চট্টগ্রাম শনিবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০২৩

সর্বশেষ:

১০ জানুয়ারি, ২০২৩ | ১১:০৬ অপরাহ্ণ

অসাধারণ এক মানুষের গল্প

আজ আমি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পেলাম। অর্ডার জারি হওয়ার পর শ্রদ্বেয় মুহাম্মদ ফাউজুল কবির খান স্যারের কাছ থেকে নাম্বার নিয়ে আকরাম স্যারকে ফোন করলাম। পেলাম না। নাম্বারটি বন্ধ বলছে। 

জানুয়ারি, ১৯৮৩, ক্লাস টেনে পড়ি। ঘোষণা এলো আমাদের স্কুলের নতুন চেয়ারমান হয়েছেন একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা। খুব নাকি কড়া, কথা বলার সময় মেঘ গর্জন করে। বলা হলো পরদিন তিনি আমাদের অ্যাসেম্বলিতে কিছু বলবেন। স্যাররা হন্তদন্ত হয়ে দৌড়াচ্ছেন, সামনে যাকে পাচ্ছেন গুমাগুম কিল দিয়ে বলছেন, খবরদার কাল মাথায় তেল দিবি। একদম আধাসের তেল। জানের ভয় থাকলে ইউনিফরম পরে আসবি। ডাক্তার আসিবার পূর্বে রোগী মারা গেলো- এটার ট্রান্সলেশন মুখস্ত না থাকলে কালই তোর রোজ কিয়ামত। নতুন চেয়ারম্যান পরোটার ভিতরে পুরে ডিম পোচ যেভাবে খায় সেভাবে খেয়ে ফেলবেন।

 

পরদিন মাথায় আধাসের তেল, কড়া ইস্তিরির পাজামার ভেতর শার্ট গুঁজে অ্যাসেম্বলিতে দাঁড়ালাম।
বাদামী মানুষটি দেখা গেলো হাসিখুশি, কথা বলার সময় বাজ পড়ল না। তিনি যা বললেন তা হল

১। এখন থেকে স্কুল মাঠে ফুটবল খেলা হবে। খেলা শেষে ভালমন্দ খাওয়া দরকার। সেটাও দেখা হবে।

২। সপ্তাহে একদিন স্কুল লাইব্রেরি খুলে দেওয়া হবে। সেখান থেকে সবাই একটা করে বই এক সপ্তাহের জন্য বাসায় নিতে পারবে।

৩। বছরে অবশ্যই স্পোর্টস হবে, বিতর্ক ক্লাব হবে।

৪। একটু আধটু দুষ্টামিও করা যাবে। তবে রেজাল্ট ভাল করতে হবে।

 

কিছুদিন পর এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্টের পর হেডস্যার আমাকে নিয়ে তাঁর কাছে নিয়ে গেলেন। আমাকে নাকি তিনি দেখতে চেয়েছেন। যেতে যেতে স্যার বার বার বলছেন, বেকুবের বেকুব সাবধানে কথা বলবি। তোতলামি করবি না। দাঁত মাজছস তো? আর গোসল? তোকে তো পুরা কলোনি খুঁজে গোসল করাতে হয়। গায়ে তো চিকা মরা গন্ধ, বলতে বলতে প্রাণভরে আমার দুই কানে আতর লাগিয়ে দিলেন।

স্কুলের চেয়ারম্যান স্যারের কাছে যখন পৌঁছালাম তখন অফিস দেখে আঁতকে উঠলাম। পুরাই রাজা, মানুষটিকেও রাজকীয় লাগছে। ভাব দেখে কথা বন্ধ হয়ে গেছে। হেডস্যার চিমটি দিয়ে ফিসফিস করে বললেন, সালাম দে, সালাম দে, গাধার গাধা। তাঁর দাঁত কিড়মিড় করছে।

 

ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বললাম, আসলামুলাইকু্ম,‌ স্যার।

তিনি উঠে এসে মাথায় হাত দিয়ে বললেন, বসো, বাবা, আর আমাকে তোমার স্যার ডাকার দরকার নাই। আমার বয়সে হয়তো তুমি আমার চেয়েও বড় হবে। আমি তাই দোয়া করি।

স্যারের নাম এস এম আকরাম। তিনি ছিলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য। স্যারকে ফোন করেছিলাম, কারণ তাঁর দোয়া উপরওয়ালা কবুল করেছেন। আমাকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্যের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। খবরটা তাঁকে খুব দিতে ইচ্ছে করছে। (আচ্ছা, কেউ কি আমাকে নারায়গঞ্জের সাবেক এমপি এস এম আকরাম স্যারের নাম্বারটি দিতে পারেন? অবসরের পর তিনি সম্ভবত নব্বই দশকের শেষ দিকে এমপি হয়েছিলেন।)

লেখক: কথাসাহিত্যিক

 

পূর্বকোণ/মামুন/পারভেজ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট