চট্টগ্রাম বুধবার, ০৭ ডিসেম্বর, ২০২২

সর্বশেষ:

২৮ অক্টোবর, ২০২২ | ১২:৫৮ অপরাহ্ণ

আসমান-জমিন সৃষ্টির ৫০ হাজার বছর আগে তকদির নির্ধারণ 

মানুষ কি পরিবর্তন করতে পারবে এবং কতটুকু পরিবর্তন করতে পারবে, এটা আল্লাহপাকের পক্ষ থেকে নির্ধারিত হয়। বিশ্বজগতে আমরা যা কিছু দেখি এবং যা কিছু চিন্তা করতে পারি, সবকিছুর দুটি দিক আছে। একটি অংশ আগে থেকে নির্ধারিত এবং অন্য একটি অংশ পরিবর্তনশীল। যেমন : ইচ্ছা করলে আপনি এ লেখাটা না পড়ে অন্য লেখায় চোখ বুলাতে পারেন। কিন্তু ইচ্ছা করলেই চোখ বন্ধ করে নাক দিয়ে এই লেখাটা দেখতে পারবেন না। চোখ বন্ধ করে নাকের সাহায্যে কোনো কিছু দেখার চেষ্টা আপনি করতেই পারেন, কিন্তু মানুষের নাক দিয়ে কোনো কিছুই দেখা সম্ভব নয়।

 

এই যে নাক দিয়ে মানুষ দেখতে পারে না, এটা আল্লাহপাক পূর্ব থেকেই নির্ধারণ করে দিয়েছেন। তাই মানুষ নাক দিয়ে কোনো কিছু দেখতে পারে না। আবার চোখ দিয়ে যে মানুষ যা ইচ্ছা তা দেখতে পারে, এটাও আল্লাহপাক আগ থেকেই নির্ধারণ করে দিয়েছেন। তাই আমাদের জীবনে ইচ্ছা শক্তিরও আবার সীমাবদ্ধতা আছে। আমাদের ইচ্ছা শক্তি অনেক কিছুই পরিবর্তন করতে পারে, আবার অনেক কিছুই পরিবর্তন করতে পারে না। মানুষ কি পরিবর্তন করতে পারবে এবং কতটুকু পরিবর্তন করতে পারবে, এটা আল্লাহপাকের পক্ষ থেকে নির্ধারিত হয়। এই নির্ধারিত হওয়ার বিষয়টাকে বিশ্বাস করার নামই তাকদীর।

 

 

তাকদীর আরবি শব্দ। এর অর্থ হল নিয়তি বা নির্ধারিত ভাগ্য। এই মহাবিশ্বে যা কিছু ঘটবে আল্লাহ তার পূর্বজ্ঞান ও প্রজ্ঞা অনুযায়ী সেসব কিছু নির্ধারণ করেছেন – এই বিশ্বাসকে ইসলামে তাকদীর বলা হয়। তাকদীরের ওপর বিশ্বাস করা আল্লাহ তা‘আলার প্রভুত্বের ওপর বিশ্বাস করার অন্তর্ভুক্ত। ঈমানের ৭টি রুকন হলো- আল্লাহপাক, ফেরেশতা, আসমানি কিতাব, নবি-রাসূল,আখেরাত, তকদির এবং মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস। ইসলামের মূল বিষয়গুলোর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাসই হলো ইমান। প্রকৃত অর্থে ৭টি রুকনের প্রতি মনে- প্রাণে বিশ্বাস করা এবং মেনে চলাই ইমান। কোনো ব্যক্তি যদি আন্তরিকভাবে এসব বিষয়কে বিশ্বাস করে তিনিই হলেন মুমিন।

 

 

তকদিরের ভাল-মন্দ বিশ্বাস করার নাম ইমান। সব আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়। আমার পছন্দ-অপছন্দ অবস্থা আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে। হাদীসে আছে-” আসমান-যমীন সৃষ্টির ৫০ হাজার বৎসর পূর্বে আল্লাহ তা‘আলা সৃষ্টজীবের তাকদীরসমূহ লিখে রেখেছেন।”-সহীহ মুসলিম। আসমান ও জমিন সৃষ্টি করার ৫০ হাজার বছর আগে আল্লাহপাক পৃথিবীর সবকিছু লিপিবিদ্ধ করেছেন। “কুল্লু নাফসিন জায়েকাতুল মউত” সকল প্রাণীকে মৃদ্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ বলেছেন, আমি তোমাদের ভাল-মন্দ অবস্থা দিয়ে পরীক্ষা করতে থাকবো মৃত্যুর আগ পর্যন্ত।

পৃথিবীতে এসেছি যখন, তখন সবাইকে যেতে হবে আগে-পরে।

আল্লাহ কি দিয়ে পরীক্ষা করবেন? ভাল-মন্দ অবস্থা দিয়ে। পরীক্ষায় দেখা যাবে কে পাশ করে, কে ফেল করে। দুনিয়া পরীক্ষার যায়গা। পরীক্ষার হলে পুরস্কার দেয়া হয় না । ভাল অবস্থায় থাকলে আল্লাহপকের শোকরিয়া আদায়। মন্দ অবস্থায় সবর বা ধৈর্যধারণ। কোন মানুষ চায় না অসুস্থ হোক। সবাই চায় আমি সুস্থ থাকি। ধনী-দরিদ্র, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, আরব-অনারব, সকলেই চায় আমি সুস্থ থাকি। অসুস্থ না হই। কিন্তু সব সময় সুস্থতা থাকবে না, অসুস্থতা আসবেই।

সব মানুষ চিন্তামুক্ত থাকতে চায়। কিন্তু তা হয় না, মানুষের মনে চিন্তা আসবেই। ঝামেলা মুক্ত থাকতে চায়, কিন্তু ঝামেলা আসে। মানুষ চায় সব সময় যৌবন ধরে রাখতে। যুবক থাকতে চায়, বৃদ্ধ হতে চায় না কেউ। কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে বৃদ্ধ হবেই। বয়স ঠেকানোর কোন সুযোগ নেই। মানুষ চিরকাল বেঁচে থাকতে চায়। মৃত্যু চায় না কেউ। কিন্তু মৃত্যু তাকে পাকড়াও করবেই।

 

 

তবে এটা সম্ভব জান্নাতে। ফেরেশতারা বলবে, ‘ওহে জান্নাতীরা এখন থেকে তোমরা চিরকাল থাকবে সুস্থ, অসুস্থ হবে না আর। এখন থেকে তোমার চিরযৌবন কখনো বৃদ্ধ হবে না। ৩৩ থেকে ৩৪ বছর আর হবে না। এখন থেকে টেনশনমুক্ত জীবন দেয়া হবে। এখন থেকে চীরজীবন কখনো মৃত্যু আসবে না’।

 

আল্লাহপাক দেখেন ভাল অবস্থায় বান্দা কি করে এবং মন্দ অবস্থায় কি আচরণ করে। কারুনকে আল্লাহপাক সম্পদশালী বানান। মুছা (আ) গিয়ে বললেন, হে কারুন তোমাকে আল্লাহপাক যা দান করেছেন, এই সম্পদ দিয়ে তুমি আখেরাত উপার্জন কর।

 

দুনিয়ার সব মানুষকে আল্লাহপাক এই ম্যাসেজ দিলেন, দুনিয়ার সম্পদ দিয়ে আখেরাত কামাই কর। দুনিয়ার প্রয়োজনও পুরণ করবে। কিন্তু শুধু দুনিয়ার কাজে নয়, আল্লাহপাক যেসব ধনসম্পদ দিয়েছেন তা দিয়ে আখেরাতও কামাই করবে।

 

কারুন অহংকার করেছিল। আখেরাততো কামাই করেনি বরং সম্পদ পেয়ে অহংকারী হয়ে গেছে। আল্লাহপাক কারুনকে তার সব সব ধনসম্পদসহ মাটিতে ধসিয়ে দিয়েছেন। অর্থাৎ খতম করে দেন। সোলায়মান (আ) ও দাউদ (আ) নবী এবং বাদশাহও ছিলেন। আল্লাহপাকের শোকরিয়া আদায় করেন। কারুন, নমরুদ, ফেরাউন রাজত্ব পেয়ে অহংকার করেন। আল্লাহপাক তাদের ধ্বংস করেছেন। সোলায়মান (আ) ও দাউদ (আ) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন।

 

ভাল-মন্দ সবই আসে আল্লাহপাকের পক্ষ থেকে। আইয়ুব (আ) ১৮ বছর অসুস্থ ছিলেন। ১৮ বছর অসুস্থ থাকা অবস্থায় তাঁর সব কিছু শেষ হয়ে যায়। সন্তান, সন্ততি, ধন –দৌলত সব শেষ। একা অসুস্থ অবস্থায়। ১৮ বছর অসুস্থ, কিন্তু সবর করেন। অধৈর্য হননি। আল্লাহপাক হযরত আইয়ুব (আ) এর ধৈর্যের কথা আমাদের শোনাচ্ছেন-“আমার নবী আইয়ুব এর কথা স্মরণ কর। আমি আইয়ুবকে সবরকারী হিসেবে পেয়েছি। দোয়ার মাধ্যমে তিনি আল্লাহপাকের সাহার্য চান। হে আল্লাহ আমি অসুস্থ হয়ে গেছি। তুমি একমাত্র ভাল করার মালিক। আল্লাহ তাঁর দোয়া কবুল করেন। দোয়াও একটি ইবাদত। সুরা ফাতিহা দিয়ে কোরআন শুরু, সূরা নাস দিয়ে শেষ। দুটিই দোয়া। নামাজের শুরু ও দোয়া দিয়ে, শেষ ও দোয়া দিয়ে। আইয়ুব (আ) আল্লাহর কাছে রোগমুক্তি কামনা করেন। তিনি অধৈর্য হননি। এটি সারা পৃথিবীর মানুষের জন্য সবর বা ধৈর্য ধারণের শিক্ষা। তকদিরের উপর বিশ্বাস ইমানের অঙ্গ।

 

 

আল্লাহপাক আল কোরআনে বলেন, ‘আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোন বিপদই আপতিত হয় না। যে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে, আল্লাহ তার অন্তরকে সৎপথে পরিচালিত করেন। আল্লাহ প্রত্যেক বিষয়ে সর্বজ্ঞ।’ -সূরা আত-তাগাবুন, আয়াত ১১।

“তুমি কি জান না যে, আসমান ও যমীনে যা কিছু রয়েছে, আল্লাহ তা জানেন? নিশ্চয় তা একটি কিতাবে রয়েছে। অবশ্যই এটা আল্লাহর জন্য খুবই সহজ।”। সূরা ২২ আল-হাজ, আয়াত ৭০ ।

‘…এ কিতাবে আমি কোনো কিছুই বাদ দেইনি…’ -সূরা আন ‘আম ,আয়াত ৩৮ । “আর তোমরা ইচ্ছা করতে পার না, যদি না সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহ ইচ্ছা করেন।”-সূরা ৮১ আত-তাকওয়ীর, আয়াত ২৯ । “..আল্লাহই তোমাদেরকে এবং তোমরা যা কর তা সৃষ্টি করেছেন?” -সূরা ৩৭ আস-সাফফাত আয়াত ৯৬ ।

 

 

হাদীসে বলা হয়েছে,”…যদি সমগ্র উম্মত তোমার উপকার করার জন্য একত্রিত হয়ে যায়, তবে ততটুকুই উপকার করতে পারবে, যতটুকু আল্লাহ তোমার (তাকদীরে) লিখে রেখেছেন। আর তারা যদি তোমার ক্ষতি করার জন্য একত্রিত হয়ে যায়, তবে ততটুকুই ক্ষতি করতে পারবে যতটুকু আল্লাহ তোমার (তাকদীরে) লিখে রেখেছেন। কলমসমূহ উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং খাতাসমূহ (তাকদীরের লিপি) শুকিয়ে গেছে।” - তিরমিযী ২৫১৬ ।

 

 

বিশ্বের সবকিছুর ক্ষেত্রেই একটু স্বাধীনতা দেয়া আছে, আবার পূর্ব নির্ধারিত একটি ফর্মুলাও দেয়া রয়েছে। আপনি ইচ্ছা করলেই আপনার হাতের মোবাইলটা বন্ধ বা চালু করতে পারেন। কিন্তু, আপনি ইচ্ছা করলেও মোবাইলের ব্যাটারিটা খুলে রেখে ওই মোবাইলটি চালু করতে পারবেন না।

 

প্রত্যেক মানুষের-ই কিছু না কিছু ক্ষমতা রয়েছে। মানুষ তার স্বাধীন ইচ্ছার মাধ্যমে সেই ক্ষমতাকে ব্যবহার করতে পারে। তবে, একটি ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্যে তার চেয়ে বড় অন্য একটি ক্ষমতা থাকে। যেমন, একজন মন্ত্রী চাইলে দেশের জন্যে ভালো কিছু করতে পারে, সে ক্ষমতা তার আছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা তার চেয়েও বেশি। প্রধানমন্ত্রী চাইলে মন্ত্রীর ক্ষমতাকে রোধ করতে পারে। অর্থাৎ, মন্ত্রীর ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার
অধীন।

 

ঠিক একইভাবে, আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক মানুষকে কিছু না কিছু ক্ষমতা দিয়েছেন, কিন্তু মানুষের সকল ক্ষমতা আল্লাহ তায়ালার ক্ষমতার অধীনে। এ বিশ্বাসের নামই ‘তকদীরে’ বিশ্বাস। আল্লাহপাক পরীক্ষা নিচ্ছেন আমার বান্দা-বান্দি আমার দিকে ফিরে আসুক। দোয়া-ইস্তগফার করুক। আমাদের অবস্থা কেউ পরিবর্তন করতে পারবে না আল্লাহপাক ছাড়া। তবে তকদির বা ভাগ্য নেক আমল, পিতা-মাতার দোয়া ও সদকা ইত্যাদির মাধ্যমে কিছুটা পরিবর্তন হয়, তাও রবের নির্দেশে। তবে কতটুকু হয় তা আল্লাহপাকই ভাল জানেন। 

লেখক: ব্যুরোচিফ, বাংলাভিশন, চট্টগ্রাম

পূর্বকোণ/আর/এএইচ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট