চট্টগ্রাম শুক্রবার, ১২ আগস্ট, ২০২২

৩০ এপ্রিল, ২০২২ | ১২:০৫ পূর্বাহ্ণ

অনলাইন ডেস্ক

সাদাকাতুল ফিতর: ঈদের আনন্দ ছড়িয়ে দেয়ার অনন্য মাধ্যম

পবিত্র রমজানের ইবাদতের মধ্যে সদাকাতুল ফিতর আদায় করা অন্যতম ইবাদত। রমজানের সিয়াম সাধনা শেষে আসে পবিত্র ঈদুল ফিতর। ঈদের আনন্দ ধনী-গরিব সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে এবং এ আনন্দে যেন মুসলিম জাতির প্রতিটি সদস্য শরিক হতে পারে এ জন্য ওয়াজিব করা হয়েছে সদাকাতুল ফিতর।

আসছে ঈদুল ফিতর। আর ঈদুল ফিতরের দিনের অন্যতম আমল হলো সদকাতুল ফিতর। ইসলামে সদকাতুল ফিতরের গুরুত্ব অপরিসীম। এটি যাকাতেরই একটি ধরন। রাসুল (সা.) হাদিস ও সুন্নাহ তা আদায়ের তাগিদ করেছেন এবং এর নিয়ম-নীতি শিক্ষা দিয়েছেন। এ কারণেই রাসূলের যুগ থেকে আজ পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহ ইসলামের পাঁচ রোকন ও দ্বীনের অন্যান্য মৌলিক আমল ও ইবাদতের মতো সদাকাতুল ফিতরও নিয়মিত আদায় করে আসছে। আমাদের এ অঞ্চলে তা ‘ফিতরা’ নামে পরিচিত।

সদাকাতুল ফিতর যাকাতের মতোই একটি আর্থিক ইবাদত। তবে সম্পদের সদাকাকে যাকাত বলা হয়। আর দেহের যাকাতকে সদাকাতুল ফিতর বা সদকায়ে ফিতর বলা হয়। ‘সদাকাহ’ শব্দটি আরবি শব্দ। ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় এটি দ্বারা ফরজ যাকাতকে বুঝায়, আবার নফল দানের ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয়। আবু মুহাম্মদ আল-আবহারী বলেছেন; সদাকাতুল ফিতরকে ‘যাকাতুল খিলকাত’ বা সৃষ্টির যাকাত বা দেহের যাকাতও  বলা হয়।

‘ফিতর’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে ‘রোজা খোলা’। আর সদাকাতুল ফিতরের অর্থ হচ্ছে-রোজা ভাঙা বা রোজা খোলার সাদাকাহ। ‘আধুনিক প্রেক্ষাপটে যাকাতের বিধান’ নামক গ্রন্থে বলা হয়েছে; ‘ফিতরাহ’ শব্দের অর্থ- জন্মস্থান বা সৃষ্টিকার্য। পারিভাষিক অর্থে-সাদাকাতুল ফিতর বলতে ঐ আর্থিক ইবাদতকে বুঝায়, যা পবিত্র রমজানের রোজা সমাপ্ত হওয়ার এবং রোজা খোলার পর দেয়া হয়। যে বছর মুসলমানদের ওপর রমজানের রোজা ফরজ করা হয়, সে বছরই নবী করিম (সা.) সাদাকাতুল ফিতর আদায় করার হুকুম দেন। অর্থাৎ দ্বিতীয় হিজরি সনের রমজান মাসে রোজা ফরজ করার আয়াত নাযিল হয়। (সুরা বাকারাহ : ১৮৩)। যাকাত যেমন মালকে পবিত্র, বৃদ্ধি ও পরিশুদ্ধ করে, তেমনি সাদাকাতুল ফিতর রোজাকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করে। সদকাতুল ফিতর ওয়াজিব করা হয়েছে রোজা পালনকালে যে সব বেহুদা বা অনর্থক কাজ অথবা কোনো অশ্লীল কথা ও কাজ করা হয়েছে, বিভিন্ন ত্রুটি-বিচ্যুতি ঘটেছে তা ধুয়ে মুছে পবিত্র করার লক্ষ্যে। একই সাথে ঈদুল ফিতরের দিন গরিব-মিসকিনদের মুখে ঈদের হাসি ফোটানোর উদ্দেশ্যে সদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব।

সদাকাতুল ফিতরের তাৎপর্য হচ্ছে- মানুষ মহান আল্লাহ তায়ালার পথে আগ্রহের সহিত তার অর্জিত মাল-সম্পদ ব্যয় করবে, যাতে করে তার রোজার ত্রুটি-বিচ্যুতির ক্ষতিপূরণ হয় এবং আল্লাহর পথে তার রোজা কবুল হয়। সাদাকাতুল ফিতরের আরো তাৎপর্য হচ্ছে-ঈদ উপলক্ষে সমাজের গরিব ও দুস্থ লোকেরা যাতে করে নিশ্চিন্তে এবং হাসি-খুশি মনে অন্ন বস্ত্রের অভাব পূরণ করতে পারে এবং অন্যান্য মুসলমানদের সাথে ঈদগাহে উপস্থিত হতে পারে। যার ফলে ঈদের সমাগম অনেক বড় হয় এবং বিপুল এ সমাগমের কারণে ইসলামের প্রভাব প্রতিপত্তি সম্প্রসারিত হয়।

হাদিসে বর্ণিত হয়েছে- “হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, নবী করিম (সা.) সাদাকাতুল ফিতর এ জন্য নির্ধারণ করেছেন যে, ফিতরা রোজাদারকে বেহুদা কাজ-কর্ম এবং অশ্লীলতার ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে পবিত্র করবে এবং অভাবগ্রস্থদের খানাপিনার ব্যবস্থা হয়ে যাবে। অতএব, যে ব্যক্তি ঈদের নামাজের পূর্বে সদাকাতুল ফিতর পরিশোধ করবে তার সে সাদাকাহ আল্লাহ তায়ালার দরবারে কবুল হবে এবং যে নামাজের পরে পরিশোধ করবে তার সাদাকাহ সাধারণ দানখয়রাতের মতো গণ্য হবে”- (আবু দাউদ)।

সাদাকাতলু ফিতর বিষয়ে শাহ অলী উল্লাহ (রহ.) বলেন, “ঈদের দিন আনন্দের দিন। এদিনে মুসলমানদের বিরাট সমাবেশের মাধ্যমে ইসলামের শান-শওকত প্রকাশ পায় এবং সাদাকাতুল ফিতরের দ্বারা এ উদ্দেশ্য পূর্ণ হয়।”-(হুজ্জাতুল্লাহিল বালেগাহ)।

সদাকাতুল ফিতর এমন প্রত্যেক স্বচ্ছল মুসলমান নারী-পুরুষ, নাবালেগ-সাবালেগের ওপর ওয়াজিব যার নিকট তার প্রকৃত প্রয়োজনের অতিরিক্ত এতো মূল্যের মাল হবে যার ওপর যাকাত ওয়াজিব হয়। সে মালের ওপর যাকাত ওয়াজিব হোক অথবা না হোক। সাদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব হয় ঈদের দিনে প্রত্যুষে। অর্থাৎ, যে ব্যক্তি ফজরের পূর্বে মারা যাবে অথবা ধন-সম্পদ থেকে বঞ্চিত হবে তার ওপর ওয়াজিব হবে না। আবার যে শিশু ফজরের পর জন্মগ্রহণ করবে তার ওপরও ওয়াজিব হবে না। তবে যে শিশু ঈদের রাতে জন্ম গ্রহণ করবে তার ওপর ওয়াজিব হবে। আবার যে ব্যক্তি ফজরের পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করবে এবং ধনের মালিক হবে তার ওপর সাদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব হবে।

সাদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব হওয়ার যৌক্তিকতা স্বয়ং রাসুল (সা.) বিশ্লেষণ করেছেন। হাদিস শীরফে পাওয়া যায়, রাসূলে করিম (সা.) সাদাকাতুল ফিতর নির্ধারণ করেছেন রোজাদরকে অশ্লীল কথা ও কাজ থেকে পরিশুদ্ধ রাখা এবং মিসকিনদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা স্বরূপ”- (মোল্লা আলী কারী-মিরকাতুল ফামাতিহ: চতুর্থ খন্ড, পৃষ্ঠা-১৭৩; আবু দাউদ শরীফ-২২৭)

সাদাকাতুল ফিতরের দুটি যৌক্তিকতা পাওয়া যায় : ১. রমজান মাসের রোজাদারের সাথে সম্পৃক্ত। যা রোজা পালনকালে কোনো বেহুদা কাজে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা। ২. যা সমাজের সাথে সম্পৃক্ত। বিশেষ করে দরিদ্র-মিসকিন ও অভাবগ্রস্ত লোকদের মাঝে ভালোবাসা, সম্প্রীতি ও আনন্দের শিহরণ জাগ্রত করা। সাদাকাতুল ফিতর ঈদের কিছুদিন আগেই পরিশোধ করা উত্তম। যাতে করে দরিদ্র ও অভাবীরা বস্ত্র সামগ্রি কিনে সকলের সাথে ঈদগাহে শরিক হতে পারে। যদিও সুবহে সাদিক উদিত হওয়ার মাধ্যমে ফিতরা ওয়াজিব হয়।

হাদিসে বর্ণিত আছে, সাহাবায়ে কিরামগণ (রা.) ঈদের দুই এক দিন আগেই সাদাকাতুল ফিতর বিতরণ করতেন। দু’চার দিন আগে আদায় করতে অপারগ হলে ঈদের নামাজের আগে অবশ্যই পরিশোধ করা উচিত। নবী করিম (সা.) বলেছেন ; যে ব্যক্তি সদাকাতুল ফিতর নামজের আগেই দিয়ে দেবে, তাহলে সেটা হবে আল্লাহর নিকট গৃহীত সদাকাহ। আর যে নামাজের পরে দেবে, তার সদাকাহ হবে দান খয়রাতের মতো একটি সাধারণ সদাকাহ”-(সহিহ আল বুখারি)। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রা.) বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেছেন ; ‘রাসুলে করিম (সা.) লোকদের নামাজের জন্য রওনা হওয়ার আগেই সাদাকাতুল ফিতর পরিশোধ করতে নির্দেশ দিয়েছেন’- (রদ্দুল মুহতারের ইবারত: খন্ড-০৭; পৃষ্ঠা-২৮২)।

যে সকল ব্যক্তির পক্ষে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব তা কয়েকটি নিম্নরূপ : ১. প্রত্যেক স্বচ্ছল ব্যক্তি তার নিজের ছাড়াও নাবালেগ সন্তানের পক্ষ থেকে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করবে। ২. জ্ঞান ও হুশহারা সন্তানের পক্ষ থেকে, তার মাল থাক অথবা না থাক তাদের পক্ষে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব। ৩. বাড়ির চাকর-বাকর বা তারা যাদের ভরণ-পোষণ করেন তাদের পক্ষ থেকে মালিককে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করতে হবে। ৪. সাবালেগ সন্তানের পক্ষ থেকে পিতার সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব, যদি দুস্থ ও দরিদ্র হয়। ৫. স্ত্রীর পক্ষে তার স্বামী সাদাকাতুল ফিতর আদায় করবেন। ৬. পিতা মারা গেলে এবং দাদা জীবিত থাকলে দাদার ওপর সকল দায়িত্ব বর্তাবে, যে দায়িত্ব পিতার ওপর ছিল। ৭. স্ত্রী যদি স্বচ্ছল হয়ে থাকেন তাহলে শুধু তার সাদাকাতুল ফিতর নিজেই আদায় করা যাবে।

এ বছর ফিতরার হার জনপ্রতি সর্বোচ্চ ২ হাজার ৩১০ টাকা এবং সর্বনিম্ন ৭৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। জাতীয় ফিতরা নির্ধারণ কমিটি এ হার নির্ধারণ করেছে। গতবছর জনপ্রতি ফিতরার হার সর্বনিম্ন ৭০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ২ হাজার ৩১০ টাকা ছিল। নিসাব পরিমাণ মালের মালিক হলে মুসলমান নারী-পুরুষের সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব। ঈদের নামাজে যাওয়ার আগেই ফিতরা আদায় করতে হয়। যাকাত পাবার হকদারগণ সাদাকাতুল ফিতর পাবার হকদার। অর্থাৎ যে সব খাতে যাকাত দেয়া যায় সে সব খাতে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করতে হব। একটি ফিতরা একজন ব্যক্তিকে দেয়া যায়, আবার কয়েকজন লোককে ভাগ করেও দেয়া যায়। তাছাড়া কয়েকটি ফিতরা একজন ব্যক্তিকে দেয়ারও বিধান আছে। সাদাকায়ে ফিতর আদায় না করা কোনো মতেই শরীয়তসম্মত নয়। আল্লাহতা’লা আমাদেরকে যথাযথ সাদাকায়ে ফিতর আদায়ের তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক: ফখরুল ইসলাম নোমানী, ইসলামি চিন্তক

 

পূর্বকোণ/সাফা/পারভেজ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট