চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৯

১৭ নভেম্বর, ২০১৯ | ৩:০১ পূর্বাহ্ন

নিজাম উদ্দিন লাভলু হ রামগড়

পাহাড়ে শেষ হল কঠিন চীবর দানোৎসব

কঠিন চীবর দানোৎসব পার্বত্য চট্টগ্রামের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠী চাকমা ও মারমাদের একটি অন্যতম ধর্মীয় অনুষ্ঠান। মাসব্যাপী এ দানোৎসব শেষ হল পাহাড়ের বৌদ্ধ বিহারগুলোতে। পূর্ণিমার পরদিন অর্থাৎ ১৪ অক্টোবর হতে কঠিন চীবর দানোৎসবের শুরু হয়। শেষ হয় ১১ নভেম্বর।

মহামতি বুদ্ধের প্রজ্ঞাদীপ্ত শিক্ষা ‘বর্ষাবাস তথা বর্ষাব্রত’ পালনের সমাপণী অনুষ্ঠান শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা এবং দানোত্তম কঠিন চীবর দান উৎসব হলো বৌদ্ধদের অতি পবিত্র ও মাহাত্ম্যপূর্ণ ধর্মীয় অনুষ্ঠান। এ পূত-পবিত্র অনুষ্ঠান-উৎসবের মধ্যদিয়ে বৌদ্ধরা তথাগত গৌতম বুদ্ধের পরম কল্যাণময় শিক্ষাচর্চার ব্রত হয়। হিংসা, ক্রোধ ও মোহের বদলে প্রেম দয়া ও ক্ষমায় মানুষের কল্যাণে তপস্যা ভিক্ষুদের। বৌদ্ধ ভিক্ষুদের পরিধেয় বস্ত্রকে বলা হয় চীবর। তাই এ বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের পরিধেয় বস্ত্রের অভাব দূর করতেই কঠিন চীবর দান অনুষ্ঠান। তাই বৌদ্ধদের কাছে প্রবারণা পূর্ণিমা ও কঠিন চীবর দান অত্যন্ত গুরুত্ববহ পুণ্যানুষ্ঠান। কঠিন চীবর সারাবছর দান করা যায় না। বছরে মাত্র ৩০ দিনের মধ্যে এই দান করা যায়। আশ্বিনী পূর্ণিমার পরবর্তী দিন থেকে শুরু করে কার্তিকী পূর্ণিমা পর্যন্ত এই ৩০ দিন কঠিন চীবর দানের কাল। বিশেষ সময়কালে দান করতে হয় বলে তাকে কাল-দান বলা হয়।
কঠিন চীবর দানোৎসবের সূচনা সম্পর্কে বৌদ্ধ ধর্মালম্বিরা বলেন, ভগবান বুদ্ধ শ্রাবস্তীর জেতবন বিহারে বাস করাকালীন কোশলরাজের বৈমাত্রেয় ভ্রাতা ত্রিশজন ভিক্ষুকে উদ্দেশ্য করে কঠিন চীবর দানের অনুমতি প্রদান করেছিলেন।

কোন একসময় পাবেয়্যবাসী উক্ত ত্রিশজন ভিক্ষু পাবা নগর থেকে শ্রাবস্তীর জেতবনে ভগবান বুদ্ধের দর্শন লাভের উদ্দেশ্যে বের হয়ে আসেন। বর্ষাবাসের আর মাত্র দুই একদিন বাকি ছিল। তাই তারা শ্রাবস্তীতে পৌঁছতে না পেরে সাকেত শহরেই বর্ষাবাস যাপন করেন। বর্ষাবাস শেষ হলে ওই ত্রিশজন ভিক্ষু ভগবান বুদ্ধের দর্শনে আসেন। তাদের পরনের চীবর ব্যতীত আর কোন অতিরিক্ত চীবর ছিল না। ওই একটি চীবরেই ¯œান করতে হতো আবার শুকিয়ে গেলে গায়ে দিতে হতো। এভাবে রোদ-বৃষ্টিতে ওই এক জোড়া চীবর এক সময় ছিঁড়ে গিয়েছিল এভাবে ছেঁড়া চীবর গায়ে দিয়েই অত্যন্ত ক্লান্ত অবসন্ন দেহে তারা শ্রাবস্তীর জেতবনে ভগবান বুদ্ধের নিকট গমন করেন।

ভগবান বুদ্ধ চিন্তা করলেন, আমি যদি কঠিন চীবরের অনুমতি দিতাম, তাহলে এ ভিক্ষুগণ দোয়াজিক খানি রেখে অন্য একটি পরিধান করে আসলে এতো কষ্ট পেত না। কঠিনের অনুমতি পূর্বের বুদ্ধগণও প্রদান করেছেন তা দিব্য জ্ঞানে দর্শন করে ভগবান বুদ্ধ বলেন, ভিক্ষুগণ সঠিকভাবে কোন দিন ভঙ্গ না করে প্রথম বর্ষাবাস পালনকারী ভিক্ষু কঠিন চীবর গ্রহণ করতে পারবে। আমি (বুদ্ধ) অনুমতি প্রদান করছি। এভাবে ভগবান বুদ্ধ প্রথম কঠিন চীবর দানের ও গ্রহণের অনুমতি দিয়ে, দাতা ও গ্রহীতা উভয়ের জন্য পূণ্য পারমী সঞ্চয়ের দুর্লভ সুযোগ দান করেন।
জগতের অন্য দানে শুধুমাত্র দাতারাই দানের ফলপ্রাপ্ত হন, গ্রহীতাগণ প্রাপ্ত হন না। কিন্তু এই কঠিন চীবর দানই একটি মাত্র আছে যে দানে দুই পক্ষই অর্থাৎ দাতা ও গ্রহীতা উভয়ের মহাফল লাভ হয়। এই সকল বিবেচনা করেই ভগবান বুদ্ধ কঠিন চীবর দানের অনুমতি দিয়েছিলেন। অতি পূণ্য লাভের আশায় ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠী চাকমা ও মারমা সম্প্রদায়ের মানুষ চীবর দানে মরিয়া হয়ে উঠেন।

খাগড়াছড়ি মারমা উন্নয়ন সংসদের সভাপতি মংপ্রু চৌধুরী বলেন, একসময় মারমা ও চাকমা সম্প্রদায়ের নারীরা দানের জন্য চীবর নিজের হাতে তৈরি করতেন। পাহাড়ের জুমে কার্পাস তুলা ফলিয়ে এ তুলা হতে সুতা তৈরি করতেন। বন জঙ্গলের বিশেষ গাছের কস দিয়ে রং তৈরি করে সুতাগুলো রঙিন করা হত। সেই সুতা দিয়ে কোমরতাঁতে নারীরা দানের চীবর বানাতেন। আর এ কাজটা করা হত একদিনের মধ্যে। তিনি বলেন, কালের বিবর্তনে এখন আর নিজের হাতে এ চীবর তৈরি করে দান করা সম্ভব হয় না। বাজার থেকে কিনে দান করা হয় এখন। তবে আগের ঐতিহ্য লালন করতে নারীরা এখন নিজেরা কোমরতাঁতে ছোট একখ- কাপড় বুনে তা বাজার থেকে সংগৃহিত চীবরের সাথে সংযুক্ত করে দেন।

কঠিন চীবর দানোৎসব অনুষ্ঠানের অন্যপর্বের মধ্যে থাকে পবিত্র মঙ্গলাচরণ পাঠ, ভোরে পরিত্রাণ পাঠ, পুষ্পপূজা ও ভিক্ষুসংঘের প্রাতরাশ, জাতীয় পতাকা ও ধর্মীয় পতাকা উত্তোলন, বুদ্ধপূজা, শীলগ্রহণ, সংঘদান ও ভিক্ষু সংঘের ধর্ম দেশনা, অনুত্তর পূণ্যক্ষেত্র ভিক্ষু সংঘকে পি-দান, দানোত্তম কঠিন চীবর দান, ধর্মোপদেশ। সন্ধ্যায় প্রদীপবাতি প্রজ্জলন ও ফানুস উত্তোলনের মাধ্যমে সমাপ্ত হয় মহাউৎসবের।

The Post Viewed By: 26 People

সম্পর্কিত পোস্ট