চট্টগ্রাম শুক্রবার, ০২ ডিসেম্বর, ২০২২

সর্বশেষ:

৭ অক্টোবর, ২০২২ | ১২:২০ অপরাহ্ণ

বনায়ন ও পশু পালনে মহানবীর (স.) শিক্ষা

যে পথে আমাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ রয়েছে, সে পথের সন্ধান দিয়ে গেছেন নূর নবী হযরত মুহাম্মাদ (স.)। মানুষের জীবনের প্রয়োজনীয় এমন কোন দিক ও বিভাগ নেই- যে বিষয়ে মহানবী আমাদের জন্য উত্তম দিক-নির্দেশনা দিয়ে যাননি। কৃষি কাজ এবং কৃষিজ দ্রব্য উৎপাদন মানুষের জীবন ধারণের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পেশা। এর সাথে সংশ্লিষ্ট অপর বিষয়টি হল গবাদি পশুপালন। হযরত মুহাম্মাদ (স.) নিজে কৃষি ও বৃক্ষরোপন কাজে অংশ নিয়ে এবং মেষ চড়িয়ে উম্মতের জন্য এ পেশায় অনুপ্রেরণা হয়ে আছেন। এসব বিষয়ে তিনি প্রচার করেছেন আল কোরআনের বাণী। পরবর্তীতে তাঁর মহান সাহাবা ও পূণ্যাত্মা খলিফাগণ (রাদি.) কৃষি উৎপাদন ও পশুপালনের ক্ষেত্রে নানাবিধ সফল কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে গেছেন।

তিবরানীতে হযরত আয়েশা (রাদি.) হতে বর্ণিত: রাসুল (সা.) বলেছেন : তোমরা জমির লুক্কায়িত ভান্ডারে খাদ্যের অনুসন্ধান কর।’ রাসুল (স.) কৃষিকাজ ও ফল-ফলাদির গাছ রোপনকে একটি পূণ্যের কাজ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন: কোন মুসলমান যদি গাছ রোপন করে অথবা কোন ফসল আবাদ করে এবং তা থেকে কোন পাখি বা মানুষ অথবা চতুষ্পদ জন্তু ভক্ষণ করে তবে তা তারঁ জন্য সাদকা বা দানরূপে পরিগণিত হবে।’ (বুখারী-মুসলিম)।

আবদুল্লাহ বিন হাবশি (রাদি.) আঁ-হযরতের (স.) উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন : যে ব্যক্তি অযথা কোন ফুল গাছ কাটে আল্লা রাব্বুল আলামিন তাকে মাথা উপুড় করে দোজখে নিক্ষেপ করবেন।’ মুহাদ্দিসগণ বলেছেন, ফলদানকারী গাছের বেলায়ও কথাটি প্রযোজ্য হবে।

ইতিহাস থেকে জানা জায়, সে যুগে মুসলিম সেনাবাহিনী যুদ্ধে রওনা হওয়ার সময় হযরত আবু বকর ও উমর (রাদি.) কঠোর নির্দেশ দিতেন যেন তারা বিজিতদের কোন শস্যক্ষেত্র নষ্ট না করে। কিতাবুল খারাজে উল্লেখ করা হয়েছে: একবার এক ব্যক্তি উমরের (রাদি.) নিকট অভিযোগ করে যে, মুসলিম সেনাবাহিনী তার একটি শস্যক্ষেত্র পদদলিত করেছে।’ খলিফা ঐ ক্ষেতের ক্ষতি পূরণস্বরূপ বায়তুলমাল হতে দশ হাজার দিরহাম প্রদান করেন। মহানবী (স.) ও তার পুণ্যাত্মা সাহাবাগণের গৃহীত ব্যবস্থার ফলে শুধু আরবমুলুকে নয়, অনারব অঞ্চলগুলোও কৃষিক্ষেত্রে ঈর্ষণীয় উন্নতি সাধন করে ছিল।

 

একইসাথে আমরা এখন দেখব, গবাদি পশুপালনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে ইসলাম ধর্ম কি রূপ গুরুত্বরোপ করেছে। পশুপালনের উপকারিতা বর্ণনা করতে গিয়ে কুরআনুল কারীমে বলা হয়েছেঃ আল্লাহতায়ালা সৃষ্টি করেছেন চতুষ্পদ জন্তুকে। এতে (চামড়ায়) তোমাদের জন্য শীতবস্ত্রের উপকরণ আছে আরো আছে অনেক উপকার এবং কিছুসংখ্যক পশুকে তোমরা আহারে পরিণত কর।’ (সুরা নমল-৫)

 

একই সূরায় আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেছেন : তোমাদের জন্য চতুষ্পদ জন্তুর মধ্যে চিন্তার অবকাশ রয়েছে। আমি তোমাদের পান করাই তাদের উদরস্থিত বস্তুসমূহের মধ্য থেকে গোবর ও রক্ত নিসৃত দুধ; যা পানকারীদের জন্য বড়ই উপাদেয়।’

সুরাটির ৮০ নম্বর আয়াতে আরো বলা হয়েছে : আল্লাহ (অতি দয়া পরবশ হয়ে) করে দিয়েছেন তোমাদের গৃহকে অবস্থানের ঠিকানা এবং চতুষ্পদ জন্তুর চামড়া দিয়ে তোমাদের জন্য করেছেন তাঁবুর ব্যবস্থা। তোমরা এগুলোকে সফরকালে ও অবস্থানকালে পাও। ভেড়ার পশম, উটের বাবরী চুল ও ছাগলের লোম দ্বারা কত আসবাবপত্র ও ব্যবহারের সামগ্রী তৈরী করেছেন এক নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত।’

 

পবিত্র সুরা ইয়াসিনে মহান আল্লাহপাক তাঁর বান্দাদেরকে অসম্ভব রকমের দরদমাখা ও আবেগময় ভাষায় বলেছেন: তারা কি দেখেনা, আমি তাদের জন্য আমার নিজ হাতের তৈরী বস্তু দ্বারা চতুষ্পদ জন্তু সৃষ্টি করেছি। অতপর তারাই এগুলোর মালিক। আমি এগুলোকে তাদের হাতে অসহায় করে দিয়েছি। ফলে এদের কিছু তাদের বাহন (হিসেবে ব্যবহৃত হয়) এবং কতগুলো তারা ভক্ষণ করে। তাদের জন্য (এসব) চতুষ্পদ জন্তুর মধ্যে দেদার উপকারিতা ও পানীয় রয়েছে। তবুও কেন তারা (আমার) শোকরিয়া আদায় করেনা?

সুতরাং আমাদের উচিৎ, আল্লাহর দেয়া কৃষিজ ও পশুসম্পদের গুরুত্ব অনুধাবন করা। মহানবীর রাষ্ট্র পরিচালনা ও তাঁর খলিফাদের রাজস্ব আদায়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আসতো কৃষি ও পশুপালন খাত থেকে। এজন্য দেখা গেছে, হযরত উমর (রা.) পশুচারণ ক্ষেত্র হিসাবে বিশাল বিশাল এলাকা খাস করে রাখতেন। (মু.প্রশাসন, পৃঃ ৬১)। পরিবার-সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে আমরা শুধু পশুখাত থেকেই পেয়ে থাকি সুস্বাদু দুগ্ধজাত দ্রব্য, বস্ত্রসামগ্রী, বাহনব্যবস্থা, সার ও ঔষধসামগ্রী, খাদ্য গোস্ত আর কৃষি-খামার আবাদের উপকরণ।

অতএব আসুন, আমরা কুরআনের শিক্ষায় উজ্জীবিত হই, ইসলামের মহানবী ও তাঁর মহাত্মা সাহাবা কেরামের আদর্শ ও ঐতিহ্য অনুকরণে চাষাবাদ আর পশুপালনের ক্ষেত্রে অধিক পরিমাণে মনোযোগী হই। তাহলেই আমাদের জীবন হয়ে উঠবে সুখী, সমৃদ্ধশালী ও বরকতময়।

আবু হুরায়রা (রাদি.) হতে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন : এ’টা কোন দুর্ভিক্ষ নয় যে, তোমরা বৃষ্টি পাওনা; দুর্ভিক্ষ এ’টায় যে, তোমরা বৃষ্টির উপর বৃষ্টি পাও, কিন্তু ভূমিতে কিছু জন্মায় না।-(মুসলিম)। মহানবী (স.) বৃক্ষরোপন, বনায়ন, কৃষিকাজ- এগুলো পূণ্যের কাজ বলে আখ্যায়িত করতেন। যারা ফল, মূল বা শস্যের গাছ লাগায়, তারা আল্লাহর অনুগ্রহ লাভ করে। আর বিনাপ্রয়োজনে এই গাছ নষ্ট করে তারা নরকবাসী হয়। ইসলামপূর্ব জাহেলীযুগে কৃষিকে একটি আদনা কাজ বলে মনে করলেও ইসলাম ধর্ম প্রচারের পর তা ক্রমান্বয়ে গুরুত্ববহ হয়ে উঠে।

আল কোরআন কৃষি ও বনায়নের উপর যে তাৎপর্যপূর্ণ বর্ণনা দিয়াছে তার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে মহানবী ও সাহাবীরা কৃষিক্ষেত্রে যে সাংঘঠনিক বিপ্লব ঘটিয়ে ছিলেন তাতে আরব ছড়িয়ে অনারব মুসলিমদেশগুলোও স্বনির্ভরতার পথ খুঁজে পেয়েছিল। তারা সম্ভাব্য সমস্ত অনাবাদী জমিকে আবাদ করার পক্ষে জোর দিয়েছিলেন। আঁ-হযরত (সা.) পরামর্শ দিয়েছিলেন কারো জায়গা জমি থাকলে তাতে যেন যে ক্ষেতখামার করে, যদি নিজের পক্ষে তা সম্ভব না হয় তবে বিনাপ্রতিদানে যেন নিজের ভাইকে সুযোগ দেয়।’-(মুসলিম)।

 

সুতারাং আমরা এ শিক্ষা নিতে পারি নিজের, দেশ ও দশের কল্যাণার্থে অন্যান্য কাজ ও পেশার পাশাপাশি কৃষি ও বনায়ন সৃষ্টিতেও আমাদেরকে মনোনিবেশ করতে হবে। তা আবার যেনতেন বিক্ষিপ্তভাবে নয়, খেয়াল রাখতে হবে সমাজ ও পরিবেশের সৌন্দয্য রক্ষণ, রাস্তা-ঘাটে পথচারীর সুযোগ সুবিধা।

আমাদের মাঝে অনেকে আছেন সখের মাঝে একবার গাছপালা রোপন করে তার যত্ন ও বেড়ে উঠার দিকে আর তাকাই না। এত আসল উদ্দেশ্য কিন্তু ম্লান হয়ে যায়। কোন ধারাবাহিকাবিহীন ও অনিয়মতান্ত্রিক কাজে বরকত মিলেনা। এদিকে সকলকে খেয়াল রাখা উচিৎ। মুসলিম দর্শনের বিখ্যাত গ্রন্থ হুজ্জাতুল্লাহয়’ বলা হয়েছেঃ সামান্য ক’জন লোকের উপর কৃষি ও পশু রক্ষার দায়িত্ব দিয়ে দেশের অধিকাংশ লোকেই যদি শিল্প-বাণিজ্য আর রাজনীতি নিয়ে পড়ে থাকে তাহলে দেশবাসীর বিপর্যস্ত হতে বাধ্য।

‘ঘন ঘন গাছ হবেনা,/গাছ হবে তো ফল হবে না।/কলা রুয়ে না কাটো পাত,/তাতে কাপড় তাতে ভাত।’ এগুলো বিখ্যাত খনার বচন। ছোটকালে পড়েছিলাম, পাঠশালায়। কিন্তু এসব অতি প্রয়োজনীয় শ্লোকগুলো হালে লোকমুখে বিলুপ্ত। হাটে-ঘাটে সাধারণ মানুষ দৈনন্দিন জীবন ও কর্ম সম্বন্ধে যে সহজ শিক্ষা পেতো তা এখন আর চোখে পড়েনা। গাছের উপকারিতা ও গাছ লাগানোর নিয়ম-কানুন সম্পর্কে খনা উপরোক্ত বচন ব্যক্ত করেছিলেন। তার কথা যেনো আজো জীবন্ত। আজকের গোটাবিশ্ব গ্রিনহাউজ এফেক্টের ভয়াবহতায় শংকিত। যান্ত্রিক সভ্যতা ও জনসংখ্যার বিস্ফোরণ বসুন্ধরার স্বাভাবিক জীবন কেড়ে নিয়েছে।

 

তাই দুনিয়াবাসী ফের উপলব্ধি করেছে সবুজ-শ্যামল পরিবেশ ও স্বাস্থ্যকর ঠিকানার অভাব আজ সবার মনোবাসনা-দাও ফিরে সে অরণ্য; লও এ নগর-। কিন্তু কিভাবে পূণনির্মিত হবে এ সবুজ জগত? শুধু মৌসুমী প্রচারের মাধ্যমে, নাকি এ সাথে সংযোজিত করতে হবে সর্বাত্বক আন্তরিকতা। আসলে এ কাজ আমাদের সকলের একান্ত নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করতে পারলেই কেবল সার্থক হয়ে উঠবে। ধর্মীয় দৃষ্টিতে এ এমন একটি কাজ-যা ইবাদতের শামিল।

 

এ বিষয়ে কুরআন,হাদীস সহ নানা ধর্মীয় পুস্তকে বারেবারে উৎসাহিত করা হয়েছে। ধর্মীয় নেতৃত্বে যারা আছেন-ইমাম, মুদারিস, ওয়ায়েজ, ব্রাহ্মণ, ঠাকুর-গাছ লাগানো, বনায়ন সৃষ্টি, কৃষিকাজের উপকারিতা নিয়ে ভূমিকা রাখার যথেষ্ট স্কোপ তাদের রয়েছে। তাঁরা বৃক্ষরোপন, শস্য-শ্যামল পরিবেশ রচনা করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেন। কিন্তু তাদের পক্ষ থেকে আশানুরুপ সাড়া নেই।

আমাদের দেশের লোকসংখ্যার বিপুল অংশই ধর্মপরায়ন। তাদের দৈনন্দিন জীবনে গাছপালার উপকারিতা সম্পর্কে ধারনা দেয়া গেলে বনায়ণ সংরক্ষণের ধর্মীয় গুরুত্ব তুলে ধরা সম্ভব হলে ‘বৃক্ষরোপন ও বনায়ন কর্মসূচী’ বাস্তবায়নে নতুন গতির সঞ্চার হবে, সন্দেহ নেই। মহান স্রষ্টা আল্লাহতায়ালা মাটিতে আমাদের প্রয়োজনীয় ভাগ্য লুকিয়ে রেখেছেন। তা যতো আমরা অন্বেষণ করতে জানবো ততো এ পৃথিবী গাছ, ফুল ফলসহ সবুজের সমারোহ ভরে উঠবে।

মনিরুল ইসলাম রফিক অধ্যাপক,

টিভি উপস্থাপক ও জাতীয় পুরষ্কারপ্রাপ্ত খতীব

পূর্বকোণ/আর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট