চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ০৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২৩

২০ আগস্ট, ২০২২ | ১:৩৩ অপরাহ্ণ

ড. মো. কামাল উদ্দিন

কেন মেধাবীরা শিক্ষকতায় আসতে চান না

শিক্ষকতা এমন একটি পেশা যাকে নিয়ে গর্ব করা যায়। এ পেশাকে নিয়ে রচিত হয়েছে অনেক দর্শন, তত্ত্ব, বাণী, বই-পুস্তক, নাটক, উপন্যাস ও নানা কাহিনী। এ গুলোর মূল বক্তব্য হচ্ছে শিক্ষকতা একটি মহান পেশা, সম্মান ও মর্যাদার পেশা। এ পেশা অন্যান্য পেশা থেকে আলাদা। অন্যান্য পেশা সৃষ্টিকারী একটি পেশা। শিক্ষকরা ব্যতিক্রমী নেশায় কাজ করেন। এটি এমন একটি পেশা, যে পেশার বিশেষক্ষেত্রে কোন অবসর নাই। এই পেশাকে সমুন্নত করার জন্য এবং পেশাগত মর্যাদাকে উচ্চতর শিখরে নিয়ে যাবার জন্য রাষ্ট্র নানাধরনের পদ তৈরি করেছে, যেমন জাতীয় অধ্যাপক, চেয়ার প্রফেসর, প্রফেসর ইমেরিটাস, বঙ্গবন্ধু চেয়ার ইত্যাদি। পৃথিবীর সভ্যতা, ইতিহাস ও দর্শন তৈরি হয়েছে শিক্ষকদের অবদানে। কথিত আছে, ১০০০ টি বই পড়ার ছেয়ে একদিন একজন মহান শিক্ষকের সান্নিধ্য পাওয়া আরো বেশি কার্যকর! শিক্ষকরা হচ্ছেন দেশের মস্তিষ্ক, কারণ তারাই তৈরি করেন একটি দেশ পরিচালনার ভবিষ্যৎ কর্ণধার। শিক্ষকরাইতো আলো ছড়ান, আলো জ্বালান। দার্শনিকরা বলে থাকেন একটি বই, একটি কলম ও সর্বোপরি একজন শিক্ষক সারাবিশ্বের ছবিটা বদলে দিতে পারেন। শিক্ষকতা নিয়ে এমন ইতিবাচক হাজারো কথা বলা যায়। পৃথিবীতে এমন কোন দেশ পাওয়া যাবে না যারা শিক্ষা ছাড়া উন্নত হয়েছে। একসময় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তিকে একটি দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতা হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু তা এখন বদলে যায়। পৃথিবীকে তারাই শাসন করবে, যাদের জ্ঞান আছে, যারা শিক্ষা-দীক্ষায় উন্নত। শিক্ষাকেন্দ্রিক উন্নয়ন মডেলই সবচেয়ে টেকসই মডেল। কিন্তু বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য শিক্ষাব্যবস্থার উপর জোর দেয়া হলেও শিক্ষকদের উপরে জোর দেয়া হয় না। শিক্ষকদেরকে শুধু মুখে মুখে সম্মান করার রেওয়াজ থাকলেও বাস্তবতা ভিন্ন। আমি বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষকতার কথা বলছি না। আমার কাছে বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষকতার চেয়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের শিক্ষকতাই গুরুত্বপূর্ণ। এখন মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশায় আসতে অনাগ্রহী। অনেকে বাধ্য হয়ে এ পেশায় আসেন। পেশা হিসেবে শিক্ষকতা মেধাবীদের কাছে অনেক নিচে।

কিছুক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম যে নাই তা নয়। তবে তা খুব নগণ্য। আমি একবার একজনকে জিজ্ঞেস করি, আপনি কেন শিক্ষকতা পেশাকে চয়েস করেছেন, তিনি বললেন বাধ্য হয়ে! অন্য কোন চাকরি পায়নি বলে! অবাক হলাম! এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় লেভেলের অনেক শিক্ষকও জানেন না উনি কেন শিক্ষক হয়েছেন? উনি পছন্দ করে এ পেশা আসেননি। এখন চাকরিপ্রার্থীদের পছন্দের তালিকায় থাকে বিসিএস এর মাধ্যমে সরকারি উচ্চপদে চাকরি, আর সেখানে পছন্দের তালিকায় শিক্ষকতা থাকে নিচের দিকে। এক বিসিএস এ শিক্ষকতা পেলেও তা পরিবর্তন করার জন্য বারবার পরীক্ষা দিতে দেখা যায়। এরকম কেন হয় এ দেশে। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে তো ভিন্ন চিত্র। এটি একটি ভাবনার বিষয়! চিন্তার বিষয় কেন মেধাবী শিক্ষার্থীরা শিক্ষকতায় আসতে চায় না। বেতন কম বা সম্মান কম বলে? বিষয়টি আসলে অন্য জায়গায়। রাষ্ট্র শিক্ষকদেরকে কতটুকু নিরাপত্তা, সম্মান ও মর্যাদা দেয় সেটি একটি বড় বিষয়। শিক্ষকদের একটি মেরুদণ্ডহীন ও মেধাহীনপ্রাণী হিসেবে তৈরি করার জন্য রাষ্ট্রীয় কৌশল অনেক শক্তিশালী। সেজন্যই একবার সরকার থেকে শিক্ষকদের আলাদা বেতন ও মর্যাদার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করলে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে শিক্ষা ও শিক্ষকতা একটি নন প্রোডাক্টিভ খাত, এখানে বেশি বিনিয়োগ করা আলাভজনক। এখানে শিক্ষকতা ও শিক্ষাখাতের সাথে উৎপাদনকারী কল-কারখানার সাথে তুলনা করা হয়েছে! শিক্ষকরা যেন স্বাধীনভাবে কথা বলতে না পারেন এবং শিক্ষকদের ভিতরে রাজনৈতিক বিভক্তি তৈরি করে রাজনৈতিক এলিটদের কাছে নতজানু করা হয় অত্যন্ত সুকৌশলে। আর যে সকল শিক্ষক মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চান তাঁদের জন্য অপেক্ষা করে কঠিন বিপদ!

হয়তো ছাত্রের হাতে খুন, না হয় রাজনৈতিক গুন্ডা দ্বারা লাঞ্চিত হন! কিছু শিক্ষক আবার গড্ডালিকাপ্রবাহে নিজেকে ভাসিয়ে দিয়ে সমাজের এই খারাপ অনুষঙ্গের সাথে নিজেকে মিশিয়ে নেন। যারা নিজেকে খাপ খেয়ে নিয়েছেন তাদের তেমন সমস্যা নেই। তারা শিক্ষকতা বাদ দিয়ে এখন বড় শিক্ষক নেতা! তারা ক্লাসে কম যান। তারা রাজনীতি, সামাজিক বিচার ও অন্যান্য কাজ করতে করতে যখন ক্লান্ত হয়ে পড়েন তখন তারা নিজেকে ক্লান্তিহীন করতে একটুর জন্য ক্লাসে যান!

এখনকার যুবকরা অত্যন্ত চালাক। মেধাবীরাতো আরো বেশি চালাক হওয়ার কথা। তারা সুখে থাকতে চান। গাড়ি-বাড়ি বানাতে চান। কারণ তারা লেখাপড়া করেছেন এটা জেনে যে ‘লেখাপড়া করে যে গাড়ি ঘোড়া চড়ে সে’। এ জন্যই সেদিকে তাদের নজর। ভাঙ্গা চেয়ার, পুরনো জামা, কোনরকম জীবন যাপন, পরিবারকে কষ্ট দিতে তারা চান না। বাংলাদেশের মতো মধ্য-আয়ের দেশে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে নিয়ে সামাজিকভাবে ও রাষ্ট্রীয়ভাবে নিগৃহীত হয়ে এক কোণায় পড়ে থাকতে কেউ চাওয়ার কথা নয়। তাদের দরকার বড় পদ! ক্ষমতা! হাতল ও টাওয়াল ওয়ালা বড় চেয়ার! রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে সবাই যেন গুরুত্ব দেন এমন একটি পদ!

যেখানে থাকবে সামাজিক সুরক্ষা ও রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ও নিরাপত্তা। তাইতো তারা শিক্ষক হতে চান না। হয়তো অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন শিক্ষকদের কোন পদই তো খালি নেই। কেউ না কেউ তো শিক্ষকতা করছেন। আমি একেবারেই একমত। দেখতে হবে কারা শিক্ষকতা করছেন। শিক্ষকতায় আসছেন মেধাবীরা নয়, তুলনামূলকভাবে কম যোগ্যতাসম্পন্নরা। বিশিষ্ট একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বলেছিলেন, একটি দেশে যারা মঞ্চে থাকেন তাদের জ্ঞান ও যোগ্যতা যদি যারা বেঞ্চে থাকেন তাদের থেকে কম হয়, তাহলে সেখানে রাজনৈতিক বিপর্যয় হয়। আর আমাদের দেশে রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিপর্যয়ের পাশাপাশি হয়েছে শিক্ষাব্যবস্থার বিপর্যয়! সামাজিক বা রাজনৈতিক মাস্তানরা শিক্ষকদের থেকে অনেক গুরুত্ব পান। তাদেরকে সবাই সম্মান করে। ওসি সাহেব তাদের ফোনের গুরুত্ব দেন! ডিসি সাহেব তাদের সামনে বসতে দেন! ভিসি সাহেব আলোচনায় বসেন। রাজনৈতিক দল তাদের নমিনেশন দেন, তারা আমাদের দ্বারা নির্বাচিত হন। আমি আমার একজন ছাত্রকে জিজ্ঞেস করেছিলাম ভবিষ্যতে তুমি কি হতে চাও? সে বলে স্যার আমি বড় মাস্তান বা সন্ত্রাসী হতে চাই। কিছুদিন মাস্তানি করবো, টাকা কামাবো, রাজনীতি করবো, এমপি বা মন্ত্রী হবো। রাজনৈতিক মাস্তানি সবচেয়ে লাভজনক পেশা। তার কাছে সমীকরণটি সোজা! কারণ এই সোজা সমীকরণে অনেকে সফল হয়েছেন!

আর বর্তমান গ্র্যাজুয়েটরা অনেকেই সোজা সমীকরণ করেন! হয়তো বিসিএস সমীকরণ না হয় রাজনৈতিক সমীকরণ! সে জন্যই অনেকেই শিক্ষকতায় আসতে চাননা! শুধু সালাম ও কুর্নিশে এখন পেট ভরে না! দরকার রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক মর্যাদা ও নিরাপত্তা। না হয় শিক্ষকতার দখল যাবে তুলনামূলক পিছিয়ে পড়াদের।

ড. মো. কামাল উদ্দিন প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান,

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

 

পূর্বকোণ/আর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট