চট্টগ্রাম শুক্রবার, ১৯ জুলাই, ২০২৪

সর্বশেষ:

জলাবদ্ধতায় ডুবে মরলেও হুঁশ ফিরছে না কারো!

নাসির উদ্দিন

২০ আগস্ট, ২০২৩ | ৫:৪৯ অপরাহ্ণ

ব্রিটিশ সরকার প্রস্তুতকৃত সিএস ম্যাপ অনুসারে চট্টগ্রাম মহানগরীতে খাল ছিল ১০৪টি। এখন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-সিডিএ বলছে- ৫৭টি। এই ৫৭ খাল থেকে এখন জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে ৩৬ খাল নিয়ে। আর বাকী ২১টি খালের অস্তিত্ব কোথায়? যারা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছেন তাদের এসব খাল খুঁজে বের করার কথা। এখন সিডিএ বলছে- ২১টি খাল চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন-সিসিসি’র অধীন। এই ধরনের কোন প্রকল্প সিটি করপোরেশনের অধীনে নেই। এসব খাল চিহ্নিত করাও নেই। এগুলো নগরবাসী ধীরে ধীরে গিলে ফেলেছে। জলাবদ্ধতা প্রকল্পের প্রথম থেকে সমালোচনা করেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। তাদের অভিযোগ- এটি ছিল অসম্পূর্ণ এবং কিছুটা ত্রুটিপূর্ণ। ত্রুটিমুক্ত করার জন্য প্রথমে উদ্যোগ ছিল। কিছুটা কাজও করেছিল। পরে তা থেকে সরে আসা হয়। এখন কাজ যেটুকু এগুচ্ছে সেটি অগ্রগতিভিত্তিক। কিন্তু ফলাফলভিত্তিক নয়। অর্থাৎ প্রগ্রেস ওরিয়েন্টেড, রেজাল্ট ওরিয়েন্টেড নয়। বিশাল কাজ হয়েছে কিন্তু ফলোদয় হয়নি। যেমন: স্লুইস গেট, যেগুলো শুরু করা হয়েছে সেগুলোর গেট লাগানো হয়নি। গেট না লাগানোর কারণে পানি প্রবেশ ঠেকানো যাচ্ছে না। আবার একইভাবে খালগুলো কাটা হচ্ছে, রিটেইনিং ওয়াল করা হচ্ছে। রিটেইনিং ওয়ালতো আর পানি ঠেকায় না। খালে মাটি রয়ে যাচ্ছে। পানি চলাচল বন্ধ হচ্ছে। রিটেইনিং ওয়াল অগ্রগতি কিন্তু খালে মাটির কারণে পানি ধীরে সরছে। পাহাড় কাটার বালি মাটি আটকানোর জন্য সিল্ক ট্যাপ করে সেটাকে কার্যকর কলার কথা। সেটাকে ইজারা দিয়ে আটকানো বালি-মাটি ইজারদার সরিয়ে নিবে। বালি-মাটি এসে খালগুলো ভরবে না। তাও কার্যকর নয়। সেখান থেকেও রেজাল ওরিয়েন্টড কিছু মিলছে না। একই সময়ে যদি জোয়ার এবং বৃষ্টি সমানতালে আসে তাহলে পানি স্বাভাবিক নিয়মে উপচাবে। সে জন্য হাইড্রোলিক পাম্প বসানোর কথা। কারণ পানি জমে থাকার মতো খালি জায়গাও নেই। তাই একই সময়ে জোয়ার এবং বৃষ্টি সমানতালে হলে খাল, নালা- নর্দমা, রাস্তা-ঘাট সব একাকার হয়ে যায়। পানি তখন উপচাতে থাকে। পাম্প করে পানি বের করে দেয়ার সুযোগ তৈরি হয়নি। সবমিলিয়ে প্রকল্প পরিচালক বলছেন, জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি ৭০ ভাগ । কিন্তু কাজ যেটুকু এগুচ্ছে সেটি প্রগ্রেস ওরিয়েন্টেড। রেজাল্ট ওরিয়েন্টেড না। কোন কাজটি করলে আমরা উপকার পাবো, সেভাবে কাজ এগোয়নি মনে করছেন নগর পরিকল্পণাবিদরা। যার ফলে প্রতি বর্ষায় বলা হচ্ছে আগামী বর্ষায় উপকার পাবেন। তারা যেই আশ্বাস দেন জনগণ তা বিশ্বাস করে। তাদের আশ্বাস আর জনগণের বিশ্বাস একসাথে বর্ষার পানিতে ভেসে যায়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন- জলাবদ্ধতা প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা সিটি কর্পোরেশনের। কিন্তু উপর মহলকে ম্যানেজ করে কাজটি করছে সিডিএ। যদিও সিডিএ’র দাবি- সিটি কর্পোরেশন সক্ষম নয় বিধায় কাজ পেয়েছে সিডিএ। তা বিশ্বাস করে না সিসিসি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন- ভিন্ন কথা, এই প্রকল্পের জন্য স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যতটা না দায়ী তার চেয়ে বেশি দায়ী সরকার। মূলতঃ সমন্বয়হীনভাবে কাজ করার জন্যই সরকারকে দায়ী করা হয়। যেমন এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে দায়িত্ব না দিয়ে সরকার কাজ দিয়েছে সিডিএকে। আর সংশ্লিষ্ট একটি প্রকল্প দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে। পূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীন সিডিএ দুটি, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন পানি উন্নয়ন বোর্ড একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। আবার স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের বারইপাড়া খাল। আলোচ্য তিন মন্ত্রণালয়ের কর্তা ব্যক্তিরা থাকেন ঢাকায়। ঢাকায় উপর লেভেলে সমন্বয় না হলে নীচে সমন্বয় হবে কিভাবে? নীচের লেভেলের সমন্বয় সভা হয় ঠিকই, কিন্তু তারা কোন ফল আসে না।

বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ পর্যায়ে সবাইকে এক ছাতার নীচে এনে প্রকল্পের ত্রুটি–বিচ্যুতি খুঁজে বের করা দরকার। ত্রুটি সংশোধনপূর্বক দ্রুততার সাথে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা উচিত। না হলে প্রকল্পের সুফল রেজাল্ট ওরিয়েন্টেড হবে না। ঠিকাদাররা মুনাফা করবে।
সেবা সংস্থাগুলোর সমন্বয়ের অভাবে স্বাধীনতার ৫২ বছর পরেও পরিকল্পিত মহানগরী হিসেবে গড়ে উঠেনি চট্টগ্রাম। তাই বর্ষা এলে মহানগরীর বিভিন্ন এলাকা তলিয়ে যায় হাঁটু থেকে কোমর পানিতে। জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ পোহাতে হয় নগরবাসীকে। ফি বছর নষ্ট হয় কোটি কোটি টাকার সম্পদ। এই জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ৪টি প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। এর মধ্যে সিডিএ দুটি, সিসিসি একটি এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। সিডিএ বলছে, জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল খনন ও সম্প্রসারণে সিডিএ’র নেওয়া প্রকল্পে কাজ শেষ হয়েছে ৭৬ শতাংশের বেশি। এই প্রকল্পে ইতোমধ্যে ব্রীজ, কালভার্ট, রোড সাইড ড্রেন ও নতুন ড্রেন নির্মাণের কাজ শতভাগ শেষ। ৫টি রেগুলেটরের নির্মাণকাজও শেষ। তবে কিছু খালের পাশে প্রতিরক্ষা দেওয়াল, সিল্ক ট্র্যাপ, খালপাড়ের রাস্তা নির্মাণে কিছুটা পিছিয়ে আছে তাঁরা। করোনা মহামারী, ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতা ও অন্যান্য বেশকিছু সংস্থার সাথে সমন্বয় করতে সময় লেগেছে। তাই নানা প্রতিবন্ধকতায় প্রকল্প শেষ করতে আরও দুইবছর লাগবে বলেছে বাস্তবায়নকারী সংস্থা। সিডিএর এই প্রকল্পের বর্তমান প্রাক্কলন ব্যয় ৫ হাজার ৬শ’ ১৬ কোটি টাকা । জলাবদ্ধতা নিরসনে এক হাজার ৬২০ কোটি টাকা ব্যয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্পের কাজ এগিয়ে চলছে জানান প্রকল্প কর্মকর্তা। একই সাথে সিটি করপোরেশনের ব্যয় প্রায় ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। কিন্তু বিপুল অর্থ ব্যয়ের সুফল পাচ্ছে না নগরবাসী । পরিকল্পিত নগরী করার জন্য সিডিএ’র একটি মাস্টারপ্ল্যান ছিল। সেই মাস্টারপ্ল্যানের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০১৮ সালে। ওই মাস্টারপ্ল্যানের ১০ ভাগও বাস্তবায়ন হয়নি। যে কারণে অপরিকল্পিত নগরায়ন হচ্ছে। দিন দিন খাল ও ড্রেন’র পরিধি ছোট হয়ে আসছে। কোথাও নাগরিকরা তা আস্ত গিলে খেয়েছে। খাল ও ড্রেনের জায়গা দখল করে ছোটবড় শত শত স্থাপনা গড়ে তুলেছে দখলদাররা। এদের উচ্ছেদ করে শাস্তির আওতায় আনা দরকার। প্রভাবশালীদের ভালভাবে চেপে ধরা দরকার। কেউই প্রকাশ্যে স্বীকার না করলেও বাস্তবে প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে চলছে সিডিএ- সিসিসি দ্বন্দ্ব। জলাবদ্ধতার দায় নিতে চান না কেউই। নানা চড়াই উৎরাইয়ের পর আপাতত দুই পক্ষ বাকযুদ্ধে বিরতি দিয়েছেন। তবে সিসিসি বলছে, চট্টগ্রামে নালা ৯৭২ কিলোমিটার এবং প্রকল্প যেহেতু সিডিএ বাস্তবায়ন করছে, তাই নালা পরিষ্কারের দায়িত্বও তাদের। আবার সিডিএ বলছে, নগরে নালা ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটার এবং শুধু নতুন নালা পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব তাদের, পুরোনোগুলো নয়। সবশেষে বলা যায়, জলাবদ্ধতা যেনো ললাট লিখন হয়ে দাঁড়িয়েছে নগরবাসীর। এই অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে নাগরিকগণ যে অস্থির হয়ে উঠেছেন, আশা করি দায়িত্বশীলরা তা উপলব্ধি করবেন।

লেখক: ব্যুরোচিফ, বাংলাভিশন চট্টগ্রাম

পূর্বকোণ/এএইচ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট