চট্টগ্রাম শনিবার, ২৯ জানুয়ারি, ২০২২

সর্বশেষ:

১৬ ডিসেম্বর, ২০২১ | ১:২৮ অপরাহ্ণ

মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম

অকার্যকর ‘ঝুড়ি তত্ত্ব’, উন্নয়নের রোল মডেল ৫০ বছরের বাংলাদেশ

জাগ্রত জনতার বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থেই সারা বিশ্বের বিস্ময়। পাকিস্তানিদের শোষণ-বঞ্চনা হতে মুক্তির জন্য এ দেশের মানুষ দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধ করেছিল। ত্রিশ লক্ষ জীবনের বিনিময়ে প্রাপ্ত বাংলাদেশ শুরুতে ছিল অতি দুর্বল একটি রাষ্ট্র, যাকে আমেরিকার রাজনীতিবিদ হেনরি কিসিঞ্জার ’তলাবিহীন ঝুড়ি’র সাথে তুলনা করেন। ক্ষুধা, দারিদ্র্য, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রাজনৈতিক সংঘাত, খনিজ সম্পদের অপ্রতুলতা, বিধ্বস্ত ও দুর্বল অবকাঠামো, উচ্চহার জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জনপ্রতি সামান্য জমি, বৈদেশিক সাহায্যের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীলতা, দুর্ভিক্ষ এসব ছিল বাংলাদেশ অর্থনীতির প্রাথমিক চিত্র। হতাশাজনক সূচকসমূহ লক্ষ্য করে ১৯৭৬ সালে জাস্ট ফ্যালান্ড এবং পার্কিনসন বাংলাদেশকে ‘টেস্ট কেস  ফর ডেভেলপমেন্ট’ হিসেবে বিবেচনা করেন। পরোক্ষভাবে তাঁরা বলতে চেয়েছিলেন পৃথিবীর অন্য সর্বত্র উন্নয়ন হলেও বাংলাদেশে উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাঁদের ভবিষ্যদ্বানীকে ভুল প্রমাণ করে বাংলাদেশ এগিয়ে চলছে দুর্বার গতিতে।

স্বাধীনতা-উত্তর  বাংলাদেশের জিডিপি ছিল ৯ বিলিয়ন ডলারেরও কম, পঞ্চাশ বছরের ব্যবধানে জিডিপির আয়তন ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি। জন্মলগ্নে এ দেশের মাথাপিছু আয় ছিল ৬০ থেকে ৭০ ডলার, বর্তমানে তা  ২ হাজার ২২৮ ডলার। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের মাধ্যমে বাংলাদেশ পুরো বিশ্বকে এক চমক দেখাতে সক্ষম হয়েছে। প্রধান খাদ্যশস্য যেমন ধান, গম, ভুট্টা উৎপাদনে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ। তাছাড়া, সবজি, মিঠাপানির মাছ, ছাগল, হাঁস-মুরগি, ডিম এবং বিভিন্ন ধরনের ফল উৎপাদনেও বর্তমানে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ। অথচ পাকিস্তান শাসকদের  বৈষম্যমূলক আচরণের কারণে ১৯৭০ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে খাদ্য ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৩৫ লাখ টন। পাঁচ দশক আগে মাত্র সাড়ে ৭ কোটি মানুষের অন্ন সংস্থান করতে এ দেশকে হিমশিম খেতে হত কিন্তু বর্তমানে জনসংখ্যা দ্বিগুনের অধিক হওয়া সত্ত্বেও খাদ্যে আমরা অনেকটা-ই স্বয়ংসম্পূর্ণ। বৈদেশিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীলতা জিডিপির ১৪ শতাংশ হতে হ্রাস পেয়ে বর্তমানে ১.৫ শতাংশের কম। সত্তরের দশকে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ৮২ ভাগ যা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়ে করোনা অতিমারীর পূর্বে ২০ ভাগে পৌঁছে।

নারীশিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়নে বর্তমান সরকারের বিশেষ মনোযোগ শ্রমবাজারে নারীদের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধির মাধ্যমে দারিদ্র্য মোকাবেলার পথ সুগম করেছে। একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে টিকে থাকতে পারা না পারা নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সংশয় উড়িয়ে দিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী তৈরি পোশাকের নেতৃস্থানীয় জোগানদাতা। কেবলমাত্র তৈরি পোশাক রপ্তানি করে বার্ষিক আয় প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলার। শ্রমঘন উক্ত খাতে লক্ষ লক্ষ কর্মী নিয়োজিত যাদের অধিকাংশ নারী। সত্তরের দশকে কেবলমাত্র পাট ও পাটজাত দ্রব্য ছিল রপ্তানিযোগ্য। সময়ান্তে বিশ্ববাজারে পাটের চাহিদা হ্রাস পেতে থাকে কিন্তু বাংলাদেশ সফলভাবেই রপ্তানিভিত্তি বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়। তৈরি পোশাক ছাড়াও বাংলাদেশের রপ্তানিযোগ্য আরও কয়েকটি আইটেম যথাক্রমে হিমায়িত মাছ, ঔষধসামগ্রী, নির্মাণসামগ্রী, হালকা প্রযুক্তি, চা, পাটজাত দ্রব্য, চামড়াজাত দ্রব্য,  সিরামিক দ্রব্য ইত্যাদি। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ছিল শূন্য দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার।

পঞ্চাশ বছর ব্যবধানে রপ্তানি আয় ১২৬ গুন বৃদ্ধি পেয়ে গত অর্থবছরে এ পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৫.৩৯ বিলিয়ন ডলার। বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনকারী অপর খাত জনশক্তি রপ্তানি। প্রায় ১০ মিলিয়ন প্রবাসীর প্রেরিত রেমিটেন্সের পরিমাণ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলারের অধিক। অভ্যন্তরীণ খাতে উন্নতির পাশাপাশি বহিঃখাতও এগিয়ে চলছে সমান তালে। ১৯৭৩ সালে এদেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল শূন্য দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার, তিনশ গুণ বেড়ে বর্তমানে উক্ত পরিমাণ ৪৩ বিলিয়ন ডলার। স্বল্পোন্নত দেশের কাতার হতে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য বাংলাদেশ সফলভাবে জাতিসংঘ নির্ধারিত তিনটি শর্ত পূরণ করেছে এবং ২০২৬ সাল নাগাদ মাথাপিছু আয় ৩ হাজার ডলার ছাড়িয়ে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে নথিভুক্ত হবে।

সাড়ে ষোল কোটি মানুষের দেশের বাজার বাংলাদেশ এখন রাজনৈতিকভাবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যা এড়াতে একাত্তর সালে এক কোটির বেশি মানুষ ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল ঠিক-ই কিন্তু শেষতক কোনো শক্তি এদেশের মানুষকে দমাতে পারেনি। বর্তমানে বাংলাদেশ এশিয়ার দ্রুততম অর্থনীতি। এদেশ তার নিজস্ব সামর্থ্যে প্রায় এগার লক্ষ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে।

কোভিড অতিমারীর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে যখন অর্থনৈতিক মন্দা, তখনও বাংলাদেশ ধনাত্মক প্রবৃদ্ধি অর্জন করে। প্রতিবেশী দেশ ভারতের জিডিপি হ্রাস পেয়েছে ১০.৩ ভাগ কিন্তু বাংলাদেশের জিডিপি বৃদ্ধি পেয়েছে ৫.৪ ভাগ। করোনাকালীন পুরো বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধির দেশ বাংলাদেশ। সরকার প্রধান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সময়োপযোগী পদক্ষেপ এমন অর্থনৈতিক সাফল্য আনয়নে সহায়ক ছিল। নিজস্ব সম্পদ হতে ১ লক্ষ ২০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্রদানের মাধ্যমে চাহিদা ঘাটতি ঠেকানো সম্ভব হয়েছে। আশঙ্কা ছিল, প্রণোদনা আকারে অর্থনীতিতে ঋণ সরবরাহ বৃদ্ধি দ্বারা মুদ্রাস্ফীতি নাগালের বাইরে যাবে, কিন্তু তা ঘটেনি। বর্তমান সময়কার সহনীয় মাত্রার উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি নিতান্তই চাহিদা বৃদ্ধিজনিত। বিশ্ববাজারে দ্রব্য দাম এবং পরিবহন খরচ বৃদ্ধি দ্বারা সৃষ্ট  মুদ্রাস্ফীতি অচিরেই নিয়ন্ত্রণ হবে আশা করা যায়।

স্বাস্থ্যখাতের অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে তথাপি এ দেশের মানুষের গড় আয়ু ৭২ বছর, যা প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তানের তুলনায় বেশি। শুরুর দিকে উচ্চহার জনসংখ্যা বৃদ্ধি বাংলাদেশে উন্নয়নের পথে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে বিবেচিত ছিল। জনসচেতনতাসহ বিবিধ নীতি বাস্তবায়ন দ্বারা জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার শতকরা ৩ ভাগ হতে কমিয়ে ১ ভাগে আনা সম্ভব হয়েছে।

সোনার বাংলা এগিয়ে চলছে ব্যাঘ্রগতিতে। স্বাধীনতা-উত্তর ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু সরকারের অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ সর্বপ্রথম বাজেট পেশ করেন, যার আয়তন ছিল মাত্র ৭৮৬ কোটি টাকা। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা সরকারের ঘোষিত বাজেটের আয়তন ৬ লক্ষ কোটি টাকা। পঞ্চাশ বছরের ব্যবধানে বাজেটের আকৃতি বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় আটশ গুন। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে এ অঞ্চল ছিল অনেকটা বিরাণভূমি, এখন চোখে পড়ে প্রশস্ত সড়ক, ঘরে ঘরে বিদ্যুতের আলো, শহরে শহরে উড়ালসেতু, হাতে হাতে মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট, নদীর তলদেশে টানেল, পদ্মা সেতু, মেট্রো রেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, প্রস্তাবিত সাবওয়ে, পারমানবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এসব দেখে বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি বলার অবকাশ নেই, বলতে হবে বাংলাদেশ ‘জমানো লোহার সিন্দুক’, উন্নয়নের রোল মডেল।

ভৌগলিক অবস্থান, আবহাওয়ার আনুকূল্য, জমির ঊর্বরতা, জনগণের কর্মস্পৃহা, কর্মক্ষমতা, মেধা, বুদ্ধিমত্তা, সরকারের নীতি কৌশল, উন্মুক্ত অর্থনীতি, প্রযুক্তির উৎকর্ষ, শ্রমের সহজ লভ্যতাসহ বেশ কটি উপাদান বাংলাদেশে দৃশ্যমান উন্নয়নে প্রধান অনুঘটক। বিপরীতে, লক্ষ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ, জবাবদিহিতা ও সুশাসনের অভাব, মানসম্মত শিক্ষার অভাব, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের অদক্ষতা, রাজনীতিসম্পৃক্ত আমলাতন্ত্র, মানবাধিকার লংঘন এবং ক্ষমতার অপব্যবহার দেশের উন্নয়নকে চরমভাবে বাধাগ্রস্ত করে। সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকসমূহের গতিপথ পর্যবেক্ষণ থেকে এটি স্পষ্ট যে, টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) অর্জন সম্ভব হলে বাংলাদেশ ২০৪১ সাল নাগাদ উচ্চ আয়ের দেশে রূপান্তরিত হবে। তবে ক্রমবর্ধমান আয় বৈষম্য ঠেকাতে না পারলে উচ্চ আয়ের তালিকাভুক্ত হওয়া অনিশ্চিত হতে পারে।

আমরা কৃতজ্ঞ শহীদগণের প্রতি যাঁদের আত্মদানে বিশ্ব দরবারে স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশ স্বীকৃতি পেয়েছে। পৃথিবীর বহু জাতি স্বাধীনতার স্বাদ আস্বাদনের সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে কিন্তু লক্ষ্যে পৌঁছাতে অপারগ। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে গভীর শ্রদ্ধা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি, যিনি স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতৃত্ব দান করেছেন সফলভাবে, নির্লিপ্ত থেকে।

লেখক : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

পূর্বকোণ/এএ

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 793 People

সম্পর্কিত পোস্ট