চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ০২ ফেব্রুয়ারী, ২০২৩

১ অক্টোবর, ২০২২ | ৯:২৬ অপরাহ্ণ

আদম (আ.) প্রথম মানব হলেও প্রথম রুহ মুহাম্মদ (সা.)’র

রবিউল আউয়াল মাসে জন্মগ্রহণ করেছেন মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)। প্রসিদ্ধমতে, এ মাসের ১২ তারিখ (সোমবার) দুনিয়াতে আসেন। শেষ নবীর (সা.) দুনিয়াতে আগমনের সংবাদ আল্লাহ পূর্ববর্তী নবীদের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। শেষ জামানায় কেয়ামতের লক্ষণ হিসেবে মহানবীর (সা.) আসার অগ্রীম তথ্য প্রত্যেক নবী-রাসূল স্মরণ করিয়ে দেন। তার দুনিয়াতে আগমন কেয়ামতের সর্বপ্রথম ছোট আলামত। কেয়ামতের সর্বশেষ ছোট আলামত হলো ইমাম মাহদির দুনিয়াতে আগমন। এরপর বড় বড় ১০টি কেয়ামতের আলামত শুরু হবে।

আল্লাহপাক সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করেছেন। তারপর লাওহে মাহফুজ, আরশ, কুরসি, আসমান সৃষ্টি করেন তিনি। এরপর কলমকে কেয়ামত পর্যন্ত যা কিছু হচ্ছে এবং যা হবে সবকিছুর আদ্যপান্ত লিপিবদ্ধ করার নির্দেশ দেন। সেই নির্দেশমতো কলম লাওহে মাহফুজের মধ্যে সবকিছু লিপিবদ্ধ করা শুরু করে। এরপর পর্যায়ক্রমে আল্লাহপাক ১৮ হাজার মাখলুকাত সৃষ্টি করেন। সর্বপ্রথম রুহ-ই-মুহাম্মদি সৃষ্টি করলেন মহান প্রভু। পৃথিবীর সমস্ত মানুষের আত্মা নূরের সৃষ্টি। আর তাদের শরীর তৈরী করলেন মাটি দিয়ে। অতঃপর আদম (আ.) থেকে কেয়ামত পর্যন্ত যত মানুষ দুনিয়াতে আসবেন, সব রুহগুলো আল্লাহ সৃষ্টি করেন।

 

সেখানে নবীদের দলকে একত্রিত করা হলো। আল্লাহ তাদের বললেন, আমি শেষ নবী পাঠাবো। এ ব্যাপারে তোমরা সবাই আজ অঙ্গীকার করবে যে তাঁকে সবাই সাহায্য করবে। অগ্রীমভাবে অঙ্গীকার ও ঈমান দিয়ে। কারণ শেষ জামানার সঙ্গে মিল থাকবেনা অন্য যুগের। সূরা আল ইমরানের ৮১ নম্বর আয়াতে এ তথ্যটি স্পষ্ট করেছেন মহান আল্লাহ।

তিনি বলেন, ‘আর স্মরণ কর, যখন আল্লাহ অঙ্গীকার নিয়েছিলেন নবীদের কাছ থেকে যে, যা কিছু আমি তোমাদের কিতাব ও হিকমত দিয়েছি এবং তোমাদের কাছে যা আছে তার সত্যায়নকারীরূপে যখন একজন রাসূল আসবে; তখন অবশ্যই তোমরা তার প্রতি ঈমান আনবে এবং তাঁকে সাহায্য করবে।’

তারপর তিনি বললেন, তোমার কী স্বীকার করলে এবং এ বিষয়ে আমার অঙ্গীকার কবুল করলে? তারা জবাব দিলেন, আমরা স্বীকার করলাম। এরপর আল্লাহ বললেন, তাহলে তোমরা সাক্ষী থেকো এবং আমিও তোমাদের সঙ্গে সাক্ষীদের অন্তর্ভুক্ত রইলাম। অঙ্গীকার ভঙ্গ করলে সে জালিমের অর্ন্তভুক্ত হবে।

 

আল্লাহপাক সব রুহকে জড়ো করে স্বীকৃতি নিলেন আমি কি তোমাদের মাবুদ নই? সবাই একবাক্যে স্বীকার করে নিলেন অবশ্যই আপনি আমাদের সকলের মাবুদ। রুহ জগতে সকলে ঈমানদার ছিল। নাবালক অবস্থায় সবাই ঈমানদার হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে। কাফির, মুশরিক সিদ্ধান্ত দেওয়া হয় বালক হওয়ার পর। জন্মগতভাবে সকল নাবালকরাই ঈমানদার।

আল্লাহ তায়ালা সর্বপ্রথম আদম (আ.)-এর শারীরিক আকৃতি সৃষ্টি করলেও প্রথম রুহ তৈরি করেন মহানবীর (সা.)। আল্লাহর নির্দেশে হযরত জিবরাঈল (আ.) কাবা শরীফের নীচ থেকে মাটি নিয়ে যান আদমকে (আ.) সৃষ্টির জন্য। এরপর ছয়দিনের মধ্যে জমিন সৃষ্টি করেন। ষষ্ঠ দিন অর্থাৎ জুমার দিন আছর থেকে মাগরিব সময়ের মধ্যে আদমকে সৃষ্টি করা হয়। তখন তিনি (আদম) ঘুমিয়ে ছিলেন। ঘুমন্ত অবস্থায় তাঁর ডান পাজর থেকে সৃষ্টি করা হয় হাওয়াকে (আ.)। পরে আদম (আ.) ঘুম থেকে উঠে দেখলেন তার পাশে হাওয়া (আ.) বসা। এ সময় তিনি হাওয়া (আ.) সম্পর্কে তখন জিজ্ঞেস করলে, ফেরেশতারা বলেন তিনি আপনার সঙ্গী। তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে বলা হয়- তুমি ততক্ষণ পর্যন্ত তাঁর দিকে হাত বাড়াতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তুমি তাঁর মোহরানা আদায় করবে। আদম (আ.) বললেন, আসমানি জগতে আমি মোহরানা কোথায় পাব? তখন জিবরাঈল (আ.) বলে দিলেন, রাসূল (সা.)-এর ওপর ২০ বার দরুদ পাঠ কর, এটি তোমার জন্য মোহরানা। আল্লাহ তখন আদমকে (আ.) জানিয়ে দেন শেষ ও শ্রেষ্ঠ নবীর কথা।

 

এরপর আদমকে (আ.) জান্নাতের মধ্যে থাকতে নির্দেশ দেন, তবে একটি গাছের ফল খেতে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে দেন আল্লাহ। বলে দিলেন, তোমার দু’জনে এই গাছের নিকটেও যেওনা। এর ফল খেলে পথভ্রষ্ট হবে। আদমকে (আ.) সৃষ্টির পর তাকে সেজদা করার নির্দেশ দেন ফেরেশতাদের। এ সময় সেজদা দিতে অস্বীকৃতি জানায় ইবলিশ। তাঁর বক্তব্য ছিল, আমি তো আগুনের তৈরী। আগুনের স্বভাব উপরের দিকে যাওয়া, মাথানত করা নয়। সেই কারণে আমি সেজদা দিতে পারি না। যার ফল হিসেবে ইবলিশকে জান্নাত থেকে বের করে দেয়া হয়। আদম-হাওয়ার (আ.) কারণে অভিশপ্ত হয়ে শয়তানে পরিণত হয় ইবলিশ। তাকে দেওয়া সামর্থ্য অনুসারেই আদমকে পথভ্রষ্ট করার জন্য সচেষ্ট হলো। এতে আদমকে (আ.) ধোকা দেয় গাছের ফলের ব্যাপারে।

ইবলিশ বর্ণনা করেছে, এই গাছের ফল খেলে তুমি চিরঞ্জীব হবে। স্থায়ীভাবে জান্নাতে থাকবে। না হয় তোমাকে দুনিয়াতে চলে যেতে হবে। তখন হাওয়ার মাধ্যমে ইবলিশ প্ররোচনা দিলেন। তাতে কাজও হলো। আদম-হাওয়া (আ.) দু’জনেই আল্লাহর নিষেধাজ্ঞা ভুলে গেলেন। আল্লাহপাক বলেন, নিষিদ্ধ গাছের ফল খেয়ে যে ভুল করেছ, তারপর আমার পাঠানো হেদায়েতের বার্তা অনুসরণ করলে আবার জান্নাত পাবে। পরে তাদের দুনিয়াতে পাঠিয়ে দেয়া হয়। আদমকে শ্রীলংকায় আর হাওয়াকে পাঠানো হলো সিরিয়ায়। আদম দুনিয়াতে এসে ৩০০ বছর তওবা করে পানাহ চান। সেই তওবা করার সময় তিনি শেষ নবীর (সা.) নাম স্মরণ করলেন- ‘আরশেও আমি (আদম) লেখা দেখলাম : লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ।’

 

তিনি নবীর নামের উসিলায় আল্লাহর কাছে দোয়া করে বললেন, ‘হে রাব্বুল আলামীন আমরা দু’জনেই নিজের উপর অপরাধ করে বসলাম। যদি আপনি আামাদের ক্ষমা না করেন, আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব।’ এরপর আল্লাহ তাদের ক্ষমা করে দিলেন। আবার নতুনভাবে সংসার শুরু করার সুযোগ করে দেন তাদের। আদমের ঔরসে ১২০ জোড়া সন্তান আল্লাহপাক হাদিয়া দিলেন।

মুহাম্মদ (সা.) আসবেন সেটা আদমের যুগে আলোচনা হয়েছে। এভাবে ইব্রাহিম (আ.)-ও তার আগমনী বার্তা দিয়েছিলেন। তিনি যখন ইসমাঈলকে (আ.) সঙ্গে নিয়ে কাবা শরীফ নির্মাণ করলেন এবং সে সময় তিনি আল্লাহর নিকট দোয়া করলেন ‘হে রাব্বুল আলামীন, আমাদের দু’জনকে আপনি মুসলমান বানান এবং আমাদের ঔরসের সন্তানদের নিয়ে একটি মুসলিম জাতি সৃষ্টি করেন। আমাদেরকে ইবাদত, হজ, ওমরা করা শিখিয়ে দিন এবং কোরআনের ব্যাখ্যা শিখান, ঈমানের মাধ্যমে অন্তরকে পরিষ্কার করবেন।’ আল্লাহ ইব্রাহিম (আ.)-এর সেই দোয়া কবুল করেন।

 

আল্লাহপাক সূরা জুমায় বলেছেন, মুসলিম জাতির মধ্যে একজন রাসূল পাঠিয়ে দিলেন এবং তিনি দায়িত্ব পালন করবেন ও কোরআন তেলাওয়াত শেখাবেন। তাদের অন্তর পরিষ্কার করবেন, তাদের কোরআন-সুন্নাহ শিক্ষা দিবেন। অন্তর শিরক, বিদআত ও কুসংস্কারমুক্ত না হলে কোরআন-সুন্নাহর জ্ঞান তার কোন কল্যাণে আসবে না। যেকোন গ্লাসে আপনি যদি পানি কিংবা দুধ নেন, তা আগে পরিষ্কার করে নিতে হবে। তারপর যা নেবেন, তা হবে সুস্বাদু।

ঠিক তেমনি মুসা (আ.)-ও তাওরাতের মধ্যে দেখেছেন শেষ নবী আসবেন। ঈসা (আ.)-ও ইনজিলের মধ্যে দেখেছেন। তাদের যুগের পাদ্রিরা বলতো মুসা (আ.) ও ঈসার (আ.) পরে একজন নবী আসবেন। তিনি হবেন উম্মিদের মধ্য থেকে এবং তিনি হিজরত করে খেজুর বাগান সম্বলিত এলাকায় যাবেন, অর্থাৎ মদীনায় যাবেন। তাই ইহুদির বড় বড় আলেমরা যখন মুহাম্মদকে (সা.) দেখতেন, তারা বলতেন উনি হলেন শেষ নবী। কারণ তাওরাত এবং ইনজিলের ব্যাখ্যার সাথে তার হুবহু মিলে যায়।

 

হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত। আবদুল্লাহ ইবনে সালাম বড় ইহুদি আলেম ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মদীনায় আগমনের সংবাদ শুনে তিনি তার সামনে হাজির হন। পরে তিনটি বিষয় জানতে চাইলেন, যা নবী (সা.) ছাড়া আর কেউ জানেন না। সেগুলো হচ্ছে- কেয়ামতের প্রথম নিদর্শন কি? বেহেশতবাসীদের প্রথম খাবার কি হবে? কি কারণে সন্তান পিতা-মাতার সাদৃশ্য লাভ করে?

আল্লাহর রাসূল (সা.) উত্তর দিলেন, জিবরাঈল (আ.) সবেমাত্র এই তিনটি ব্যপারে জানিয়ে গেছেন। এরপর তিনি বলতে থাকেন- আগুন হল কেয়ামতের প্রথম নিদর্শন, যা মানুষকে পূর্ব থেকে পশ্চিমে তাড়িয়ে নিয়ে যাবে। দ্বিতীয়ত, বেহেশতবাসীর প্রথম খাবার হবে মাছের কলিজার সর্বোত্তম অংশ। তৃতীয়ত, পুরুষ যখন স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস করে তখন যদি প্রথমে তার বীর্য বের হয়, তাহলে সন্তান পিতার আকৃতির হয়। আর যদি আগে স্ত্রীর বের হয়, তাহলে সন্তান হবে মায়ের আকৃতির। অতঃপর আবদুল্লাহ বললেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, অবশ্যই আপনি আল্লাহর রাসূল।

 

তারপর ইহুদিরা এসে আবদুল্লাহ’র ঘরে প্রবেশ করে। তখন রাসূল (সা.) তাদের জিজ্ঞেস করলেন, আবদুল্লাহ ইবনে সালাম কেমন লোক? তারা উত্তর দিলো, তিনি আমাদের মধ্যে সবচেয়ে জ্ঞানী এবং শ্রেষ্ঠ জ্ঞানীর পুত্র। তখন রাসূল (সা.) বললেন, আবদুল্লাহ ইসলাম গ্রহণ করলে তোমাদের অভিমত কি হবে? তারা উত্তর দিলো- আল্লাহ এ থেকে হেফাজত করুন। আবদুল্লাহ অকস্মাৎ তাদের সামনে ঘোষণা করলেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই এবং আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রাসূল। এই ঘোষণা শুনে ইহুদিরা আব্দুল্লাহ’র নামে কুৎসা রটাতে শুরু করে।

আমরা যদি সেই নবীর (সা.) আদর্শ অনুসরণ করতে পারি তাহলে আমরা ইহকাল এবং পরকালে সফলতা অর্জন করতে পারবো। আল্লাহপাক আমাদের সেই তৌফিক দান করুন, আমিন।

লেখক : ব্যুরোচিফ, বাংলাভিশন, চট্টগ্রাম

 

পূর্বকোণ/এএস/এএইচ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট