চট্টগ্রাম শনিবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০২৩

সর্বশেষ:

২৭ নভেম্বর, ২০২২ | ১:৪১ অপরাহ্ণ

বৈশ্বিক মন্দা, ডলার সংকট : আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে ভাটার টান

চট্টগ্রাম বন্দর ভবনের সামনের সড়ক মোড়ে পানির ফোয়ারা। এর চারপাশে সুন্দর করে লেখা আছে ‘Country moves with us’। অর্থাৎ দেশ আমাদের সাথে চলে। সত্যিই তো! দেশ চট্টগ্রাম বন্দরের সাথে চলে। তারা মিথ্যা বলেননি। কারণ দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের বেশিরভাগই চট্টগ্রাম বন্দর নির্ভর। মোট আমদানির ৮২ শতাংশ এবং রপ্তানির ৯১ শতাংশই চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর দিয়েই হয়। তাই তারা বলতেই পারেন দেশ তাদের সাথে চলে।

এছাড়া অনেকে বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর অচল তো, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতি অচল। অর্থনীতি অচল তো, দেশ অচল। এক সময় এই অচলের অপকর্মটি করে রাজনৈতিকরা ফায়দা লুটতেন। ওয়ান ইলেভেনের পর এর গতিধারা অনেক পাল্টেছে। এর পরের ইতিহাস বন্দরের শনৈ-শনৈ উন্নতি। এই উন্নয়নের গতিধারায় ছেদ পড়লো এবার।

 

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক মন্দায় দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে স্থবিরতা তৈরি হয় চলতি বছরের প্রথম দিকে। শেষদিকে এসে ডলারের মূল্য বৃদ্ধি ও সংকট আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যকে করেছে গতিহারা। গেল সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানি-রপ্তানি দুটোই নিম্নমুখী। অর্থাৎ এখন আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে জোয়ারের জায়গায় শুরু হয়েছে ভাটার টান।

গত এপ্রিলে শুরু হওয়া ডলার সংকট এখনও কাটেনি। বরং দিন দিন এই সংকট বাড়ছে। কমেছে প্রবাসী আয়, আমদানি-রপ্তানিও নিম্নমুখী। আমদানি ঋণপত্র (এলসি) কমিয়ে দিয়েছে ব্যাংকগুলো। ডলার সংকটে আমদানি ব্যয়ও পিছিয়ে দেয়া হচ্ছে। আগে ছোট, মাঝারী প্রতিষ্ঠান এলসি খুলতে সমস্যায় পড়েছিল এখন বড় প্রতিষ্ঠানও সমস্যায় পড়েছে। যে সব ব্যাংকের রপ্তানি আয় নেই তারা ডলার সংকটের কারণে ঋণপত্র খোলা বন্ধ রেখেছে। এপ্রিল থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকখাতে ডলারের দাম ৮৬ থেকে ১০৭ টাকায় উঠেছে। খোলা বাজারে ডলারের দাম আরও বেশি। মূলত ডলার সংকটের কারণে ব্যাংকগুলো ঋণপত্র খোলা কমিয়ে দিয়েছে।

 

ডলারের বড় উৎস প্রবাসী ও রপ্তানি আয়। খোলা বাজারের তুলনায় ব্যাংকে ডলারের দাম কম হওয়ায় এখন বৈধ পথে ডলার আসাও কমে গেছে। প্রবাসী আয় ২০২১ সালের অক্টোবরে ছিল ১৬৪ কোটি ডলার। ২০২২ সালের অক্টোবরে এসে হয়েছে ১৫২ কোটি ডলার। কমেছে ৭ শতাংশ। আবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মতো বড় রপ্তানি বাজারে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে কমেছে রপ্তানিও।

করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও ব্যাহত হয়নি চট্টগ্রাম বন্দরের উৎপাদনশীলতা। কিন্তু আগের সেই প্রবৃদ্ধি এখন আর ধরে রাখা যায়নি। গেল অক্টোবরে চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানি পণ্যের কন্টেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে ৯৭ হাজার ৫৩৮ টিইইউএস, সেপ্টেম্বরে ১ লাখ ১ হাজার ৪৯৩ টিইইউএস এবং আগস্টে ১ লাখ ১৪ হাজার ৯২০ টিইইউএস। অর্থাৎ চলতি বছরের আগস্টের তুলনায় গেল দুই মাসে ১৭ হাজার ৩৮২ টিইইউএস আমদানি কন্টেইনার কম হ্যান্ডলিং হয়েছে। একইসাথে গেল অক্টোবরে চট্টগ্রাম বন্দর রপ্তানি পণ্যের কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করেছে ৫৯ হাজার ৩৩১ টিইইউএস, সেপ্টেম্বরে ৬৩ হাজার ৮০৩ টিইইউএস এবং আগস্টে ৭৫ হাজার ৬৯৭ টিইইউএস। অর্থাৎ চলতি বছরের আগস্টের তুলনায় চট্টগ্রাম বন্দর গেল দুই মাসে রপ্তানি কন্টেইনার কম হ্যান্ডলিং করেছে ১৬ হাজার ৩৬৬ টিইইউএস।

এছাড়া ২০২১ সালের অক্টোবরে আমদানি পণ্যের কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করেছিল ১ লাখ ২৪ হাজার ৬৫৯ টিইইউএস। যা এবছরের অক্টোবরে ছিল ৯৭ হাজার ৫৩৮ টিইইউএস। অর্থাৎ গতবছরের তুলনায় এ বছর একই সময়ে ২৭ হাজার ১২১ টিইইউএস কন্টেইনার পণ্য কম আমদানি হয়েছে। অর্থাৎ এই সময়ে গত বছরের তুলনায় আমদানি কমেছে ১১.৬৮ শতাংশ এবং রপ্তানি কমেছে ১৬ শতাংশ। শুধু তাই নয় অক্টোবর মাসে কার্গো হ্যান্ডলিং হয়েছে সেপ্টেম্বরের তুলনায় এক লাখ টন কম। একইভাবে এক মাসের ব্যবধানে বিদেশি জাহাজ আসা কমেছে ১৭টি।

 

বন্দরের উৎপাদনশীলতা কমার সাথে সাথে কমেছে তৈরি পোশাক শিল্পখাতের রপ্তানি আয়ও। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় রপ্তানি আয় কমেছে ১৪০.৮৮ মিলিয়ন ডলার। ৩০ শতাংশ ক্রয়াদেশ কমায় আতংকগ্রস্থ হয়ে পড়েছেন পোশাক-শিল্প মালিকরা।

পোশাক-শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমই‘র প্রথম সহ-সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম জানান, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে জ্বালানী তেলের সংকট, মুদ্রাস্ফীতির কারণে ইতোমধ্যে ইউরোপ-আমেরিকায় রপ্তানি করা তৈরি পোশাক তেমন বিক্রি হয়নি। ক্রেতারা সন্দিহান। ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তাগ্রস্থ ক্রেতারা মনে করছেন, তারা যদি আবার ক্রয়াদেশ দেন, তা যদি আবার তাদের দেশে পৌঁছায় তা বিক্রি করতে পারবেন কিনা? তাই এই মৌসুমে ক্রয়াদেশ ৩০ শতাংশ কমে আসছে। দুঃখের বিষয় আমাদের ক্রয়াদেশ কমে গেছে। তাই আতংকগ্রস্থ মালিকরা। এভাবে ৬ মাস চললে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতিতে নেগেটিভ ইমপ্যাক্ট পড়ছে বলে মনে করছেন তারা।

 

এদিকে ডলার সংকটের কারণে মধ্যম পর্যায়ের আমদানিকারকরা বসে আছেন হাতগুটিয়ে। দেশের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন বেশ ক’জন বড় আমদানিকারক। চট্টগ্রামের পাইকারি ব্যবসাকেন্দ্র খাতুনগঞ্জে ১৯৭২ সাল থেকে ব্যবসা করছেন মোহাম্মদ ইদ্রিস মিয়া। তিনি আবার ভোগ্যপণ্য আমদানিকারকও। ১৯৮৩ সাল থেকে তিনি ভোগ্যপণ্য আমদানির সাথে জড়িত। তিনি জানালেন বর্তমান বাজার পরিস্থিতির কথা। সারা বিশ্বের মন্দার প্রভাব আমদানি খাতেও পড়েছে। প্রত্যেকটি ব্যাংক ভুগছে ডলার সংকটে। তাই আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে মন্দাভাব। এই অবস্থায় নিম্ন-মধ্যম এবং মধ্যম শ্রেণির আমদানিকারক নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। তাদের এখন আমদানির সুযোগ নেই। ৫০ থেকে শতভাগ মার্জিনে এলসি করার সামর্থ্য নেই তাদের। তবে এই সুযোগে ১৫ থেকে ২০ জন বড় আমদানিকারক একচেটিয়া ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অধিক মুনাফা করছেন বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের। মধ্যম পর্যায়ের আমদানিকারকদের জন্য সুযোগ তৈরি না হলে দেশের বাজার সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে যাবার পাশাপাশি দ্রব্যমূল্য আরো বাড়ার আশংকা তাদের।

একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ড. মইনুল ইসলাম মনে করেন, দুর্নীতি ও খেলাপী ঋণের অর্থপাচার বেড়েছে বলে এখন বৈধ পথে প্রবাসী আয়ও কমছে। ডলারের চাহিদা বাড়ছে। রিজার্ভ দ্রুত কমছে। এখনই দুর্নীতি, খেলাপী ঋণ ও হুন্ডি ব্যবসার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান না নেওয়া হলে আগামী এক বছরের মধ্যে দেশ চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়বে।

লেখক : ব্যুরো চিফ, বাংলাভিশন, চট্টগ্রাম।

 

পূর্বকোণ/এএস

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট