চট্টগ্রাম বুধবার, ০৬ জুলাই, ২০২২

সর্বশেষ:

২১ জুন, ২০২২ | ৩:২১ পূর্বাহ্ণ

এক আলোকবর্তিকার প্রস্থান

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, নারী-উন্নয়নের অগ্রদূত ও সমাজকর্মী, কুমিল্লার শিক্ষা ও সামাজিক অঙ্গনে সর্বজনশ্রদ্ধেয় মিসেস শরিফুন্নেছা আহমেদ গত ১৫ই জুন ঢাকার নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের জরুরী বিভাগে নেয়ার পথে ইন্তেকাল করেছেন। অসুস্থতার জন্য গত কয়েক বছর সমাজজীবনের অন্তরালে থাকলেও দীর্ঘদিন তিনি কুমিল্লায় শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সমাজকর্মে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। তিনি আজ থেকে প্রায় ৮১ বছর আগে কুমিল্লা জেলার চান্দিনা থানার প্রত্যন্ত কংগাই গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মরহুম আমিন উদ্দিন সরকার ১৯১৯ সালে কলিকাতা বোর্ডের অধীনে প্রথম শ্রেণিতে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় পাশ করেন এবং ভারতীয় সিভিল সার্ভিসে ডাক বিভাগে চাকুরির সুযোগ পান। কিন্তু গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে হবে বলে সে চাকরিতে যোগ না দিয়ে গ্রামেই হোমিওপ্যাথি প্র্যাকটিস শুরু করেন। শরিফুন্নেছা আহমেদ ছিলেন সাত ভাই বোনের মধ্যে ষষ্ঠ। তিনি তাঁর বাবার মেধা ও প্রজ্ঞার উত্তরাধিকার পেয়েছিলেন। তিনি চাঁদপুর লেডি প্রতিমা গার্লস স্কুল থেকে প্রথম শ্রেণিতে মেট্রিক পাস করেন। সেবছর সমগ্র চাঁদপুর মহকুমা থেকে ছেলে ও মেয়েদের মধ্যে তিনিই একমাত্র প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন, যা তখনকার পত্রিকায় ছবিসহ ছাপা হয়েছিল। পরবর্তীকালে টাঙ্গাইলের কুমুদিনি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। তারপর তিনি ময়মনসিংহ শিক্ষক প্রশিক্ষণ মহাবিদ্যালয় থেকে বিএড পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে উত্তীর্ণ হন এবং শিক্ষকতাকে জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন। টাঙ্গাইলের ভারতেশ্বরী হোমসে শিক্ষকতার মাধ্যমে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। তাঁর স্বামী মরহুম আজগার আহমেদ তখন চট্টগ্রামে রেলওয়েতে কর্মরত ছিলেন। স্বামীর কর্মস্থলে থাকার জন্য তিনি ভারতেশ্বরী হোমসের চাকুরি ছেড়ে চট্টগ্রামের পাহাড়তলী গার্লস স্কুলে যোগ দেন প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে। তাঁর মতো তরুণ বয়সে প্রধান শিক্ষিকা নিয়োগপ্রাপ্তি সে সময় খুব বেশি একটা ঘটেনি।
১৯৬৮ সালে আজগার আহমেদ-শরিফুন্নেছা দম্পতি মাটির টানে নিজ শহর কুমিল্লায় চলে আসার সিদ্ধান্ত নেন। একজন রেলওয়ের আকর্ষণীয় চাকরি ছেড়ে যোগ দিলেন কুমিল্লা পৌরসভার নগরশুল্ক সুপারিনটেন্ডেন্ট হিসেবে আরেকজন যোগ দিলেন লুৎফুন্নেসা স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে। সেই স্কুলের ছাত্রী সংগ্রহের জন্য তিনি বাড়ি বাড়ি গিয়েছেন। কুমিল্লার একটি পশ্চাদপদ জনপদে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে সন্তান প্রসবের কয়েক দিনের মাথায় রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে তিনি ছাত্রীদের বাড়ি বাড়ি গিয়েছেন, তাদের অভিভাবকদের সম্মতি আদায় করেছেন, স্কুলের পরিধি বাড়িয়েছেন। ৬৯ এর গণ-আন্দোলনের জোয়ার তখন সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। শরিফুন্নেসা উপলব্ধি করলেন শুধু শিক্ষকতা দিয়েই জাতির প্রতি তাঁর সমুদয় দায়িত্ব পালন করা হবে না। জাতি তখন স্বাধীকার থেকে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জিবীত। তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনকে বেগবান করতে আওয়ামী লীগে যোগ দিলেন এবং কুমিল্লা জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদিকা নির্বাচিত হলেন। ’৭০ সালের নির্বাচনকে সামনে রেখে তিনি তাঁর অসাধারণ বাগ্মী প্রতিভায় কুমিল্লার নারীসমাজকে সংগঠিত করেন এবং তাদের এক বিরাট অংশকে আওয়ামী লীগের পতাকাতলে সমবেত করতে সক্ষন হন।
বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে তিনি প্রাদেশিক পরিষদের সংরক্ষিত মহিলা আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য আওয়ামী লীগের মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন। কিন্তু প্রাদেশিক পরিষদের সংরক্ষিত আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার আগেই মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে আওয়ামী লীগের হাই কমান্ডের নির্দেশে জেলায় জেলায় বেসামরিক প্রতিরক্ষা (সিভিল ডিফেন্স) ট্রেনিং শুরু হয়। তিনি তখন কুমিল্লা শহরের ২৪টি ট্রেনিং সেন্টারের তত্বাবধায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি কুমিল্লা জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী নির্বাচিত হন। কিন্তু তখন উপলব্ধি করেন রাজনীতি ক্রমশই পঙ্কিলতার আবর্তে নিমজ্জিত হচ্ছে। তিনি যে উদ্দেশ্যে (স্বাধীনতা সংগ্রাম) রাজনীতিতে যোগ দিয়েছিলেন সে উদ্দেশ্যও তখন অর্জিত হয়ে গেছে। তাই তিনি ১৯৭৪ সালে রাজনীতি থেকে অবসর নেন। অবশ্য ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের সময় দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধ গণকমিটি গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন এবং প্রবীনদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেয়ার লক্ষে বয়স্ক শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। ৭০ দশকের মাঝামাঝি তিনি লুৎফুন্নেসা স্কুল ছেড়ে শৈলরাণী বহুমুখি বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে যোগ দেন এবং পরবর্তীকালে ফয়জুন্নেসা সরকারী বালিকা বিদ্যালয়ে ইংরেজীর শিক্ষিকা হিসেবে যোগদেন এবং সেখান থেকেই অবসর নেন। তিনি কুমিল্লা বোর্ডের ইংরেজির প্রধান পরীক্ষক ছিলেন। তাঁর শতশত ছাত্রী আজ সমাজজীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত, অনেকেই সাফল্যের শিখরে আরোহন করেছেন। ৮০’র দশকের মাঝামাঝি এসে উনি তাঁর বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করে শিক্ষকতার পাশাপাশি হোমিওপ্যাথি প্র্যাকটিসের সিদ্ধান্ত নিলেন। দৃঢ়চেতা মানুষ। যে ভাবনা সে কাজ। চল্লিশোর্ধ বয়সে ১৯৮৭ সালে তিনি হোমিওপ্যাথি বোর্ডের ৪ বছরের কোর্সশেষ করে সার্টিফিকেট লাভ করেন এবং শিক্ষকতার পাশাপাশি বেশ কয়েক বছর প্র্যাকটিস করেন।
পেশাগত জীবন ছাড়াও সাংস্কৃতিক এবং সমাজকর্মের পরিম-লে তাঁর আলাদা একটি জীবন ছিল। তিনি বাংলাদেশ পরিবার পরিকল্পনা সমিতি, বাংলাদেশ এসোসিয়েশন ফর ভলান্টারি স্টেরিলাইজেশনসহ একাধারে ১৯টি সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের সভানেত্রী কিংবা সাধারণ সম্পাদিকার দায়িত্ব পালন করেন। সেই সাথে তিনি কুমিল্লা পূর্বাশা ও মধুমিতা কচিকাঁচার মেলার উপদেষ্টার দায়িত্বও পালন করেন। শুধু তাই নয়, ১৯৮৫ সালে তিনি কুমিল্লায় প্রথম স্পোকেন ইংলিশ কোর্স চালু করেন এবং পরবর্তী কয়েক বছর নিজে সেই কোর্স পরিচালনা করেন। তিনি কুমিল্লা শহরের দুঃস্থ নারীদের কর্মসংস্থানের লক্ষে ‘সুচারু কটেজ’ নামে একটি সেলাই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি ছিলেন ধর্মপরায়ণতা আর আধুনিকতার সমন্বয়। সুস্থ থাকা অবস্থায় তিনি যেমন কখনো নামাজ ছাড়েননি তেমন আবার ষাট/সত্তরের দশকে স্বামীর মোটর সাইকেলের পেছনে করে সারা শহর ঘুরে বেড়িয়েছেন, সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখেছেন, বন্ধু-বান্ধবী আর দলীয় নেতা-কর্মীদের নিয়ে চুটিয়ে আড্ডা দিয়েছেন, মঞ্চনাটক উপভোগ করেছেন। রবীন্দ্র সংগীত আর নজরুল গীতি শুনে সকাল-সন্ধ্যা শুরু করেছেন। শরিফুন্নেছা আহমেদ ব্যক্তিজীবনে অত্যন্ত সৌখিন মানুষ ছিলেন। তিনি এত কাজের মধ্যেও বাড়ির আঙ্গিনায় বাগান করা, গবাদি পশু পালন করা ও মৌমাছি চাষের সময়ও বের করতে পেরেছেন।
২০১৮ সালে স্বামির মৃত্যুর পর উনার শারীরিক ও মানসিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকে। পর পর দুইবার স্ট্রোক হয়। এর মধ্যে তাঁর ডিমেনশিয়া (স্মৃতিভ্রম) এবং পার্কিনসনিজম রোগ দ্রুত তাঁকে কাবু করে ফেলে। সম্প্রতি ঢাকার নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে ভর্তি করার পর উনার শারীরিক অবস্থার সাময়িক উন্নতি হয় এবং তাঁকে বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু ১৫ই জুন সকালে তাঁর আবার ম্যাসিভ স্ট্রোক করে। হাসপাতালে নেয়ার পথে সেদিন দুপুরে তাঁর জীবনাবসান হয়। মৃত্যুকালে তিনি প্রবাসী চিকিৎসক ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম-সচিব দুই পুত্র সহ ছয় সন্তান ও অগণিত ভক্ত ও শুভানুধ্যায়ী রেখে গেছেন। মিসেস শরিফুন্নেছা আহেমদ বেঁচে থাকবেন তাঁর কর্মে, তাঁর শত সহ¯্র ছাত্রীদের সাফল্যের মধ্যে, কুমিল্লার তৎকালীন পিছিয়ে পড়া নারীসমাজের অগ্রগতির মধ্যে। তিনি ছিলেন তাঁদের একজন আলোকবর্তিকা। তাঁর প্রস্থানে সমাজ হারিয়েছে একজন মহিয়সী নারীকে, কুমিল্লা হারিয়েছে তার একজন শ্রেষ্ঠ সন্তানকে।

 

আহমেদ শরীফ শুভ
মরহুমা শরিফুন্নেছা আহমেদের জ্যেষ্ঠ সন্তান,
অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী চিকিৎসক, কবি, প্রাবন্ধিক ও সমাজকর্মী।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট