চট্টগ্রাম শুক্রবার, ১২ আগস্ট, ২০২২

সর্বশেষ:

৬ আগস্ট, ২০২২ | ৪:০৬ অপরাহ্ণ

স্পর্শ যখন স্পর্শকাতর

অনুভূতি প্রকাশের বিভিন্ন মাধ্যমের মধ্যে স্পর্শের ভূমিকা তেমন স্বীকৃত নয়। আমরা মুখের কিংবা চোখের অভিব্যক্তি, লেখা, হাতের ইশারা অথবা অন্য কোন অঙ্গভঙ্গিকে অনুভূতি প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে গণ্য করে এসেছি। স্পর্শের মতো এমন একটি সংবেদশীল মাধ্যম রয়ে গেছে আমাদের স্বীকৃতির আড়ালে। অথচ সঠিক প্রয়োগে স্পর্শ হয়ে উঠে অনুভূতি প্রকাশের অত্যন্ত শক্তিশালী মাধ্যম। চেতনে অবচেতনে স্পর্শের উপলব্ধিকে আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠা না দিলেও আমরা তার প্রভাবের বাইরে খুব একটা থাকতে পারি না।

কোন মা যখন তার সন্তানকে মাথায় হাত দিয়ে দোয়া করেন কিংবা জড়িয়ে ধরেন তার যে অনুভূতি তার সাথে তিনি যদি ফোনে বা সামনা সামনি বসে দোয়া করেন সেই অনুভূতি অনেকাংশেই ভিন্ন। তেমনটিই বলা যায় প্রেমিক প্রেমিকা বা স্বামী স্ত্রীর ক্ষেত্রেও। তারা যখন পরস্পরকে ছুঁয়ে কথা বলেন তার অনুভূতি প্রকাশের তীব্রতা দূর থেকে কথা বলা কিংবা কাছাকাছি থেকেও স্পর্শহীন কথা বলার চেয়ে অনেক বেশি। অনেক সময় কেবল স্পর্শের মাধ্যমেই অনেক অব্যক্ত কথা বলা হয়ে যায়। মুখ ফুটে বলতে হয় না।

 

আবার স্পর্শ মানেই যে গভীর আলিঙ্গন কিংবা অন্তরঙ্গ কোন স্পর্শ হতে হবে এমনটিও সব সময় নয়। কখনও কখনো আলতো পরশও অনেক অনুভূতিপ্রবণ ও অর্থবহ হতে পারে। অনুভূতি প্রকাশের অত্যন্ত শক্তিশালী মাধ্যম বলেই স্পর্শের বিষয়টি অনেক সময়ই স্পর্শকাতর হয়ে উঠে। যে কোন দুইজন মানুষের সম্পর্কের রসায়নের ভিত্তিতেই তাদের পরস্পরকে স্পর্শ করার ধরন ও গভীরতা নির্ধারিত হয়। একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে কখন, কী পরিস্থিতিতে, কীভাবে এবং কতটুকু স্পর্শ করতে পারবেন তা পুরোপুরি নির্ভর করে সে দু’জন মানুষের সম্পর্কের উপর।

প্রত্যকটি সম্পর্কেই অলিখিত কিছু সীমারেখা থাকে। স্পর্শ হতে হবে সে সীমারেখাকে মেনে। অন্যথায় তা হয়ে উঠতে পারে অনধিকার চর্চা। স্পর্শের মাধ্যমে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে চাইলে তাই প্রথমেই বুঝে নিতে হবে আমি যেভাবে স্পর্শ করতে চাই ঠিক সেভাবে স্পর্শ করার অধিকার আমার আছে কিনা। অনধিকার স্পর্শ হতে পারে সংঘাতের কারণ। আবার শুধু স্পর্শের অধিকার থাকলেই যথেষ্ট নয়। আমি তাকে কোথায় এবং কীভাবে স্পর্শ করতে পারবো সেটাও জানা থাকতে হবে। এমনও হতে পারে, আমার তার কাঁধে হাত রাখার অধিকার আছে কিন্তু তার চিবুক স্পর্শ করার অধিকার নেই, সম্পর্কটাও সেরকম নয়। সেই সীমাবদ্ধতাটুকু বুঝে সে মোতাবেক আচরণ করতে হবে। আমরা যদি স্পর্শ করার স্পর্শকাতর সীমারেখা বিবেচনায় নিয়ে আমাদের চারপাশের মানুষদের তার আবেশ দিতে পারি তবে আমাদের অনুভূতির প্রকাশ হতে পারে পরিপূর্ণ। বন্ধুর দুর্দিনে তাকে মুখে মুখে সান্ত্বনা দেয়ার সাথে তার কাঁধে হাত রেখে সান্ত্বনা দেয়ার অনুভূতি অবশ্যই আলাদা। ঠিক তেমনিভাবে কারো আনন্দের সংবাদে তাকে সহাস্য বদনে অভিনন্দিত করা আর তাকে আলিঙ্গন করে অভিনন্দিত করায় অনুভূতির মাত্রাও ভিন্ন। সঠিক সময়ে, সঠিক স্থানে এবং সঠিকভাবে স্পর্শ করার মাধ্যমে আমরা কোন কথা না বলেও অনেক অনুভূতি প্রকাশ করতে পারি। আলতো ছোঁয়া, বলিষ্ঠ স্পর্শ কিংবা গভীর আলিঙ্গন- প্রত্যেকেরই আলাদা আলাদা ভূমিকা আছে। প্রতিটি স্পর্শের সীমারেখাও নির্ধারিত হয় সেভাবেই। তবে পারস্পরিক স্পর্শের সমুদয় বিষয়ই সামলাতে হয় স্পর্শকাতরভাবে।

লেখক : অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান, কবি, গল্পকার, প্রাবন্ধিক ও সমাজকর্মী। পূর্বকোণের নিয়মিত লেখক।

 

পূর্বকোণ/এএস

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট