চট্টগ্রাম শনিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২২

সর্বশেষ:

৬ আগস্ট, ২০২২ | ৬:২০ অপরাহ্ণ

নাসির উদ্দিন

সত্য ও ন্যায়ের প্রতীক হিসেবে বেঁচে আছেন হোসাইন (রা.)

যুদ্ধের সিদ্ধান্ত জানার পর হোসাইন (রা)কে হুর বিন ইয়াজিদ বললেন, আমি প্রথম এই সিদ্ধান্ত জানলে আপনাকে চলে যাওয়ার অনুমতি দিতাম। এই বলে ৩০ জনের বাহিনী নিয়ে তিনিও হোসাইনের দলে যোগ দিলেন। 

ইবনে জিয়াদের বাহিনী কারবালার প্রান্তরে অবরোধ করলে হোসাইন (রা.) বললেন, আমি তো যুদ্ধ করতে আসিনি। তোমরা আমাকে ডেকেছ বলে আমি এসেছি। এখন তোমরা কুফাবাসীরাই তোমাদের বাইয়াত পরিত্যাগ করছ। তাহলে আমাদেরকে যেতে দাও, আমরা মদিনায় ফিরে যাই অথবা সীমান্তে কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করি। অন্যথায় ইয়াজিদের কাছে গিয়ে তার সঙ্গে বোঝাপড়া করি। কিন্তু হযরত হোসাইন (রা.)কে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করতে আদেশ দেয় ইবনে জিয়াদ। ঘৃণা ভরে এ আদেশ প্রত্যাখ্যান করেন ইমাম হোসাইন (রা.)।

ফলে যুদ্ধের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হল। যুদ্ধ শুরু হয়ে যাচ্ছে দেখে রাতের মধ্যে হোসাইন (রা) আহলে বায়েতের যারা ছিল তাদের উদ্দেশ্যে বললেন, এই বাহিনীর একমাত্র উদ্দেশ্য আমি হোসাইন। অতএব আমি এখানে ময়দানের মধ্যে একা থাকি। তোমরা চাইলে রাতের আঁধারে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আত্নগোপনে যেতে পার।

তারা বললো, ‍‍‘হে হোসাইন, আপিন যদি এখানে থাকেন আপনাকে ছাড়া আমাদের জীবন নিষ্ফল। আমরা আপানাকে ছেড়ে কোথাও যাবো না। আপনি যদি শাহাদাত বরণ করেন আমরাও আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে শহীদ হতে চাই’। এই বলে কেউ রাতের মধ্যে আত্নগোপনে যায়নি।

৬১ হিজরীর ১০ মহররম, ৬৮০ খ্রিস্টাব্দের ১০ অক্টোবর কারবালা প্রান্তরে বিশাল যুদ্ধ শুরু হলো। ইমাম হোসাইন (রা.) ও ইয়াজিদ বাহিনীর মধ্যে এ অসম যুদ্ধ। সকাল থেকে ইবনে জিয়াদের নেতৃত্বে প্রায় ৪ হাজার ইয়াজিদ বাহিনী হোসাইন (রা.)-এর ওপর আক্রমণ চালাতে থাকে এবং ফোরাত নদী থেকে পানি সংগ্রহের সব পথ বন্ধ করে দেয়। হজরত হোসাইন (রা.)-এর শিবিরে শুরু হয় পানির জন্য হাহাকার।

হোসাইন (রা.) সাথীদের নিয়ে বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করতে থাকেন। এই যুদ্ধে একমাত্র ছেলে জয়নুল আবেদিন (রহ.) ছাড়া পরিবারের শিশু, কিশোর ও মহিলাসহ সবাই একে একে শাহাদাত বরণ করেন।
মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত ইমাম হোসাইন একাই লড়াই চালিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত অত্যন্ত নির্মম ও নির্দয়ভাবে ইমাম হোসাইনকে শহীদ করা হয়। শিমার নামক এক পাপিষ্ঠ তার মস্তক দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। শাহাদাতের পর ইমাম হোসাইন (রা.)-এর ছিন্ন মস্তক বর্শা ফলকে বিদ্ধ করে এবং তাঁর পরিবারের জীবিত সদস্যদেরকে দামেস্কে ইয়াজিদের কাছে প্রেরণ করা হয়। ইমামের খণ্ডিত মস্তক দেখে ইয়াজিদ ভীত ও শঙ্কিত হয়ে পড়ে।

কারবালার প্রান্তরে হোসাইন (রা.)সহ প্রায় ৭৮ জন বীর সৈনিক শাহাদত বরণ করেছিলেন। এর মধ্যে নবী পরিবারের শহীদ হন ২৭ জন। ইয়াজিদের পাপিষ্ঠ বাহিনী এক একজনকে হত্যা করে কবর রচনা করেন। এটা ছিল ইতিহাসের নির্মম পরিহাস। কেয়ামত পর্যন্ত এই ঘটনা মুসলমান স্মরণ করবে এবং ইয়াজিদের উপর অভিশাপ দেবে। হোসাইন (রা.) এর হত্যাকারীদের উপর অভিশাপ দেবে।

আল্লাহর প্রিয় হাবিব এর সামনে এক সময় জিবরাঈল এলেন। তিনি কান্না করছেন। হযরত আয়েশা (রা) জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল আপনি কেন কান্না করছেন? তখন তিনি বললেন, ‘এখন জিবরাঈল এসে আমাকে একটি দু:সংবাদ দিলেন। আমার প্রিয় হোসাইন ইরাকের ফোরাত নদীর তীরে শাহাদাত বরণে করবে’। নবীকে আগে থেকে সে কথা জানিয়ে দেয়া হয়েছিল। তাই আল্লাহর প্রিয় হাবিব বলেন, ‘হে আমার উম্মত তোমাদের এবং আমার আহলে বায়েতদের উপর বিভিন্ন সময়ে ফেতনা আসবে। অতএব তোমরা তা মোকাবেলা করবে’।

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, যে দিন হযরত হোসাইন (রা) শাহাদাত বরণ করেছেন, সেই রাতেই আমি স্বপ্নে দেখলাম, আল্লাহর নবী একটি শিশিতে রক্ত ভরছেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম এগুলো কিসের রক্ত? তখন তিনি জানালেন, কারবালা প্রান্তরে শহীদ হেসাইনের রক্ত শিশিতে ভরছেন।

উম্মে সালমা (রা) স্বপ্নে দেখলেন, সেই রাতে আল্লাহর প্রিয় হাবিব শরীরে ধূলা-বালি, ময়লা অবস্থার মধ্যে আছেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন আপনার এই অবস্থা কেন? তখন তিনি বললেন, আমি কারবালা প্রান্তরে যুদ্ধের মধ্যে উপস্থিত ছিলাম। সেখানে আমার শরীরে ধূলা-বালি, ময়লা লেগেছে। সুবহানাল্লাহ।

আল্লাহর প্রিয় হাবিব এই হাসান ও হোসাইন (রা) সম্পর্কে সুসংবাদ দিয়েছিলেন তারা জান্নাতে যুবকদের সর্দার হবেন। আল্লাহ চাইলে কি এই ১০০ জনকে ৫ হাজারের উপর বিজয় করতে, পারতো না। নিশ্চয়ই পারতেন। এটা হলো আল্লাহপাক এর পরীক্ষা।

হাদীসের মধ্যে রয়েছে: পৃথিবীর মধ্যে যার মর্যাদা যত বেশি হবে, তার পরীক্ষা তত বেশি হবে, বিপদের মাধ্যমে। সবচেয়ে বেশি মর্যাদা আমাদের নবীর। তাই সেই কারণে তাঁর পরীক্ষা তত বেশি হয়েছে। তাঁকে মাতৃভূমি ছেড়ে মদীনায় হিজরত করতে হয়েছে। এতিম অবস্থায় লালিত-পালিত ছিলেন। ওহুদের ময়দানে দন্ত মোবারক শহীদ হয়েছে প্রিয় নবীর। ইসলাম প্রচারের জন্য নানা যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছে। তাই একইভাবে ইব্রাহিম (আ) কে আগুনের মাধ্যমে আইয়ুব (আ.)কে ১৮ বছর চর্মরোগ দিয়ে- এভাবে নবী-রাসূলদের পরীক্ষা করেন আল্লাহপাক।

আল্লাহ মানুষকে দুই কারণে বিপদ দেন। এক পরীক্ষার জন্য, দুই পাপের কারণে। নেককারদের বিপদ দেয়া হয় মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য। হোসাইন (রা)কে বিপদগ্রস্ত করলেন আল্লাহপাক মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য। কেন? কিসের মর্যাদা? আল্লাহপাক তাকে জান্নাতের সর্দার বানাবেন। অথচ তারা কোন মেহনত করেননি। রাসূল (সা.) এর ইন্তেকালের সময় তাদের বয়স ছিল ৬/৭ বছর। কোন যুদ্ধ পায়নি তাঁরা। বদর যুদ্ধ, ওহুদের যুদ্ধ দেখেনি। সেই কারণে সাহাবায়ে কেরাম যে কস্ট করেছেন এই কস্ট তাদের করতে হয়নি। তাই আল্লাহপাক তাদের বিপদে ফেলে পরকালে বিশাল মর্যাদা দেয়ার ব্যবস্থা করেছেন। কেয়ামত পর্যন্ত তাঁদের মর্যাদাকে উচুঁ করে দিলেন। আহলে বায়েতকে মহব্বত করা ঈমানের অংশ। ঈমানের অংশ হিসাবে তাই তাদের কেয়ামত পর্যন্ত মহব্বত করবে মুমিন-মুসলমানরা। আর কেয়ামত পর্যন্ত ইয়াজিদ ও তার বাহিনীকে মানুষ ঘৃণার চোখে দেখবে। এবং তাদের উপর লানত করে।

ইয়াজিদের এই জয়লাভ বেশি দিন টিকে থাকেনি। মাত্র চার বছরের মধ্যে ইয়াজিদ মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করে। এর কয়েকদিনের মধ্যে মৃত্যু হয় ইয়াজিদ পুত্রের। কারবালার এই মর্মান্তিক হত্যায় জড়িত প্রতিটি ব্যক্তি কয়েক বছরের মধ্যেই মুখতার সাকাফির বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে নিহত হয়। এরপর ইয়াজিদের বংশের কেউ শাসন ক্ষমতা লাভ করেনি।

ইমাম হোসাইন (রা.) আজও বেঁচে আছেন সত্য ও ন্যায়ের প্রতীক হিসেবে। তার ত্যাগ যুগের পর যুগ মুসলিম বিশ্ব শ্রদ্ধা ও ভক্তির সঙ্গে স্মরণ করবে। এ মর্মান্তিক ঘটনাটি এতই লোমহর্ষক ও হৃদয় বিদারক যে, সারা বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমান আজো তা ভুলতে পারেনি-পারবেও না কেয়ামত পর্যন্ত।

লেখক : ব্যুরোচিফ, বাংলাভিশন, চট্টগ্রাম।

 

পূর্বকোণ/মামুন/পারভেজ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট