চট্টগ্রাম সোমবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২৩

২৯ জুলাই, ২০২২ | ১১:২৬ পূর্বাহ্ণ

অধ্যক্ষ কাযী আবুল বয়ান হাশেমী

শাহাদাতবার্ষিকীতে স্মরণ তৃতীয় খলিফা হযরত ওসমান যুন নুরাইন (রা.)

মুসলিম জাহানের তৃতীয় খলিফা হযরত ওসমান যুন নুরাইন (রা.) ছিলেন খোদায়ী বিধানের প্রতি গভীরভাবে অনুরক্ত, দানশীলতায় অগ্রগামী, লজ্জাশীলতায় সর্বকালীন দৃষ্টান্ত। বিপুল ধন-ঐশ্বর্যের কারণে তিনি ‘গণি’, মহানবী (দ.) এর পরপর দুই কন্যা বিবাহের সুবাদে ‘যুন নুরাইন’ এবং আবিসিনিয়া ও মদিনায় হিজরত করার কারনে ‘যুল হিজরতাঈন’ উপাধি লাভ করেন। তিনি আশারায়ে মুবাশ্শারা তথা জীবদ্দশায় বেহেশতের সুসংবাদ প্রাপ্ত দশজনের একজন এবং সেই ছয়জন সাহাবীর মধ্যে অন্যতম, যাঁদের উপর মহানবী (দ.) সন্তুষ্ট ছিলেন। এছাড়া তিনি ‘বি’রে রুমা’ পানির কূপ খরিদ করে সর্বসাধারনের জন্য উম্মুক্ত করার কারনে দু’টি জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত ছিলেন।

 

হযরত ওসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু ৫৭৩ মতান্তরে ৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে মক্কার ঐতিহ্যবাহী কুরাইশ বংশের উমাইয়া বংশের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর উপনাম ছিল আবু আমর, আবু আবদিল্লাহ, আবু লায়লা। তাঁর বাবা ছিলেন আফফান এবং আরওয়া বিনতে কুরাইশ ছিলেন তার মা। তার উর্ধ্ব পুরুষ (৫ম স্তরে) আবদে মান্নাফে গিয়ে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বংশের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। জাহিলি যুগে জন্ম হলেও জাহিলিয়্যাতের বীভৎসতা তাঁর চরিত্রকে বিন্দুমাত্র কলুষিত করতে পারেনি। তিনি ছিলেন মক্কার মুষ্টিমেয় শিক্ষিতদের একজন এবং বংশীয় আভিজাত্যের ধারায় তাঁর যৌবন কেটেছে ব্যবসায়। হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর উৎসাহে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন, তখন তাঁর বয়স ত্রিশের কোটায়। তিনি নিজেই বলেছেন, আমি ইসলাম গ্রহণকারী চারজনের মধ্যে চতুর্থ। হজরত আবু বকর, হজরত আলী ও জায়েদ বিন হারিসের পরে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। হযরত ওসমান (রা.) সম্পর্কে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেছেন, প্রত্যেক নবীরই বন্ধু থাকে, জান্নাতে আমার বন্ধু হবে ওসমান।

হযরত ওসমান (রা.) অত্যন্ত জনপ্রিয় খলিফা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালীন খলিফার সরলতা, সহিষ্ণুতা ও উদারতার সুযোগে শিয়া মতবাদের প্রবর্তক ইবনে সাবার নেতৃত্বে স্বার্থান্বেষী চক্র হযরত ওসমান (রা.)-এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে। বনি হাশিম ও বনি উমাইয়ার বিরোধ, কোরাইশ-অকোরাইশ দ্বন্দ্ব, মুহাজির-আনসার সম্প্রীতি বিনষ্ট করে মুসলিম সাম্রাজ্যে এক চরম সংঘাতময় অবস্থার সৃষ্টি করে। অথচ খলিফার বিরুদ্ধে আনীত সব অভিযোগই ছিল মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর ও অবাস্তব। শেষপর্যন্ত মিসর, বসরা ও কুফার বিদ্রোহী গোষ্ঠী একাট্টা হয়ে ৬৫৬ খ্রিস্টাব্দে মদিনায় সমবেত হয়ে খলিফার পদত্যাগ দাবি করে। হজ্ব উপলক্ষে অধিকাংশ মদিনাবাসী মক্কা মোয়াজ্জমায় অবস্থান করায় তারা এ সময়কেই মোক্ষম সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে। বিদ্রোহীদের অনৈতিক দাবী মেনে না নেওয়ায় হিজরী ৩৫ সনের ১৮ জিলহজ, শুক্রবার আসর নামাযের পর কুরআন তেলাওয়াতরত অবস্থায় বিদ্রোহীরা তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করে। ৩৫ হিজরীর ১৮ জ্বিলহজ মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত শোকাবহ ও বেদনাদায়ক দিবস। পক্ষান্তরে শিয়া, রাফেজী মতাবলম্বী ও তাদের দোসররা দিবসটিকে পালন করে ‘ঈদুল গাদির’ তথা একটি আনন্দের দিন হিসেবে। শিয়ারা হযরত আলী (রা.) এর আগে হযরত আবু বকর (রা.) ও ওমর (রা.)-কে বৈধ খলিফা মনে করেনা এবং হযরত ওসমান (রা.) এর নির্মম হত্যাকান্ডের পর যেহেতু হযরত আলী খলিফা হবার পথ পরিস্কার হয় সেহেতু ওসমান (রা.) হত্যাকান্ডের ঐ দিনকে তারা পালন করে ‘ঈদুল গাদির’ হিসেবে।

শিয়াদের দাবী- ৬৩২ খ্রি. বিদায় হজ থেকে ফেরার পথে হেজাজের জুহফার নিকটবর্তী ‘গাদীরে খুম’ বা খুম নামক কূপের পাশে মহানবী (দ.) যে ভাষণ দিয়েছিলেন সেই ভাষণে ‘মান কুনতু মওলাহু ফা আলীউন মওলাহু’, অর্থাৎ, আমি যার মওলা ছিলাম, আলীও তার মওলা- বাক্য দ্বারা মহানবী (দ.) হযরত আলীকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত বলে ইঙ্গিত করেছেন। কিন্তু, সুন্নিরা এ ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করে বলেন, ‘মওলা’ শব্দটি ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়। মহানবী (দ.) এর এই ঘোষণায় ‘মওলা’ শব্দটি ‘মিত্র’ বা ‘বন্ধু’ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, অর্থাৎ ভাষণটির অর্থ ‘আমি যার মিত্র, আলীও তার মিত্র’। কিন্তু শিয়ারা এখানে ‘মওলা’ শব্দটির অর্থ গ্রহণ করেছে ‘প্রভু’ কিংবা স্থলাভিষিক্ত হিসেবে। সে হিসাবে বক্তব্যটির অর্থ দাঁড়ায়, ‘আমি যার প্রভু (মুসলমানদের), আলীও তার প্রভু’, অর্থাৎ আলী মুসলমানদের কাছে আল্লাহর রাসুলের স্থলাভিষিক্ত। স্মর্তব্য, হযরত ওসমান (রা.) এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহীরা নিজেদের হযরত আলী (রা.) এর দল দাবী করলেও হযরত আলী (রা.) তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছেন এমন কোন প্রমাণ অদ্যবধি কেউ দিতে পারেননি। বরং, বিদ্রোহীদের দুরভিসন্ধি বুঝতে পেরে হযরত আলী ঐ বৎসর হজে পর্যন্ত যাননি। হযরত আলী (রা.) বিদ্রোহীদের প্রতিহত করতে হযরত ওসমান (রা.) এর অনুমতি চাইলে রক্তপাতের আশঙ্কায় তিনি অনুমতি দেননি। তারপরও তিনি নিজে এবং পুত্রদ্বয়- হাসানাঈনে করিমাঈনকে নিয়ে হযরত ওসমান (রা.) এর পাহারায় ছিলেন এবং বিদ্রোহীদের প্রতিহত করতে গিয়ে হযরত ইমাম হোসাইন (রা.) আঘাতপ্রাপ্তও হয়েছিলেন। অন্যদিকে হযরত আমিরে মুয়াবিয়া (রা.) মদিনা ও খলিফার নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য ১০ হাজার সিরিয়ান সৈন্য প্রেরণের প্রস্তাব দিলেও প্রিয় নবীর প্রতিবেশী মদিনাবাসীদের দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে হযরত ওসমান (রা.) সেই প্রস্তাবও ফিরিয়ে দেন। হযরত আমিরে মুয়াবিয়া (রা.) কর্তৃক নিরাপত্তার স্বার্থে মদিনা ছেড়ে দামেস্কে চলে যাওয়ার অনুরোধও প্রত্যাখ্যান করে নবীর শহর ছেড়ে তিনি কোথাও যাবেন না বলে সাফ জানিয়ে দেন।

 

হাদিসের বিভিন্ন ভাষ্য মতে, ‘হযরত আলীই মহানবী (দ.) এর পর স্থলাভিষিক্ত’ শিয়া ও রাফেজীদের এই দাবী অসার প্রমাণিত হয়। মহানবী (দ.) তাবুক যুদ্ধের সময় হযরত আলী (রা.)-কে মদিনায় রেখে গেলেও মসজিদে নববীতে নামাজের ইমামতির দায়িত্ব দিয়েছিলেন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম (রা.)-কে। উম্মুল মুমিনিন হযরত আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনানুযায়ী রাসুল (দ.) সোমবারে তাঁর ঘরে আসেন। বুধবার পর্যন্ত যথারীতি মাগরিবের নামাজ পড়ান। এশার সময় খুব বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েন। সাহাবায়ে কিরাম মসজিদ-ই-নববীতে প্রিয় নবীর পেছনে নামাজ আদায় করবেন- এই আশায় অপেক্ষমান। রাসুল (দ.) একে একে তিনবার ওঠার চেষ্টা করেন; কিন্তু তিনবারই বেহুঁশ হয়ে পড়েন। হুঁশ ফিরে পেলেই জিজ্ঞেস করতেন, আমার সাহাবিরা ইশার নামাজ পড়েছে? আয়েশা (রা.) জবাব দিতেন, না, তারা তো আপনার অপেক্ষায় আছে। তৃতীয়বার উঠে বললেন, আবু বকরকে নামাজ পড়াতে বলো। আয়েশা (রা.) বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! তিনি কোমল হৃদয়ের মানুষ। নামাজে দাঁড়ালে হয়তো ঠিকমতো কিরাতও পড়তে পারবেন না। সুতরাং ওমরকে নামাজে ইমামতি করার অনুমতি দিলে ভালো হয়। কিন্তু রাসুল (দ.) হযরত আবু বকর (রা.)-এর নাম বললেন। আয়েশা (রা.) তিনবার হযরত ওমর (রা.) এর নাম প্রস্তাব করলেন। কিন্তু মহানবী (দ.) প্রতিবারই একই জবাব দিলেন।

এভাবে ওফাতের পূর্বে অসুস্থাবস্থায় হুজুরে পাক (দ.) এর নির্দেশক্রমে হযরত আবু বকর (রা.) মসজিদে নববীতে ১৭ ওয়াক্ত নামাজে ইমামতির দায়িত্ব পালন করেন। বুখারী শরীফের ৪৪৪৭ নাম্বার হাদিসে উল্লেখ রয়েছে, মহানবী (দ.) এর ওফাতের তিনদিন পূর্বে চাচা হযরত আব্বাস (রা.) হযরত আলী (রা.)-কে ডেকে বললেন, চলো আমরা হুজুর পাক (দ.) এর সাথে সাক্ষাৎ করে উনার পরবর্তীতে খেলাফতের দায়িত্ব আমাদের বনি মুত্তালিব তথা কুরাইশ বংশের কারো উপর বর্তাবে তা জেনে নিই। হযরত আলী (রা.) বললেন, আমি এরকম কিছু জিজ্ঞেস করতে পারবোনা। কারন, নবীয়ে দু’জাহান হযরত মুহাম্মদ (দ.) ইতিমধ্যেই উম্মাহর জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছুর দিকনির্দেশনা দিয়ে ফেলেছেন। তাছাড়া মহানবী (দ.) এর কাছে এরকম কিছু জানতে চাওয়ার ফল হিতে বিপরীত হতে পারে। কারন, তিনি যদি বনি মুত্তালিব তথা কুরাইশ বংশের দিকে ইঙ্গিত না করেন তবে জনগণ তা জানতে পারলে পরবর্তীতে বনি মুত্তালিব তথা কুরাইশ বংশের কাউকে ক্ষমতায় বসাতে আগ্রহ দেখাবেনা।

হাদীসের উপরোক্ত ভাষ্যমতে, প্রমাণিত হয় যে, মহানবী (দ.) হযরত আলীকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত ঘোষণা দেননি, এমনকি বনি মুত্তালিব তথা কুরাইশ বংশের কাউকে নয়। সুতরাং শিয়া-রাফেজীদের এ ধরণের দাবী মিথ্যা, বানোয়াট, মনগড়া। শাহাদতের সময় হযরত ওসমান (রা.) এর বয়স হয়েছিল ৮২ বছর। তিনি ১২ দিন কম ১২ বছর খিলাফতের দায়িত্ব পালন করেন। হযরত জুবাইর ইবনে মুতইম তাঁর জানাজায় ইমামতি করেন। জান্নাতুল বাকিতে তাঁকে দাফন করা হয়।

 

কাযী আবুল বয়ান হাশেমী অধ্যক্ষ, আহছানুল উলুম জামেয়া গাউছিয়া কামিল (এমএ) মাদরাসা, চট্টগ্রাম; চেয়ারম্যান, গোলজার হাশেমী ট্রাস্ট বাংলাদেশ।

 

পূর্বকোণ/আর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট