চট্টগ্রাম শনিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২২

সর্বশেষ:

১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২২ | ১:৩৮ অপরাহ্ণ

বস্ত্র প্রকৌশল শিক্ষার উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রা

মো. নুরুল আবছার

আমাদের দেশের অর্থনীতির বড় একটি শক্তির জায়গা হলো বস্ত্র ও তৈরি পোশাকশিল্প। রপ্তানী আয়ের চার—পঞ্চমাংশ আসে এখাত থেকেই। এককভাবে কোন একটি খাতের উপর এমন নিরঙ্কুশ নির্ভরতা বিশ্বে নিতান্তই বিরল। কাজেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, নির্ভরতা, ভবিষ্যত এবং অগ্রগতি এখাতকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে। এ শিল্প বিশ্ববাজারে সুনাম অর্জনের পাশাপাশি সৃষ্টি করেছে লাখ লাখ লোকের কর্মসংস্থান। মোট কথা, বাংলাদেশের রপ্তানি শিল্পে এটি একটি সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বস্ত্র প্রকৌশলবিদ্যার উন্নতি। বিশ্ববাজারে প্রকৌশলবিদ্যার কাতারে বস্ত্র প্রকৌশলবিদ্যা এখন একটি উজ্জ্বল নাম।
টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পাস করে বের হওয়া একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ সুবিস্তৃত। টেক্সটাইল সেক্টর প্রতিনিয়ত বাড়ছে। মেডিকেলের উপকরণ, অটোমোবাইল, মহাকাশ, জিও টেক্সটাইলসহ বিভিন্ন সেক্টরে টেক্সটাইলের ব্যবহার বাড়ছে। আজকাল উন্নত দেশগুলোতে মাইক্রোচিপ থেকে শুরু করে বিশাল ভবন, সেতু, অস্ত্রের কাঠামো, বুলেটরোধী পোশাক, এসব মিশ্র বস্তু উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন ফাইবার দিয়ে করা হচ্ছে। দিন যত যাবে, টেক্সটাইলের ব্যবহার বাড়তেই থাকবে।
বর্তমান সময়ে শিক্ষা লাভ করে চাকরির ক্ষেত্রে যে কেউ সাফল্যের শীর্ষে পৌছতে পারে। মূলত উন্নতি আর সাফল্য নির্ভর করে কর্মক্ষেত্র নির্বাচন ও যথাযথ প্রয়োগের উপর। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন মেধা, মনন ও দক্ষতা। বর্তমানে বাংলাদেশসহ বিশ্বে যে কয়েকটি শিল্প মাধ্যম দ্রুত বিকাশ লাভ করেছে, তার মধ্যে টেক্সটাইল শিল্প অন্যতম।
বাংলাদেশে যেখানেই বস্ত্রের সংশ্লিষ্টতা আছে, সেখানেই টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারদের কর্মস্থল। দেশের বাইরেও রয়েছে প্রচুর চাকরির সুযোগ। এছাড়া বিদেশে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারদের বিপুল চাহিদার কারণে কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন উন্নত দেশে মাইগ্রেশনের মাধ্যমে প্রতি বছর প্রচুর টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন।
পুরো খাতটির পরিসর এত বড় যে এখনো অনেক কিছুই অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে। তরুণেরা যদি আগ্রহী হন, তাহলে একদিকে যেমন তাঁরা নিজেরা পেশাজীবনে সফল হতে পারবেন, তেমনি দেশও এগিয়ে যাবে। বাংলাদেশের পোশাক খাতে প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় পদে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কাজ করছেন ভারতীয়, শ্রীলঙ্কান বা চীনারা। যাঁরা নিজেদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার কারণেই এই জায়গা দখল করে নিয়েছেন। আমাদের তরুণেরা যদি উদ্যোগী হন, শিক্ষাজীবন থেকেই নিজেকে গড়ে তোলেন, তাহলে তাঁরা কেন পারবেন না?
বাংলাদেশে বর্তমানে কটন ও সিনথেটিক মিল, উলেন ও উইভিং মিল, হ্যান্ডলুম, ডাইং, ফিনিশিং এবং এক্সপোর্ট ওরিয়েন্টেড গার্মেন্টসহ প্রায় ৯ হাজার টেক্সটাইল শিল্প আছে। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা সত্ত্বেও এ সেক্টরের অগ্রগতি অব্যাহত আছে। প্রায় প্রতি বছর নতুন নতুন টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রি স্থাপিত হচ্ছে। বাংলাদেশের বস্ত্র আজ বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়। বর্তমানে এ শিল্পের চাহিদার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে প্রয়োজনীয় দক্ষ ও শিক্ষিত জনশক্তি জোগান দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তাই টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে উচ্চশিক্ষা এখন সময়ের দাবি।
দুই শতাব্দীর ব্রিটিশ শাসন এবং তৎ—পরবর্তী পাকিস্তানী শাসন ও শোষন থেকে মুক্ত হয়ে বাঙ্গালী জাতি কৃষি নির্ভরতা থেকে বের হয়ে কৃষি ভিত্তিক শিল্পায়নের প্রতি মনোযোগী হয়। যার শুভ সূচনা হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর “মৃত প্রায় এবং রুগ্ন শিল্প—কারখানা গুলোকে” জাতীয় করণ ও পূণরুজ্জীবনের মাধ্যমে। এর পরবর্তী ইতিহাস খুব দ্রুততার সাথে রং বদলেছে। মাত্র চার দশকের ব্যবধানে বাংলাদেশ চীনের পরে বিশ্বের সর্বোচ্চ পোষাক রপ্তানীকারক দেশের মর্যাদা অর্জন করেছে।
বস্ত্র শিল্পের বিশ্বায়ন এবং দেশের অর্থনৈতিক জাগরণে বস্ত্র মন্ত্রণালয় এবং বস্ত্র অধিদপ্তরের অনবদ্য এবং ব্যতিক্রমী ভূমিকা রয়েছে। তৈরী পোষাক শিল্পের “পোষক কর্তৃপক্ষ” হিসেবে বস্ত্র অধিদপ্তর এ শিল্পের অনুমোদন, মনিটরিং এবং বিশ্বব্যাপী বাজার সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে, এ কথা হয়ত অনেকেই জানেন। বস্ত্র প্রকৌশল শিক্ষার উন্নয়ন ও প্রসারে এ অধিদপ্তরের ভূমিকা এবং অবদান সবচেয়ে বেশি। টেকসই শিল্পোন্নয়নের পূর্বশর্ত দক্ষ এবং প্রশিক্ষিত জনসম্পদ। বস্ত্র অধিদপ্তর এ লক্ষ পূরণে তিন স্তরের শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে।
১। এসএসসি টেক্সটাইল ভোকেশনাল শিক্ষাক্রম :
প্রতিষ্ঠানের ধরণ : টেক্সটাইল ভোকেশনাল ইনস্টিটিউট (৪১টি)
কোর্সের নাম : এসএসসি টেক্সটাইল ভোকেশনাল (২বছর মেয়াদী)
ভর্তির যোগ্যতা : জেএসসি/জেডিসি পাশ
সনদ প্রদানকারী কতৃর্পক্ষ : বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষাবোর্ড, ঢাকা
অর্জনঃ প্রতি বছর ৮০০০ থেকে ৯০০০ দক্ষ কর্মী তৈরী। যারা বস্ত্র শিল্পের যেকোন সেক্টরে ফ্লোর লেভেলে কাজ করার যোগ্যতা অর্জন করে অথবা উচ্চ শিক্ষার জন্য প্রস্তুত হয়।
২। ডিপ্লোমা ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষাক্রম :
প্রতিষ্ঠানের ধরণ : টেক্সটাইল ইনস্টিটিউট (১০টি)
কোর্সের নাম : ডিপ্লোমা ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং (৪বছর মেয়াদী)
ভর্তির যোগ্যতা : ন্যূনতম ৩.৫০ জিপিএ সহ এসএসসি/সমমান পাশ
সনদ প্রদানকারী কতৃর্পক্ষ : বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষাবোর্ড, ঢাকা
অর্জন : প্রতি বছর ১৫০০ থেকে ২০০০ মিড লেভেল বস্ত্র প্রকৌশলী তৈরী। যারা বস্ত্র শিল্পের উৎপাদন থেকে শুরু করে বাজারজাতকরণের সকল স্তরে তাদের দক্ষতার প্রমাণ রাখতে সক্ষম।
৩। বিএসসি ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষাক্রমঃ
প্রতিষ্ঠানের ধরণ : টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ (০৮টি)
কোর্সের নাম : বিএসসি ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং (৪বছর মেয়াদী)
সনদ প্রদানকারী কতৃর্পক্ষ : বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
অর্জন : প্রতি বছর ১০০০ থেকে ১২০০ এক্সিকিউটিভ লেভেল বস্ত্র প্রকৌশলী তৈরী। যারা বস্ত্র শিল্পের উৎপাদন, উন্নয়ন, ও গবেষণা সহ সকল ক্ষেত্রে প্রতিনিধিত্ব করতে সক্ষম।

বস্ত্র প্রকৌশল শিক্ষায় চট্টগ্রাম : বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী খ্যাত চট্টগ্রাম বস্ত্র শিল্পের সর্গরাজ্য হিসেবে পরিচিত। চট্টগ্রামে সমুদ্র বন্দরের অবস্থান এবং পরিবহণ সুবিধার কারণে দেশী—বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের কেন্দ্রে থাকে এ নগরী। বস্ত্র প্রকৌশল শিক্ষা বিস্তারে রয়েছে এ জেলার ঐতিহাসিক অবদান। চট্টগ্রামের প্রবেশদ্বার হিসেবে খ্যাত মিরসরাই উপজেলার জোরারগঞ্জ থানায় বস্ত্র অধিদপ্তর পরিচালিত প্রথম টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, “টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, জোরারগঞ্জ” প্রতিষ্ঠিত হয়। এইচএসসি পাশের পর দেশের শীর্ষ মেধাবীরা এ প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়ে বিএসসি ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রী অর্জনের সুযোগ পেয়ে থাকে।
বস্ত্র প্রকৌশল শিক্ষায় টেক্সটাইল ইনস্টিটিউট, চট্টগ্রামঃ চট্টগ্রাম নগরীর প্রাণকেন্দ্র পশ্চিম ষোলশহর ওয়ার্ডের আমীন কলোনীতে তিন একর ভূমির উপর টেক্সটাইল ইনস্টিটিউট, চট্টগ্রাম অবস্থিত। পাহাড়—সমতল মিলিয়ে চমৎকার ভূমি বৈচিত্রে, সবুজে ঘেরা নয়নাভিরাম পরিবেশে অত্যাধুনিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত টেক্সটাইল ইনস্টিটিউট, চট্টগ্রামের ক্যাম্পাস। এ প্রতিষ্ঠানের ৫তলা বিশিষ্ট একাডেমিক ভবনের পাশা—পাশি হাতে কলমে শিক্ষা গ্রহণের জন্য রয়েছে—
১। অত্যাধুনিক মেশিনারী সমৃদ্ধ ২তলা বিশিষ্ট একটি কটন স্পিনিং শেড।
২। অত্যাধুনিক মেশিনারী সমৃদ্ধ ২তলা বিশিষ্ট একটি ফেব্রিক ম্যানুফেকচারিং শেড।
৩। অত্যাধুনিক মেশিনারী সমৃদ্ধ ২তলা বিশিষ্ট একটি ওয়েট প্রসেসিং শেড।
৪। অত্যাধুনিক মেশিনারী সমৃদ্ধ ২তলা বিশিষ্ট একটি জুট স্পিনিং শেড।
এ ছাড়াও (১) একটি সমৃদ্ধ টেস্টিং ল্যাবরেটরী (২) একটি এ্যাপারেল ল্যাবরেটরী (৩) একটি মাল্টিমিডিয়া কম্পিউটার ল্যাবরেটরী (৪) একটি ফ্যাশন এন্ড ডিজাইন ল্যাবরেটরী এবং (৫) একটি মেকানিক্যাল ওয়ার্কসপ দক্ষ প্রকৌশলী তৈরীর এ কর্মযজ্ঞকে আরো শানিত ও পূর্ণতা দান করেছে।
একাডেমিক কার্যক্রম : বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড, ঢাকার অধীনে ৪ বছর মেয়াদী ডিপ্লোমা ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্স বাস্তবায়িত হয় এ প্রতিষ্ঠানে। প্রতি বছর এসএসসি পাশের পর জিপিএ ৩.৫০ প্রাপ্তরা এ প্রতিষ্ঠানে ভর্তির জন্য আবেদন করতে পারে। বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সেন্ট্রাল এডমিশন সিসটেম এর মাধ্যমে ১২০ জন শিক্ষার্থী এ প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায়। ২০১৬ খ্রিস্টাব্দ হতে এ প্রতিষ্ঠানে একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে।
চট্টগ্রাম জেলা এবং পার্শ্ববর্তী জেলা সমূহের মোট ৭টি টেক্সটাইল ভোকেশনাল ইনস্টিটিউট সহ বিদ্যমান ৪১টি প্রতিষ্ঠান হতে পাশ করা শিক্ষার্থীরা এ প্রতিষ্ঠানে ভর্তির ক্ষেত্রে ৩০% কোটা সুবিধা পেয়ে থাকে।

লেখক : জুনিয়র ইন্সট্রাক্টর (কারিগরি), টেক্সটাইল ইনস্টিটিউট, চট্টগ্রাম

 

পূর্বকোণ/এসি

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট