চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ০২ মার্চ, ২০২১

সর্বশেষ:

৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ | ১:০৫ পূর্বাহ্ণ

অনুপম কুমার অভি , বাঁশখালী

দেশের ১৬২ বাগানের মধ্যে মানে ৫ম বাঁশখালীর প্রাণ বেলগাঁও চা বাগান

দক্ষিণ চট্টগ্রামের আলোচিত বাঁশখালীর বেলগাঁও চা বাগান। সবুজে সবুজাভ এই বাগানটির চা পাতা দেশের ১৬২টি বাগানের মধ্যে মানে ৫ম স্থানে রয়েছে। জানা যায়, মধুপুর চা বাগান, খৈয়াছড়া চা বাগান, ক্লিফটন চা বাগান ও কর্ণফুলী চা বাগানের পরেই মানের দিক থেকে এখানের উৎপাদিত চায়ের যেমন রয়েছে পুষ্টিগুণ, তেমনি এ বাগানের উৎপাদিত চায়ের কদর রয়েছে দেশজুড়ে।

বর্তমানে চা বাগানে কচিপাতা গজে উঠছে। বাঁশখালীর সর্ব উত্তরে পুকুরিয়া ইউনিয়নের উঁচু নিচু পাহাড়ি এলাকায় ৩ হাজার ৪৭২.৫৩ একর জায়গা জুড়ে অবস্থিত এই চা বাগানটিতে রয়েছে বিশাল কর্মযজ্ঞ। সরেজমিন পরিদর্শনকালে দেখা যায়, উঁচু-নিচু ও ঢালু পাহাড়ে নারী-পুরুষ চা শ্রমিকরা চা পাতা তুলতে ব্যস্ত সময় পার করছে। কেউবা গাছের বীজতলা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন কাজে ব্যস্ত রয়েছে, আবার কেউবা মেশিনে চা পাতা তুলে তা বাজারজাতকরণের জন্য প্রস্তুত করছে। বাগানের ম্যানেজার মো. আবুল বাশার বলেন, এই বাগানের চা পাতার সুখ্যাতি রয়েছে সারাদেশে। এ কারণে দেশের যতসব চা বাগান রয়েছে, বাঁশখালীর চা বাগানের পাতা মানের দিক দিয়ে ৫ম স্থানে রয়েছে। এই মানের জন্য চা বাগানের কর্মরতরা প্রতিদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছে। তিনি বলেন, আমাদের উৎপাদন যত বৃদ্ধি পায় সরকার রাজস্ব তত বেশি পায়। বর্তমানে চা পাতার বিক্রির অর্থ থেকে সরকার ১৫% হারে ভ্যাট পান। তবে তিনি বাগানের কিছু সমস্যার কথা উল্লেখ করে বলেন, চা বাগানের চারপাশে ঘেরা বেড়া না থাকায় প্রতিদিন হাতির পাল চা বাগানে ছুটে আসে। এতে শ্রমিক-কর্মচারীরা প্রায়সময় শংকিত অবস্থায় থাকে। তিনি সরকারি এই রাজস্ব আয়ের অন্যতম চা বাগানকে আরো বেশি পৃষ্ঠপোষকতার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

বেলগাঁও চা বাগান তথ্য সূত্রে জানা যায়, বাগানটির প্রতিষ্ঠার সঠিক তথ্য কারো জানা নেই, লোকমুখে জানা গেছে যে ১৯১২ সালে ইংরেজরা বাগানটি শুরু করেন তখন বাগানের ম্যানেজার ছিলেন হিগিন। তবে রেকর্ড পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বাঁশখালী উপজেলার লট হল ও লট চানপুর মৌজায় অবস্থিত চাঁদপুর বেলগাঁও চা বাগানটি ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর থেকে মালিকানার অনুপস্থিতিতে অব্যবস্থাপনার সম্মুখীন হয়। ক্রমান্বয়ে বাগানের অধিকাংশ জমি স্থানীয় অধিবাসীদের অবৈধ দখলে চলে যায়। পরবর্তীতে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত রায় বাহাদুর জমিদারের মালিকানায় ছিল। জমিদার রায় বাহাদুরের জন্ম ছিল কু- পরিবারে। তাই এই বাগান পূর্বে কু- চা-বাগান নামে খ্যাত ছিল। ১৯৬৫ সালের একটি গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে বাগানটি অর্পিত চা-বাগানসমূহের চিফ কাস্টডিয়ান চা বোর্ডের ওপর ন্যস্ত করা হয়। পরবর্তীতে এনিমি প্রপার্টি ম্যানেজমেন্ট বোর্ড (ইপিএমবি) গঠিত হলে বাগানটির ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ইপিএমবি’র ওপর ন্যস্ত করা হয়। ১৯৭২ সালে স্বাধীনতার পর মিনিস্ট্রি অফ ইন্ডাস্ট্রিজ এন্ড ন্যাচারাল রিসোর্স কর্তৃক ১৯৭২ সালের ৯ মার্চ একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তৎকালীন ইপিএমবি’র ব্যবস্থাপনাধীন আরও কতিপয় চা-বাগানসহ চাঁদপুর বেলগাঁও চা-বাগানটির ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পরিত্যক্ত চা-বাগানগুলো পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ চা-বোর্ডের আওতায় গঠিত বাংলাদেশ টি ইন্ডাস্ট্রিজ ম্যানেজমেন্ট কমিটির (বিটিআইএমসি) ওপর ন্যস্ত করা হয়। কিন্তু ইপিএমবি ও বিটিআইএমসি কোন প্রতিষ্ঠানই চায়ের অস্তিত্ববিহীন এ বাগানটির বেদখলীয় জমির দখল উদ্ধার করে চা-চাষাবাদ করতে পারেনি। ১৯৬৫ সাল থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২০ বছর বাগানটি পরিত্যক্ত ছিল। ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ চা বোর্ড ক্ষুদ্রায়তন চা চাষ প্রকল্প চালু করার উদ্দেশ্যে বাগানটির বাস্তব দখল চা বোর্ডের নিকট হস্তান্তরের জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়ের নিকট আবেদন জানায়। এই পরিপ্রেক্ষিতে ভূমি মন্ত্রণালয় ১৯৮৫ সালের ৭ এপ্রিল ৮-৪২০/৮৪ নং পত্রে বাগানটির দখল চা বোর্ডের নিকট বুঝিয়ে দেয়ার জন্য অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্বকে) নির্দেশ প্রদান করেন। তখন চা বোর্ড প্রায় ৮ একর জমির ওপর চা চাষ শুরু করে। অতপর মাত্র ৮ একর চা বাগানটি বাংলাদেশ চা বোর্ড ১৯৯২ সালের ৫ মে স্বাক্ষরিত চুক্তিপত্র অনুযায়ী চাঁদপুর বেলগাঁও চা বাগানটি ব্যবস্থাপনার জন্য রাগীব আলীর স্বত্বাধিকারী বাঁশখালী টি কোম্পানির নিকট হস্তান্তর করেন। অতপর ২০০৩ সালে বাঁশখালী টি কোম্পানির সমুদয় শেয়ার ক্রয় করে ব্র্যাক এবং কোম্পানি আইন ১৯৯৪ এর বিধান অনুযায়ী এ কোম্পানিকে ব্র্যাক বাঁশখালী টি কোম্পানি লিমিটেড নামকরণ করা হয়। ব্র্যাক চা বাগানটির মালিকানাস্বত্ব গ্রহণ করার পর ২০০৪ সালে চা কারখানা চালু করে। অতপর চাঁদপুর বেলগাঁও চা বাগানের মালিকানা ব্র্যাক বাঁশখালী টি কোম্পানি লিমিটেড’র নিকট থেকে গত ২০১৫ সালের ৫ নভেম্বর থেকে সিটি গ্রুপ পরিচালিত ফজলুর রহমান গংয়ের ভ্যান ওমেরান ট্যাংক টার্মিনাল (বাংলাদেশ) লি. এবং ইন্টারন্যাশনাল ওয়েল মিলস্ লি. ক্রয় করেন। প্রতিদিন ৭ শতাধিক শ্রমিক এই চা বাগানে তাদের শ্রমের মাধ্যমে নতুন পাতা উৎপাদন, ট্রেসিং থেকে শুরু করে চা-বাগানের সামগ্রিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। বাঁশখালীর চা সারাদেশে মানের দিক দিয়ে ৫ম স্থানে অবস্থান করলেও চট্টগ্রামে প্রথম স্থানে রয়েছে বলে জানান চা বাগান কর্তৃপক্ষ। চলতি বছরে ৩ লক্ষ ৩০ হাজার কেজি চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে চা বাগান কর্তৃপক্ষ তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 645 People

সম্পর্কিত পোস্ট