চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ০২ ফেব্রুয়ারী, ২০২৩

২ ডিসেম্বর, ২০২২ | ১১:২৫ পূর্বাহ্ণ

মসজিদ গড়া ও মসজিদ পরিচালনা করা

মসজিদ আল্লাহর ঘর, মহামহিম প্রভুর নামে সিজদার সর্বোত্তম স্থান। পবিত্র কা’বার প্রতিচ্ছবি এ মসজিদ। দুনিয়ার প্রথম ঘর ও মসজিদ হলো ‘কা’বাগৃহ’। তাই দুনিয়ায় সব মসজিদের কিবলা হলো কা’বার দিক। সূরা আল ইমরানে বলা হয়েছে : নিশ্চয় মানবজাতির জন্য যে আদি গৃহ নির্মাণ করা হয়েছিল তা মক্কায়। তা সৌভাগ্যময় এবং বিশ্বজগতের পথ প্রদর্শক।’ (আয়াত-১৬)।

 

মসজিদ সম্পর্কে হযরত (স.) ইরশাদ করেছেন : আল্লাহর কাছে সবচে প্রিয় জনপদ হলো মসজিদসমূহ এবং সবচে ঘৃণ্য ও ধিকৃত স্থান হলো বাজার সমূহ’ (মুসলিম)। কুরআনুল কারীমে মসজিদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বলা হয়েছে- মসজিদ শুধুমাত্র আল্লাহর ইবাদত ও তার সন্তুুষ্টির জন্যই নির্মিত (হয়ে থাকে), সুতারাং সেখানে (তোমরা) আল্লাহর সঙ্গে অন্য কাউকে ডেকো না’ (৭২ঃ১৮)।

 

সূরা তাওবায় এ সম্পর্কে আরো সুন্দর বলা হয়েছে- নিঃসন্দেহে তারাই আল্লাহর ঘর আবাদ করবে যারা ঈমান এনেছে আল্লাহর প্রতি ও শেষদিনের প্রতি এবং কায়েম করেছে নামাজ ও আদায় করে যাকাত; আর আল্লাহ ব্যতীত আর কাউকে ভয় করেনা’-(আয়াত-১৮)। মসজিদ তৈরি অফুরন্ত নেকীর কাজ এবং সামাজিক দায়িত্ব। এটি সমাজের শান্তির ও নিরাপত্তার প্রতীক, সভ্যতা এবং নৈতিক শিক্ষার মৌলিক স্তম্ভ। মসজিদ কেন্দ্রিক সমাজ আদর্শ ও ঐক্যের আধার। এজন্য হাদীসে মসজিদ নির্মাণের প্রতি বিভিন্নভাবে উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। যে ব্যক্তি আল্লাহর ওয়াস্তে একখানা মসজিদ বানায় আল্লাহপাক তার জন্য বেহেস্তে একখানা দালান নির্মাণ করেন (বুখারী মুসলিম)।

 

হযরত ওমর (রাদি.) থেকে ইবনে মাজাহ বর্ণনা করেছেনঃ হযরত আয়েশা (রাদি.) বলেন : রাসূলুল্লাহ (স.) আমাদেরকে বাড়িতে মসজিদ নির্মাণ এবং তা পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখার নির্দেশ দেন (আহমদ)। নবী কারীম (স.) বলেছেন : কিয়ামতের দিন আল্লাহর আরশের নীচে যে সাত ব্যক্তি ছায়া পাবে, তন্মধ্যে একজন হলো রাজুলুন কালবুহু মুয়াল্লাকুন বিল মসজিদ-ঐ ব্যক্তি, যার অন্তর সর্বদা মসজিদের সাথে আটকে রয়েছে (বুখারী মুসলিম)।

 

হাদীসে বর্ণিত : ‘মুয়াল্লাকুন’ শব্দের অর্থে বলা যায়, ইবাদত গুজারের জন্য মসজিদ পানে তাড়না থাকা কিম্বা নির্মাণ-মেরামত ও সুরক্ষার জন্য আন্তরিকতা পোষণ করা। মহানবী শুধু নিজের কথা ও বক্তৃতামালায় মসজিদ প্রতিষ্টার জন্য তাগাদা দেন নি। তিনি একজন সর্বশ্রেষ্ঠ পদপ্রদর্শকের মত কাজে ও বাস্তবে দেখিয়ে গেছে এর গুরুত্ব ও শিক্ষা। নবুয়াত পাওয়ার আগেও তিনি (খৃ. ৬০৫) কুরাইশ গোষ্টি কর্তৃক পবিত্র কাবা ঘর মেরামতের সময় কায়িক পরিশ্রম ও সহযোগিতা দিয়েছিলেন। জেদ্দা সমুদ্র বন্দর থেকে জাহাজ কাটা বহন করে এনে তিনি এ মহৎ কাজের গুরুত্ব বুঝিয়েছেন।

 

৬২২ খৃষ্টাব্দে মক্কা থেকে মদীনা হিজরত কালীন সময়ে প্রথম যে কাজটি করেন তিনি, তা হলো বর্তমান মসজিদে নববী থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার আগে কোবা পল্লিতে পবিত্র ‘মসজিদে কোবা’র প্রতিষ্টা।

 

এ মসজিদ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন : প্রথম দিন থেকে যে মসজিদের ভিত্তি তাকওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত, সেখানে দাঁড়ানোই সর্বাধিক উপযোগী। সেখানে এমন সব লোক আছে,যারা পবিত্র হতে ভালবাসে। আল্লাহ পবিত্র লোকদের ভালবাসেন (সুরা তাওবা-১০৮)। আমাদের প্রিয় নবীজী তার সাহাবাদেরকে এ মসজিদ নির্মাণের কেবল নির্দেশ বা তাদের কাজের তত্ত্বাবধান করেই দায়িত্ব শেষ করেননি। তিনি এ নির্মাণ কাজে অন্যদের সাথে দৈহিকভাবে অংশগ্রহণও করেছিলেন। মুসলমানদের সাথে তিনি মাটি কেটেছেন, কাঁধে করে পাথর বহন করেছেন। এটাই হলো রাসূলুল্লাহর নির্মিত ইসলামের প্রথম মসজিদ। এ মসজিদের স্মরণ চিরন্তন করে রাখার জন্য মদীনায় মসজিদে নববী নির্মাণ করার পরও তিনি সপ্তাহের প্রতি শনিবারে সাওয়ারীর সাহায্যে বা পায়ে হেটে এ মসজিদে এসে নামাজ আদায় করতেন।

 

বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত হাদীসে আছে : মসজিদে কোবার একটি নামাজ এক ওমরাহর সমান।’ যে ব্যক্তি নিজের বাড়িতে বা হোটেল বাসা থেকে পবিত্র হয়ে মসজিদে কোবায় এসে দু’ রাকাত নফল নামাজ আদায় করলো তার সাওয়াব হবে একটি পরিপূর্ণ মকবুল ওমরাহ সাওয়াবের মত। সুবহানাল্লাহ! মদীনা শরীফে যিয়ারত করতে গেলে কিভাবে একটি বড় ধরনের সাওয়াব অর্জনের আল্লাহ নূর নবীর মাধ্যমে ব্যবস্থা করে দিয়েছন তা মসজিদে কোবায় নামাজ আদায়ের মাধ্যমে প্রমাণিত।

 

একইভাবে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স.) পবিত্র মক্কা ও মদীনার মসজিদে সালাত আদায়ে এবং অপরিমেয় সাওয়াবের কথা বলেছেন। মহানবী মদীনায় মসজিদ নির্মাণেও কঠোর পরিশ্রম করেছেন, দৈহিক অংশ নিয়েছেন। এ হলো মসজিদ নির্মাণ সম্পর্কিত ইসলামের সুদীর্ঘ গুরাত্বারোপ এবং পবিত্র আয়োজনের ভিত্তি কথা। মসজিদ নির্মাণের বিষয়টি অত্যন্ত আগ-পিছ ভেবে করতে হয়। কারণ তা আল্লাহর ঘর। তা একবার সেজদার উপযোগী করে গড়ে তুললে কোন কিছুর বিনিময়ে তা ভাঙ্গা ঠিক নয়, কিম্বা এর পবিত্রতা বিঘ্ন হয় এমন পদক্ষেপ নেয়া যায়না।

 

কিন্তু আজকাল আমাদের সমাজে মসজিদ নির্মাণ ও মসজিদ ভাঙ্গা অতি সহজে করা হয়-যা বিধি সম্মত ভাল লক্ষণ নয়। আর সবচেয়ে বড় লক্ষনীয় বিষয় হলো আজকাল মসজিদ নির্মানে হালাল হারাম টাকা ব্যায়ে বাচ বিচার করা হচ্ছে না। অনেকে হারাম টাকা দিয়ে অথবা সমাজের দুর্নিতীবাজ হারামখোরদের কাছ থেকে টাকা কালেকশান করে মসজিদ বানিয়ে আহ্লাদ করে থাকেন। যা ইসলামী শরিয়ত বিন্দুমাত্র, আমি আবার রিপিট করছি, বিন্দু মাত্র উৎসাহিত করে না। হারামে অর্জিত টাকা পয়সা সম্পদ ভালো কাজে ব্যয় হোক আর খারাপ কাজে ব্যয় হোক তার কঠোর জবাবদিহিতা হারামখোরকে অবশ্যই পরওয়ারদিগারের আদালতে দিতে হবে।

 

আর আমাদের ইয়াকীন এবং বিশ্বাস থাকা দরকার মসজিদ মানেই সুরম্য প্রাসাদ নয়, এসি করা নান্দনিক বিল্ডিং নয়; মসজিদ মানে পরওয়ার দিগার রহমানুর রাহীম আল্লাহর নামে সিজদাক দেয়ার যেকোন পবিত্র জমিন। হ্যা, প্রয়োজনে এ জমির উপর তাকওয়াদার খোদাভীরুদর সহযোগিতায় প্রয়োজনীয় নির্মান কাজ, সম্প্রসারন কাজ সম্পন্ন হতে পারে। পারে যুগউপোযগী সমুদয় আধুনিকতার ছোয়া লাগাতে।

 

আলহামদুলিল্লাাহ। আল্লাহ সুবানাহু তায়ালা আমাদের প্রিয় নবীজীকে অন্যান্য নবীদের চেয়ে কয়েকটি অধিকার মুজিজা বা কনসিডারেশান দিয়েছেন। তন্মাধ্যে একটি হলো সব নবী রাসূলগণ তাদের ইবাদাত করতে পারতেন নির্দিষ্ট ইবাদাতগাহী বা উপাসনালয়ে। আর আমাদের নবীজী এবং তার উম্মতকে সুযোগ দিয়েছেন দুনিয়ার সমস্ত জমিতে নামাজ আদায়ের।

 

প্রসঙ্গত, আরেকটি বিষয় বর্তমানে প্রখর আকার ধারন করেছে। সমাজে টাকা পয়সার অহংকারে মসজিদে মসজিদে বিবাদ সৃষ্টি করে পাশাপাশি মসজিদ নির্মান করা। এটাও ইসলামি ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যের খেলা বলে শরীয়ত উৎসাহিত করে না। উপরন্তু মসজিদ উন্নয়নের নামে, আধুনিকতার নামে প্রতিযোগিতা চললেও মসজিদের ইমাম মুয়াজ্জিন খাদেমগণ আজও প্রচন্ডভাবে আর্থিক দৈন্যতা ও সো কল্ড সামাজিক নেতাদের চাপে নিদারুন প্যারেশানিতে থাকেন। তারা হলো মুসল্লি এবং আল্লাহ পাকের ইবাদাতের মাঝখানে সেতুবন্ধন সুতরাং তাদের এ প্যারেশানি আমাদের ইমান ইসলাম ও ইবাদাত কবুলের প্রশ্নে মোটেই সোভনীয় নয়। আসুন না, আমরা বিষয়গুলো নিয়ে একটু ভাবি? হক হালালীভাবে মসজিদ এনতেজামিয়া কমিটির সদস্য হই।

 

লেখক : অধ্যাপক, টিভি উপস্থাপক ও জাতীয় পুরষ্কারপ্রাপ্ত খতীব।

 

পূর্বকোণ/আর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট