চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ০২ ফেব্রুয়ারী, ২০২৩

২০ ডিসেম্বর, ২০২২ | ৫:১৯ পূর্বাহ্ণ

ডা. আফতাবুজ্জামান

কীভাবে মেসিপ্রেমী হল একজন ফুটবলপ্রেমী

আমাদের ছোটবেলায়, মানে স্বাধীনতার পরের বছরগুলোতে, বাংলাদেশের ফুটবল বাংলাদেশে খুব জনপ্রিয় ছিল। সেই সময় আবাহনী ও মোহামেডান ছিল সবচেয়ে জনপ্রিয় দুটো দল। আমার এক বন্ধু ছিল মোহামেডান সমর্থক। সে মোহামেডানের খেলা দেখতে রাতের ট্রেনে চিটাগাং থেকে ঢাকা যেতো, সারাদিন এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করে বিকেলে খেলা দেখে রাতের ট্রেনে চিটাগাং ফিরত। ফুটবল এমন জনপ্রিয় ছিল সেসময়। মোহামেডান বা আবাহনীর খেলার দিন ঢাকা স্টেডিয়ামে জায়গা খালি থাকতো না। আজকালতো আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচেও স্টেডিয়াম পুরো ভরে না।
বন্ধুর মতো পাগল না হলেও খেলা পাগল ছিলাম। সেই সময় ইউটিউব ছিল না, টিভিতে সরাসরি কোন খেলা দেখাতো না। অনেকের মুখে শুনেছি আর পড়েছি, পেলে ফুটবলের যাদুকর। শুনে আর পড়েই পেলে এবং ব্রাজিলের ভক্ত হয়ে গেলাম। এরপর অবশ্য পেলের কিছু ক্লিপ দেখেছি। খুব সম্ভবত ম্যারাডোনার বিশ্বকাপের সময় থেকে টিভিতে সরাসরি খেলার সম্প্রচার শুরু হয়। ম্যারাডোনার অনেক খেলা দেখেছি, দেখেছি জিদান, ক্রাউফ, প্লাতিনি, কাকা, রুমেনিগে, ম্যাথিউস, রোনালদিনোসহ পাগল করা অনেকের খেলা। এতো খেলোয়াড় আর এতো দলের মাঝে ব্রাজিলের প্রতিই ছিল আমার বড় দুর্বলতা। হারুক বা জিতুক, মনে হতো ব্রাজিলের ফুটবল হল কবিতা, আর বাকিরা গদ্য।
এবারের বিশ্বকাপের শুরুতেও আমি ব্রাজিলের সমর্থক ছিলাম। চেয়েছিলাম তারাই বিশ্বকাপ জিতুক। তা সত্ত্বেও একজন খেলোয়াড়ের কথা আমি বারবার ভাবতাম, তিনি লিওনেল আন্দ্রেস মেসি। মেসির বাবা ছিলেন এক কারখানার ম্যানেজার। মা কারখানা শ্রমিক। পরিবারে সবাই ফুটবল ভালোবাসতেন। সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন মেসির নানী সিলিয়া। সিলিয়া মেসিকে খেলা দেখতে আর ট্রেনিংয়ে নিয়ে যেতেন। নানীর মৃত্যুর পর মেসি ভেঙে পড়ে, কিন্তু নানীর কথা ভেবে সে খেলা চালিয়ে যায়। কোন খেলায় গোল দেয়ার পরই মেসিকে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখা যায়। মেসি ভাবে, তার নানী উপর থেকে তার খেলা দেখছে। নানীকে স্মরণ করেই সে আকাশের দিকে তাকায়।
বিশ্বের ক্রীড়া সাংবাদিকরা ১৯৫৬ সাল থেকে বছরের সেরা ফুটবল খেলোয়াড়দের একটা পুরস্কার বা খেতাব দিয়ে আসছে, যার নাম ব্যালন ডি’অর। মেসি এই খেতাব জিতেছে সাতবার, তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী রোনালদো জিতেছে পাঁচবার। এছাড়াও মেসি বা মেসির দল অনেককিছু জিতেছে। কিন্তু একটা জয় তার বাকি ছিল, সেটি বিশ্বকাপ।
এসব ভাবতে ভাবতেই একসময় আমি মনে প্রাণে চাইতে শুরু করলাম মেসি বিশ্বকাপ জিতুক। লক্ষ- কোটি মানুষকে যে মানুষটা নির্ভেজাল আনন্দ দিয়েছে, মাতিয়েছে, লক্ষ লক্ষ শিশু কিশোরকে যে মানুষটা অনুপ্রাণিত করেছে, কেন তার জীবনে একটা অপূর্ণতা থাকবে? কেন আকাশের দিকে মুখ তুলে মেসি বলতে পারবে না, দেখো নানী, তোমার আদরের ছোট্ট লিও বিশ্বকাপ জিতেছে?
মেসি কি সর্বকালের সেরাদের একজন? অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ মনে করেন, মেসি সেরা তিনজনের একজন, বাকি দু’জন পেলে ও ম্যারাডোনা।
আমি অবশ্য এসব ভাবি না। আমি ভাবি, বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলার সবচেয়ে প্রভাবশালী কবিদের সে একজন। খুব সম্ভবত ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী।
বিশ্বকাপের ফাইনালে পেনাল্টির সময় মেসির জন্য দোয়া করেছি- আর কোন খেলায় কোন দল বা কোন খেলোয়াড়ের জন্য যা করিনি।
ভবিষ্যৎ বুঝা কঠিন। তবে মনে হয়, যতদিন ফুটবল বেঁচে থাকবে, ততদিন বেঁচে থাকবে সিলিয়ার আদরের নাতি, লিওনেল আন্দ্রেস মেসি।

ডা. আফতাবুজ্জামান
নিউজিল্যান্ড থেকে

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট