখানা মূলত মৌলিক শিল্প।

 

মৌলিক শিল্পের প্রধান প্রধান খাতের কাঁচামাল কৃষিজাত পণ্য ও খনিজ পণ্য। খনি থেকে আহরিত আকরিক, কয়লা, চুনাপাথর, অপরিশোধিত জ্বালানি তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার হয় মৌলিক শিল্পকারখানায়। এসব থেকেই তৈরি হয় হাজারও শিল্পের কাঁচামাল ও প্রস্তুত পণ্য। মৌলিক শিল্প গড়ে তোলার জন্য অর্থায়ন-সুবিধা ও সরকারের নীতিসহায়তাও দরকার। এক দশকে ধীরে ধীরে এসব নীতিসহায়তার কিছুটা পেয়েছেন উদ্যোক্তারা, তাতে তারা বড় বিনিয়োগে এগিয়ে এসেছেন।

 

শিল্পের সবচেয়ে বড় খাত ইস্পাত। বছর পাঁচেক আগেও রড তৈরির মধ্যবর্তী কাঁচামাল ‘বিলেট’ আমদানি হতো। বছরে আমদানির পরিমাণ ছিল ১৪-১৬ লাখ টন। দেশে বিলেট কারখানা থাকলেও উৎপাদন ছিল খুবই কম। চাহিদা বাড়ায় এ অবস্থা পাল্টে যায় বছর পাঁচেক ধরে। কয়েক বছর ধরে বিলেট আমদানি শূন্যের কোঠায় নেমেছে। রড তৈরির প্রাথমিক কাঁচামাল পুরোনো লোহার টুকরো ব্যবহার করেই প্রথমে বিলেট ও বিলেট থেকে রড উৎপাদিত হচ্ছে।

 

কোম্পানিগুলো এখন দেশের বাজারে বিলেটের চাহিদার বড় অংশ পূরণ করছে। আবার আমদানির পরিবর্তে ইস্পাত পাত পরিশোধনের কারখানাও চালু হয়েছে, যেটি দিয়ে ঢেউটিনসহ ইলেকট্রনিকসের নানা পণ্য তৈরি হচ্ছে। ইস্পাতশিল্পের কাঁচামালে দ্রুত রূপান্তরের পর এখন মৌলিক শিল্প গড়ার পথেই হাঁটছেন উদ্যোক্তারা।

 

ইতিমধ্যে চট্টগ্রামের পিএইচপি গ্রুপ বঙ্গবন্ধু অর্থনৈতিক জোনে ৫০০ একর জায়গায় ইস্পাতের পাত তৈরির প্রথম মৌলিক কারখানা গড়ে তোলার প্রস্তুতি শুরু করেছে। এই কারখানায় মৌলিক কাঁচামাল আকরিক লৌহ ও কয়লা ব্যবহার করে উৎপাদিত হবে অপরিশোধিত ইস্পাতের পাত। ইস্পাত পাত থেকে ভবন ও অবকাঠামো নির্মাণ, ইলেক্ট্রনিকস, মুঠোফোন, গাড়ি, শিল্পকারখানার যন্ত্রপাতি, গৃহস্থালিতে ব্যবহার্য হাজারো পণ্য তৈরি হবে। প্লাস্টিকশিল্পের প্রায় পাঁচ হাজার কারখানা মধ্যবর্তী কাঁচামাল ব্যবহার করে পণ্য উৎপাদন করে আসছে। গত অর্থবছরে প্লাস্টিকশিল্পের মধ্যবর্তী কাঁচামাল ও সরঞ্জাম আমদানি হয় প্রায় সাড়ে ৪ বিলিয়ন বা ৪৫০ কোটি মার্কিন ডলারের। আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ২৩ লাখ টন।

 

এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আমদানি হয় পিভিসি ও পেট রেজিন। বিশাল এই বাজারে কাঁচামালের আমদানিনির্ভরতা কমাতে বিনিয়োগ শুরু করেছেন এ দেশের উদ্যোক্তারা। এই খাতে উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ পরিকল্পনায় আছে মৌলিক শিল্প গড়ার। মহেশখালী অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্লাস্টিকের কাঁচামাল তৈরির পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পে বড় বিনিয়োগ হচ্ছে। সেখানে মৌলিক কাঁচামাল ব্যবহার করে প্লাস্টিক, টেক্সটাইলসহ বহু শিল্প খাতের কাঁচামাল তৈরি হবে। রাসায়নিক খাতে মৌলিক শিল্পে পদার্পণও এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে। মূল কাঁচামাল ব্যবহার করে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড তৈরি হচ্ছে দেশে।

 

দেশে এই শিল্পের পাঁচটি কারখানা চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করছে পণ্য। এখন ফুডগ্রেড ছাড়া শিল্পগ্রেডের হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড কার্যত আমদানি হয় না। হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড ছাড়া আরেক রাসায়নিক কস্টিক সোডা খাতেও মূল শিল্প গড়ে তুলেছেন উদ্যোক্তারা। এই শিল্পের মূল কাঁচামাল লবণ। এই খাতের কারখানায় কস্টিক সোডা ছাড়াও ক্লোরিন ও হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড উৎপাদিত হচ্ছে। কস্টিক সোডা কারখানার উৎপাদিত পণ্য ক্লোরিন ব্যবহৃত হচ্ছে প্লাস্টিকশিল্পের কাঁচামাল পিভিসি কারখানায়। রাসায়নিক খাতের কাঁচামাল উৎপাদনের এমন কারখানার সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।

 

স্বাধীনতার আগেই চট্টগ্রামের প্রগতি কারখানার মাধ্যমে গাড়ি সংযোজনশিল্পের সূচনা হয়। প্রায় ৫৬ বছরে সরকারি গাড়ি কারখানা প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড সংযোজনশিল্পে আটকে থাকলেও এখন এগিয়ে এসেছে বেসরকারি উদ্যোক্তারা। চট্টগ্রামের পিএইচপি গ্রুপ সংযোজন থেকে গাড়ি উৎপাদনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। গাড়ি উৎপাদনের পাঁচ ধাপের মধ্যে তিন ধাপে রয়েছে গ্রুপটি। ফেয়ার টেকনোলজি গাজীপুরের কালিয়াকৈরে, মিরসরাইয়ে বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরে গাড়ি উৎপাদনের কারখানা গড়ে তুলছে।

 

আবার সংযোজন থেকে ইলেক্ট্রনিকস পণ্য তৈরির কারখানা গড়ে উঠেছে দেশে। মুঠোফোন, টেলিভিশন, ফ্রিজসহ নানা পণ্য তৈরির কারখানা হয়েছে দেশে। ধীরে ধীরে এসব খাতের মূল্য সংযোজন বাড়ছে। দেশে স্বীকৃত উৎপাদনের সংজ্ঞায় স্থান পেয়েছে এসব খাত। নতুন নতুন যন্ত্রাংশ উৎপাদনের মাধ্যমে এসব খাত মৌলিক শিল্পে পালাবদলের পথে এগোচ্ছে। দেড়দশক আগে বেসরকারি খাতে কাচশিল্পে মৌলিক কারখানা গড়ে তুলেছেন উদ্যোক্তারা। গত একদশকে এই খাতের বেশ সম্প্রসারণও হয়েছে। উৎপাদনের তালিকায় যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন পণ্য। সিরামিকস খাতের অনেক উপখাতে উৎপাদনে এখন দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ। গত কয়েক বছরে অনেকগুলো কারখানা হয়েছে এ দেশে। মূল কাঁচামাল ব্যবহার করেই তৈরি হচ্ছে সিরামিকস পণ্য।

 

বাংলাদেশে নীরবে গড়ে উঠেছে জাহাজ নির্মাণশিল্প। এই শিল্প এখন আশার আলো দেখতে শুরু করেছে। বাংলাদেশে নির্মিত পন্য এবং যাত্রী বহনকারী জাহাজ দেশের বাইরে যাচ্ছে। বাংলাদেশে তৈরী জাহাজ ডেনমার্ক, জার্মান, পোল্যান্ডে যাচ্ছে। এসব দেশ ছাড়াও পৃথিবীর অন্যান্য দেশ বাংলাদেশে নির্মিত জাহাজ ক্রয় করতে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। বৃটিশ নৌবাহিনী বাংলাদেশ থেকে যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ করে নিয়ে গেছে। বাংলাদেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্প ইতিমধ্যে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। এভাবে এগিয়ে গেলে এদেশের অর্থনীতিতে এক অর্থনৈতিক বিপব ঘটবে বলে আশা করা যায়। বাংলাদেশে জাহাজ নির্মাণ শিল্পের সূচনা প্রাচীনকাল থেকেই। ১৫ থেকে ১৭ শতাব্দীর মধ্যে আমাদের দেশে জাহাজ নির্মান শিল্পের সূচনা ঘটে।

 

১৮০৬ সালের দিকে চট্টগ্রাম শিপইয়ার্ড ১০০০ টন পণ্যবাহী বাণিজ্যিক জাহাজ নির্মাণ করে। একই সময় বৃটিশ নৌবাহিনীর জন্য যুদ্ধ জাহাজ নির্মাণ করা হয়। তখনকার সময়ে সম্পূর্ণ কাঠের জাহাজ নির্মাণ করা হত। বর্তমান সময়ে সম্পূর্ণ স্টিলের বডি জাহাজ নির্মাণ করা হচ্ছে। বর্তমানে আমাদের দেশে ছোটবড় সব মিলিয়ে প্রায় ২০০টি জাহাজ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব জাহাজ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ছোটবড় যাত্রীবাহী এবং পণ্যবাহী জাহাজ নির্মাণ করছে। এসব প্রতিষ্ঠানে নির্মিত জাহাজ বিদেশে রপ্তানী হচ্ছে।

 

বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে জাহাজ নির্মাণশিল্প গড়ে উঠলেও আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য জাহাজ নির্মাণপ্রতিষ্ঠান আনন্দ শিপইয়ার্ড এবং ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড। তারা অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে জাহাজ নির্মাণ করছে। বর্তমানে পৃথিবীর মধ্যে জাহাজ নির্মাণশিল্পে চীন সবার শীর্ষে থাকলেও বাংলাদেশ জাহাজ নির্মাণশিল্পে চীনের কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে। জাহাজনির্মাণ শিল্পে বাংলাদেশের শ্রমিকদের মজুরী চীন, কোরিয়া এবং জাপানের তুলনায় অনেক কম। কিন্তু দক্ষতার দিক দিয়ে বাংলাদেশের শ্রমিকরা অনেক এগিয়ে আছে।

 

আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের নির্মিত জাহাজ নির্মাণ ব্যয় সর্ববৃহৎ জাহাজ নির্মাণকারী দেশ চীনের তুলনায় ১৫% কম। জাহাজ নির্মাণশিল্পে প্রচুর মূলধনের প্রয়োজন হয়। যা নাকি এদেশে সব শিপইর্য়াডের কাছ নেই। মূলধন সমস্যা সমাধান করতে পারলেই শিপইয়ার্ডগুলো লাভের মুখ দেখতে পারত। দেশের জাহাজ নির্মাণশিল্প যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে তাতে দেশের রপ্তানী পণ্য তালিকায় নির্মিত জাহাজ স্থান পেয়েছে। জাহাজ নির্মাণ শিল্পের ব্যাপারে সরকারী সাহায্য সহযোগিতা পেলে এই শিল্প আরো এগিয়ে যাবে।

 

বর্তমানে এই শিল্পে হাজার হাজার লোক কর্মরত আছেন। দিনে দিনে এই শিল্পে দক্ষ জনশক্তির চাহিদা বাড়ছে। এই শিল্পের জন্য দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার লক্ষ্যে ব্যাপক কর্মসূচী গ্রহণ করা হয়েছে। জাহাজ নির্মাণশিল্প মালিক সমিতি এই কর্মসূচী বাস্তবায়ন করছে। আগামীতে এই কর্মসূচীর মাধ্যমে জাহাজ নির্মাণশিল্পে প্রচুর লোকের কর্মসংস্থান হবে এবং এই শিল্পের মানও আরো বেড়ে যাবে।

 

আমাদের দেশের জাহাজ নির্মাণশিল্প যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে তাতে আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে নতুন দিগন্তের সূচনা হবে। পুরোনো কয়েকটি খাতে অনেক আগেই মৌলিক শিল্পের যাত্রা শুরু হয়েছে। বেসরকারি খাতের হাত ধরে এখন বড় শিল্পে রূপান্তর হচ্ছে এসব খাত। বস্ত্র খাত তারই একটি। আবার পাট ও চামড়াশিল্পেও বেসরকারি খাত এগিয়ে এসেছে। আসবাব খাতে ছোট ছোট মৌলিক কারখানাও গড়ে উঠেছে। এ রকম ছোট-বড় অনেক খাতে পালাবদল ঘটছে। বেসরকারি খাতে মৌলিক ও আধা মৌলিক কারখানা যাঁরা গড়ে তুলছেন, তাঁদের বিকাশ হয়েছে পুঁজির ধারাবাহিক রূপান্তরের মাধ্যমে। নিজ শহরে পণ্য বেচাকেনার মতো ছোট ব্যবসা থেকে যাত্রা শুরু করেছেন তারা। পরে আমদানি ব্যবসা করে পুঁজি বাড়িয়েছেন।

 

এরপর সেই পুঁজি খাটিয়ে প্রথমে সংযোজন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের শিল্পকারখানা গড়ে তুলেছেন। পুঁজি আরও বাড়ার পর আধা মৌলিক ও মৌলিক শিল্প গড়ায় মনোযোগ দিয়েছেন তারা। বাংলাদেশে শিল্পের পালাবদলের বর্তমান সময়ে এসে নানা ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর তৈরি হওয়া এই সংকট ব্যাপক প্রভাব ফেলছে শিল্প খাতে। গ্যাসের চাপ কম, বিদ্যুৎ-সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। আবার মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতেও জটিলতার শিকার হচ্ছেন উদ্যোক্তারা।

 

তাই সংকটের সময় শিল্পখাতকে প্রাধান্য দেওয়া না হলে শিল্পায়নের পালাবদলে বড় বাধা তৈরি হবে। শিল্পের রূপান্তর অব্যাহত রাখতে হলে উদ্যোক্তা ও শিল্পকে সুরক্ষা দিতে হবে। এ জন্য সবার আগে দরকার নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুতের সুবিধা। যেসব পণ্য দেশে উৎপাদিত হয়, সেগুলো আমদানিতে করভার বাড়াতে হবে। পাশাপাশি কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানিতে বিদ্যমান বাধাগুলো দূর করতে হবে। কারণ, কোনো দেশেই সরকারের নীতিসহায়তা ছাড়া মৌলিক শিল্পে বিপ্লব হয়নি।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার, কলাম লেখক।

 

পূর্বকোণ/আর

 

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট