চট্টগ্রাম শনিবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০২৩

সর্বশেষ:

২ এপ্রিল, ২০২২ | ১১:২৭ অপরাহ্ণ

 

অটিস্টিক শিশুদের প্রতি ভালোবাসা বাড়িয়ে দিন

মুহাম্মদ আনোয়ার শাহাদাত

আজ বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস। প্রতিবছর ২ এপ্রিল বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাথে বাংলাদেশেও গুরুত্বের সাথে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে ২০১৮ সাল থেকে। বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবসের প্রস্তাবটি ২০০৭ সালের ১৮ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত হয়।

এই বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য হলো- ’মহামারী উত্তর বিশ্বে ঝুঁকি প্রশমন, কর্মক্ষেত্রে সুযোগ হবে প্রসারণ’। গত বছরও একই প্রতিপাদ্যকে সামনে নিয়ে দিবসটি পালিত হয়েছে। এবার ১৫তম বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস উপলক্ষে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাথে বাংলাদেশের সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান নীল বাতি প্রজ্জ্বলন, আলোচনা সভা, র‌্যালি, অটিস্টিক শিশুদের সহায়ক উপকরণ বিতরণসহ বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। অটিজম কোন নতুন ব্যধি বা নতুন সমস্যা নয়। এটি কয়েক দশক ধরে বিদ্যমান যদিও এ ব্যাপারে এখনও অনেক মানুষ অবগত নয়। তাই প্রতিবছর এই সচেতনতা দিবস পালন করা হয়। যাতে করে মানুষ অটিজম সম্পর্কে সঠিক ধারণা নিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে অটিজম সোসাইটির তথ্য মতে, বিশ্ব জনসংখ্যার প্রায় এক শতাংশ অটিজম আক্রান্ত। বাংলাদেশে প্রতি ১০ হাজারে ১৭ জন বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন বা অটিজম আক্রান্ত মানুষ রয়েছে।

অটিজম বা আত্মসংবৃতি বা আত্মলীনতা কোন পাপ বা পাপের ফসল নয়। এটি মূলত এক ধরনের স্নায়ুবিক বিকাশিত রোগের শ্রেণি, যা সামাজিক বিকলতা, কথা বলার প্রতিবন্ধকতা এবং পুনরাবৃত্তিমূলক আচরণ দ্বারা জন্মের তিন বছর বয়সের মধ্যে চিহ্নিত হয়। অটিজম শব্দটি আমাদের দেশে প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে যতটুকু পরিচিত সামাজিক ক্ষেত্রে কিন্তু ততটুকু পরিচিত নয়। এমনকি অটিস্টিক শিশু আছে এমন পরিবারও জানে না তাদের সন্তান অটিস্টিক। অনেক ক্ষেত্রে পরিবার-পরিজন বা সমাজ এসব শিশুকে পাপের ফসল, কপালের দুঃখ, হাবাগোবা, পাগল ইত্যাদি নাম দিয়ে অবহেলার আস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করে।

আবার অনেকের ধারণা জ্বীনের প্রভাবে এসব রোগ হয় তাই তারা শিশুদেরকে নিয়ে বিভিন্ন বৈদ্য বা কবিরাজের কাছে যায় যাদের কাছে অটিজম বা এর চিকিৎসা সম্পর্কে ন্যূনতম কোন ধারণা নেই। অটিস্টিক শিশুর প্রতি যে বিশেষ মনোযোগ দিতে হয় এবং তাদের যে বিশেষ চাহিদা রয়েছে সেটি সম্পূর্ণ রূপেই উপেক্ষিত হয় নিজ পরিবারে নিজ সমাজে। ফলে এসব শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের পরিবর্তে দিন-দিন আরো অবনতি হতে থাকে এবং সংসার ও সমাজে বোঝা হয়ে অসহায় জীবন যাপনের পথে এগিয়ে যায়।

অথচ পরিবার বা সমাজ যদি ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসে অটিজম জয় করা দূরহ হবে না এবং এদেরকেও আত্মনির্ভরশীল করে তোলা যাবে। দরকার আমাদের পজিটিভ ও মানবিক মানসিকতা এবং অটিজম সম্পর্কে উপযুক্ত জ্ঞান অর্জন ও প্রয়োগ। এসব বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুর জন্য প্রয়োজন সামষ্টিক সহানুভুতি ও সহযোগিতা। সবচাইতে আগে দরকার ব্যাপক ভাবে সচেতনতা সৃষ্টি করা। অটিজম সম্পর্কে মানুষকে যত বেশি সচেতন করা  যাবে তত বেশি অটিস্টিক শিশুরা সামাজিক ও পারিবারিক সহযোগিতা পাবে।

স্নায়ুবিক এই ত্রুটির জন্য কেউ দায়ী নয়, তাই অটিস্টিক শিশু কিংবা শিশুর পরিবারকে এই ব্যাপারে দায়ী করে সামাজিক হীনমন্যতার দিকে ঠেলে দেয়া অমানবিক। আমি-আপনি যে কেউ অটিস্টিক হতে পারতাম বা আমার-আপনার ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যে কেউ এরকম হতে পারে তাই বিষয়টিকে পজিটিভ দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে গ্রহণ করে সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও ভালোবাসা বাড়িয়ে দিতে হবে যাতে এসব শিশুরা কোনভাবেই তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়। তাদেরকে শিক্ষা-দীক্ষায় উপযুক্ত করে মূল স্রোতে নিয়ে আসতে হবে। অটিজম আক্রান্তদের কষ্ট দেয়া বা তাদের উপেক্ষা করা মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল।

অটিজম আন্দোলনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সরকারের গৃহীত বিভিন্ন কর্মসূচি ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে। বাংলাদেশে অটিস্টিক শিশুদের প্রশিক্ষণের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউড গড়ে তোলা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তনয়া অটিজম বিশেষজ্ঞ সায়মা ওয়াজেদ পুতুলর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় অটিজম মোকাবেলায় বাংলাদেশ বিশ্বে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। অটিজম আক্রান্তদের দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিনামূল্যে থেরাপিউটিক, কাউন্সেলিং ও অন্যান্য সেবা দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

দেশের বিভিন্ন জেলায় একশ’র বেশি প্রতিবন্ধী সেবা ও ওয়ানস্টপ সার্বিস চালু করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে অটিজম কর্র্নার চালু রয়েছে। এছাড়া ঢাকা শিশু হাসপাতাল সহ ১৫টি সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে শিশু বিকাশ কেন্দ্র স্থাপন করে অটিজম ও নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল সমস্যাজনিত শিশুদের চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে। অটিজম আক্রান্তদের স্বার্থ ও অধিকার রক্ষায় নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করে সেখান ৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

মানুষ হিসেবে জন্মগত ভাবে আমরা সকলেই সমান। মানুষের বর্ণ, ভাষা, রং, দৈহিক সৌন্দর্য্য বা গঠনের ভিন্নতার উপর কোন মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমানিত হয় না। মহান প্রভুর কাছে মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারিত হয় তার তাকওয়া বা আল্লাহ ভীতির ওপর । যে যত বেশি আল্লাহকে ভয় করে এবং সৎকর্ম করে সে তত বেশি আল্লাহর নিকট মর্যাদাবান। ইসলামের এই মাপকাটির মাধ্যমে মানুষে মানুষে সকল ভেদাভেদকে ধূলায় মিশিয়ে দিয়েছে। পবিত্র কোরানে আল্লাহ পাক ঘোষণা দেন-’আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী হতে, পরে তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তিই আল্লাহর নিকট অধিক মর্যাদাবান, যে অধিক মুত্তাকি। (সূরা হুজুরাত) এই ব্যাপারে প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘আল্লাহ তোমাদের শরীর ও আকৃতির দিকে দেখেন না বরং তোমাদের অন্তরের দিকে দেখেন।’ (মুসলিম শরীফ)। মানবতার নবি এসব বিশেষ শ্রেণির মানুষের সামাজিক মর্যাদা সমুন্নত রাখার জন্য সদা তৎপর ছিলেন।

তাই তিনি মদিনার মসজিদে কয়েকবার ইমামতির দায়িত্ব প্রতিবন্ধী সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাখতুম রাদিয়াল্লাহ আনহুকে অর্পন করে সমাজের সর্বোচ্চ সম্মানে অধিষ্ঠিত করার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তাই তাদেরকে আর অবহেলা বা অবজ্ঞা নয়। বিশেজ্ঞদের মতে তাদের কল্পনা শক্তি অসাধারণ। তাদেরকে অক্ষম না ভেবে বিশেষ ধরনের সক্ষম ভেবে তাদের প্রতি ভালোবাসা উজাড় করে দিতে হবে। তাদেরকে বিশ্বাস করতে হবে, প্রশংসা করতে হবে, মমতা নিয়ে পাশে থাকতে হবে তবেই তারা সামনে এগিয়ে যাবার যোগ্যতা অর্জন করবে ও সাহস পাবে। বিশেষ যোগ্যতা সম্পন্ন এসব মানুষগুলোকে উপযুক্ত পরিবেশ, যথাযথ শিক্ষাপোকরণ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে আত্মনির্ভরশীল মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার পথকে সুগম ও মসৃণ করে দেয়া আমাদের সকলের নৈতিক দায়িত্ব।

লেখক: প্রাবন্ধিক

 

পূর্বকোণ/সাফা/পারভেজ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট