চট্টগ্রাম শনিবার, ০৩ ডিসেম্বর, ২০২২

সর্বশেষ:

১৬ অক্টোবর, ২০২২ | ১০:১৭ অপরাহ্ণ

মো. আবু নাছের 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্ণফুলী টানেল: সম্ভাবনার নতুন স্বর্ণদুয়ার

সাড়ে তিন বছর পর আবুধাবি থেকে দেশে ফিরেছেন সাজ্জাদ। দুবাই শহরে মামার হোটেল ব্যবসায় সহযোগিতা করেন তিনি। সর্বশেষ করোনা শুরুর আগে এসেছিলেন। বাড়ি আনোয়ারার চাতুরি এলাকায়।

দীর্ঘদিন পর দেশে ফেরার উচ্ছ্বাস তার চোখে মুখে। পরিবারের সসদস্যদের নিয়ে ছোটভাই  আসছেন এয়ারপোর্টে তাকে রিসিভ করতে। মাইক্রোবাস ভাড়া করে তারা চাতুরি চৌমুহনী থেকে রওয়ানা দিয়েছেন, কিন্তু শহর পার হতেই দেড়ঘণ্টা। আনোয়ারা থেকে তিন ঘণ্টায় এয়ারপোর্ট পৌঁছতে পারেননি প্রিয়জনরা। অপ্রত্যাশিত এ অপেক্ষা এতদিন পর ঘরে ফেরা সাজ্জাদের উচ্ছাসকে যেন খানিকটা বিবর্ণ করে দেয়।

 

একই ফ্লাইটে দেশে ফিরেছেন বাঁশখালীর তোফাজ্জল। সৌদি আরবের মদীনায় তাঁর নিজের ব্যবসা। দুই তিন মাস পর পর দেশে আসেন। মায়ের অসুস্থতার খবর জানতে পেরে অনেক চেষ্টায় একটা টিকেট ম্যানেজ করে দেশে এসেছেন। কিন্তু শহরের যানজটতো অনিশ্চিত। কখন বাড়ি ফিরে মা’কে দেখবেন, সে অনিশ্চয়তার দোলাচলে তোফাজ্জল সাহেব। শেষমেষ এয়ারপোর্ট থেকেই গাড়ি ভাড়া করে রওয়ানা করলেন বাড়ির উদ্দেশ্য। আনোয়ারা, বাঁশখালী, কর্ণফুলী, পটিয়া খুব দূরের পথ নয়। এয়ারপোর্ট হতে সরাসরি যাওয়ার পথ নেই। যেতে হয় শহর ঘুরে আমানত শাহ সেতু হয়ে। বহতা কর্ণফুলী তৈরি করেছে এ আপাত বিচ্ছিন্নতা। নদীর ওপারেই যুবক সাজ্জাদ আর মাঝবয়সী তোফাজ্জলের আবাস।

 

অথচ সরাসরি পথ নেই যাওয়ার। চট্টগ্রাম শহর হয়ে বাড়ি পৌঁছতে তিন থেকে চার ঘণ্টা। আর স্পীডবোটে নদী পার হলে বড়জোর বাড়ি পৌঁছতে আধাঘণ্টা। কিন্তু সে ব্যবস্থাওতো নেই। অগত্য এতদূর আকাশপথ পাড়ি দিয়ে অপেক্ষার প্রহরগুণে বিমানবন্দরে। তোফাজ্জল সাহেবের গাড়ি ছুটে শহরের দিকে। চারদিকে চলছে উন্নয়ন কাজ। শেষবার সৌদি যাওয়ার আগে টানেলের কাজ দেখতে গিয়েছিলেন পতেঙ্গাপ্রান্তে। ব্যাপক কর্মযজ্ঞ। দেখে এসেছিলেন কর্ণফুলী নদীর নীচ দিয়ে সুড়ঙ্গপথের কাজ এগিয়ে চলেছে। খবরের কাজে দেখেছিলেন, এ বছরের ডিসেম্বর নাগাদ কাজ শেষ হবে। মনকে সান্তনা দেন, হবে হয়তো! কিন্তু ততদিন মা কি বেঁচে থাকবেন! স্রষ্টা হায়াত রাখলে আগামী জানুয়ারিতে পরিবার নিয়ে এ টানেল দিয়েই বাড়ি ফেরার স্বপ্ন দেখেন তিনি।

 

সাজ্জাদ, তোফাজ্জলদের মত অসংখ্য মানুষের অপেক্ষার পালা শেষ হতে যাচ্ছে। এ বছরের ডিসেম্বরেই শেষ হতে যাচ্ছে বন্দরনগরী এবং আশপাশের মানুষের বহুল প্রত্যাশিত স্বপ্নের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্ণফুলি টানেলের নির্মাণ কাজ। এরই মাঝে শতকরা নব্বই ভাগের বেশি কাজ শেষ হয়েছে। বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ায় নদীর নিচে এটি প্রথম টানেল। এ টানেল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাহসী ও স্বপ্নদর্শী নেতৃত্বের এক অনন্য উদাহরণ। ২০১৬ সালের ১৪ অক্টোবর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও চীনের প্রেসিডেন্ট জি-টু-জি ভিত্তিতে টানেলের নির্মাণ কাজে শুরুর ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন।

 

প্রকল্পের মোট দৈর্ঘ্য নয় কিলোমিটারের বেশি। মূল টানেলের দৈর্ঘ্য তিন কিলোমিটারের বেশি। এতে রয়েছে দুটি টিউব, যার প্রতিটির দৈর্ঘ্য প্রায় আড়াই কিলোমিটার। টিউবের ভেতরের ব্যাস প্রায় এগার মিটার। চারলেনের টানেল সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে যাচ্ছে। প্রকল্পটির মোট ব্যয় দশ হাজার তিনশ’ চুয়াত্তর কোটি টাকা, যার মধ্যে বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়ন প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা এবং চীন সরকারের অর্থ সহায়তা প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯  প্রধানমন্ত্রী টানেল বোরিং মেশিনের সাহায্যে টানেলের প্রথম টিউবের খনন কাজ উদ্বোধন করেন। পরের বছরের আগস্টের প্রথম সপ্তাহে প্রথম টিউবের খনন কাজ শেষ হয়। বর্তমানে এ টিউবের ভেতরের কাঠামোর কাজ চলছে। এরই মাঝে পেভমেন্ট স্ল্যাব এর কাজ শতকরা ৯৩ ভাগের বেশি এবং অগ্নিনিরোধক বোর্ড স্থাপনের কাজ শতকরা সাতষট্টি ভাগ শেষ হয়েছে।

 

টানেলের দ্বিতীয় টিউবটির খনন কাজ ১২ ডিসেম্বর ২০২০ এ আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী। পরের বছর আক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে খনন কাজ শেষ হয়। বর্তমানে এ টিউবের ভেতরের কাঠামোর কাজ চলছে। এরই মাঝে পেভমেন্ট স্ল্যাব এর কাজ শতকরা সাতানব্বই ভাগের বেশি এবং অগ্নিনিরোধক বোর্ড স্থাপনের কাজ ছিয়ানব্বই ভাগ শেষ হয়েছে। এছাড়া ডেকোরেটিভ বোর্ড স্থাপনের কাজ শেষ হয়েছে। ইতিমধ্যে আনোয়ারা প্রান্তে সাতশ সাতাশ মিটার ওভার ব্রিজ নির্মাণ কাজ শতভাগ শেষ হয়েছে। উভয় প্রান্তে প্রায় সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার এপ্রোচ সড়কের কাজ প্রায় শেষপ্রান্তে। পুনর্বাসন কার্যক্রমের আওতায় টানেল নির্মাণে উভয়প্রান্তে দুই হাজার তিনশত পনেরো জন ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি মালিকের মাঝে অতিরিক্ত মঞ্জুরিসহ তিনশত বারো কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে।

 

বর্তমানে কর্ণফুলী টানেল নির্মাণ প্রকল্পে দুইশ সাতাশ জন চীনা নাগরিক এবং প্রায় এগারোশ’ বাংলাদেশী নাগরিক কাজ করছেন। চট্টগ্রাম বাংলাদেশের প্রধান বন্দরনগরী এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। কর্ণফুলী নদী চট্টগ্রাম শহরকে দুটি ভাগে বিভক্ত করেছে। নদীর একপাশে রয়েছে শহর ও বন্দর এবং অপরপাশে ভারী শিল্প এলাকা। শহরের দুটি অংশ প্রথম ও দ্বিতীয় কর্ণফুলী সেতু বা শাহ আমানত সেতু দ্বারা সংযুক্ত, যা চট্টগ্রাম বন্দর হতে যথাক্রমে সাড়ে নয় কিলোমিটার ও একুশ কিলোমিটার উজানে অবস্থিত। কর্ণফুলী নদীর গঠন ব্যবস্থা, প্রবাহ ও তলদেশের পলি এবং জাহাজ চলাচলের সুব্যবস্থার বিষয় বিবেচনায় রেখে সরকার বন্দরের কাছাকাছি কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করে।

 

চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি। বীর চট্টলার উন্নয়নে শেখ হাসিনা সরকার সবসময় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে আসছে। চট্টগ্রামের সাথে পার্বত্য জেলাসমূহ এবং পর্যটননগরী কক্সবাজারকে ঘিরে ব্যাপকভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে সরকার। এ পরিকল্পনার আওতায় মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল, কর্ণফুলীর ওপাড়ে কোরিয় ইডিজেড, কক্সবাজারের মাতারবাড়ি বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ অন্যান্য প্রকল্প দেশের অর্থনীতিতে আগামী দিনে সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মুক্ত করতে যাচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়ন এবং এর সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে।

 

এসব উন্নয়ন পরিকল্পনার সাথে সড়ক যোগাযোগ অবকাঠামোর রয়েছে নিরবচ্ছিন্ন সম্পর্ক। সে লক্ষ্যে নির্মাণাধীন কর্ণফুলী টানেল ঢাকার সাথে চট্টগ্রাম হয়ে কক্সবাজারের সংযোগকে আরো গতিময় এবং সাশ্রয়ী করে তুলবে। পাশাপাশি ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে আরো কিছু উদ্যোগ নিয়েছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। টানেলের আনোয়ারা প্রান্ত হতে ওয়াই জংশন পর্যন্ত মহাসড়ক ধীরগতির যানবাহনের জন্য পৃথক সার্ভিস লেনসহ ছয়লেনে উন্নীত করার কাজ শেষ হয়ে এসেছে। এছাড়া চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক সার্ভিসলেনসহ ছয়লেনে উন্নীতকরণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। মিরসরাই হতে কক্সবাজার পর্যন্ত মেরিনড্রাইভ নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। পটিয়া শহরের যানজট নিরসনে বাইপাস নির্মাণ করা হয়েছে।

 

কক্সবাজার লিংকরোড হতে লাবনী পয়েন্ট পর্যন্ত মহাসড়ক চারলেনে উন্নীতকরণ কাজ শেষ হয়েছে। এর আগে অক্সিজেন হতে হাটহাজারী সড়ক ডিভাইডারসহ প্রশস্ত করা হয়েছে। চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি সড়কের হাটহাজারি হতে মানিকছড়ি পর্যন্ত সড়ক প্রশস্তকরার কাজ শেষ হতে চলেছে। চট্টগ্রাম-রাঙ্গামাটি সড়কের হাটহাজারি-রাউজান অংশ চারলেনে উন্নীতকরণ কাজও শেষপ্রান্তে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে পটিয়া সেতু, চন্দনাইশে মাজারপয়েন্ট সেতু, দোহাজারি এলাকায় সাঙ্গু সেতু এবং চকরিয়ায় মাতামুহুরী সেতুর নির্মাণ কাজ শেষ হতে চলেছে। শেষ হয়েছে ফটিকছড়ি-হেঁয়াকো সড়ক উন্নয়ন কাজ।  সড়ক অবকাঠামো উন্নয়নে গৃহীত এবং বাস্তবায়িত কার্যক্রম বদলে দিবে বৃহত্তর চট্টগ্রামের দৃশ্যপট। আনোয়ারা, বাঁশখালী, পটিয়া এলাকায় বিশেষ করে নদীর ওপাড়ে সম্প্রসারিত হবে মহানগরী। গড়ে উঠবে শিল্পকলকারখানা এবং আবাসন ব্যবস্থা।

 

একদিকে ব্যবসা বাণিজ্যের সম্প্রসারণ অপরদিকে পর্যটনশিল্পের বিকাশে বঙ্গবন্ধু টানেল রাখবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। রাজধানী ঢাকার সাথে চট্টগ্রাম কক্সবাজার হয়ে টেকনাফ পর্যন্ত গড়ে উঠবে নিরবচ্ছিন্ন সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা।

আধাঘণ্টার দূরত্বের জন্য আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবেনা। অচিরেই অপেক্ষার পালা শেষ হতে চলেছে সাজ্জাদ হোসেন এবং তোফাজ্জল আলীর মতো অসংখ্য মানুষের। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল নির্মাণের ফলে চট্টগ্রাম শহর চীনের সাংহাই নগরীর মতো ‘ওয়ান সিটি এন্ড টু টাউন’ মডেলে গড়ে উঠবে। ঢাকা-চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের মধ্যে আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ার পাশাপাশি এশিয়ান হাইওয়ের সাথে সংযোগ স্থাপিত হবে।

 

চট্টগ্রাম বন্দর ও প্রস্তাবিত গভীর সমুদ্রবন্দরের সুষ্ঠু কার্যক্রম ও ব্যবস্থাপনা সহজতর হবে। কর্ণফুলী নদীর পূর্ব প্রান্তের প্রস্তাবিত শিল্প এলাকার উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে এবং পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত চট্টগ্রাম শহর, বন্দর ও বিমানবন্দরের সাথে উন্নত ও সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপিত হবে। ফলে পূর্বপ্রান্তের শিল্প কারখানার কাঁচামাল ও প্রস্তুতকৃত মালামাল চট্টগ্রাম বন্দর, বিমানবন্দর ও দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে পরিবহন সহজ হবে। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং প্রবৃদ্ধিসহ উন্নয়নের অপার সম্ভাবনা তৈরি করবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্ণফুলী টানেল। বদলে যাবে বীরপ্রসবিনী চট্টগ্রাম এবং পার্বত্য এলাকাসহ পর্যটননগরী কক্সবাজার। উন্মুক্ত হবে সম্ভাবনার নতুন স্বর্ণদুয়ার। (পিআইডি ফিচার)

 

পূর্বকোণ/সাফা/পারভেজ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট