চট্টগ্রাম শনিবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০২৩

সর্বশেষ:

৪ ডিসেম্বর, ২০২২ | ২:২৭ অপরাহ্ণ

জেগে আছি

মাহবুব রশীদ

তখন দুপুর দুইটা আট মিনিট। আমি গাড়ি চালাচ্ছি । অগ্রহায়ণের শুরুতে শীত নামার কথা থাকলেও এখন গরম লাগছে। রাস্তা কিছুটা ফাঁকা। এক সময় গাড়িতে গান শুনতাম । এখন আর ইচ্ছে করে না। এলিভেটেড এক্সপ্রেস নির্মাণ কাজের জন্য চট্টগ্রামের টাইগারপাস রোডটিতে এখন প্রায় যানজট লেগেই থাকে। তবুও আমি সে দিক দিয়ে এগুতে থাকলাম।

ঢাকা থেকে মোবাইলে ছোট বোন ফোন করে জিজ্ঞেস করে, ‘গাড়ি চালাচ্ছো”?  টাইগারপাস ফ্লাইওভার অতিক্রম করতে-করতে আমি, ‘হ্যাঁ’ সূচক জবাব দেই।

পাল্টা প্রশ্ন, ‘গাড়িটা একটু সাইড করো’?

আমি কিছুটা অবাক হলাম, সেই সাথে বুকের ভেতর ধাক্কাও খেলাম। বুঝলাম জরুরি কিছু। তবে মায়ের গুরুতর অসুস্থতার বিষয়টি তখনো মাথায় আসেনি। কারণ মা গত কয়েক বছর ধরে অসুস্থতার মাঝে জীবন কাটিয়ে যাচ্ছেন । আগস্টে প্রায় এক মাস ছিলেন আইসিইউতে। তখনই ধরেই নিয়েছিলাম মা আর ফিরবেন না। এত গুরুতর শারিরীক উপসর্গ থাকা সত্ত্বেও তিনি ফিরে এলেন। তবে স্মৃতিশক্তি ছিল অনেকটা বিলুপ্ত। সারাক্ষণ এদিক-ওদিক শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতেন। রাইস টিউবে খেতে হত। এক বিছানায় দিনরাত পার করতেন। এতটা শুকিয়ে গেছেন যে, মাকে চেনাই যেত না। মাকে এই ভাবে দেখতে আমার ভাল লাগত না।

ঢাকায় ছোট বোনের বাসার একটা রুমকে অনেকটা আইসিইউর আদলে সাজানো হয়। মা ছোট বোনে কাছেই থাকতেন। ছোট বোন এবং বোনের জামাই সহ বড় ভাইয়ের সার্বিক তত্ত্বাবধানে অভিজ্ঞ নার্স দিয়ে চলছিল পরিচর্যা। তবুও প্রতি দিনই মায়ের নিত্য নতুন শারীরিক উপসর্গ নিয়ে চিন্তিত ছিল সবাই। এই কয়েক মাস মা ছিল অনেকটা জীবন-মৃত্যুর মাঝখানে। মায়ের শারিরীক দুশ্চিন্তার সাথে ক্রমেই আমারা অভ্যস্ত হয়ে পড়ি। তাই হয়তো প্রথমে মায়ের বিষয়টি তাৎক্ষণিক মাথায় আসেনি।

 

চলন্ত গাড়িতে চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কি হয়েছে’ ? ছোট বোন শান্ত গলায় বললো, ‘আম্মা আর বেঁচে নেই’। 

 

দুই প্রান্তে কেন সাড়াশব্দ নেই।  ক্ষনিকের স্তব্ধতা নেমে এলো। কেন রাস্তায় কোনও যানবাহন নেই। অপর প্রান্তের লাইন অপনাআপনি কেটে গেল।

 

আমি আরো দশ মিনিট গাড়ি চালিয়ে গন্তব্যে পৌঁছলাম। আমি তখনও অনেকটা স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করলাম। গাড়ির ভেতর শুধু ভাবতে লাগলাম পরবর্তী করনীয় নিয়ে। 

 

মায়ের জন্য গ্রামের কবরের স্থান নির্ধারণ করে কবর খনন, গ্রামের সব আত্মীয়-স্বজনকে জানানো। গ্রামের বাড়িতে আমাদের ঘরটি আজ প্রায় পাঁচ মাস ধরে তালা মারা। এটি পরিষ্কার করতে সময় লাগবে। মৃত্যু পরবর্তী জানাজা-দাফন ও শীতের রাতে বিভিন্ন স্থান থেকে আগতদের থাকার ব্যবস্থা সহ অনেক কিছু মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে।

এর মধ্যে বড় ভাই ফোনে জানালো অনেকক্ষণ ধরে মায়ের পালস্ নেই। মারা গেছেন তা অনেকটাই নিশ্চিত তবে ডাক্তারের ঘোষণা এখন জরুরি। তাই এম্বুলেন্সে করে হাসপাতাল নেয়া হলো। বিকেল সোয়া তিনটার ডাক্তারা নিশ্চিত করলেন, আম্মা মারা গেছেন।

এরই মধ্যে আমি বাহিরে যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করলাম। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মায়ের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে পোস্ট দিয়ে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হই। যেতে যেতে ভাবতে লাগলাম, আমার গর্ভধারিনী মা মারা গেছেন, অথচ আমার ভেতর গভীর শোকের ছায়া নেই কেন?

ফোনের পর ফোন আসার কারণে মোবাইল সাইলেন্ট করে দিলাম। শুধু কবর, জানাজার নির্দেশনার ফোনগুলো রিসিভ করছি । নিজেকে স্বাভাবিক রাখার জন্য বন্ধু-বন্ধবসহ শুভাকাঙ্ক্ষীদের ফোন রিসিভ করছিনা। তারপরও অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে রেখে দু-চারটি ফোন রিসিভ করতে হলো।

চলার পথে চট্টগ্রাম স্টেডিয়ামের শিশু পার্কের পাশে গাড়িটি পার্ক করি। কেন যেন একটু একা থাকার তাগাদা অনুভব করলাম। উল্টো দিকে মুক্ত মঞ্চে বসে এক কাপ চা পান করলাম। মাকে নিয়ে একটু ভাবতে ইচ্ছে হলো। কিন্তু আমার ভাবনা সে দিকে যাচ্ছে না। এখনে বসে পরবর্তী করণীয় কিভাবে শেষ করা যায়, সেটা নিয়ে নিজের ভেতর চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে লাগলাম। তখনও মা যে নেই , সেটা অনুভব করতে পারছিনা পরিস্থিতির স্রোতের কারণে কারণে।

নগরীর ওয়ার সিমেট্রি স্মৃতিসৌধ অতিক্রম করার সময় দেখলাম এনটিভির শামসুল হক হায়দরী ভাইয়ের ফোন। কেন জানি এভয়েট করতে পারিনি। রিসিভ করলাম । হায়দরী ভাইও বড় ভাই সুলভ করণীয় বিষয়গুলো মনে করিয়ে দিচ্ছি। হঠাৎ আমার ভেতর পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম। ভেতর কান্নার ঢেউ উপরে উঠে আমার চোখে ভাসচ্ছে। হায়দরী ভাইয়ের সাথে কথা বলতে পারছি না। কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে আসছে। দুই চোখে শ্রাবনের বর্ষা । হায়দরী ভাইও ব্যাপারটি হয়ত বুঝতে পেরেছেন, কথা না বাড়িয়ে শেষ করলেন। অনেকক্ষণ চোখে জল আটকে ছিল । কোথায় যেন পড়েছিলাম, মায়ের জন্য কাঁদতে হয় শিশুর মত করে। নবজাতক শিশুর কান্নার শব্দে গর্ভধারনী মায়েরা সবচেয়ে বেশি খুশি হন। কিন্ত আমি কেন শিশুর মত কাঁদতে পাচ্ছি না?

বাসায় ঢুকতেই ক্লাস ফোরে পড়া ছোট ছেলেটি আমার সামনে এসে দাঁড়াল। আদর মাখা কন্ঠ জিজ্ঞেস করলো, বাবা তোমার মা মারা গেছে? ভেতরটা আবার কেঁদে উঠল। মুহুর্তেই চোখে জল। দ্রুত ওয়াশরুমে গিয়ে চোখে পানি দিলাম। বের হতেই আবার ছেলে বলছে, বাবা তুমি তো কান্না করছে? ছেলেকে বুকে  জড়িয়ে বল্লাম, না তো। ছেলের পাল্টা প্রশ্ন করে, তোমার চোখে তো পানি।

পরদিন শুক্রবার সকাল নয়টায় জানাজার সুচি নির্ধারণ হওয়ায় কিছুটা স্বস্তি পেলাম। কারণ এই সময়ে সব গুছানো সহজ হবে।

সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় নিজে গাড়ি চালিয়ে নোয়াখালী উদ্দেশ্যে রওনা হই । মোবাইল ফোনটি বড় ছেলের কাছে। আমি শুধু গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছি । চৌমুহনী পৌঁছার আগে মনে হল গাড়ির ভেতর কারো তো কিছুই খাওয়া হয়নি। তখন রাত ৯টা। গাড়ির ভেতর অনেকেই ঘুমে । যথারীতি চৌমুহনীর ‘আমানিয়া হোটেলে’ যাত্রাবিরতি করলাম। সবার সাথে আমিও খাচ্ছি । মনে মনে ভাবছি, মাত্র কয়েক ঘন্টার আগে মা মারা গেছে। আমার তো শোকে মুজ্জমান থাকার কথা! অথচ আমি দিব্যি খাচ্ছি। আমার মুখে দানা-পানি কিভাবে ডুকছে? আমি ঠিক বুঝতে পারছিনি। তবে পেটের চাহিদাও কঠিন বাস্তবতা।

রাত দশটায় বাড়িতে পৌঁছালাম। সারাদিন বাড়িতে অনেক লোক ছিল । শীতের রাত বাড়াতেই সমবেদনা জানাতে আগতরা ফিরে গেলেন। আমি সহ দুইজন কয়েক ঘন্টার আবিরাম চেষ্টায় পুরো বাড়িটি পরিষ্কার করলাম। তখনও লাশের গাড়ি ঢাকা থেকে রওনা হয়ে কুমিল্লায়। বাড়ির সবাইকে বললাম বিশ্রাম নিতে। আমি গড়াগড়ি দিতে লাগলাম। কিন্তু ঘুম আসছে না। 

ঢাকা-নোয়াখালীর ‘ফোর লেইনের’ নতুন রাস্তার পাশেই অবস্থিত সোনাইমুড়ী পৌরসভার কলাবাগানস্থ কাঠালী নামক ওয়ার্ডটি। এখানে রাত যত গভীর হয় নির্জন রাস্তায় গাড়ির কোলাহল ততই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিভিন্ন গাড়ির শব্দ স্পষ্ট হতেই মনে হচ্ছে, এই বুঝি মা আসছে। এভাবে শোয়া অবস্থায় বিনীদ্রভাবে কেটে গেল কয়েক ঘন্টা । রাত তিনটায় বড় মাইক্রোবাসটি অনুসরণ করে মা’কে বহনকারী ফ্রিজিং করা এম্বুলেন্সটি অবশেষে বাড়িতে পৌঁছালো।

ঢাকা থেকে আগতরা খুবই পরিশ্রান্ত থাকায় অনেকটা জোর করে সবাইকে বিশ্রামে পাঠানো হল। সবাই বিছানায় শরীর এলিয়ে দিলেও, কারো চোখে শেষ পর্যন্ত ঘুম এসেছে কিনা জানিনা। তবে আমার চোখের ঘুম অদৃশ্য হয়ে গেল। ফজরের আযানের আগ পর্যন্ত আমি শুধু চেয়ারে বসেই ছিলাম । নির্জন গভীর রাতে চেয়ারে বসে সমুদ্রময় মায়ের স্মৃতির ইতি বৃত্তান্ত আবিষ্কারের চেষ্টা করলাম।

বেগমগঞ্জের মিরওয়রিশ পুরের স্বনামধন্য মজুমদার বাড়ির মাদ্রাসা শিক্ষক আমার নানা আব্দুল খালেককে এলাকার সবাই খুবই ফরেজগার এবং ভালো মানুষ হিসেবে চিনতেন। নানীকে আমি ঘোমটা ছাড়া দেখেছি বলে মনে পড়েছে না। দুই ভাই, তিন বোনের মধ্যে মা”ই ছিল মেজো। 

অন্যদিকে আমার মরহুম পিতা স্বাধীনতার পূর্বে চৌমুহনী কলেজ থেকে পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে, চট্টগ্রামের সদরঘাট, টেরিবাজার ,খাতুনগঞ্জসহ কদমতলীতে নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠার জন্য শূন্য হাতে অনেক সংগ্রাম করেছেন। ছিলেন দূরদৃষ্টি সম্পন্ন এবং তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন। অতি আবেগী ছিলেন বলে সবার সাথে তিনি সহজেই মিশে যেতে পারতেন তবে কিছুটা রাগী থাকার কারণে অনেকে ওনাকে ভুল বুঝছো। আশির দশক পর্যন্ত ওনার  ব্যবসা ছিল জমজমাট। তখন তিনি জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও কলম্বো যাতায়ত করতেন এখনকার ঢাকা ও চট্টগ্রামে যাওয়া আসার মত করে। আধুনিক পোশাক পরিচ্ছদ এবং ঝাঁকড়া চুলের মানুষটি ব্যবহার করতেন নতুন গাড়ি।

অথচ মা ছিলেন পুরো উল্টো। সাদাসিধে মানুষটি কখনো বিদেশ যাননি। ছেলে মেয়েদের বিয়ে শাদীর দেয়ার আগ পর্যন্ত তিনি কক্সবাজারও যাননি।

ঘর সংসারই ছিল মায়ের ধ্যান জ্ঞান। ছিলেন ভালো রাঁধুনি এবং খুবই অতিথি পরায়ন। যাওয়ার সময় মেহমানরা যদি বলতো, ‘রান্না ভাল হয়েছে। এতে তিনি বেজায় খুশি হতেন। চাওয়া-পাওয়া কিছুই না থাকলেও মায়ের বড় গুণ ছিল তিনি মানুষকে সহজে আপন করে নিতেন। এতকিছুর পরও কেউ উনাকে মনে কষ্ট দিলে তিনি নিরবে সব মেনে  নিতেন।

শেষ দুই-তিন বছর অসুস্থ থাকা অবস্থায় ওনার কোন শারীরিক অভিযোগ ছিল না। ওনার মুখে কোনো কথা বা শারীরিক অভিযোগ না থাকায় মাঝে-মাঝে ডাক্তারাও বিভ্রান্তিতে পরতেন। নীরবে-নিভৃতে ৭৫ বছরের হায়াতের মধ্য প্রায় ৫৬ বছর সংসারের জন্য শুধু দিয়েই গেছেন।

নিদ্রাহীন বারান্দায় চেয়ারে বসে আমি ছুটে গেছি মায়ের স্মৃতির ভান্ডারে। বারান্দার সামনে একশ গজের মধ্য আগামীকাল মাকে শায়িত করা হবে। মাঝখানে শুধু একটি খাল দু’দিককে আলাদা করে রেখেছে। রাতের গভীরতা অন্ধকারকে যেন আরও উজ্জ্বল করে তুলছে। রাতের অন্ধকারের নিজস্ব একটা ভাষা আছে। অন্ধকারের ভাষা আমার চিন্তার জগৎকে ক্রমে এগিয়ে নিচ্ছে। সেই সাথে অন্ধকার তার মায়াবী পরশের চাদর দিয়ে লোকালয়টি ঢেকে রেখেছে। আমি আর মা সেই চাদরে পাশাপাশি অবস্থান করছি।

ফ্রিজ চালু রাখার কারণে এম্বুলেন্সটি সারা রাত সচল ছিল। গাড়ি আর আমি সমান্তরাল হয়ে আমাদের উপস্থিতির কথা মাকে জানান দিয়ে যাচ্ছি । এখন গভীর রাতে। আমি জেগে আছি। লাশের গাড়িটিও জেগে আছে । অথচ মা চলে গেলেন চির নিদ্রায়।

লেখক: সাংবাদিক

পূর্বকোণ/পিআর/এএইচ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট