চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ০৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২৩

২৬ আগস্ট, ২০২২ | ২:৫৩ অপরাহ্ণ

রাসূল (সা.)’র বংশধরের মর্যাদা কোরআন দ্বারা স্বীকৃত

আহলে আল-বাইত আরবি শব্দ। যার অর্থ ঘরের লোকজন। প্রাক-ইসলামি যুগে এই শব্দগুচ্ছ দ্বারা আরব উপদ্বীপের গোত্র শাসকের পরিবারকে বোঝানো হত। আর ইসলামি ঐতিহ্য অনুসারে আহলে আল-বাইত দ্বারা হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পরিবার এবং কিছুক্ষেত্রে তাঁর পূর্বপুরুষ ইব্রাহিম (আ.)-কেও বোঝানো হয়।

আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত হলেন মুহম্মদ (সা.)-এর স্ত্রীগণ, তাঁর কন্যা ফাতিমা (রা.), জয়নব (রা.), রুকাইয়া (রা.), উম্মে কুলসুম (রা.), তাঁর চাচাতো ভাই ও জামাতা আলী (রা.) এবং তাঁর দৌহিত্র হাসান (রা.) ও হোসাইন (রা.)। মুহম্মদ (সা.)-এর চাচাসহ আব্বাসের বংশধর অবধি বিস্তৃত। মালিক ইবনে আনাস ও আবু হানিফার মতে, সমগ্র বনু হাশিম গোত্র আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত।

 

কারবালার প্রান্তরে জালিম শাসক ইয়াজিদের বাহিনীর হাতে আহলে বাইতের প্রথম সারির সদস্যসহ ৭৮ জন বীর সৈনিক শাহাদাত বরণ করেন। এর মধ্যে হোসাইন (রা.)-সহ নবী পরিবারের সদস্য ছিলেন ২৭ জন। এই ঘটনা কিয়ামত পর্যন্ত স্মরণীয় হয়ে থাকবে। প্রতিবছর মহররম মাস এলে ঈমানদার রাসূল প্রেমিকগণ আহলে বাইতদের নিয়ে আলোচনা করেন। এতে রাসূলের (সা.) বংশধরদের প্রতি সবার মহব্বতের বহিঃপ্রকাশ ঘটে।

আল্লাহপাক আহলে বাইতকে যে মর্যাদা দিয়েছেন তা কোরআন দ্বারা স্পষ্ট। কোরআনে আল্লাহপাক নবীজির (সা.) পরিবারকে বিশেষ নির্দেশ দিয়েছেন। ‘হে নবী পত্নীগণ, তোমরা ঘরের মধ্যে থাক। জাহেল যুগের মতো নিজেদের প্রদর্শন করে বেড়াবে না; তোমরা নামাজ প্রতিষ্ঠা কর, জাকাত আদায় কর, আল্লাহ এবং রাসূলের অনুসরণ কর। হে নবী পরিবার! আল্লাহতো তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে চান এবং তোমাদের সর্বতোভাবে পবিত্র রাখতে চান’। (সূরা-আহযাব-৩৩)

 

এ আয়াতটি নাযিল হওয়ার পর মুহাম্মদ (সা.) প্রথম সারির আহলে বাইতদের ডাকলেন। আলী (রা.), ফাতেমা (রা.) , হাসান (রা.) ও হোসাইন (রা.) চারজনকে একটি চাদরে বসান। তাদের বললেন, আল্লাহপাকের ঘোষণা অনুযায়ী তোমরা প্রথম সারির আহলে বাইত। তোমাদের আল্লাহপাক জান্নাতি বানাবেন। তোমাদের থেকে আহলে বাইত দুনিয়ায় সম্প্রসারণ করবেন। এরপর আল্লাহ’র প্রিয় হাবিব (সা.) আহযাবের ৩৩ নম্বর আয়াতটি তাদের তেলওয়াত করে শুনান।

আহলে বাইত দুই প্রকার- প্রথম সারির আহলে বাইত ও দ্বিতীয় সারির আহলে বাইত। নবীর বংশধর বা ঘরের লোকজন প্রথম সারির আহলে বাইত। হযরত হাসান (রা.) ও হোসাইন (রা)-এর বংশধর বর্তমান বিশ্বে বিরাজমান। তারা সরাসরি রাসূলের (সা.) বংশধর হওয়ায় প্রথম সারির আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত।

 

প্রথম সারির আহলে বাইত রাসূলের (সা.) বংশ। তাঁর ১১ জন বিবি ছিলেন। এরমধ্যে ১০ জন ছিলেন নিঃসন্তান। শুধুমাত্র খাদিজা (রা.)-এর ৭ সন্তান ছিলেন। তারমধ্যে ৪ মেয়ে ও ৩ ছেলে। ৩ ছেলে শিশুকালে মারা যাওয়ায় তাদের কোন প্রজন্ম পৃথিবীতে নেই। ৩ মেয়েরও কোন প্রজন্ম পৃথিবীতে নেই। কারণ তারাও নিঃসন্তান ছিলেন। শুধুমাত্র রাসূলের (সা.) সরাসরি প্রজন্ম হযরত ফাতেমা (রা.)-এর সন্তান থেকে আহলে বাইত দুনিয়ায় সম্প্রসারিত হয়।

এছাড়া দ্বিতীয় সারিতে আওলাদে রাসূল বা অন্যান্য আত্মীয় ও তাদের ওরশজাতরা। এরকম ছিলেন তাঁর চাচা ও চাচাত ভাইয়েরা। রাসূলের (সা.) চাচা আবু লাহাব ও আবু জাহেল ছিল কাফের। তবে আবু জাহেলের ছেলে ইকরামা ছিল মুসলমান। ইকরামার বংশও রাসূলের (সা.) বংশধর। অন্যদিকে আবু লাহাবের নাতি-নাতনি থেকে শুরু করে তার বংশেও মুসলমান রয়েছে, তারাও রাসূলের (সা.) বংশধর।

 

বর্তমান পৃথিবীতে রাসূলের (সা.) বংশধর দুটি। একটি সরাসরি ফাতেমা (রা.)-এর মাধ্যমে। অপরটি রাসূলের চাচা, চাচাত ভাই ও আত্মীয়-স্বজনের মাধ্যমে। উভয় আহলে বাইতই বর্তমান বিশ্বে বিরাজমান। যেমনি ফাতেমার বংশধরের জন্য অন্য বংশের সদকা হারাম, তেমনি আব্বাস (রা.)-সহ অন্যদের জন্যও অপরের সদকা হারাম। এটা রাসূলের (সা.) বংশধর হিসেবে হারাম করা হয়েছে, তাদের পবিত্র রাখার জন্য।

একদিন রাসূল (সা.)-এর সামনে হাসান (রা.) একটি খেজুর মুখে দিতে চাইলেন। এটা ছিল সদকার খেজুর। রাসূল (সা.) হাসানকে বললেন, এই খেজুর তুমি ফেলে দাও। কারণ এটা সদকার খেজুর। তাই এটি তোমার গ্রহণ করা উচিত নয়। আল্লাহপাক আমার বংশধরের সম্মানের জন্য যাকাত, সদকা গ্রহণের ব্যাপারে নিষেধ করেছেন। আমার বংশধর পরস্পরকে যাকাত ও সদকা দিতে পারবে, তবে অন্যেরটা নিতে পারবে না। সবার উপরে তোমাদের মর্যাদা দান করেছেন আল্লাহ। আল্লাহপাক পৃথিবীর ১৮ হাজার মাখলুকাতের মধ্যে মানুষকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। মানুষের মধ্যে আদমকে প্রাধান্য দিলেন। আরব থেকে আল্লাহপাক কুরাইশ বংশের বনি হাশিম গোত্র এবং রাসূলকে মর্যাদা দিয়েছেন। সুবহান্নাল্লাহ।

 

সারা বিশ্বে মর্যাদাবান বংশ হল কুরাইশ আর বনি হাশিম। কেয়ামত পর্যন্ত বনি হাশিমের যত বংশ থাকবে তাদেরকে রাসূলের (সা.) বংশধর বলা হবে। হাশিব ইবনে আবদুল মানাফ হলেন বনি হাশিম বংশের জনক। তিনি হলেন মুহাম্মদ (সা.)-এর দাদা আবদুল্লাহ আল মুত্তালিবের বাবা। তার ছেলে আবদুল্লাহ হলেন মুহাম্মদ (সা.)-এর পিতা। অর্থাৎ মুহাম্মদ (সা.)-এর বড় দাদা বনি হাশিম বংশের জনক। এই হাশেমের বংশধরকে বলা হয় আহলে বাইত।

আল্লাহর প্রিয় হাবিব (সা.) তাই বললেন, একদিন জিবরাঈল (আ.) আমার কাছে একটি সুসংবাদ নিয়ে এলেন। জিবরাঈল (আ.) বললেন, হে আল্লাহর হাবিব আমি সারা পৃথিবী যাছাই করলাম, কিন্তু পৃথিবীর মধ্যে বর্তমানে সেরা বংশকে পেলাম না? আল্লাহতায়ালা আপনার বংশের কথা বললেন। আল্লাহপাক নবীর বংশকে আহলে বাইতের মর্যাদা দিয়েছেন। সেই কারণে আমরা আহলে বাইত স্মরণে সালাতে দরুদ পাঠ করি। ‘আল্লাহুমা সাল্লি আলা মুহাম্মদ, ওয়ালা আলি মুহাম্মদ’। আমরা বলি আল্লাহ রহম করুন মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর এবং নবীর বংশধরের ওপর। এটা হলো রাসূলের বংশ আহলে বাইতের বৈশিষ্ট্য। পৃথিবীর সমস্ত মানুষ প্রতি ওয়াক্ত নামাজে রাসূলের (সা.) বংশের জন্য দোয়া করে। কারণ প্রত্যেকে দরুদে ইব্রাহিম পাঠ করে।

 

আল্লাহপাক আহলে বাইতের মর্যাদা দরুদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে নামাজের অংশ বানিয়ে দিলেন। শেষ বৈঠকে দুরুদ পাঠ করা সুন্নতে মোয়াক্কাদা করে দিয়েছেন। তাই রাসূলের (সা.) বংশ মর্যাদাকে মহান ও পবিত্র রাখার জন্য বাইরের সদকা গ্রহণ থেকে বিরত রাখলেন। কারণ মানুষ তাঁদের সদকা বেশি প্রদান করতে চাইবে। তাদের পূর্ব পুরুষ নবী দাবি করেছে সদকা নেওয়ার জন্য। টাকা পয়সার অভাবের কারণে নয়। এরকম মিথ্যা অপবাদ যাতে দিতে না পারে, সেজন্য আল্লাহপাক নবী পরিবারকে সদকা গ্রহণে নিষেধ করেছেন। তবে নবী (সা.) হাদিয়া গ্রহণ করতেন। কেউ সদকা নিয়ে এলে বলে দিতেন, এসব গরীব সাহাবীদের জন্য।

লেখক : ব্যুরোচিফ, বাংলাভিশন, চট্টগ্রাম

 

পূর্বকোণ/এএস

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট