চট্টগ্রাম সোমবার, ০৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৩

১৫ মে, ২০১৯ | ১:২২ পূর্বাহ্ণ

মো. ফারুক ইসলাম

বোয়ালখালীর কড়লডেঙ্গা হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধদের পুণ্যভূমি

ইতিহাস-ঐতিহ্যের ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম দেশের কোন জেলার চেয়ে পিছিয়ে নেই। এখানে রয়েছে বৃটিশবিরোধী আন্দোলনের অনেক সাহসী পুরুষ ও পীর আউলিয়ার আগমনের ইতিহাস। তেমনি ইতিহাস ও ঐতিহ্যের একটা অংশ জুড়ে আছে শহরতলী নামে খ্যাত কর্ণফুলীর কূল ঘেঁষে গড়ে ওঠা বোয়ালখালী উপজেলা।
বোয়ালখালী উপজেলার কড়লডেঙ্গায় রয়েছে ঐতিহ্যম-িত মুসলিম, হিন্দু ও বৌদ্ধদের ধর্মীয় স্থান। এক কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত এসব দর্শনীয় তীর্থস্থান দেখতে প্রতিদিন ছুটে আসছে লোকজন। খুব কাছাকাছি অবস্থিত হওয়ায় লোকজন এ স্থানটিকে তিন ধর্মের মানুষের পুণ্যস্থান হিসেবে অভিহিত করেছেন। এই তিন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হলো মুসলিম আউলিয়া হযরত বু-আলী কলন্দর শাহ’র (রহ.) আস্তানা শরীফ, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মেধস মুনির আশ্রম ও বৌদ্ধদের আর্য কুঠির ভাবনা কেন্দ্র। এ তিনটি স্থানকে কেন্দ্র করে বোয়ালখালীর শেষ প্রান্তের আহলা কড়লডেঙ্গা ও আমুচিয়া ইউনিয়ন দুটি দূর-দূরান্তের মানুষের কাছে বহুল পরিচিতি লাভ করেছে।
জনশ্রুতি আছে, কোন একসময় হযরত বু-আলী কলন্দর শাহ (রহ.) মধ্যম কড়লডেঙ্গার পাহাড়ের উঁচু একটা স্থানে বিশ্রাম নিয়েছিলেন। আর বিশ্রামের এ স্থানটিতে বহুকাল আগে গড়ে উঠেছে তার নামে বু-আলী কলন্দর শাহর আস্তানা শরীফ। সেইসাথে বোয়ালখালী নামকরণের ক্ষেত্রে বু-আলী কলন্দর শাহর নামটি থেকে বোয়ালখালী নামকরণ করা হয়েছে বলে জনশ্রুতি আছে। অর্থাৎ হযরত বু-আলী কলন্দর শাহর নামানুসারে বর্তমান বোয়ালখালী উপজেলার নামকরণ করা হয়েছে। এ আস্তানা শরীফটি মানুষের কাছে বহুল পরিচিত।
কলন্দর শাহ মাজার থেকে এক কিলোমিটার উত্তরে কড়লডেঙ্গার সন্ন্যাসীর পাহাড়ে রয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের তীর্থস্থান মেধস মুনি আশ্রম। যেখান থেকে তৎকালীন ভারতীয় উপমহাদেশসহ বিশ্বে দুর্গাপূজার উৎপত্তি হয়েছিল। সপ্তসতী চ-ী গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়ে মেধস মুনি আশ্রমের কথা উল্লেখ আছে। এই তীর্থভূমিতে হাজার হাজার বছর আগে দেবী ভগবতীর আবির্ভাব ঘটে। রাজ্যহারা সুরথ রাজা ও স্বজন পরিত্যক্ত বণিক সমাধি বৈশ্য উপস্থিত হয়েছিলেন মেধস মুনির আশ্রমে। মেধস ঋষি তাদের দুঃখের কথা শুনে তাদেরকে মধুময়ী চ-ী শোনান। ঋষির উপদেশ শুনে সুরথ রাজা ও সমাধি বৈশ্য অরণ্য অভ্যন্তরে ঋষি মেধসের আশ্রমে মৃম্ময়ী মূর্তি গড়ে সর্বপ্রথম মর্ত্যলোকে দশভূজা দুর্গাদেবীর পূজা শুরু করেছিলেন। এ আশ্রম নিয়ে রচিত গ্রন্থ থেকে জানা যায়, মেধসাশ্রম আবিষ্কার এক দৈব ঘটনা। বরিশালের গৈলা অঞ্চলের প-িত জগবন্ধু চক্রবর্তীর ঘরে ১২৬৬ বঙ্গাব্দের ২৫ অগ্রহায়ণ জন্ম নেন চন্দ্রশেখর। তিনি জন্মের দুই বছর পরে পিতাকে হারান। মায়ের অনুরোধে বিয়ে করেন মাদারীপুরের রাম নারায়ণ পাঠকের কন্যা বিধূমুখীকে। বিয়ের ছয় মাস পার না হতেই স্ত্রী ও মাকে হারিয়ে চন্দ্রশেখর চলে আসেন চট্টগ্রামের সীতাকু-ের চন্দ্রনাথ পাহাড়ে।
সেখানে বৈরাগী ধর্ম গ্রহণ করে চন্দ্রশেখর হয়ে উঠেন বেদানন্দ স্বামী। সেখানে যোগবলে বেদানন্দ স্বামী চন্দ্রনাথের দর্শন লাভ করেন।
চন্দ্রনাথ বেদানন্দকে পাহাড়ের অগ্নিকোণে অবস্থিত পৌরাণিক হাজার হাজার বছরের তীর্থভূমি দেবীর আবির্ভাব স্থান মেধস মুনির আশ্রম আবিষ্কার করে এর উন্নয়নে মনোনিবেশ করতে বলেন। প্রভূ চন্দ্রনাথের আদেশে বেদানন্দ স্বামী পাহাড়-পর্বত পরিভ্রমণ করে মেধস মুনির আশ্রম আবিষ্কার করেন। মেধস মুনির আশ্রমে রয়েছে ভগবতীর মূল মন্দির। আরো আছে শিব, সীতা, কালী, তারা ও কামাখ্যা মন্দির। সীতা মন্দিরের পাশেই রয়েছে সীতার পুকুর। যে পুকুরে পুণ্যার্থীরা পুণ্য¯œান করেন। বর্তমানে বোয়ালখালীর মেধস মুনির আশ্রম সনাতন ধর্মের মানুষের কাছে অন্যতম তীর্থভূমির মর্যাদা লাভ করেছে। হিন্দু ছাড়াও বিভিন্ন ধর্মের মানুষ ছুটে আসেন এখানে সুন্দর নয়নাভিরাম আশ্রম ও আশ্রমের চারপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য। এছাড়া মহালয়া, বিভিন্ন পূজা-পার্বণে লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে এই তীর্থস্থানটি। প্রতিবছর পৌষের ২৯ তারিখ এখানে বিশাল মেলা হয়। এ মেলায় দর্শনার্থীদের ভিড় নামে।
মেধস মুনি আশ্রম যাওয়ার পথেই রাস্তার বামপাশে পাহাড়ের চূড়ায় রয়েছে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের তীর্থস্থান আর্য কুঠির ভাবনা কেন্দ্র। এখানে রয়েছে একটা ছোট্ট প্যাগোডা। এর পাশেই রয়েছে বৌদ্ধ ভিক্ষু ও শ্রামণদের ধ্যান কেন্দ্র। এখানে ভিক্ষু এবং শ্রামণরা নির্জনে ধ্যানে মগ্ন থাকেন। তাই এ স্থানে কোন দর্শনার্থী, দায়ক-দায়িকা, উপাসক-উপাসিকা, পুণ্যার্থী কুঠিরে অবস্থানরত ভান্তেদের সাথে দেখা করতে চাইলে সকাল ১১টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত দেখা করতে পারেন।
তবে কুঠিরে প্রবেশ করতে গেলে অনেকগুলো নিয়ম-কানুন মেনে প্রবেশ করতে হয়। বিশেষ করে মহিলা উপাসিকাদের কুঠি এলাকার ভান্তেদের সাথে দেখা করতে হলে সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ ভান্তের অনুমতি নিতে হয়। এখানে মাথায় ছাতা, পায়ে স্যান্ডেল পরে প্রবেশ করা যায় না। এছাড়া আরো বিভিন্ন নির্দেশনাসম্বলিত সাইন বোর্ড পাহাড়ের পাদদেশে টানিয়ে দিয়েছেন কর্তৃপক্ষ।
কড়লডেঙ্গার এই তীর্থভূমিকে আরো বেশি জনপ্রিয় করে তুলতে চট্টগ্রাম-৮ আসনের বর্তমান সাংসদ মঈন উদ্দিন খান বাদল তার একটা স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিলেন। তিনি তিন ধর্মের এই স্থানে একটি লেক গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন।
যে লেকে মুসলমানরা ওযু করে কলন্দর শাহ’র মাজার জেয়ারত করবেন, সনাতন ধর্মের লোকেরা লেকের পানিতে পুণ্য¯œান করবেন ও বৌদ্ধ ধর্মের লোকেরা তাদের ধর্মীয় কাজে এই লেক ব্যবহার করবেন। এককথায় একটি মাত্র লেক সেতুবন্ধন গড়ে তুলবে তিন ধর্মের মানুষের মধ্যে। কিন্তু বিভিন্ন জটিলতার কারণে তা এখনো করা হয়ে ওঠেনি। তবে সাংসদ মঈন উদ্দিন খান বাদলের এই স্বপ্নকে অনেকেই স্বাগত জানিয়েছেন।
কারণ, শুধু তিন ধর্মের মানুষের মধ্যে সেতুবন্ধন রচিত হবে, কেবল তা নয়। এই লেককে ঘিরে সৃষ্টি হতো পর্যটনের অপার সম্ভাবনা। এই এলাকায় একসময় রাস্তাঘাটের বেহাল দশার কারণে লোকজন অনেক দুর্ভোগের মধ্যে এসব স্থানে আসতেন। তাছাড়া যানবাহনের ভোগান্তি তো ছিলই।
বর্তমানে রাস্তাঘাটের সংস্কার হওয়ায় প্রতিদিন তিন ধর্মের শত শত মানুষ ছুটে আসেন এসব স্থানে। বোয়ালখালীর কানুনগোপাড়া থেকে সিএনজি ট্যাক্সিযোগে লোকাল অথবা রিজার্ভ করে ১৫-২০ মিনিটেই এখন এই এলাকায় যাওয়া যায়।
অথচ আজ থেকে বছরখানেক আগে তা ছিলো দুঃস্বপ্নের মতো। অদূর ভবিষ্যতে বোয়ালখালীর কড়লডেঙ্গা হবে চট্টগ্রামের আরেকটি পর্যটন কেন্দ্র। ইতিমধ্যে মেধস মুনি আশ্রমকে জাতীয় তীর্থক্ষেত্র ঘোষণা করার জন্য সনাতনী সংগঠনগুলো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
খুব শীঘ্রই সেটি বাস্তবায়ন হতে পারে। তাছাড়া তিন ধর্মের এই পুণ্যভূমিকে ঘিরে যদি কড়লডেঙ্গায় পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা যায়, তাহলে পাল্টে যাবে প্রত্যন্ত এই অঞ্চলের চিত্র।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট