চট্টগ্রাম শুক্রবার, ১২ আগস্ট, ২০২২

১২ মে, ২০২২ | ৮:৫৬ অপরাহ্ণ

শেষবয়সে মা-বাবা যেনো হতাশা আর একাকীত্বে না ভোগেন

মোহাম্মদ শাহজাহান

যে মা-বাবা এক সময় নিজে না খেয়েও সন্তানের মুখে তুলে খাইয়ে দিতেন, তারা আজ কোথায় আছেন, কেমন আছেন, তাদের খোঁজখবর নেয়ার সময় আমাদের নেই। এভাবেই পৃথিবীতে প্রায় বেশিরভাগ পরিবারে মা-বাবা শেষবয়সে অবহেলার শিকার হন।

কিন্তু কেন এই অবহেলা, কেন এতো হতাশা? অতি স্নেহ-আদরে যাদেরকে মা-বাবা বড় করে তুলেন, তারাই কেন তাদের দুঃসময়ে পাশে থাকেন না। আজ আমরা চাকরি করি, ব্যবসা করি, প্রতিষ্ঠিত হচ্ছি, সুনাম কুড়াচ্ছি। তারপর বিয়ে করে নতুন সংসার নিয়ে আলাদাভাবে থাকছি। অন্যদিকে বৃদ্ধ মা-বাবা কী করছেন, কী খাচ্ছে, কোন জটিল ও কঠিন রোগে ভুগছেন সেদিকে বিন্দুমাত্র কোনো খেয়াল নেই আমাদের। শুধু নিজের স্ত্রী এবং সন্তান নিয়ে কীভাবে চলব সেটা ভেবে থাকি। এটাই বাস্তবতা।

একদিন মা-বাবাকে আমাদের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু আজ মা-বাবা বৃদ্ধ হয়ে গেছে তাই তাদের কোন প্রয়োজন নেই। মনে রাখতে হবে আমি আজ যুবক, কারো হয়তো আমাকে প্রয়োজন আছে, কিন্তু আমিও একদিন বৃদ্ধ হব। তখন আমি কারো প্রয়োজনে নাও আসতে পারি, সেই দিন আমার অবস্থা কি হবে? আমরা সারাদিন সময় দিতে না পারলেও বাবা-মাকে একা সময় কাটাতে দেয়া যাবে না। এতে তারা মানসিকভাবে আরো অসুস্থ হয়ে পড়বে এবং এটা বৃদ্ধাশ্রমের চাইতেও কম নয়। আমরা চাইলেই একটু সময় বের করতেই পারি তাদের জন্যে। মা-বাবাকে খুশি রাখা, তাদের সময় দেয়া, তাদের ইচ্ছার প্রাধান্য দেয়া এগুলো আমাদের দায়িত্ব।

দিনের শেষে বাসায় ফিরে আসার সময় মা-বাবার জন্য সামান্য কিছু নিয়ে আসলে, দেখবেন তারা কতটা খুশি হয়। যদি পরিবারের সিদ্ধান্ত এবং ছোটখাটো সমস্যা নিয়ে তাদের সাথে আলোচনা করি, তাদের পরামর্শ নিই। এতে তাঁরা আর নিজেদেরকে অসহায় মনে করবে না। তাঁরা ভাবতে পারবে, তাঁদের ইচ্ছা, পরামর্শকে আমরা এখনো কতো প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। ছুটির দিন সবারই থাকে। তাদের ছুটির দিনে তাদের একটু বেশী সময় দেয়া প্রয়োজন। আমরা তাদের পছন্দের খাবার রান্না করে খাওয়াতে পারি, তাদের নিয়ে বাইরে কোথাও ঘুরে আসতে পারি।

বাবা-মা চান, তাঁদের সন্তান উঁচু কোনো পর্যায়ে যাক, তবে তাঁরা আমাদেরকে কখনো একেবারেও হারাতে চান না। আমরা প্রচুর টাকা উপার্জন করে বাবা-মাকে সব দিক দিয়ে খুশি রাখার চেষ্টা করলেনও কিন্তু তাদের সময় না দিলে, এতে তারা কখনোই খুশী থাকবে না। আমাদের সান্নিধ্য তাদেরকে অন্যসব কিছু থেকে বেশী খুশী রাখতে পারবে। এতে আমরা নিজেও খুশী থাকতে পারবো। অনেক পরিবার আছে, যারা স্বামী-স্ত্রী দুইজনই চাকুরি করেন। তারা ভেবে পান না কীভাবে সময় দিবেন মা-বাবাকে। দিনের শেষে এসে হলেও একটু সময় দিবেন তাদের। একটু চা করে এনে, মা-বাবার সাথে গল্প করতে পারেন। সেই সাথে তাঁদের বিশেষ দিনগুলো মনে রাখুন এবং ছোটখাটো সারপ্রাইজ দেয়ার চেষ্টা করুন। এতে, তাঁরা যে আপনার কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা তাঁরা বুঝতে পারবে। অনেকেই সময় থাকতে বুঝতে চায় না ব্যাপারগুলো। কিন্তু একটা সময় যখন তাদের খালি চেয়ারটা চোখের সামনে দেখতে হয়, তখন ঠিকই বুঝে যায় যে, তাঁরা কি ছিলো।

কারণ পিতা-মাতা সবসময় সন্তানের কল্যাণের কথা ভাবেন। তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে কোনো সন্তান কখনও সফলতার পথে এগিয়ে যেতে পারে না। মা-বাবার অবাধ্য সন্তানের ধ্বংস অনিবার্য। আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘তোমার পালনকর্তা আদেশ করেছেন, তাকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত কর না এবং পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার কর। তাদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে ‘উহ’ শব্দটিও বল না, তাদেরকে ধমক দিও না এবং তাদের সঙ্গে শিষ্টাচারপূর্ণ কথা বল।

তাদের সামনে ভালোবাসার সঙ্গে, নম্রভাবে মাথা নত করে দাও এবং বল- হে প্রভু, তাদের উভয়ের প্রতি রহম কর, যেমন তারা আমাকে শৈশবকালে লালন-পালন করেছেন (সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত ২৩ ও ২৪)। সুতরাং প্রত্যেক সন্তানের উচিত মা-বাবার প্রতি তাদের যে কর্তব্য তা সঠিকভাবে পালন করা এবং সব সময় তাদের পাশে থেকে সদ্ভাব, সৎ আচরণ বজায় রাখা। কেননা সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর থেকে পূর্ণ ব্যক্তিত্বে পরিণত হওয়া পর্যন্ত মা-বাবা সন্তানের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে থাকেন। সন্তানের জন্য এত ভালোবাসার আর কেউ নেই। তাই আসুন! মা-বাবা দু’জন বা কোনো একজন বেঁচে থাকলেও তাদের সেবা-যত্ন করে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাত অর্জন করি।

লেখক: মোহাম্মদ শাহজাহান, প্রাবন্ধিক, ব্যাংকার

পূর্বকোণ/সাফা

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট