চট্টগ্রাম শনিবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০২৩

সর্বশেষ:

৯ এপ্রিল, ২০২২ | ১২:২৪ পূর্বাহ্ণ

মাহে রমজানে পানাহার বর্জনে রোজাদারের কতিপয় সতর্কতা

মনিরুল ইসলাম রফিক

পবিত্র মাহে রমজানে আমরা সিয়াম সাধনা করে চলেছি। বছর ঘুরে এ মাস আসে আমাদের আত্মশুদ্ধির জন্য। কুরআনুল কারীমে সিয়াম সাধনার উপকার বর্ণনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে ‘লায়াল্লাকুম তাত্তাকুন’ যাতে তোমরা খোদাভীতি, পরহিযগারী’ আত্মশুদ্ধি অর্জন করতে পার।’ পঞ্চ ইন্দ্রিয়কে জয় করে আল্লাহ পাকের নির্দেশিত পথে এ মাস ও বাকী এগারো মাস তথা গোটা জীবন পরিচালিত করার প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি আমরা সিয়াম সাধনার মাধ্যমে।

আল্লামা ইমাম গাজ্জালী (রহ.) সহ মুসলিম দার্শনিক ও বুজুর্গানে দ্বীন (রহ.) বলেছেন, শুধু উপোস থাকার নাম সিয়াম নয়। উপবাস থাকা সিয়াম সাধনার একটি অংশ মাত্র। বাস্তবিক অর্থে সিয়াম সাধনার পরিধি বহু ব্যাপক ও বিস্তৃত। প্রকৃত রোজা হতে হবে পানাহার বর্জন, জৈবিক চাহিদা বিসর্জন, জিহবাকে অযথা কথাবার্তা, অশ্লীলতা হতে হিফাযত এবং চিন্তায় ও মানসিকতায় হিংসা-বিদ্বেষ বিদূরিত সেখানে দয়া, মমত্ব, মহত্ব ও খোদাপ্রেম স্থান দেয়া।

এসব বৈশিষ্ট্যের মধ্যে দিয়ে সাধারণ মুসলমান আর আউলিয়া বুজুর্গ ও মহামনীষীদের সিয়াম সাধনার মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে যায়। অনেকে অত্যন্ত উৎসাহ-উদ্দীপনার সাথে রোজা ব্রত পালন করে থাকে। অর্থাৎ যথারীতি পানাহার ও জৈবিক লালসা চরিতার্থ করা থেকে বিরত থাকে বটে কিন্তু যাবতীয় গর্হিত কর্ম থেকে এতটুকু সংযত হয়না। এ ধরণের রোজা কোনরূপ স্বার্থকতা বয়ে আনেনা। আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাপাচার নিষিদ্ধ কর্ম থেকে বেঁচে থাকার জন্য সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেছেন; ‘যে ব্যক্তি মিথ্যা বলা ছাড়তে পারল না তার পানাহার বর্জনে আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই’। (রিয়াজুস সালেহীন)। রোজা শুদ্ধ হওয়ার জন্য এবং পরিপূর্ণ ফযিলত লাভের জন্য কতিপয় বিষয়ের প্রতি সতর্ক ও সজাগ থাকতে হবে।

প্রথমত: দৃষ্টি হেফাযত করা অর্থাৎ অপাত্রে দৃষ্টিপাত না করা। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন: দৃষ্টি শয়তানের তীর সমূহ হতে একটি তীর। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর ভয়ে উহাকে হেফাযত করে, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাকে ঈমানের এরূপ নূর দান করেন, যার স্বাদ সে অন্তরে অনুভব করে।

দ্বিতীয়ত, জবান হিফাযত করা: মিথ্যা কথা বলা, চোগলখুরী করা, পরনিন্দা গীবত, শেখায়েত, কটুবাক্য প্রভৃতি হতে জিহবাকে সংযত রাখা একান্ত  অপরিহায্য কর্তব্য। বুখারী শরীফে বর্ণিত আছে যে, রোজা মানুষের জন্য ঢাল স্বরূপ। ততক্ষণ পর্যন্ত রোজা মানুষকে শয়তানের কুমন্ত্রণা হতে রক্ষা করে যতক্ষণ সে গর্হিত আচার আচরণ থেকে রোজাকে হেফাযত করে। এতএব রোজাদারের উচিৎ ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত না হওয়া এবং কেউ ঝগড়া করলে প্রত্যুত্তরে বলা ‘আমি রোজাদার’। হযরত নবী করীম (স.) এর যুগে দু’জন মহিলা রোজা রেখে ক্ষধায় অত্যন্ত কাতর হয়ে পড়ে।

তাদেরকে মৃত প্রায় দেখে সাহাবায়ে কিরাম হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাদের সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলে প্রত্যুত্তরে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন; তাদের নিকট একটি পেয়ালা-পাত্র নিয়ে যাও এবং ইহাতে বমি করতে বল। বমি করার পর দেখা গেল উহাতে গোশতের টুকরা ও তাজা রক্ত। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরূপ হওয়ার কারণ বিশ্লেষণ করে বললেন; তারা হালাল রুজি দ্বারা রোজা রেখেছে বটে কিন্তু গীবত করে হারাম ভক্ষণ করেছে। তাই তাদের এমন দুরাবস্থা হয়েছে।

তৃতীয়, কানের হিফাযত করা: পাপ বোধ ও কু-প্রবৃত্তি প্ররোচিত হয় এমন সব বস্তু শোনা পরিহার করা রোজাদারের জন্য একান্ত কর্তব্য।

চতুর্থ, অন্যান্য অঙ্গ প্রতঙ্গ হেফাযত করা: যেমন হাতকে নিষিদ্ধ বস্তুর স্পর্শ থেকে রক্ষা করা, পাপকে অবৈধ স্থানে গমন হতে হেফাযত করা। পেটকে সন্দেহেজনক বস্তুর আহার থেকে মুক্ত রাখা।

পঞ্চমত, ইফতারের সময় হালাল বস্তু হলেও উদর পূর্ণ করে না খাওয়া। কেননা এতে রোজার উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। রোজার উদ্দেশ্য হচ্ছে কামভাব ও পশু প্রবৃত্তিকে দমন করা। এজন্য সাহরী ও ইফতারীতে অতিভোজন উদরপূর্তি পরিহার করা বাঞ্চনীয়। ইমাম গাজ্জালী (রহ.) বলেন, ‘রোজার উদ্দেশ্য হল শয়তান ও নফছ- কুপ্রবৃত্তি দমন করা। আমরা যদি রমজানে অন্য মাসের চেয়ে অধিক পরিমাণ খাদ্য সামগ্রীর আয়োজন করি এবং দিনভর উপবাস থেকে মজার মজার খাদ্য পানিয়তে ঝাপিয়ে পড়ি। তাহলে শুধু আহারের সময় পরিবর্তন করা হল এবং কামভাব প্রবৃত্তিকে সংযত না করে উত্তেজিত করা হল।’

কোন কোন মুফাসসিরগণ, ‘কুতিবা আলাইকুমুস সিয়াম’ আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেছেন যে, ‘মানুষের প্রত্যেক অঙ্গের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে। মুখের রোজা মিথ্যা হতে বেঁচে থাকা, কানের রোজা অকথ্য ভাষা ও অশ্লীলতা না শুনা, চক্ষুর রোজা খেল তামাশা না দেখা, নফসের রোজা লাভ ও কাম প্রবৃত্তি হতে বিরত থাকা। অন্তরের রোজা পার্থিব মোহ ও লালসা থেকে অন্তরকে মুক্ত রাখা।

আল্লাহ আমাদের সকলকে সিয়ামের বাহ্যিক ও অন্তর্নিহিত হক সমূহ আদায় করে রমজানুল মুবারকের শেষ পর্যন্ত সিয়াম সাধনার তাওফিক দান করুন। আমাদের আচার-আচরণে পবিত্র রমজান যেন আমাদের পক্ষ হয়ে আল্লাহর কাছে সাক্ষী দেয়-সে পুত: মানস ও ধ্যান ধারণা পোষণ করে খুলুসিয়াতের সাথে এ মাসে আমরা রোজা, তারাবীহ সহ অন্যান্য সব ইবাদত বন্দেগী আঞ্জাম দেব ইনশা আল্লাহ।

লেখক: মনিরুল ইসলাম রফিক অধ্যাপক, টিভি উপস্থাপক ও জাতীয় পুরষ্কারপ্রাপ্ত খতীব

 

পূর্বকোণ/সাফা/পারভেজ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট