চট্টগ্রাম বুধবার, ২৪ জুলাই, ২০২৪

সর্বশেষ:

বাংলার মানুষ ও বাংলার শক্তির সাধক

অনলাইন ডেস্ক

১০ আগস্ট, ২০২৩ | ৭:৪৫ অপরাহ্ণ

‘আমার ছবির ব্যাপার হচ্ছে সিম্বল অব এনার্জি। এই যে মাসলটা, এটা যুদ্ধের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে, সয়েলের সঙ্গে যুদ্ধ। তার বাহুর শক্তিতে লাঙলটা মাটির নিচে যাচ্ছে, ফসল ফলাচ্ছে। শ্রমটা হলো বেসিস।

আর আমাদের এই অঞ্চল হাজার বছর ধরে এই কৃষকের শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। অথচ সেই কৃষকদের হাজার বছর ধরে মারা হয়েছে।… আমি কৃষকের হাজার বছরের এনার্জিকে, ওদের ইনার স্ট্রেংথকে এক্সজারেট (বাড়িয়ে) করে দেখিয়েছি। কাজের ফিলিংসটাকে বড় করে দেখিয়েছি।’

সুলতানের চিত্রকলার বিষয়বস্তুতে গ্রামবাংলার সাধারণ প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, শ্রমজীবী মানুষ, সদা কর্মোদ্দীপক, সংগ্রামী, তেজদীপ্ত ও সুগঠিত নর-নারীদেহ ও তাদের জীবন প্রণালি বিশেষত্ব আরোপ করেছে। তিনি বলেছিলেন, তাঁর ছবিতে মাইকেলেঞ্জেলো বা ভিঞ্চি অর্থাৎ পশ্চিমের প্রভাব থাকতে পারে। কিন্তু তাঁর ছবির উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ আলাদা, বিষয়বস্তু ও পরিবেশ আলাদা। সুলতানের নারীদেহ দেখে অজন্তা-ইলোরা অথবা কালীঘাটের পটের কথা মনে পড়লেও সেগুলো যে সুলতানের ‘মানুষ’– তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বাংলার সাধারণ মানুষকে তিনি বিষয় হিসেবে বেছে নিলেও চিত্রশৈলীর বিচারে তার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়।

শিল্পী এস এম সুলতান ১৯২৩ সালের ১০ আগস্ট নড়াইলে জন্মগ্রহণ করেন। আজ তাঁর জন্মের শতবর্ষপূর্তি হলো। তিনি তাঁর চিত্রকর্মে গ্রামীণ জীবনের আবহ, সংস্কৃতি এবং মানবিক আবেগের সারাংশকে ধারণ করেছিলেন। অসচ্ছল পরিবারে জন্ম নেওয়া সত্ত্বেও তাঁর ছবি আঁকার প্রতি আগ্রহ আর বাবার উৎসাহে অনুমান করা যায়, সুলতান শিল্পের পথে যাত্রা শুরু করেছিলেন শৈশবেই।

আর্ট কলেজে নিয়মমাফিক শিল্পশিক্ষা শেষ না করেই ১৯৪৪ সালে সুলতান ভারত ভ্রমণে বেরিয়ে পড়েন। কলকাতা ছেড়ে ভারতের অন্যান্য রাজ্যে ছবি আঁকার বিষয়বস্তু খুঁজে বেড়িয়েছেন। কাশ্মীরে কাটিয়েছেন ১৯৪৪-৪৬। একে তো দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ চলছিল, আবার তখন কাশ্মীরের রাজনৈতিক অস্থিরতাও দেখা দিয়েছিল। এর মধ্যে তিনি আঁকছিলেন কখনও যুদ্ধের ছবি, কখনও অনাহারকৃত শরণার্থীর মুখ, কখনও ছিন্নমূল পরিবারের আর্ত-চেহারা আর কিছু ব্যক্তিগত প্রতিকৃতি। সুলতানের সংগ্রহে পুরোনো সেই সময়ের কোনো কাজ পাওয়া যায়নি। সেই সময়ের কাজ সম্ভবত তিনি বিক্রি করে দিয়েছিলেন। জানা যায়, তিনি এ সময়ে প্রধানত নিসর্গ-দৃশ্যই এঁকেছিলেন; বাংলার ও কাশ্মীরের। তাঁর প্রায় সব নিসর্গ-চিত্রায়ণই স্মৃতিনির্ভর ছিল। এ কারণে তাঁর ছবিতে আদর্শায়নের একটি প্রবণতা দেখা যায় এবং একই সঙ্গে তা সংবেদনশীল।

বিশেষ করে স্থানীয় গ্রামীণ লোকজন তাঁর ক্যানভাসে এসেছিল। সুলতানের ছবি আঁকার স্বাচ্ছন্দ্য অবিশ্বাস্য ছিল। ধারণা করা যায়, তিনি কখনও দীর্ঘ সময় নিয়ে ছবি আঁকতেন না। তিনি অস্থির প্রকৃতিরও ছিলেন। ফলে কখনও সুচারুভাবে তাঁর ছবি শেষ করেছেন বলে মনে হয় না। বরং তাঁর বেশির ভাগ কাজই স্কেচ-পর্যায়ের ছিল। জলরঙে আঁকা বাংলার নিসর্গ-দৃশ্যের সহজ-সরল বর্ণবিন্যাস, যেখানে আকাশ ও নদীর অবাধ বিস্তার, অদৃশ্য হতে থাকে দিগন্ত, নারকেল গাছ, নৌকা, জেলে– সাধারণ গ্রামীণ পরিবেশকে উপস্থাপন করে। তেলরঙে আঁকা কাশ্মীরের নিসর্গ-চিত্রায়ণ ছিল খুবই বর্ণিল। বাংলার নিসর্গ-দৃশ্যের সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্রপটে করা কাশ্মীরের সেই বেগুনি রঙের পর্বত, বিচিত্র ঝোপঝাড়, গাছ, নদী ও হ্রদের ছবিগুলো দর্শকদের সামনে অন্য এক সুলতানকে দাঁড় করিয়ে দেয়।

কাশ্মীরে তিনি যে সময় কাটিয়েছেন, তার একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব দেখা গিয়েছিল পরবর্তী সময়ে। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর লাহোর, করাচি পেরিয়ে তিনি আরও দূরে যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ড এবং ইউরোপ সফরে গিয়েছিলেন এবং বেশ কিছু প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর তিনি নড়াইলে ফিরে যান। তিনি বলেছিলেন, তিনি যথেষ্ট ভাবনাচিন্তা করেই দেশে ফিরে এসেছিলেন। কারণ নিজের পরিবেশ, মানুষের জন্যই তিনি ছবি আঁকতে চেয়েছেন সব সময়। আর এ সময়ে তাঁর চিত্রকর্মে ‘মানুষ’ প্রধান উপজীব্য হয়ে উঠেছিল।

এস এম সুলতান যাপন করেছেন এক সরল সাধারণ, প্রকৃতিসান্নিধ্যের নিবিড় মানুষের জীবন। নাগরিক জীবনের সুখ-দুঃখ, গরিমা উপেক্ষা করে শিল্পের অভিমুখ পরিবর্তন করে নিয়েছিলেন অনায়াসে। আর সুলতানের প্রতিবেশ ভিন্ন; সভ্যতার বিপরীতের এক মায়ার জগৎ; কৃষিসর্বস্ব বাংলাকে তিনি স্বপ্ন-বাস্তবতা পুনর্নির্মাণ করেছিলেন।

শিল্পী সুলতান বাংলার লোকায়ত জীবনের গল্প এমনভাবে এঁকেছেন, যেখানে মানুষের সংগ্রামী জীবনের কোনো ক্লেদ নেই; আছে গৌরব। কৃষকের শীর্ণকায় দেহ নয়, বরং পেশিবহুল দেহসৌষ্ঠব। নারীকে আলাদা ম্রিয়মাণ নয়, বরং কোমল আর সবল। তিনি মনে করেন, মানসিক শক্তি পেশির মধ্য দিয়ে উপস্থাপন করা শিল্পের নতুন ধারার সূচনা করতে পারে। সংগ্রাম মানুষকে কঠিন করে তোলে; ভঙ্গুর নয়। চিত্রপটে কখনও কখনও তিনি গ্রামীণ প্রেক্ষাপটের শ্রেণি-দ্বন্দ্ব, বৈষম্য, বিদ্রোহ অর্থাৎ বাস্তবতার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি জীবনঘনিষ্ঠ বিষয়গুলো তথাকথিত আধুনিক দর্শকের সামনে উপস্থিত করেছেন।

শিল্পী সুলতানের চিত্রকর্ম দর্শক কীভাবে দেখছে, ব্যাখ্যা করছে– তা প্রাসঙ্গিক বর্তমান সময়ে। দরিদ্র দেশের কৃষকদের এমন ‘দেহ’ বেশ প্রশ্নের জন্ম দেয়। ভারতীয় ষড়ঙ্গের রীতিকে এই ‘মানুষ’ উপেক্ষা করে কি? প্রাচ্য বা পাশ্চাত্যে ‘আদর্শিক’ রূপের ইঙ্গিত দর্শক দেখতে পায় না শিল্পী সুলতানের চিত্রমালায়। বরং সুলতান নতুন ‘আদর্শিক’ ধারণা নির্মাণ করেছেন তাঁর চিত্রপটে। বাংলার নিজস্ব রাজনৈতিক-ঐতিহাসিক কাঠামোতে সুলতানের ‘মানুষ’ প্রচ্ছন্নভাবে বিষাক্ত অসাম্য বিনাশ করে। সুলতানের ‘দেহের অতিরঞ্জন শক্তি’ তাঁর সামর্থ্যের আধার হিসেবে উপস্থিত হয়েছে। সমগ্র মানব-ইতিহাসের গৌরবকে শিল্পী এস এম সুলতান ইঙ্গিত করেছেন তাঁর চিত্রকর্মে। তিনি মানব সভ্যতার আদিমতাকে পুনর্গ্রহণ করেন, আর প্রত্যাখ্যান করেন আধুনিক জীবনের চাকচিক্য।

তিনি শিল্পীজীবনকে নির্মাণ করেছেন সম্পূর্ণ দ্বিধাহীন স্বকীয়তায়। এই জগতের উৎপাদনের প্রধান চালিকাশক্তিকে বিষয় হিসেবে নির্বাচনের পাশাপাশি ভেষজ রং, নানান উপাদান, করণকৌশল, চিত্রের মাধ্যম নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নিজস্ব শৈলীকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছেন অনায়াসে। শিল্পচর্চায় এই নিবেদিতপ্রাণ শিল্পী বাঙালি তথা সমগ্র মানব জাতিকে জীবনের চিরন্তন সত্যের সম্মুখীন করেছেন। এই শিল্পসাধকের একশ বছর উদযাপন আমাদের শিল্প-ইতিহাসকে পুনঃপাঠের তাগিদ, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি হয়ে ওঠার গল্প, প্রচলিত মূল্যবোধের বিরোধিতা, অধিকার ও দায়িত্বের সম্প্রসারণ, শারীরিক সামর্থ্যের রূপায়ণের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হওয়ার প্রেরণা জোগায়।

লেখক: সিলভিয়া নাজনীন: শিল্পী ও শিল্পতাত্ত্বিক

পূর্বকোণ/সাফা

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট