চট্টগ্রাম শনিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০২২

সর্বশেষ:

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২২ | ৮:৪৭ অপরাহ্ণ

অনলাইন ডেস্ক

বৈষম্যের পৃথিবীতে ক্ষুধার্ত মানুষের হাহাকার

বাংলাদেশ সবে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে নাম লেখালেও এটি এখনো একটি গরিব দেশ হিসাবেই পরিচিত। এখন পর্যন্ত দেশে প্রতি চারজন মানুষের একজন ক্ষুধার্ত থাকে। সেই হিসাবে বর্তমানে দেশে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা ৪ কোটির ওপরে।

এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৩ কোটি। করোনা মহামারির কারণে দারিদ্র্যে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ২ কোটি ৭০ লাখ মানুষ। এ সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা ৫ কোটি ৭০ লাখ! অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, বিশ্বে প্রতি ৯ জন মানুষের মধ্যে একজন মানুষ অভুক্ত অবস্থায় ঘুমায়। এ হিসাবমতে, পৃথিবীতে বর্তমানে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৮৯ কোটি। পৃথিবীতে ক্ষুধার সমান্তরালে যুক্ত হয়েছে পুষ্টিহীনতা। অর্থনৈতিক অন্য এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, পৃথিবীতে অপুষ্টিতে জর্জরিত মানুষের সংখ্যা আড়াইশ কোটি! এই যখন অবস্থা, তখন দেশে-বিদেশে খাদ্য ও অর্থ অপচয় রীতিমতো উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

 

আমাদের দেশে বিভিন্নভাবে বেহিসাব খাদ্য অপচয় হয়ে থাকে। অনেক মানুষের বাড়িতে খাবার উপচে পড়ে। অথচ তার পাশেই অসংখ্য বনি আদমের হাহাকারে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠছে। জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক সংস্থা ইউনেপ ২০২১-এর এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বছরে মোট খাদ্য অপচয় হয় ১ হাজার ৬০ কোটি কেজি! যা বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষের প্রায় ৪ বছরের খাবার! তার মানে হলো, দেশের এক বছরের অপচয়কৃত খাদ্য দিয়ে দেশ থেকে স্থায়ীভাবে ক্ষুধা দূর করা সম্ভব। এছাড়া সরকারের নানা প্রকল্প আছে, আছে রিলিফ ও নানা রকম ভাতা। কিন্তু দেশে তার সফল বাস্তবায়ন নেই।

জনগণ এসব ভাতার সুফল ভোগ করতে পারছে না। বিশেষজ্ঞরা প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় বাধা হিসাবে সংশ্লিষ্টদের দুর্নীতিকে দায়ী করেছেন। তারা মনে করেন, প্রকল্পে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও অবকাঠামোগত গলদ থাকে। ফলে যথাযথভাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন হয় না বিধায় ক্ষুধা দূরীকরণে বাংলাদেশ কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পায় না।

 

বর্তমান পৃথিবীকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পৃথিবী বলা হয়। বিগত ৫০ বছরে বিজ্ঞান অভাবনীয় সাফল্য এনে দিয়েছে। বিজ্ঞানের এ আবিষ্কার পৃথিবীকে মানুষের হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। বিজ্ঞানের আবিষ্কারের মাধ্যমে মানুষ ভূপৃষ্ঠকে জয় করতে সক্ষম হয়েছে। সাগর, মহাসাগর ও আকাশ-জগৎকে তারা করায়ত্ত করেছে। মহাশূন্যে তারা স্টেশন নির্মাণ করেছে। এসব আবিষ্কারে বিশ্ব মোড়লরা ব্যয় করেছে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে সবচেয়ে অপচয় ও ক্ষতিকর আবিষ্কার হলো মানববিধ্বংসী অস্ত্র নির্মাণ।

২০২১ সালে বিশ্বের পরমাণু অস্ত্রের পেছনে ব্যয় বেড়েছে ২০২০ সালের চেয়ে আটগুণ। অথচ পারমাণবিক অস্ত্র নির্মূল করতে গঠিত আছে ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্যাম্পেইন টু এবোলিশ নিউক্লিয়ার উইপনস’। কিন্তু শক্তিধর দেশগুলো এ নিষেধাজ্ঞাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলেছে। এ নিষেধাজ্ঞাকে অবজ্ঞা করে তারা প্রতিবছর আবিষ্কার করে চলেছে দেশবিধ্বংসী মারণাস্ত্র। আর এর পেছনে খরচ করছে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র এর পেছনে খরচ করছে ৪৪ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। চীন খরচ করেছে ১১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। রাশিয়া করেছে ৮ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। ব্রিটেন করেছে ৬ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। ফ্রান্স করেছে ৫ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার। ভারত করেছে ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। আর পাকিস্তান করেছে ১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার। আর এককভাবে উত্তর কোরিয়া করেছে ৬৪২ বিলিয়ন ডলার! সব মিলিয়ে ৯টি পারমাণবিক শক্তিধর দেশের এক বছরে অস্ত্র নির্মাণের ব্যয় ৭১৭ বিলিয়ন ডলার।

 

বাংলাদেশি টাকায় যার পরিমাণ হলো ৭১ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা; যা বর্তমান বাংলাদেশের ১২ বছরের বাজেটের সমান! উন্নত দেশগুলোয় অপচয়ের এই যখন চিত্র, ঠিক তখনই এক মুঠো অন্ন আর দুফোঁটা পানির অভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে লাখ লাখ বনি আদম। একটি বড় গোষ্ঠী যখন বিলাসে ব্যস্ত, প্রাচুর্য আর অপচয়ের উৎসবে যখন তারা মত্ত, ঠিক তখন তারই অদূরে শোনা যাচ্ছে ক্ষুধার্ত মানুষের হাহাকার। ধনাঢ্য পরিবারের একজন শিশুর বিনোদনের জন্য লক্ষ-কোটি টাকাও যেখানে যথেষ্ট মনে হচ্ছে না, সেখানে পূর্ব আফ্রিকার একদল কঙ্কালসার শরীরের শিশু এক ঢোক পানি আর একটা রুটির জন্য তীর্থের কাকের মতো তাকিয়ে থাকে। ভাবতে লজ্জা লাগে, সভ্যতার এ উৎকর্ষের মধ্যেও পৃথিবীর চল্লিশ শতাংশ মানুষ এখনো ক্ষুধার্ত! বিশাল এ জনগোষ্ঠী ক্ষুধায় কাতর এবং পুষ্টিহীনতায় ক্লিষ্ট। তাদের চারপাশে শুধুই অভাব-অনটন আর ক্ষুধা-তৃষ্ণার পাহাড়। বাংলাদেশ এ ক্ষুধা-তৃষ্ণার বৃত্ত থেকে আজও বের হতে পারেনি। বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান মোটেই সন্তোষজনক নয়। বিশ্ব ক্ষুধা সূচক ২০২১ অনুযায়ী, ১১৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৭৬তম।

 

সূচকের স্কোর অনুযায়ী, বাংলাদেশে ক্ষুধার মাত্রা গুরুতর পর্যায়ে রয়েছে। অবশ্য ২০২০ সালের তুলনায় বাংলাদেশে এ সূচকের উন্নতি ঘটেছে। গোটা বিশ্বের ক্ষুধার সূচকে প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় আমাদের উন্নতি হচ্ছে; কিন্তু আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বাংলাদেশের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। দেশে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা কিছুতেই কমছে না। উলটো অনাহার ও খাদ্যের হাহাকার বাড়ছে। পিপিআরসির জরিপ অনুযায়ী, দেশের জনসংখ্যার ৪৩ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। গরিব মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭ কোটির বেশি। সিপিডির মতে, দেশে দারিদ্র্যের হার ৩৫ শতাংশ এবং দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা ৫ কোটি ৭৭ লাখের বেশি। আর এসব মানুষ ক্ষুধার্ত জনতার অন্তর্ভুক্ত।

আমরা ঢাকঢোল পিটিয়ে উন্নয়নের বাজনা বাজাচ্ছি। আমরা ঢাকঢোল পিটিয়ে দেশের উন্নতি, অগ্রগতি ও প্রবৃদ্ধির কথা বলছি। কিন্তু গরিবের ঘরে ক্ষুধার তীব্রতার কথা বলছি না। সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করার পরও একটি ছেলের বেকার থাকার কথা বলছি না। আমরা সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে টাকা প্রদানের কথা বলছি। কিন্তু গরিবরা তা কেন পাচ্ছে না, এর কারণ বলছি না।

 

বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা ও মাতৃত্বকালীন ভাতা বিলানোর কথা বলছি, কিন্তু স্থানীয় দলীয় নেতার চুরি করার কথা বলছি না। মুক্তিযোদ্ধা ভাতা ও প্রতিবন্ধী ভাতার কথা বলছি, কিন্তু দালাল আর ধান্ধাবাজ নেতারা তা মেরে খাচ্ছে, এ কথা বলতে পারছি না। এটাই হলো আমাদের দেশের রাজনীতির ধারাবাহিক চিরন্তন চিত্র।

এভাবেই আসল সত্যিটা কালের গর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে। সত্য গোপন করে আজ আমরা উন্নয়নের ফানুস নিয়ে মিথ্যা আনন্দে গদগদ হয়ে পড়েছি। আমরা নানা আমোদ-আহ্লাদে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছি। কিন্তু আমাদের চোখে গরিবের সংকট ধরা পড়ে না। চোখে পড়ে না গরিব কৃষকের ঘামঝরা গল্প। খেটে খাওয়া মানুষের ক্ষুধা আর অনাহারীর আর্তনাদের ইতিবৃত্ত আমাদের নজরে আসে না। ফলে দেশ ক্ষুধামুক্ত হওয়ার পরিবর্তে ক্ষুধা বৃদ্ধি পাচ্ছে। গরিব আরও গরিব, আর লুটপাটকারী ধনীরা আরও ধনী হচ্ছে।

 

লন্ডনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ওয়েলথ-এক্সের প্রতিবেদন ২০১৮তে বলা হয়েছে, বিশ্বে আড়াইশ কোটি টাকার বেশি সম্পদের মালিক আছে এমন সংখ্যা বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি হারে বাড়ছে। ২০১৭ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে বাংলাদেশে এ সংখ্যা বেড়েছে ১৭ শতাংশ হারে; যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, ভারতসহ মোটি ৭৫টি বড় অর্থনীতির দেশকে পেছনে ফেলেছে বাংলাদেশ! এ সংস্থার ২০২০ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে রয়েছে আরেক চাঞ্চল্যকর তথ্য। সেখানে বলা হয়েছে, বিশ্বে গত এক দশকে ধনী ব্যক্তির সংখ্যা বৃদ্ধির হারে শীর্ষে থাকা দশটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান প্রথম।

বোঝা গেল, দেশে কোটিপতির সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পেলেও দারিদ্র্যের হার কমেনি। ফলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন একটি গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে। মানুষ মধ্যবিত্ত থেকে নিম্নমধ্যবিত্ত এবং নিুমধ্যবিত্ত থেকে নিুবিত্তে নেমে যাচ্ছে। একদিকে কিছু লোক অঢেল টাকার মালিক হচ্ছে, অন্যদিকে সিংহভাগ লোকের আয় কমে যাচ্ছে। এতে সমাজে বৈষম্য বেড়ে একধরনের সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি হচ্ছে। বৈষম্যের কারণে সমাজে ন্যায়বিচার ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে। তাদের বিত্তবৈভবে পিষ্ট হচ্ছে দেশের অধিকাংশ মানুষ। বৈষম্যের পৃথিবীতে দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে ক্ষুধার্ত মানুষের হাহাকার। তথ্যসূত্র: যুগান্তর

 

লেখক: ড. মো. কামরুজ্জামান, অধ্যাপক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

পূর্বকোণ/সাফা/পারভেজ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট