চট্টগ্রাম শুক্রবার, ০৯ ডিসেম্বর, ২০২২

সর্বশেষ:

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২২ | ১১:১৭ পূর্বাহ্ণ

ইফতেখারুল ইসলাম

জেলা পরিষদকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেছি, যা নজিরবিহীন

চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোহাম্মদ আবদুস সালাম (এম এ সালাম) ২০১১ সালের ১২ ডিসেম্বর ৫ বছরের জন্য চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পান। ২০১৭ সালের ১৫ জানুয়ারি ৫ বছরের জন্য নির্বাচিত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। চলতি বছরের ২৮ এপ্রিল ৬ মাসের জন্য ফের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পান। সাড়ে ১০ বছর দায়িত্ব পালনকালের নানা দিক নিয়ে পূর্বকোণ এর সাথে কথা বলেছেন তিনি।

একান্ত আলাপকালে এম এ সালাম বলেন, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হবো এটা আমার কল্পনাতে কখনো ছিল না। আমি রাজনীতি করছি মূলত বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ধারণ করে শেখ হাসিনার একজন কর্মী হিসেবে মানুষের কল্যাণকে মাথায় রেখে। মানুষের কল্যাণ নানাভাবে করা যায়। তবে পদ পেলে বিশেষ করে প্রশাসনিক পদ, যার দ্বারা কোন সংস্থার মাধ্যমে কিংবা সংসদ সদস্য হলে সুযোগটা বেড়ে যায়। নিজের দল ক্ষমতায় থাকলে সুযোগ আরো বেশি থাকে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জেলা পরিষদ জনপ্রতিনিধি দ্বারা চালানোর যে ব্যবস্থা এইচ এম এরশাদ চালু করেন বিএনপি তা বন্ধ করে দেয়। আমাদের নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১১ সালে তা চালু করে প্রশাসক নিয়োগ দেয়ার ব্যবস্থা করেন। নেত্রী আমাকে ৫ বছরের জন্য প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে বললেন, তোমাকে তো কিছু দিতে পারিনি। এখন এটা চালাও। চালাতে এসে দেখলাম, জেলা পরিষদ আসলে মানুষের কাছে পরিচিত কিছু না।

তবে এখান থেকে অনেক কাজ করা যায় এই সম্ভাবনা দেখলাম। তবে চেয়ারে বসার আগে জেলা পরিষদ নিয়ে অন্য দশ জনের মতই আমার ধারণা ছিল। উন্নয়ন কাজের ব্যাপ্তি তেমন বেশি ছিল না। ভাঙা একটি অফিস। ছাদ থেকে পলেস্তরা খসে পড়ে। বৃষ্টির পানি চুইয়ে পড়ে। ফান্ড নেই। মন্ত্রণালয় থেকে কোন বরাদ্দ পায় না। বেতন-ভাতা, দান অনুদান, রাস্তা-ঘাট, ব্রিজ কালভার্ট উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সবকিছু নিজস্ব আয় থেকে করতে হয়। কঠিন এক পরিস্থিতি। ধীরে ধীরে আয়ের পথ খুলতে থাকলাম। একসময়ে এসে নিজস্ব বহুতল ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নিলাম। তখন আরেক বাধা এল। এটাকে হেরিটেজ বিল্ডিং হিসেবে রাখার কথা উঠল। বাস্তবে এখানে হেরিটেজের কিছু নেই। ভবনের অর্ধেক ব্রিটিশ আমলে বাকি অর্ধেক নির্মাণ হয় পাকিস্তান আমলে। সব বাধা পেরিয়ে অবশেষে কাজ শুরু হয়ে ভবন নির্মাণ হয়ে গেছে। তবে ফিনিশিংটা বাকি আছে।

পাশাপাশি বেহাত জমি উদ্ধার করে তা লিজ দেয়া, কিছুতে মার্কেট নির্মাণ করে দোকান বিক্রি, বন্ধ ফেরিঘাট চালু করে আয়ের পথ খুললাম। বাংলাদেশের অন্য কোন জেলা পরিষদ আছে কিনা আমার জানা নেই যারা ১০ বছরে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে। দ্বিতীয় মেয়াদে চেয়ারম্যান হওয়ার পর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যদের বছরে ৬০ লাখ টাকা সম্মানি দেয়া, করোনাকালে সহায়তা প্রদান, শিক্ষাবৃত্তির আওতা বাড়ানো, গরিব-দুঃস্থ ও মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা, মানবসম্পদ উন্নয়নে সেলাই প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রশিক্ষণার্থীদের সেলাই মেশিন উপহার দিয়েছি। যত স্কুল-কলেজ শহীদ মিনার নির্মাণের জন্য এসেছে কাউকে ফিরিয়ে দেইনি। কুমিরায় স্মৃতি ৭১, চন্দ্রনাথ পাহাড়ের নিচে মৃত্যুঞ্জয় মিত্র নির্মাণ করেছি। ডিজাইন একজন শিল্পীকে দিয়ে করালেও, তবে থিমটা ছিল তার। বধ্যভ‚মির খবর যেখানে পেয়েছি সংরক্ষণ করেছি। মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধিত করেছি অত্যন্ত ভালমানের ক্রেস্ট দিয়ে। যাতে সেটি দীর্ঘকাল সংরক্ষণ করা যায়। চট্টগ্রামে যেখানে দুর্যোগের ঘটনা ঘটেছে সেখানে জেলা পরিষদের সহায়তা নিয়ে হাজির হয়েছি। একদিকে, জেলা পরিষদের আয়ের উৎস বাড়িয়েছি। অপরদিকে, তা উন্নয়ন এবং মানুষের কল্যাণে ব্যয় করেছি।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তিনি দায়িত্ব নেয়ার সময় সম্ভবত ২৩ কোটি টাকার বাজেট ছিল। সর্বশেষ বাজেট ছিল ৩৫০ কোটি টাকা। পুরোটাই নিজস্ব অর্থায়ন। এর জন্য শুক্র-শনিবারও অফিস করেছি। আবার উপজেলাগুলোতেও গিয়েছি কাজ দেখার জন্য। ১৫টি উপজেলা। অথচ আমাদের জনবল অত্যন্ত কম। যেকারণে তাদেরকে রাত ১০টা পর্যন্ত খাটাইছি। আমি নিজেও খেটেছি। একটা চিন্তা আমার মাথায় ছিল যে, প্রধানমন্ত্রী আমাকে যে আমানত দিয়েছেন যথাযথভাবে রক্ষা করে তা ফোকাসে নিয়ে আসা। সেখান থেকে যে মানুষের উপকার করা যায়, সেবা দেয়া যায়, উন্নয়ন কাজ করা যায় তার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছি। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে কিছু কাজ শেষ করতে পারেনি। একদিনের কাজ করতে হয়তো একমাস লেগেছে। আরো অনেক স্বপ্ন ছিল। এই দীর্ঘসূত্রতার কারণে পারিনি। অনেক জমি উদ্ধার করতে পারিনি মামলার কারণে। একটির শুনানি হয়, আরেকটি তারিখ পরে ৬ মাস পরে। তবে অনেক মামলা নিস্পত্তি করে জায়গা উদ্ধার করেছি। এমনকি বেহাত হওয়া গেস্ট হাউজও উদ্ধার করেছি।

সরকারি বরাদ্দ প্রসঙ্গে বলেন, বছরে ৪ থেকে ৫ কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ আসে না। এডিপি’র এই টাকা সংসদ সদস্যদের বরাদ্দ দিয়ে দিই। তারাই তা উন্নয়ন কাজে ব্যয় করেন।

মূলত গ্রামভিত্তিক কাজ করে থাকে জেলা পরিষদ। গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে কম বাজেটের প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। বছরে এক থেকে দেড় হাজার প্রকল্প হয়।

কাজের বাধা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, জেলা পরিষদের আইন-২০০০ এর মধ্যে কিছু বিষয় আনা উচিত ছিল যা আনা হয়নি। জেলা পরিষদ ১৮৮৫ সাল থেকে শুরু। জেলা পরিষদ এবং ইউনয়ন পরিষদের মাঝে এরশাদ সরকার উপজেলা পরিষদ চালু করে। সেই বিষয়টি মাথায় না রেখেই আইনটি প্রণয়ন করা হয়। যেকারণে জেলা পরিষদে সদস্য প্রথা চালু আছে। একসময় প্রাথমিক শিক্ষা, এলজিইডি, প্রাণিসম্পদ দপ্তরসহ অনেকগুলো সংস্থা জেলা পরিষদের অধীনে ছিল। যদিও অনেক সংস্থা আলাদা হয়ে গেছে।

আরেক বাধা হল জনবল, ফেনী কিংবা মেহেরপুরের যে জনবল চট্টগ্রামেও একই জনবল। জনবল কাঠামো একটি বড় বাধা। কীভাবে রিফর্ম হওয়া উচিত সে বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবনা দিয়েছি। বর্তমান সময়ে তা কি হওয়া উচিত তা বলেছি। যেহেতু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার জন্য জেলা পরিষদ চালু করেছেন তাই এর রিফর্ম করা উচিত। চেয়ারম্যান হওয়ার পর শুরুর মিটিংয়ে এসব কথা বলেছি।

ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বারদের নেতৃত্ব দেন চেয়ারম্যান। চেয়ারম্যানদের নিয়ে কাজ করেন উপজেলা চেয়ারম্যান। উপজেলা পর্যায়ে যাতে সেবাটা পাওয়া যায়। কিন্তু উপজেলা চেয়ারম্যানদের নিয়ে জেলা পরিষদ হওয়া দরকার। কিন্তু নতুন যে রিফর্ম হয়েছে তা যেভাবে হওয়া উচিত ছিল সেভাবে হয়নি। এখানে সদস্য প্রথা চালু রাখা হয়েছে। আবার ইউএনও, পৌরসভার মেয়ররা আসবেন। এভাবে জেলায় অন্তত ৮৭ জনের একটি পরিষদ হয়ে যাচ্ছে। এই পরিষদটা এভাবে করার কারণে বিরোধ সৃষ্টি হতে পারে। কারণ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এবং জেলা পরিষদের সদস্যের মর্যাদা নিয়ে কথা আসবে। যেহেতু প্রশাসনিক কিছু এখানে নেই। সম্পূর্ণ উন্নয়ন এবং সেবামূলক কাজ এখান থেকে হয়।

রোম একটি পুরাতন মিউনিসিপালিটি। সেখানে পুলিশ আছে। বাজেট প্রণয়ন, কর আহরণসহ সবকিছু আছে। সেকারণে জেলা পরিষদের ফর্মেশন হওয়া উচিত ছিল জেলা গভর্মেন্ট। প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ না করলেও উন্নয়ন বিকেন্দ্রীকরণ করা উচিত ছিল।

প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছা আমি দেখেছি। কিন্তু নানা কারণে এসব রিফর্ম হয়নি। কারণ এটি একটি জটিল কাজ। জল, স্থলে-অন্তরীক্ষে উন্নতি হয়েছে। পাতালেও টানেল হয়েছে। উন্নয়নের অগ্রযাত্রার বিরুদ্ধে যারা ষড়যন্ত্র করছে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তিনি কাজ করে যাচ্ছেন। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতার মাধ্যমে জেলা পরিষদ পরিচালনা করেছি। ঈমানদারির সাথে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আমানত রক্ষা করেছি।

জেলা পরিষদে নির্বাচন পদ্ধতির বিষয়ে আমি জাতীয় এক সেমিনারে বলেছিলাম, সরাসরি সাধারণ মানুষের নির্বাচনে নির্বাচিত করার জন্য। কারণ অন্য সব নির্বাচন সরাসরি হয় শুধুমাত্র জেলা পরিষদ নির্বাচন ছাড়া।

এই ধরনের ভোট মানুষের ঈমান নষ্ট করে ফেলে। কারণ প্রার্থীরা সবার কাছে যায় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং মেম্বাররা সবাইকে আশ্বাস দিচ্ছেন। অথচ তার কাছে ভোট আছে মাত্র একটি। সরাসরি নির্বাচন হলে জনগণ যোগ্য ব্যক্তিকে বাছাই করার সুযোগ পেত।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যে লক্ষ্য নিয়ে জেলা পরিষদ চালু করেছেন, ভবিষ্যতে এটি রিফর্ম হতে হতে একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে।

এটিএম পেয়ারুল ইসলাম সাবেক ছাত্র নেতা, আমার রাজনৈতিক সহযোদ্ধা। ত্যাগী ও পোড়খাওয়া রাজনীতিক। আমার দৃঢ় বিশ্বাস তিনি ভাল চালাতে পারবেন। আমার চেয়েও ভাল চালাতে পারবেন। তবে তিনি যদি আমার কাছে কোন পরামর্শ চান আমি তাকে মনপ্রাণ দিয়ে সহযোগিতা করবো। জেলা পরিষদ সত্যিকার অর্থে জনগণের প্রকৃত সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে সেটাই আমার কামনা।

পূর্বকোণ/আর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট