চট্টগ্রাম শুক্রবার, ১২ আগস্ট, ২০২২

সর্বশেষ:

১৬ ডিসেম্বর, ২০২১ | ১:১৬ অপরাহ্ণ

মো. জামাল উদ্দিন

বিজয়ের ৫০ বছরে কৃষির সাফল্য

বিজয়ের ৫০ বছরে বাংলাদেশ কৃষিতে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। একদিকে জনসংখ্যা বেড়েছে, অন্যদিকে কৃষি জমি কমেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব ও নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যেও দেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। ১৯৭২ সালে এ দেশে খাদ্যশস্যের উৎপাদন ছিল ১০ মিলিয়ন টন। ২০২১ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫.৪ মিলিয়ন টনে অর্থাৎ ৪ কোটি ৫৪ লাখ মেট্রিক টনে। এই ৫০ বছরে খাদ্যশস্যের গড় প্রবৃদ্ধির হার হলো প্রতি বছর ৩ শতাংশ। অন্যদিকে জনসংখ্যা বেড়েছে সাড়ে ৭ কোটি থেকে ১৭ কোটিতে। এ প্রবৃদ্ধির হার বার্ষিক ১.৯ শতাংশ। অর্থাৎ জনসংখ্যার চেয়ে খাদ্যশস্যের প্রবৃদ্ধি বেশি।

বিগত সত্তরের দশকে দেশে খাদ্যশস্য আমদানি করা হতো প্রতি বছর গড়ে ৩০ লাখ টন। বর্তমানে জনসংখ্যা দ্বিগুনেরও বেশি হওয়া সত্ত্বেও খাদ্যশস্যের গড় আমদানি বাড়েনি বরং রপ্তানি বেড়েছে। চলতি বছর ২৩ টি দেশে শুধু আম রপ্তানি হয়েছে ১৭শ মেট্রিক টন। খাদ্যশস্যের উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে বিশে^র শীর্ষ স্থানীয় দেশের তালিকায় উঠে এসেছে বাংলাদেশ। সরকারের নেওয়া কৃষি-বান্ধব নীতি ও পরিকল্পনার কারণে কৃষিতে এ সাফল্য এসেছে। সে সাথে কৃষক, কৃষি বিজ্ঞানী, সম্প্রসারণবিদ ও উদ্যোক্তা শ্রেণিদের নিরলস প্রচেষ্টাতো রয়েছে।

১৯৭১-৭২ সালে মাথাপিছু জমির পরিমাণ ছিল ২৮ শতাংশ, তা কমে এখন দাঁড়িয়েছে ১০ শতাংশে। তারপরও ধান উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান বিশে^ তৃতীয়, পাট উৎপাদনে দ্বিতীয়, সবজি উৎপাদনে তৃতীয়, আলু উৎপাদনে অষ্টম, আম উৎপাদনে সপ্তম, ইলিশ উৎপাদনে প্রথম, অভ্যন্তরীণ উন্মুক্ত পানির মাছ উৎপাদনে তৃতীয় এবং ছাগলের মাংস উৎপাদনে চতুর্থ স্থান ধরে রেখেছে। গত ১৩ বছরে কৃষি উৎপাদনে বড় ধরনের সাফল্য এসেছে। জাতীয় কৃষি গবেষণা সিস্টেমের অন্তর্ভুক্ত প্রতিষ্ঠান সমূহ ২০০৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ৬৫৫টি উচ্চ ফলনশীল জাত এবং ৫৯১টি উন্নত প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে।

গত এক যুগে শুধু সারেই ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে ৭৬ হাজার কোটি টাকা। ফলে অনেক কম দামে কৃষক সার পাচ্ছে। পানি ও সেচের জন্য ব্যবহৃত বিদ্যুতের উপর চালু করা হয়েছে ২০ শতাংশ ভর্তুকি। বর্তমানে পানি সেচের আওতা বেড়ে দাঁড়িয়েছে মোট আবাদী জমির ৭০ শতাংশে। উচ্চ ফলনশীল ফসলের আওতায় এসেছে ৮৫ শতাংশ জমি। ফলে দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে কৃষির সার্বিক উৎপাদন। একসময় ভূমিকর্ষণের ৯০ শতাংশই সম্পন্ন করা হতো দেশীয় লাঙল ও পশুশক্তি দিয়ে। এখন পশুশক্তির ব্যবহার হ্রাস পেয়ে ৫ শতাংশে নেমে এসেছে। সরকার কৃষি যান্ত্রিকীকরণে গুরুত্ব দিচ্ছে। কৃষি যন্ত্রপাতি কৃষকদের দেওয়া হচ্ছে ৫০ শতাংশ ভর্তুকি মূল্যে। ফলে যন্ত্রপাতির ব্যবহার বেড়েছে বহুগুনে।

কৃষিক্ষেত্রে ডিজিটালাইজেশন একটি নতুন সংযোজন। কৃষির বিভিন্ন অ্যাপস ব্যবহার করে কৃষক লাভাবন হচ্ছে। পণ্য বিক্রির অনেক সুযোগ তৈরি হচ্ছে। সফল কৃষকদের রাষ্ট্রীয় পুরস্কারে ভূষিত করা হচ্ছে। ফলে তাদের সম্মান বাড়ছে। কৃষিতে তাদের আত্মনিয়োগ ও মর্যাদা আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে সরকার কৃষি বিপণন নীতিমালা-২০২১ প্রণয়ন করেছে। সহসাই কৃষক এর ফল ভোগ করবে বলে আশাবাদী।

দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো চট্টগ্রামের অর্থনীতিও কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্য নির্ভর। চট্টগ্রামের মানুষ বেশিরভাগ বাণিজ্য নির্ভর হলেও এ অঞ্চলের কৃষি জাতীয় অর্থনীতিতে বিরাট ভূমিকা রাখছে। চট্টগ্রাম দক্ষিণ এশিয়ার ৫ম বৃহৎ অর্থনীতির শহর। স্বাধীনতা পূর্বের সময়ে এ অঞ্চলের মানুষেরও কৃষি প্রযুক্তির দেখা মেলেনি। তখনকার সময়ে ছিল না উচ্চ ফলনশীল ফসলের জাত বা প্রযুক্তি। মানুষ তখন সনাতনী পদ্ধতিতে চাষাবাদ করতো। তখন মাটির ঊর্বরতা ও মাথাপিছু জমির পরিমাণ বেশি থাকলেও ফসলের গড় ফলন ছিল খুব কম। খাদ্য ঘাটতি লেগেই থাকতো। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাংলাদেশের প্রথম ৫ম বার্ষিক পরিকল্পনা (১৯৭৩-৭৮) এর হাত ধরেই চট্টগ্রামসহ দেশের কৃষি স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। সে সময় বঙ্গবন্ধু প্রথম বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির ৫০০ কোটি টাকার মধ্যে ১০০ কোটি টাকা কৃষিখাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়। সেটার প্রভাব চট্টগ্রামের কৃষিতেও লাগতে শুরু করে। ১৯৮৩ সালে দেশের প্রথম রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকারী অঞ্চল চট্টগ্রামেই স্থাপিত হয়।

বর্তমানে মেধাবী কৃষি বিজ্ঞানীদের নব নব আবিষ্কার ও সম্প্রসারণবিদদের নিরলস প্রচেষ্টার কারণে ফসলের উন্নত জাত ও প্রযুক্তি চট্টগ্রামের কৃষকের দুয়ারেও কড়া নাড়ছে। কৃষকদের ঘামঝরা পরিশ্রমে চট্টগ্রাম অঞ্চলের কৃষির ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। অসময়ে মানুষ হরেক-রকম শাক-সবজি খেতে পারছে। চট্টগ্রামের বৈচিত্র্যময় কৃষির প্রধান শস্য ধান। এ অঞ্চলে ২০২০-২১ সালের বোরো ধান উৎপাদন হয়েছে ১ লক্ষ ৮০ হাজার দুইশত পঁচাশি মেট্রিক টন, রোপা আউশ ৩ লক্ষ ২৩ হাজার আটশত ছিয়াশি মেট্রিক টন এবং আমন ধান ১৬ লক্ষ ২৯ হাজার ছয়শত এগার মেট্রিক টন। শীত ও গ্রীষ্ম মৌসুমে উচ্চ ফলনশীল শাকসবজি ও ফলের ব্যাপক আবাদ হচ্ছে। যার ফলশ্রুতিতে এ অঞ্চলের শস্য নিবিড়তার হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে শতকরা ২০১ ভাগ। আশা করা যায় ভবিষ্যতে ফসলের এ নিবিড়তার হার আরও বৃদ্ধি পাবে এবং রপ্তানির সুযোগ বাড়বে।

লেখক: মো. জামাল উদ্দিন, কৃষি অর্থনীতিবিদ

সাবেক ন্যাশনাল কনসালটেন্ট, এফএও; সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ এগ্রিকালচারাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট (বারি)

পূর্বকোণ/এএ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট