চট্টগ্রাম সোমবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২২

১৭ আগস্ট, ২০২২ | ৫:৪৭ পূর্বাহ্ণ

ডা. মো. সাজেদুল হাসান

চলমান বিশ্বমন্দা, মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানি তেলের সংকট এবং উত্তরণের উপায়

শতভাগ বিদ্যুতায়নের বর্ণিল উদযাপনের রেশ না ফুরাতেই দেশব্যাপী বিদ্যুতের হাহাকার। শুনেছি ভুতের পা নাকি উল্টোমুখী হয়, মনে হচ্ছে আমরাও তেমন উল্টো রথের যাত্রি। পৃথিবীতে যখন জ্বালানি তেলের দাম নিম্নমুখী এবং আরও দর পতনের সম্ভাবনা প্রবল তখন সরকার সর্বপ্রকার জ্বালানি তেলের দাম ৪২ থেক ৫১ শতাংশ বাড়িয়ে দিলো। বাংলাদেশই সম্ভবত পৃথিবীতে একমাত্র দেশ যেখানে কোনও উৎসবকালে ভোগ্যপণ্যের দাম জামিতিক হারে বৃদ্ধি পায়। অথচ পৃথিবীজুড়ে পালাপার্বনে সাধারণ মানুষ যেন একটু বেশি কেনাকাটায় উৎসবের আনন্দে শামিল হতে পারে সেজন্য থাকে নানাপ্রকার মূল্য ছাড়। এ দেশেই কোন আপত কিংবা সঙ্কটকালে কালোবাজারি মজুতদারি এবং মূল্যবৃদ্ধির মত অমানবিক চর্চায় আমরা তৃণমূল থেকে শীর্ষ ব্যবসায়ীদের অনৈতিক আচরণ প্রত্যক্ষ করি।
নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধির পাশাপাশি অকস্মাৎ জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি হলো, নিকট অতীতে গ্যাসের মূল্য সমন্বয় হয়েছে, বিদ্যুৎ আর ওয়াসা মুখিয়ে আছে কখন দাম বাড়ানোর সবুজ সংকেত পাবে। তারা আর লোকসান দিতে নারাজ, আমরা এটাকে মূল্য সমন্বয় বলে থাকি, সেবার মান বিবেচনায় তারা যদিও আঁচল দিয়ে মুখ লুকানোর মত। নাগরিক পরিষেবা প্রদানে ব্যর্থ হলে পদত্যাগ কিংবা পদচ্যুতি এটাই প্রতিষ্ঠিত প্রথা কিন্তু আমার জন্মভূমি এক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম। এখানে ব্যর্থ কর্মকর্তারাই বরং ক্ষমতাধর, উল্টো তাদের বেতন কিংবা আমরণ চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধির নজির প্রায়ই দৃশ্যমান। সভ্যদেশের স্বচ্ছল বিত্তবান মানুষ তাদের গচ্ছিত সম্পদ জনকল্যাণে অকাতরে দান করেন। বৃহদায়তন হাসপাতাল, দাতব্য প্রতিষ্ঠান তাদের অর্থে দরিদ্র্য ও অক্ষম মানুষের চিকিৎসাসেবায় সহায় হয় আর এই দেশের ধন্যাঢ্য গোষ্ঠী দেশের সম্পদ বিদেশে পাচার করেন। আবার আরেক শ্রেণি আছেন যারা ব্যাংকের ঋণ নিজসম্পদ জ্ঞান করে ফেরত প্রদানে অনীহা বোধ করেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে দেশের খেলাপি ঋণের পরিমাণ সোয়া লক্ষ কোটি টাকা, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এর মতে আড়াই লক্ষ কোটি টাকা আর কাঠখোট্টা অর্থনীতিবিদদের অনুমান এটি ৪ লক্ষ কোটি টাকার কম নয়। সূত্রমতে প্রতিবছর বাংলাদেশে হতে প্রায় ৭৫ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয় আর অর্থপাচারে আমরাই নাকি শীর্ষস্থানের অধিকারী। যাবতীয় সূচকে তলানিতে থাকলেও কোন কোন বিষয়ে আমরা প্রথম হওয়ার গৌরব করতে পারি।
খেলাপি ঋণ আর দুর্নীতির অর্জিত অর্থের প্রধান গন্তব্য কানাডা, সিঙ্গাপুর, দুবাই, মালয়েশিয়া, আর মরুভূমির বুকে স্বজনহারা শ্রমিক তার ঘামের বিনিময়ে ডলার পাঠায় দেশে, বস্ত্রবালিকাদের জীবন নিংড়ানো শ্রমে সৃষ্টি হয়েছে বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রাখাত। ফুলে-ফেঁপে ওঠে রিজার্ভ ডলার। অথচ কারা পায় শুল্ক ছাড়, ঋণ তফসিল, পুনঃতফসিল আর রাষ্ট্রের প্রণোদনা! এরাই এখন দেশের অর্থনীতির প্রধান নিয়ন্ত্রক। খেলাপি ঋণের চার লক্ষ কোটি টাকা দেশের বিনিয়োগ প্রবাহে সঞ্চালিত হলে তৈরি হতে পারত অসংখ্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, সৃষ্টি হতো নিত্যনতুন কর্মসংস্থান।
হয়তো ধান ভাঙতে গিয়ে শিবের গীত গাইলাম, কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে চলমান বিশ্বমন্দার ধাক্কায় টলমল অর্থনৈতিক সংকট থেকে আমাদের উত্তরণের উপায় কি? ক্রমপুঞ্জিভুত অনৈতিকতা আর অব্যবস্থাপনার দায় এখন মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত ও দরিদ্র জনগণের ওপর ভর করেছে। বোঝাই যাচ্ছে চলমান সংকটের সহসা অবসান হচ্ছে না। কোভিড মহামারী আর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে সৃষ্ট মন্দা দিনদিন গভীর হচ্ছে। এ দেশগুলোই বিশ্বের খাদ্য ও জ্বালানির প্রধান যোগানদাতা। আর বাংলাদেশের জ্বালানি প্রায় পুরোটাই আমদানিনির্ভর। খাদ্যনিরাপত্তায় আমিষে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও আমরা দানাদার শস্য চাল-গম, চিনি, ডাল, তেল বীজের জন্য বৈদেশিক সরবরাহের মুখাপেক্ষী। অথচ এর প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা অর্জন সম্ভব ছিল। শুধু প্রয়োজন হতো সরকারের সঠিক পরিকল্পনা, নীতি সহায়তা আর প্রযুক্তির প্রসার। এই দেশের কৃষক-শ্রমিক অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলতে পারেন। তার উজ্জ্বল উদাহরণ মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে বৈপ্লবিক উত্থান। ফলমূল ও সবজি উৎপাদনের ক্ষেত্রেও এই কথা অনায়াসে বলা যায়।
আমাদের জ্বালানি ও খাদ্যনিরাপত্তা বিধানে বৈদেশিক নির্ভরতা হ্রাস এর কোন বিকল্প নেই। সেটি অর্জনে আশু কর্তব্য হলো কৃষিখাতকে সর্ব্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া। তার জন্য স্বল্পমেয়াদে করণীয় হচ্ছে-
১. জ্বালানী, সার ও কীটনাশক খাতে ভর্তুকি। ২. উন্নত বীজ উৎপাদন ও সরবরাহ। ৩. অঞ্চলভিত্তিক ফসল উৎপাদনের বর্ষপঞ্জী। ৪. কৃষকবান্ধব বিপণন ব্যবস্থা। ৫. কারিগরি সহায়তা ও মাঠপর্যায়ে তদারকি। আর দীর্ঘমেয়াদে কৃষিশিক্ষা ও গবেষণা। নতুন কোন কথা নয়, তবে এ কথাগুলিই বারেবারে বলা দরকার।
জ্বালানি নিরাপত্তায় স্বল্পমেয়াদে তেল, গ্যাস, বিদ্যুতের সাশ্রয়ী ব্যবহারের উপর জোর দিতে হবে। সাময়িকভাবে এটি জনঅসন্তোষ সৃষ্টি করলেও সরকারকে এই অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নিতেই হবে। সেই ক্ষেত্রে করণীয় হরেচ্ছ- ১. রুটিন করে বিদ্যুতের লোডশেডিং। ২. দিনের আলোর সর্ব্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিতকল্পে অফিস-আদালতের সমযসূচি সকাল ৮টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত নির্ধারণ। ৩. ঔষধ ও খাদ্যের দোকানের মত অত্যাবশ্যকীয় সেবা ছাড়া সকল দোকানপাট, শপিংমল সন্ধ্যা ৭টার পর বন্ধ। ৪. বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস ও জ্বালানি তেলের সাশ্রয়ী ব্যবহারে জনসচেতনা সৃষ্টির জন্য অব্যাহত প্রচার।
দীর্ঘমেয়াদে সম্ভাব্য সকলপ্রকার শক্তির উৎস সন্ধানে সর্বশক্তি নিয়োজিত করা প্রয়োজন। গ্যাস অনুসন্ধানের স্থবির খনন কাজ সচল করতে হবে। আমরা সমুদ্র বিজয় করলাম কিন্তু সুনীল অর্থনীতির দ্বার উম্মোচন করতে পারলাম না। অথচ প্রতিবেশী মিয়ানমার ভারত এইক্ষেত্রে অনেক দূর অগ্রসর। দীর্ঘ এক যুগেও ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড ২ (ইআরএল-২) প্রকল্পটি অনুমোদনের মুখ দেখছেনা কিন্তু প্রকল্পের অনুমিত প্রাক্কলন ইতোমধ্যে ৬ হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। সুবিধাভোগী প্রভাবশালীদের চাপেই নাকি এই অনুমোদন প্রক্রিয়া বিলম্বিত হচ্ছে বলে গুঞ্জন আছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বছরে ৩ হাজার কোটি টাকা জ্বালানি খাতে সাশ্রয় হতো বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যা বৈদেশিক মুদ্রার উপর বিশাল চাপ কমাতে পারত।
জ্বালানি ও খাদ্যবস্তুর আন্তর্জাতিক বাজার নানামুখী ষড়যন্ত্রে অস্থির। নব্য উপনিবেশবাদ এখন দেশ দখল নয়, বাজার দখলে লিপ্ত। আমাদের যতোটা সম্ভব আমদানিনির্ভরতা কমাতে হবে, বিলাসী ভোগ্যপণ্যের উপর পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করতে পারলেও অন্তত উচ্চ শুল্ক নির্ধারণ করলে আমাদানি নিরুৎসাহিত হবে। তারপরও কথা থেকে যায়। ঋণখেলাপী আর অর্থ পাচারকারীদের কঠোর হস্তে দমন না করতে পারলে সব আয়োজন ভেস্তে যাবে। লাভের গুড় সব পিপঁড়ায় খেয়ে ফেললে সাধারণ জনগণের কপালে ভোগান্তি ছাড়া আর কিছু নেই। সৃষ্টিকর্তার কাছে এই প্রার্থনা করি আমাদের তেমন কোনো করুণ পরিণতি যেন না হয়।

ডা. মো. সাজেদুল হাসান
বাংলাদেশ সরকারের সাবেক অতিরিক্ত সচিব

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট