চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ৩১ জানুয়ারি, ২০২৩

সর্বশেষ:

২৮ নভেম্বর, ২০২২ | ৭:১০ অপরাহ্ণ

ডা. জয়ব্রত দাশ

পরজীবী প্রাণী কৃমি ও জনস্বাস্থ্য

কৃমি একটি পরজীবী প্রাণী। মানুষের অন্ত্রে এদের বসবাস। এরা নিজেরা খাদ্য তৈরি করতে পারে না তাই মানুষের পেট থেকে পুষ্টি সংগ্রহ করে এরা বেঁচে থাকে। মানুষের পেটে বিভিন্ন ধরনের কৃমি থাকে।

বড় কৃমি বা গোল কৃমি, ফিতা কৃমি, সুতা কৃমি, হুক কৃমি, ট্রাইচুরা ও স্ট্রংগিলয়ড। এদের জীবন প্রণালী একটু ভিন্নধরনের। খালি পায়ে হাটলে অথবা খালি পায়ে ওয়াশরুমে গেলে পায়ের চামড়া ভেদ করে কৃমির লার্ভা মানবশরীরে প্রবেশ করে। এরপর ফুসফুসে আশ্রয় নেই ও হৃষ্টপুষ্ট হয়ে কফের মাধ্যমে খাদ্যনালীতে পৌঁছে। সেখানে পরিপক্ক হয়।

বংশবিস্তারের জন্যে ডিম পাড়ে। সেই ডিম পায়খানার সাথে বেরিয়ে এসে পরিবেশ আক্রান্ত করে। ডিম ফুটে লার্ভা হয়। সেই লার্ভা চামড়া ভেদ করে অথবা নোংরা খাবারের মাধ্যমে মানবশরীরে প্রবেশ করে। একটি হুক কৃমি মানুষের অন্ত্র থেকে দিনে ০.২ মিলিলিটার রক্ত শুষে খায়। ফলে পেটে ব্যাথা অনুভব হয়। অনেকগুলো কৃমি শরীরে থাকলে প্রতিদিনই বেশকিছু পরিমাণ রক্ত হারিয়ে যায়। ফলে আমরা অপুষ্টি ও রক্তশূন্যতায় ভুগী ছোট বড় সবাই। ছোটদের শরীরের রক্তশূন্যতা হয়ে বৃদ্ধি কম হয়। একে লোফলারস সিন্ড্রোম বলে।

এছাড়াও কৃমির কারণে শরীরে অ্যালার্জি, ত্বকে চুলকানি, শুকনো কাশি, শ্বাসকষ্ট হতে পারে, কারো আবার কৃমির জন্য রাতে ঠিকমতো ঘুমও হয় না। কখনো অন্ত্রের বা পিত্তথলির নালিতে কৃমি আটকে গিয়ে বড়ধরনের জটিলতা হয়। পিত্তের প্রবাহ বন্ধ হয়ে গিয়ে জন্ডিস হয়ে যেতে পারে। অগ্নাশয়ের প্রদাহ হতে পারে। বড় কৃমির সংক্রমণ বেশি হলে দলা পাকিয়ে অন্ত্র বন্ধ হয়ে যেতে পারে পারে। ফলে বড়ধরনের স্বাস্থ্যসমস্যা এবং অপারেশন দরকার হতে পারে।

কৃমি দূর করতে হলে প্রথমেই জানা দরকার এটি কেন হয়? এর কারণ নোংরা পরিবেশ, অনিরাপদ পানি পান, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, খালি পায়ে হাঁটা ও বাথরুমে যাওয়া কৃমি সংক্রমণের জন্য দায়ী। কৃমি ঔষুধের মাধ্যমে দূর করার উপায় আছে। কিন্তু অনেকে নানা ভুল ধারণার জন্য ভয়ে কৃমির ঔষুধ খান না। শিশুদেরকেও খাওয়াতে চান না। কিন্তু ঔষুধ নিয়ম মেনে খেলে আর সহজ কিছু উপায় মেনে চললে সহজেই কৃমি দূর করা যায়।

সহজ কিছু উপায়: ঔষধ-প্রতি তিনমাস পরপর পরিবারের সবাই একটি করে অ্যালবেনডাজল ট্যাবলেট সেবন করতে পারেন। সাত দিন পর আরেকটা ডোজ খাওয়া লাগবে। শিশুদেরও একইভাবে সিরাপ খাওয়াতে হবে। দুই বছরের নিচে কোনো শিশুকে খাওয়াতে হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। বয়স ১বছরের কম হলে কৃমির ঔষধ খাওয়াতে হয় না। গর্ভকালীন সময় কৃমির ঔষধ খাওয়া যাবে না। অন্য ঔষধ যেমন লিভামিসল, পাইরেন্টাল পামোয়েট, মেবেনডাজল এক বার খাওয়া যেতে পারে। ঔষধ সাধারণত রাতে খালিপেটে খাওয়া ভালো। চিনি খেলে বা মিষ্টি খেলে কৃমি হবে বলে যে ধারণা প্রচলিত, তা ঠিক নয়। মিষ্টি বা চিনি খাওয়ার সঙ্গে কৃমির কোনো সম্পর্ক নেই। বরং নোংরা হাতে বা ফলমূল না ধুয়ে ও অস্বাস্থ্যকর খাবার খেলে কৃমি হবে।

বাচ্চাদের সুতা কৃমি হলে পায়ুপথ চুলকায় বলে সেখানে হাত দিয়ে চুলকানোর পরে আবার সেই হাত মুখে দেয়। এভাবেই সংক্রমণ ছড়াতে থাকে। তবে পায়ুপথ চুলকানো মানেই কৃমি সংক্রমণ নাও হতে পারে। কৃমি সংক্রমণের আরও উপসর্গ আছে। যেমন ওজন না বাড়া, পেট ফাঁপা, পেট কামড়ানো, আমাশয়, অপুষ্টি, রক্তশূন্যতা ইত্যাদি। গরমকালে কৃমিনাশক খাওয়া যাবে না এমন ধারণারও কোনো ভিত্তি নেই। গরম, শীত, বর্ষা যেকোনো সময়ই কৃমিনাশক খাওয়া যাবে। যাদের বমি লাগে তাদের খাওয়ার পর বা ভরা পেটে খাওয়া ভালো।

কৃমিনাশক নিরাপদ ঔষুধ। এর তেমন কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। তবে কারও কারও পেট ফাঁপা বা বমি ভাব হতে পারে। অনেক সময় কৃমিনাশক খেয়ে শিশুদের অসুস্থ হওয়ার যে খবর পাওয়া যায়, তা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অজ্ঞতা ও কুসংস্কারজনিত। তবে ঔষধের মেয়াদকাল উত্তীর্ণ কিনা দেখে নিতে হবে।

পানি অবশ্যই ফুটিয়ে বা বিশুদ্ধ করে পান করবেন। কাঁচা শাকসবজি ও মাংস খাওয়ার আগে ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে। খাবার প্রস্তুত ও পরিবেশনের আগে ভালো করে হাত ধুয়ে নিতে হবে। শিশুদের খাওয়ার আগে ও শৌচাগার ব্যবহারের পর হাত পানি ও সাবান দিয়ে ধুয়ে নিতে হবে। শিশুদের  কিভাবে ভালো করে হাত কচলে ধুতে হয়, তা তাদের  শেখানো খুব জরুরী। সবাই কে খাবার আগে হাত ধুয়ে নেবার অভ্যাস করতে হবে। বাইরের খোলা অপরিচ্ছন্ন খাবার না খাওয়াই ভালো। মাঠঘাটে শিশুদের খালি পায়ে খেলতে দেবেন না। বাইরের অনুষ্ঠানে সালাদ না খাওয়া ভালো। কেবল গ্রামে বা রাস্তায় থাকা শিশুদের কৃমি হয় এই ধারণাও ভুল।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যে-কারও কৃমি সংক্রমণ হতে পারে। কুকুর, গরু, ছাগল ভেড়া, পাখি, হাঁস, মুরগি, ফলমুল, বিভিন্ন খাবার,ইত্যাদির মাধ্যমে ও কৃমি ছড়িয়ে পড়ে।। কাঁচা ফলমূল ভালো করে ধুয়ে তারপর খেতে হবে। তাই অপুষ্টি এড়াতে নিয়মিত কৃমিনাশক ট্যাবলেট খাওয়াই ভালো। কৃমির ঔষধ একা খেলে হবেনা, একা খেলে আবারো হবে তাই ৩ মাস পরপর পরিবারের সবাইকে একসাথে কৃমিনাশক ট্যাবলেট খাওয়াতে হবে। সবসময় একই কৃমির ঔষধ না খেয়ে ভিন্ন ভিন্ন কৃমির ঔষধ খাওয়া ভালো। তাতে করে ঔষধ রেজিস্ট্যান্স হয় না। সময় মতো ঔষধ খেলে ও পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকলে কৃমি মুক্ত থাকা সম্ভব।

লেখক: অধ্যাপক ডা. জয়ব্রত দাশ, অধ্যক্ষ, সাউদার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

 

পূর্বকোণ/সাফা/পারভেজ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট