চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ০৯ আগস্ট, ২০২২

সর্বশেষ:

২৬ জুন, ২০২২ | ৭:০১ অপরাহ্ণ

আগের এবং পরের অবস্থার পরিবর্তন হলে নিজেই বুঝবেন হজ কবুল

সামর্থ্যবান মুসলিমদের জীবনে একবার হজ পালন ফরজ। এর পরের হজ নফল হজ হিসেবে গণ্য হবে। জীবনে একবার ওমরা করা সুন্নাত। এরপর বারবার করতে চাইলে তা মুস্তাহাব হিসেবে গণ্য হবে। আল্লাহপাক এর নির্দেশ পালনের জন্য হজ। কামারের হামানদিস্তা যেমন লোহার মরিচা দূর করে, ঠিক তেমনি হজ মানুষের গুনাহ এবং ময়লা দূর করে। তাই হজকে গুনাহ মাফের কারণ বলা হয়েছে। মকবুল হজের একমাত্র ফল জান্নাত। হজ ফরজ হওয়া সত্বেও যারা পালন করেননি। তাদের বেইমান হয়ে মৃত্যুর আশংকা রয়েছে। কারণ যেখানে ইসলামের একটি মৌলিক স্তম্ভ থাকবে না সেখানে ইমান দুর্বল হয়ে যাবে।

পবিত্র আল কোরআনে আল্লাহপাক হজ ও ওমরাকে ইসলামের প্রতীক হিসেবে ঘোষণা করেছেন। অনেকে মনে করেন ৫-৬ লাখ টাকা খরচের কারণে সংকট হবে। কিন্তু কোরআন-হাদীসে রয়েছে হজ ও ওমরা পালনে মানুষের রিজিকে বরকত হয়। আয়-রোজগার আরো বাড়বে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। একবার মহানবী মুহাম্মদ (সা.) এর কাছে ইমানদারেদের প্রশ্ন ছিল, জাহেলি যুগে এখানে মূর্তি ছিল। আমরা এখানে তওয়াফ করতে পারি কিনা? তখন মুহাম্মদ (সা.) বলেন, কোন অসুবিধা নেই। আগে মূর্তি থাকলেও এখন নেই। তাই তাওয়াফ ও সাহী করতে কোন অসুবিধা নেই।

স্বামীর টাকার কারণে মহিলাদেরও হজ ফরজ হয়। নিজের সম্পদ এবং মোহরের কারণেও হজ ফরজ হয়। এবং মহিলার মাহরম বিহীন হজ করা জায়েয নেই। মাহরম বিহীন হজ ফরজ আদায় হয়ে যাবে, কিন্তু কবুল হবে না। মহিলারা মাসিক অবস্থায় সেখানে হজ করতে যেতে পারবেন। কাবা শরীফ তওয়াব ও নামাজ ছাড়া সব করতে পারবেন। ইহরাম মাসিক অবস্থায় বাঁধা যায়। তওয়াব করা নামাজ পড়া যাবে না কারণ তওয়াব ও নামাজ হবে মসজিদে। মসজিদে মাসিক অবস্থায় মহিলা প্রবেশ নিষেধ। এই দুটি ছাড়া বাকি সব কাজ করতে পারবেন। সাফা-মারওয়া সাহী করতে পারবেন। মিনায় অবস্থান, পাথর মারাসহ সব কাজ তাদের জন্য বৈধ। মাসিক মুক্ত হওয়া পর্যন্ত তওয়াফ করার জন্য অপেক্ষ করবেন। অন্য কাজগুলো সেরে নেবেন। ১০ থেকে ১২ তারিখের মধ্যে তওয়াব করা ওয়াজিব। কিন্তু ওজরের কারণে পরে হলেও অসুবিধা নেই।

হজের ফরজ ৩টি:- ইহরাম বাঁধা, আরাফার ময়দানে অবস্থান ও তওয়াফে জিয়ারাত। এরমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো আরাফার ময়দানে অবস্থান করা। আরাফার ময়দানে যেতে না পারলে হজ বাতিল হবে। এহরাম বাঁধার পর স্ত্রী সহবাস করলেও হজ বাতিল হবে। আবার হজ করতে হবে। এহরামের পর দ্বিতীয় ফরজ হলো আরাফাহ। তৃতীয় হলো তওয়াফ। হজে আগে গেলে অনেকে মদীনার কাজ সেরে আসে। কেউ যদি প্রথম জিদ্দায় গিয়ে মদীনায় যাওয়ার নিয়ত করলে তাহলে এহরাম বাঁধতে হবে না। সিভিল পোশাকে জেদ্দায় গিয়ে সেখান থেকে মদীনায় গিয়ে আসার সময় এহরাম বাঁধবেন। কিন্ত সরাসরি জেদ্দা থেকে মদীনায় না গিয়ে মক্কার নিয়ত করলে তখন এহরাম আগে থেকে বেঁধে যেতে হবে। না হলে এহরাম সহীহ হবে না। মদীনার যাওয়ার ইচ্ছা হলে এহরাম না বাঁধতে পারবেন।
হজের ওয়াজিব ৮ টি :- মিকাত থেকে ইহরাম বাঁধা, যে মীকাতের ভেতরের অধিবাসী সে নিজ বাড়ি হতে ইহরাম বাঁধবে। এমনকি মক্কাবাসীরা মক্কা হতেই ইহরাম বাঁধাবে। সূর্য অস্ত যাওয়া পর্যন্ত আরাফাতে অবস্থান করা। আরাফার দিন শেষে ঈদের রাত ফজর পর্যন্ত মুযদালিফায় অবস্থান করা যতক্ষণ আকাশ প্রস্ফুটিত না হয়। তবে নারী ও দুর্বল পুরুষদের জন্য মধ্য রাতের পর মুযদালিফা ত্যাগ করা বৈধ আছে। ১১, ১২ ও ১৩ তারিখের রাত্রিগুলো মিনায় কাটানো। আইয়ামে তাশরিকের দিনগুলোতে শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করা: ঈদের দিনে সর্বশেষ বড় পাথর মারার স্থানে পাথর নিক্ষেপ করে মাথার চুল মুণ্ডন করা। হজের কোরবানি করা। সবার জন্য বিদায়ী তাওয়াফ করা। ৯ থেকে ১৩ তারিখ ৫দিনের মধ্যে হজের মৌলিক কাজ সম্পন্ন হয়।

মদীনায় যাওয়া কিংবা মদীনায় জিয়ারত করা এটি হজের কোন অংশ নয়। তবে এটি মহব্বতের অংশ, ঈমানের অংশ। রাসূলের সুপারিশ পাওয়ার জন্য মতব্বতের অংশ হিসেবে মদীনায় যাওয়া। তাই যারা হজ করতে যান, সবাই মদীনায় যান। আর যারা স্থানীয় তারা মদীনায় যান না। তারা অন্য সময় যান । কারণ হজের সাথে এর যোগসূত্র নেই। মদীনায় জিয়ারত করা এটি আলাদা ইবাদাত। এখানে বাইরে থেকে যারা যান ৮দিন থাকার চেষ্টা করেন।

হাদীসে এসেছে, মুহাম্মদ (সা) বলেছেন, যারা মদীনায় গিয়ে ৪০ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করবে গুনাহ থেকে পবিত্র হবে। কবরের আজাব এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তির সনদ পাবেন । তাই এই ৮দিন ৪০ ওয়াক্ত নামাজ মসজিদে নববীতে ইমামের পেছনে জামায়াতের সাথে পড়া গুরুত্বপূর্ণ। কারন তার আমল এবং ইমানের অবস্থা পরিবর্তন হয়ে যায়। মদীনা শরীফে আছে মসজিদে কুবা। এটি মুহাম্মদ (সা) নির্মাণ করেছেন। তিনি দুটি মসজিদ নির্মাণ করেন মসজিদে নববী ও মসজিদে কুবা।

রাসূল (সা) বলেছেন, যারা মসজিদে কুবায় এসে ২ রাকায়াত নামাজ আদায় করবেন আল্লাহপাক তাঁর আমলনামার মধ্যে একটি ওমরাহ আদায়ের সওয়াব দেবেন। সুবহানাল্লাহ। তাই সেই কারণে ২ রাকায়াত নামাজ আদায় করা হয়। মদীনা শরীফে ওহুদের পাহাড় দেখতে যায়। যেখানে হাজার হাজার সাহাবায়ে কেরাম শুয়ে আছেন। বিশেষ করে ওহুদ যুদ্দের ৭০ জন সাহাবী রয়েছেন । এবং শহীদদের নেতা হামজা (রা) এর কবর সেখানে রয়েছে।

মদীনা শরীফের মধ্যে এমন একটি জায়গা আছে সেটি বেহেস্তের বাগান। দুই রাকায়াত নামাজ আদায় করা সুন্নাহ এবং বরকতময়। রাসূল (সা) ঘর এবং মিম্বরের মাঝখানের স্থানটি জান্নাতের টুকরা। তখন ঘর ছিল এখন ওই ঘর রাসূলের রওজা হয়ে গেছে। কারণ নবীকে দাফন করে ঘর বানানো হয়নি। ঘরের ভেতর দাফন করা হয়েছে। সেই কারণে রাসূলের রওজা এবং মিম্বরের মাঝখানের স্থানকে জান্নাতের টুকরা বলা হয়। তাঁর রওজার পাশে আয়েশা (রা) এর কক্ষ। তাঁর এক হাত পরে আবু বক্কর (রা) এর কবর। ওমর (রা) এর কবরও একই জায়গায়। তারা ধারাবাকিভাবে শুয়ে আছেন। তাদের সকলের মাথা পশ্চিম দিকে। আর পা হলো পূর্বদিকে। জেয়ারত করতে হয় দক্ষিণ দিক দিয়ে। কারণ আমাদের কেবলা পশ্চিমদিকে। মদীনাবাসীর কেবলা হলো দক্ষিণদিক।

পরস্পর তিনটি ছিদ্র আছে প্রথম ছিদ্র বরাবর মহানবী (সা) এর চেহারা মোবারক, দ্বিতীয় ছিদ্র বরাবর আবু বক্কর (রা) এর চেহারা মোবারক, তৃতীয় ছিদ্র বরাবর ওমর (রা) এর চেহারা মোবারক। এসব ছিদ্র দিয়ে সালাম জানাতে হয়। নবী বলেন, যারা আমার কাছে এসে সালাম দেয় আমি তাদের সালাম শুনি এবং তার উত্তর দিই। যারা দূর থেকে যারা সালাম দেয় বা দরুদ পেশ করে আল্লাহপাক স্পেশাল দুটি ফেরেশতা রেখেছেন, তারা আমার রওজায় তা পৌঁছে দেয়, আমি তার উত্তর দিই। সুবহানাল্লাহ। “আসসালাতু আসসালা মুআলাইকা ইয়া রাসূলুল্লাহ, আসসালাতু আসসালা মুআলাইকা ইয়া হাবিবুল্লাহ, আসসালাতু আসসালা মুআলাইকা ইয়া রাহমাতাল্লুল আলামীন”।

মক্কায় অসংখ্য জিয়ারতের স্থান আছে। মানুষ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান জিয়ারত করে। মক্কা শরীফে জান্নাতুল মহল্লা কবর স্থান দেখতে যায়। যেখানে অসংখ্য সাহাবায়ে কেরাম শুয়ে আছেন। সেই কবরগুলো জেয়ারত করতে যায়। হজ ও ওমরা মানুষের ইমানকে জাগ্রত করে। ইমান বৃদ্ধি করে। তাই প্রত্যেক মুমিনের উচিত একবার হলেও হজ পালন করা। বিশেষ করে বিত্তবানদের অবশ্যই হজ পালন করা উচিত। এতে করে ইমান তাজা হয়। হজ মকবুল হলে একমাত্র প্রতিদান জান্নাত।

আপনার হজ আল্লাহর দরবারে কবুল হলো কিনা কিভাবে বুঝবেন। নিদর্শন হলো হজ করে আসার পর আপনার অবস্থার যদি পরিবর্তন হয়, তখন বুঝবেন আপানার হজ কবুল হয়েছে। আপনি আগে দাঁড়ি রাখেননি, আসার পর দাঁড়ি রেখেছেন। আগে নামাজ পড়তেন না, এখন নামাজ পড়ছেন। আগে রোজা রাখতেন না, এখন রোজা রাখছেন। আগে মানুষের হক নষ্ট করেছেন, এখন আদায় করছেন। আগে পাপে নিমজ্জিত ছিলেন, এখন পাপ বর্জন করছেন। আপনার আগের অবস্থা এবং পরের অবস্থায় যদি পরিবর্তন হয় বুঝতে পারবেন আপনার হজ আল্লাহর দরবারে কবুল হয়েছে। আর হজ আল্লাহর দরবারে কবুল না হলে আপনি হজের আগের অবস্থায় থাকবেন। তখন আপনাকে বুঝে নিতে হবে আপানর হজ আল্লাহর দরবারে কবুল হয়নি। কারন হজ কবুল হলে আপনার নিষ্পাপ হওয়ার কথা। কিন্তু তারপরও অবস্থার পরিবর্তন না হলে বুঝতে হবে কোথাও না কোথাও ত্রুটি আছে। তাই হজ আমরা গুরুত্ব সহকারে আদায় করবো। তাই অবহেলা না করে যে কোন মুহূর্তে মৃত্যু হতে পারে আমরা এখন থেকে হজ পালনের নিয়ত করে নিই।

অবশ্য আল্লাহপাক বলেন: যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হজ করবে। প্রত্যেক কাজ হবে আল্লাহর জন্য। গুণাহর কাজ থেকে বিরত থাকবে। আল্লাহপাক তার হজ্ কবুল করবেন। ফলে বান্দা-বান্দির পেছনের সমস্ত গুণাহ মাফ করে আল্লাহ তাদের নিষ্পাপ হিসাবে দেশে ফেরত পাঠাবেন। আল্লাহতায়ালা সবাইকে মকবুল হজ্ব নসীব করুন।

লেখক: নাসির উদ্দিন, ব্যুরোচিফ, বাংলাভিশন, চট্টগ্রাম

 

পূর্বকোণ/মামুন/পারভেজ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট