চট্টগ্রাম শনিবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০২৩

সর্বশেষ:

১৮ এপ্রিল, ২০২২ | ১২:১৬ পূর্বাহ্ণ

 নাওজিশ মাহমুদ

পুঁজিবাদের প্রভাব: বিশ্ব, রাষ্ট্র ও সমাজ

নাওজিশ মাহমুদ

পুঁজিবাদের প্রভাবে বিশ্ব, রাষ্ট্র ও  সমাজে ব্যাপক পরিবর্তন  ঘটে। এই পরিবর্তন শুধু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নয়। রাজনীতি, সংস্কৃতি, যোগাযোগ ব্যবস্থা, তথ্য আদান-প্রদান, খাদ্য অভ্যাস, ভাষা-সাহিত্য, চিন্তা-চেতনা এবং জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তি সবকিছু দ্রুতগতিতে বদলে যেতে থাকে।

সাম্রাজ্যবাদের প্রধান ভিত্তি হয়ে উঠে এই পুঁজিবাদ। সারাবিশ্বকে একই সংস্কৃতির দিকে ধাবিত করে। তথ্য-প্রযুক্তির বিকাশের কারণে বিশ্বমিডিয়া মানুষের চিন্তাজগতের উপর প্রভাব ফেলে। মানুষের জীবনযাত্রাকেও নিয়ন্ত্রণ করে। সারাবিশ্বের মানুষেকে ভার্চুয়াল যোগাযোগের মাধ্যমে কাছাকাছি নিয়ে আসে। কম্পিউটার, ইন্টারনেট ও মোবাইলের কারণে যে কোন  তথ্য সহজলভ্য হয়ে উঠে। কষ্টার্জিত জ্ঞানের বদলে সহজলভ্য তথ্য, জ্ঞানের গভীরতায় যেমন পৌঁছে না, তেমনি প্রয়োগের ক্ষেত্রেও প্রজ্ঞার ঘাটতি থেকে যায়। সেই সাথে জ্ঞান ও প্রজ্ঞার ভিত্তিতে গড়ে উঠা আদর্শের স্থায়িত্বের বদলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশের কারণে তথ্যসমৃদ্ধ  চেতনার বিস্তার ঘটেছে। যাতায়াত ব্যবস্থাকে দ্রততর করে মানুষের সময়কে আরো অর্থবহ করে তুলেছে।

মানুষের জীবনযাপন ও খাদ্যভ্যাসে শুধু পরিবর্তন আনেনি, এর একটি বৈশ্বিক রূপও পেয়েছে। সামাজিক শ্রেণি নতুন করে বিন্যাস হয়েছে। রাষ্ট্র পুঁজিবাদকে আইনগত ভিত্তি দিয়েছে। পুঁজির বিস্তারের সাথে প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির কারণে শ্রমশক্তির বদলে যন্ত্র স্থান দখল করে নিয়েছে। পুঁজিবাদ বিস্তারের সাথে পরিবেশও হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়েছে। গণমাধ্যম জনমতের প্রকাশের প্রধান মাধ্যম হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। পুঁজিপতিরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের ভূমিকায় চলে গিয়েছে। পুঁজির সাথে রাষ্ট্রের অন্তর্মিলনের  রাষ্ট্র হয়ে উঠে পুঁজিবাদের ধারক ও বাহক।  পুঁজিবাদের প্রভাবে সমাজের মূল্যবোধ ধ্যান-ধারণা এবং চিন্তা-চেতনা  পুঁজি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। সাহিত্য ও সংস্কৃতি সবকিছু পুঁজিবাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। সেই সাথে সম্পদ এবং আয়ের পরিসরও বৃদ্ধি পায়। সমাজে ভোগপ্রবণতা বেড়ে  যায়। সবচেয়ে বড় যে পরিবর্তন আসে, তা হচ্ছে সমাজে সম্পদের বৈষম্য বিশাল আকার ধারণ করে।

আধুনিক অর্থনীতির ভিত্তিই হলো পুঁজিবাদী অর্থনীতি। পুঁজিবাদী অর্থনীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য ক্রমাগত সম্পদ বৃদ্ধি। এটা সম্ভব কেবলমাত্র অর্থ বিনিয়োগের মাধ্যমে। লাভের টাকা বিনিয়োগ করে আরো সম্পদ বৃদ্ধিই হচ্ছে পুঁজিবাদের প্রধান বৈশিষ্ট্য। মধ্যযুগকে সামন্তবাদী বা প্রাক-পুঁজিবাদী সমাজ হিসেবে গন্য করা হয়।

প্রাক-পুঁজিবাদী সমাজে ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে যে লাভ পাওয়া যেত, তা দিয়ে  সঞ্চয়, নানারকম প্রতিযোগিতা, বিয়ে-পার্বণে, ভোজসভার আয়োজনে, ভোগবিলাসে, যুদ্ধে, ধর্মীয় কাজে, দান-খয়রাতের মাধ্যমে ব্যয় করা হতো। যন্ত্রের বিকাশ, শিল্পে উৎপাদন পদ্ধতির উৎকর্ষতা, কৃষিকাজে ফলন বৃদ্ধি,  শ্রমশক্তি ক্রয়ের মাধ্যমে বৃহৎ আকারে প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং পুঁজির মুনাফার বিনিয়োগ ও পুনর্বিনিয়োগের মাধ্যমে পুঁজিবাদ আধুনিক অর্থনীতি বা আধুনিক সভ্যতার প্রধান নিয়ামক হয়ে উঠে। সেই সাথে গড়ে উঠে ব্যাংকিং ব্যবস্থা।

প্রাক-পুঁজিবাদী সমাজে ছিল মহাজনিপ্রথা। যার সুদ ছিল উচ্চহারে। মহাজনরা নিজেদের কাছে গচ্ছিত সম্পদ থেকেই সুদে টাকা ধারা দিত। আর ব্যাংকিং ব্যবস্থায় জনগণ টাকা ব্যাংকে জমা রাখে, সেখান থেকে ব্যাংক টাকা ধার দেয়। অর্থাৎ ব্যাংক টাকা ধারদেয়ার অর্থ হলো  বিনিয়োগে গতি বাড়ানো। তখনই ব্যাংক ধার দিতে পারবে, যখন সে জনগণের টাকা গচ্ছিত রাখতে পারবে। জনগণ ব্যাংকে টাকার রাখার অর্থ হলো ব্যাংকে গচ্ছিত টাকা ফেরত পাওয়ার আস্থা এবং টাকা নিরাপদে গচ্ছিত থাকার আস্থা বা গুডউইল। এই গুডউইল হলো আধুনিক অর্থনীতি বা পুঁজিবাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। টাকার মালিক না হওয়া সত্ত্বেও গচ্চিত টাকা ধার দিয়ে বা বিনিয়োগের মাধ্যমে সুদ আদায় বা মুনাফা করে। আবার গচ্ছিত টাকার জন্য সে সুদ প্রদান করে। প্রাক-পুঁজিবাদী সমাজে মহাজনরা কাউকে সুদ দিত না। প্রাক-পুঁজিবাদী সমাজে টাকা ধার পাওয়াটা ছিল অনেক কঠিন। কোন স্বর্ণ বা জমির বিনিময়ে টাকা ধার দিত। কিন্তু বর্তমানে বিশেষ বিনিয়োগকারি বা ব্যবসায়িদের পরিশোধের উপর আস্থা রেখেই ব্যাংক টাকা ধার দেয়। অর্থাৎ ধার হয়ে পড়ে অনেক সহজলভ্য, যা পুর্বে ছিল কঠিন কাজ।

গ্রামসমাজের বদলে নাগরিকসমাজের উত্থান ঘটে। গ্রামসমাজের কৃষিব্যবস্থা ও কৃষি উৎপাদনে বদলে শিল্পব্যবস্থা ও উৎপাদন প্রাধান্য সৃষ্টি হয়। বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিস্কারের মাধ্যমে যন্ত্রের বৈপ্লবিক পরিরবর্তন সূচনা হয়।বিদ্যুত আবিস্কারের ফলে মানবসভ্যতা আরও একধাপ অগ্রগতি ঘটে। বিদ্যুতের ব্যবহার উৎপাদনে দ্রুত বিকাশ ঘটে। বিদ্যুত মানুষের জীবনকে আমূল পরবির্তন করে দেয়।

আগুনের মাধ্যমে অন্ধকার দূর করার পরিবর্তে বিদ্যুত শুধু আলো প্রদান করে না। এই বিদ্যুৎ মানুষের জীবন ও সমাজকেও আলোকিত করে ব্যাপক পরিবর্তন আনে। রাতকে কাজে লাগাবার সুবর্ণসুযোগ এসে যায়। কাজের পরিধি ও কর্মঘণ্টা বেড়ে যায়। আধুনিক জীবনকে সহজ করে দেয় বিদ্যুৎ। মানুষের কাছে বিদ্যুতকে সহজলভ্য করে তোলার ব্যাপারে বড় ভূমিকা রাখে পুঁজি ও পুঁজিবাদ। প্রাক-পুঁজিবাদী সমাজে লোহার, তামা ও ব্রোঞ্জ  এর ব্যবহারের মাধ্যমে সমাজে যে অগ্রগতি হয় তার আরো বেশি অগ্রগতি হয় পুঁজিবাদী সমাজে প্লাস্টিক ব্যবহারের মাধ্যমে।

তাই বিশিষ্টজনেরা লৌহ যুগ, তাম্রযুগ ও ব্রোঞ্জযুগের পর বর্তমান যুগকে প্লাস্টিকের যুগ বলে অভিহিত করেন। বিদ্যুতে ব্যবহারের বৃদ্ধির ফলে মানুষের মধ্যে বিনোদনের পাশাপশি তথ্য ও জ্ঞান সহজলভ্য পড়ে।  এর মূলে হচ্ছে পুঁজিবাদের অপ্রতিহত প্রভাব। কারণ পুঁজির  যোগানের মাধ্যমে বিশাল বিদুৎ প্ল্যান্ট গড়ে উঠে।  আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ ঘটে। এই বিকাশের পিছনে বড় ভূমিকা পালন করে পুঁজি। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশের ফলে মানুষের খাদ্য উৎপাদন থেকে  শুরু করে জীবন ধারণের জন্য অত্যাবশকীয় সবকিছু সহজলভ্য হয়ে যায়। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হয় সম্পদের ব্যবহারের ক্ষেত্রে। পৃথিবীব্যাপি ব্যবহারযোগ্য সম্পদ বৃদ্ধি পায় দ্রুতগতিতে। বিশ্বে ১৫০০ সালে ব্যবহারযোগ্য সম্পদ ছিল মাত্র ২৫ হাজার কোটি ডলার। ২০২০সালে তা বেড়ে হয় ৮৪৭ লক্ষ কোটি ডলার। ১৫০০ সালে মাথাপিছু উৎপাদন ছিল ৫৫০ ডলার ২০২০ সালে ১০,০০০ ডলারে রূপান্তরিত হয়।

পুঁজিবাদের উত্থানের পূর্বে বিশ্বের সভ্যতার কেন্দ্রবিন্দু ছিল এশিয়া ও আফ্রিকা। মধ্যপ্রাচ্যে আরব, চীন, ভারত এবং তুরস্কের অটোমান সাম্রাজ্যের আধিপত্য্যের জায়গায় স্থান দখল করে নেয় পশ্চিম ইউরোপে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।  ইসলাম ধর্ম এবং বৌদ্ধ ধর্মের বদলে খ্রিস্টান ধমের্র আধিপত্য শুরু হয়। তবে অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণে থেকে যায়  ইহুদিদের কাছে। প্রাচীন যুগ থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত অর্থনীতির পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ তারাই করে। তার কোন হেরফের হয়নি। মাঝে মধ্যে এই নিয়ন্ত্রণ কিছুটা শিথিল হলেও একেবারে নিঃশেষ হয়ে যায়নি। পুঁজিবাদের যুগে এসে বিশ্ব অর্থনীতির কর্পোরেটহাউজের মূলত নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠে এই ইহুদি গোষ্ঠী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে খ্রিষ্টানদের তুলনায় মুসলিমদের সাথেই ছিল ইহুদিদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। যেহেতু জেরুজালেম থেকে ইহুদিদেরকে উৎখাত করে খ্রিষ্টানরা। তাই খ্রিষ্টানদের সাথে ইহুদিদের দ্বন্দ্ব ছিল খ্রিষ্টানদের উত্থানের পর থেকেই।

এমনকি জেরুজালেম নিয়ে ক্রুসেডার যুদ্ধে অটোমানদের সাথে বৃটিশ ও জার সাম্রাজ্যের দ্বন্দ্বে ই্হুদিরা সবসময়  মুসলমানদের পক্ষেই ছিল। ইহুদিরা নিয়ন্ত্রণ করতো জার্মান অর্থনীতি। হিটলারের নেতৃত্বে নাৎসিদের উত্থানের পর, ৬০ লক্ষ ইহুদি নিধনের ফলে জার্মানিতে ইহুদি প্রভাব হ্রাস পায়। এই সুযোগে বৃটিশ এবং আমেরিকা সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে জেরুজালেমকে কেন্দ্র করে একটি ইহুদি রাষ্ট্রের গোড়া পত্তন করে। ইউরোপকে ইহুদি মুক্ত করে। জেরুজালেম ও তার আশেপাশে মুসলিমদের উচ্ছেদ করে মুসলমান ও ইহুদির মধ্যে স্থায়ী দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে। এই দ্বন্দ্বের বিপরীতে খ্রিষ্টান ও ইহুদি ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে ঐক্য স্থাপিত হয়। ইহুদিদের জ্ঞান ও অর্থ এবং খ্রিষ্টান পাশ্চাত্যের বিজ্ঞান, দর্শন সাহিত্য মিলে পুঁজিবাদের  নতুন মাত্রা যোগ করে। বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাদের প্রভাব অপ্রতিহত গতিতে এগিয়ে যায়।

পুঁজিবাদের উত্থানে বিজ্ঞানের বিরাট ভূমিকা রয়েছে। বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে পুঁজিবাদ ক্রমশ এগিয়ে যায়।   বিজ্ঞানের নতুন নতুন আবিস্কার এবং নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও ব্যবহার মানুষের সম্ভাবনাকে দ্রতগতিতে এগিয়ে নেয়। বিশেষ করে বাষ্পীয় ইঞ্জিন এবং বিদ্যুত আবিস্কারের   ফলে যাতায়াতে ও উৎপাদনে নতুন গতি পায়। বর্তমানে ইন্টারনেট, কম্পিউটার প্রযুক্তি এবং মোবাইল ব্যবহারের ফলে মানুষকে অনেক কাছাকছি নিয়ে আসে। পুঁজির বিশাল উদ্বৃত্ত সৃষ্টি মহাকাশে জয়ও সহজ হয়ে যায়।  অন্যান্য গ্রহের সাথে যোগাযোগের অনবরত প্রচেষ্টা ও মহাকাশ জয়ের স্বপ্ন মানবজাতি ও মানবসভ্যতা উৎকর্ষতায় অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে যায়।

লেখক: নাওজিশ মাহমুদ  রাজনীতি বিশ্লেষক ও কলামিস্ট

 

পূর্বকোণ/সাফা/পারভেজ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট