চট্টগ্রাম রবিবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০২০

সর্বশেষ:

১৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ | ৩:২১ পূর্বাহ্ন

আবসার মাহফুজ

মুক্তিযুদ্ধের চেতনাভিত্তিক গণমাধ্যমের স্বপ্ন ও বাস্তবতা

লাখো শহীদের রক্তে রাঙা স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভিত্তিভূমি হচ্ছে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ। পাকিস্তানী শাসন-শোষণ, নির্যাতন-নিপীড়ন, হত্যা-লুণ্ঠন সীমা ছাড়িয়ে গেলে বাঙালি জনগোষ্ঠী ‘জীবন মৃত্যু পায়ের ভৃত্য, চিত্ত ভাবনাহীন’ মনে করে স্বাধীনতার লক্ষে ঝাঁপিয়ে পড়েন মহান মুক্তিযুদ্ধে। বাঙালি জাতির ত্রাণকর্তা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে স্বাধীনতাপ্রিয় জনগণ যার যা কিছু আছে তা নিয়েই মুক্তির লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়। শুরু হয় ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ২৬ মার্চ পাক হানাদার হটিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জনের এক অসম রক্তাক্ত যুদ্ধ। এ যুদ্ধে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছেন, সম্ভ্রম হারিয়েছেন লাখো মা-বোন। শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ নয় মাসের অবর্ণনীয় ত্যাগ-তিতিক্ষার পর ১৬ ডিসেম্বর ঘটে মহান মুক্তিযুদ্ধের কাঙিক্ষত সাফল্যময় অবসান। ৯৩ হাজার প্রশিক্ষিত সৈন্যসহ ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে লজ্জাকর আত্মসমর্পণ করেন পাক হানাদার বাহিনীর প্রধান জেনারেল নিয়াজী। বিশে^র রাজনৈতিক মানচিত্রে ভাস্বর হয়ে উঠে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার ফিরে পাই আমরা। মুক্তিযোদ্ধাদের অসীম সাহসিকতা, দৃঢ় মনোবল, লড়াই-কুশলতা ও প্রাণ উৎসর্গ করতে প্রস্তুত থাকার মানসিকতার ফলশ্রুতিতে আরাধ্য বিজয় অর্জিত হয়েছে। তবে মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত বুদ্ধিদীপ্ত ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমও বিরাট ভূমিকা রেখেছে। গণমাধ্যমের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সমর্থন সহযোগিতা মুক্তিযুদ্ধে শক্তি সঞ্চার করেছে। মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস যুগিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জোরদার হয়েছে বিশ^জনমত। এতে সুগম হয়েছে বিজয় অর্জনের পথ। শেষ পর্যন্ত বিজয়সূর্য ছিনিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে বাংলার দামাল ছেলেরা।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা এদেশের মানুষের দীর্ঘদিনের সংগ্রামের ফসল। এ স্বাধীনতা অর্জন করতে এ দেশের মানুষ সংগ্রাম আর আন্দোলনের নানামাত্রিক অধ্যায় অতিক্রম করেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পটভূমি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বঙ্গোপসাগরের বুক থেকে উঠে আসা প্রায় ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের এই সুফলা জনপদটির মানুষ সুপ্রাচীনকাল থেকেই স্বাধীনতাপ্রিয়। তারা সকল শোষণ, নির্যাতন এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে কালে কালে। যদিও ঐতিহ্যগতভাবে বাঙালিরা খুবই সহজ-সরল এবং সহিষ্ণু। কিন্তু তারা কখনও অন্যায়কে প্রশয় দেয় নি। প্রশ্রয় দেয় নি শোষণ এবং নির্যাতনকে। যার কারণে তারা যখনই শোষিত ও নির্যাতিত হয়েছে তখনই ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলনের অবতীর্ণ হয়েছে। সামরিক, বেসামরিক সব ক্ষেত্রে পাক আমলে বাঙালি জনগোষ্ঠী অধিকারবঞ্চিত হচ্ছিল, তখনই বাঙালিরা নিজেদের অধিকারের জন্যে গর্জে উঠেছে। আর দেশি-বিদেশি গণমাধ্যম বাঙালিদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের আন্দোলন-সংগ্রামে সমর্থন-সহযোগিতা দিয়েছে অকৃপণভাবে। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে গণমাধ্যম যে ভূমিকা রেখেছে তা এক কথায় অতুলনীয়। স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের প্রচারিত উজ্জীবনী গান, সংবাদ, কথিকা, সাক্ষাৎকার, আলোচনা অনুষ্ঠান, সংবাদ বিশ্লেষণ মুক্তিযোদ্ধা ও বাংলার সাধারণ মানুষকে সাহস ও শক্তি যুগিয়েছে। মুক্তিপাগল মানুষের মনে মুক্তিচেতনার অগ্নিস্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি করেছে। দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক আজাদসহ বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ, সংবাদবিশ্লেষণ, সম্পাদকীয়, উপম্পাদকীয় সাধারণ মানুষকে শুধুই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সংগঠিত করে নি, মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে বাংলার দামাল ছেলেদের অনুপ্রাণিত করেছে, মুক্তিযোদ্ধাদের পথ-নির্দেশনা দিয়েছে, বিদেশিদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের যৌক্তিকতা তুলে ধরেছে, মহান মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রবল বিশ^জনমত গঠন করেছে। দেশি গণমাধ্যমের পাশাপাশি বিদেশি গণমাধ্যমও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে প্রশংসনীয় ভূমিকা রেখেছে। বিশে^র প্রভাবশালী পত্রিকা নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট, দ্য গার্ডিয়ান, দ্য টাইমস, দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ, দ্য স্টেটস ম্যান, ফিন্যানসিয়াল টাইম, বিবিসি, টাইম ম্যাগাজিনসহ বিভিন্ন গণমাধ্যম বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাকে মুহূর্তেই ছড়িয়ে দেয় বিশ^ময়। একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের যৌক্তিকতা তুলে ধরে বিশ^জনমতকে বাঙালিদের পক্ষে আনতেও প্রশংসনীয় ভূমিকা রেখেছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম। ফলে দিন দিন বেড়েছে আমাদের বন্ধুদেশের সংখ্যা। এক ঘরে হয়ে পড়েছে হানাদার পাকিস্তান। বিশ^জনমত আগ্রাসী পাকিস্তানের বিপক্ষে যাওয়ায় পাকসেনাদের মনোবল ভেঙ্গে যায়। পক্ষান্তরে বিশ^জনমত ও দেশি-বিদেশি গণমাধ্যম মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে থাকায় মুক্তিযোদ্ধারা শক্তি-সাহস পেয়েছে, তাদের নৈতিক মনোবল ছিল ইস্পাতকঠিন। ফলে দীর্ঘ নয় মাসের রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ অর্জন সহজ হয়েছে।
আমরা মনে করি, গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশকে উন্নতি-সমৃদ্ধির শিখরে নিয়ে যেতেও গণমাধ্যম একাত্তরের ন্যায় পথপ্রদর্শকের ভূমিকা রাখতে পারে। বিশ^স্ততার সাথে গণমাধ্যম দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করলে হাজার বছরের আরাধ্য সোনার বাংলা তথা একটি সমৃদ্ধ স্বয়ম্ভর বাংলাদেশ অর্জনের পথ মসৃণ হয়ে যাবে। তবে এজন্যে সুস্থধারার গণমাধ্যমকে সরকারের যৌক্তিক পৃষ্ঠপোষকতা দিতে হবে। যেসব সংবাদপত্র ও টিভি চ্যানেল মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে, যারা আমাদের হাজার বছরের সভ্যতা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, যারা দেশ ও জনগণের বিরুদ্ধে, অবস্থান নেয় গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে, যারা দু’তিনশ পত্রিকা ছাপিয়ে অবৈধভাবে সরকারি বিজ্ঞাপন হাতিয়ে নেয়, সংবাদকর্মীদের ন্যায্য বেতন-ভাতা দেয় না, সাংবাদিক-কর্মচারীদের সাথে প্রভু-ক্রীতদাসসুলভ আচরণ করেন, নেই কর্ম-পরিবেশ, সেসব পত্রিকা ও টিভি চ্যানেলের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। যথাযথ তদন্তসাপেক্ষে এসব প্রতিষ্ঠানের প্রতারক ও শোষক মালিকদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির উদ্যোগ নিতে হবে। প্রয়োজনে ডিক্লারেশন-শর্ত ভঙ্গকারী পত্রিকা ও টিভি চ্যানেল বন্ধ করে দিতে হবে। এতে সুস্থধারার দেশ ও সাংবাদিকবান্ধব পত্রিকা ও টিভি চ্যানেলগুলো শক্তিশালী হয়ে গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখাসহ দেশের উন্নয়ন-সমৃদ্ধিতে জনকাক্সিক্ষত ভূমিকা রাখার সুযোগ পাবে।
উন্নত দেশগুলোতে গণমাধ্যমের লাইসেন্স দেওয়ার সময় রাজনৈতিক বিবেচনার পরিবর্তে বিজ্ঞাপনের টোটাল বাজার, সাংবাদিক-কর্মচারীদের ন্যায্য বেতনভাতা প্রদানের সক্ষমতা, মালিকপক্ষের দেশপ্রেম এবং গণমাধ্যম পরিচালনার যোগ্যতা প্রভৃতি বিষয়কে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে গণমাধ্যমের লাইসেন্স দেওয়ার সময় সাধারণত এসব বিষয়কে তেমন আমলে নেওয়া হয় না। পরিণতিতে গণমাধ্যমজগতে প্রতারকদের দৌরাত্ম্য বাড়ছে দিন দিন। এতে কোণঠাসা হয়ে পড়ছে বিশেষত সুস্থধারার পত্রিকাগুলো। আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকাগুলো হাতিয়ে নিচ্ছে সরকারি বিজ্ঞাপনের একটি বিশাল অংশ। এসব পত্রিকা আবার হলুদ সাংবাদিকতাকেও উৎসাহিত করছে। অশিক্ষিত, মূর্খ কিছু ধান্ধাবাজকে সাংবাদিক পরিচয়পত্র দিয়ে মাঠে-ময়দানে ছেড়ে দিচ্ছে চাঁদাবাজি করার জন্যে। এসব চাঁদাবাজ সাংবাদিক সাধারণ নিরীহ মানুষদের ভয়-ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায় করে। তারা আদায়কৃত অর্থের একটি বড়ো অংশ দেয় মালিকদের তহবিলে। তাদের কারণে আজ সৎসাংবাদিকদেরও সাধারণ মানুষ সন্দেহের চোখে দেখে। এদের দ্বারা আজ দূষণের শিকার সাংবাদিকতার পরিবেশ। এদের কারণে আজ সাধারণ মানুষের কাছে হেয় প্রতিপন্ন হচ্ছে সত্যিকারের সংবাদপত্র ও সংবাদকর্মীরা। তাই এসব তথাকথিত সাংবাদিক এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। একইসঙ্গে যেসব পত্রিকায় কর্মপরিবেশ নেই অথচ সরকার প্রদত্ত নানা সুযোগ-সুবিধা কড়ায়-গন্ডায় আদায় করে নেয় তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। এটি সময়ের দাবি। এ দাবি পূরণে সরকারকেই শতভাগ আন্তরিক হতে হবে। এ বিষয়ে যে কোনো ধরনের খামখেয়ালি দেশ ও জনগণের জন্যে বিরূপ ফল বয়ে আনবে।
সংবাদপত্রকে সমাজের দর্পণ এবং সাংবাদিকদের জাতির বিবেক হিসেবে গণ্য করার কারণে পৃথিবীর সব সভ্যদেশে বিচারকদের সমবেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়। সাংবাদিকদের জীবনের নিরাপত্তা বিধানে নেওয়া হয় কঠোর পদক্ষেপ। কারণ জাতির বিবেকখ্যাত সাংবাদিকরা উচ্চ বেতন-ভাতা, সুযোগ-সুবিধা ও নিরাপত্তা না পেলে সাহসিকতা ও সততার সাথে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে পারবে না। আর সাংবাদিকরা যথাযথ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে সমাজ অশুভ-শক্তির দখলে চলে যাবে। যার কারণে সে কোনো ধরনের অনৈতিক বা অন্যায় প্রভাব থেকে সাংবাদিকদের নিরাপদ রাখতে উচ্চ বেতন-ভাতা ও সুুযোগ-সুবিধার বিধান রাখা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে বেশিরভাগ পত্রিকায় তার বিপরীত চিত্রই দেখা যায়। এখানে সুস্থ ধারার সংবাদপত্র, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা বিধান এবং সম্মান ও মর্যাদা রক্ষায় সরকারের পদক্ষেপ বলিষ্ঠ নয়। এ ব্যাপারে নেই সরকারের যৌক্তিক পদক্ষেপ। এই চিত্র কোনো সভ্য গণতান্ত্রিক দেশের জন্যে শুভ হতে পারে না। কারণ শক্তিশালী গণমাধ্যম ছাড়া সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা কঠিন। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় মূলত সুস্থধারার শক্তিশালী গণমাধ্যমই সরকারকে স্বেচ্ছাচারী হতে বাধা দেয়, আইনের শাসন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় পালন করে জনকাক্সিক্ষত ভূমিকা। আবার মুক্তিযুদ্ধের চেতনাভিত্তিক সৎ, যোগ্য ও চৌকষ সংবাদকর্মী ছাড়া শক্তিশালী গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠা অসম্ভব। তাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে একটি উন্নত-সমৃদ্ধ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের স্বার্থে সর্বাগ্রে শক্তিশালী গণমাধ্যম সৃষ্টি এবং সাংবাদিক সমাজের সম্মান, মর্যাদা, নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার সুচিন্তিত উদ্যোগ নিতে হবে। এটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারী প্রতিটি দেশপ্রেমিক মানুষের প্রত্যাশা। এই জনপ্রত্যাশা পূরণে সরকারকে সুচিন্তিত পদক্ষেপ নিতে হবে।
ঃ লেখক : সাংবাদিক, কলামিষ্ট, প্রবন্ধিক ও পরিবেশকর্মী

বিজয় দিবস সংখ্যা ২০১৯
চট্টগ্রাম ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯ সোমবার ১ পৌষ ১৪২৬

The Post Viewed By: 200 People

সম্পর্কিত পোস্ট