চট্টগ্রাম শনিবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০২৩

সর্বশেষ:

২০ মার্চ, ২০২২ | ৭:৪০ অপরাহ্ণ

জসীম চৌধুরী সবুজ

সময়ের দাবি সর্বজনীন রেশনিং ব্যবস্থা পুনর্প্রবর্তন

দ্রব্যমূল্য বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের অস্বাভাবিক উল্লম্ফনে জনজীবন অতিষ্ট প্রায়। সাধারণ মানুষের জীবন-যাপনে চলছে নাভিশ্বাস অবস্থা। মূল্যস্ফীতির কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের নীরব হাহাকার দেখার মত কেউ নেই। তারা না পারছেন লাইনে দাঁড়াতে, না পারছেন সাহায্য চাইতে।

ফড়িয়া-মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে কৃষক তার উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাদের উৎপাদন খরচও উঠে আসছে না। তাদের কাছ থেকে স্বল্পমূল্যে কেনা শাক-সবজি, তরি-তরকারির দাম বাজারে আাকাশচুম্বি। আলু ছাড়া কোন তরি-তরকারি ৪০ থেকে ৬০ টাকার নিচে বাজারে মিলছে না। অথচ কৃষক এর চার ভাগের এক ভাগ দামও পাচ্ছেন না। মুক্তবাজার অর্থনীতির নামে এভাবে কৃষকদের বঞ্চিত করা হচ্ছে, তারা ক্রমশ দরিদ্র থেকে দরিদ্রতম হচ্ছেন। এই অবস্থায় দ্রব্যমূল্যের চাপে কৃষক, শ্রমিক, নিন্মবিত্ত, মধ্যবিত্তসহ সাধারণ মানুষ দিশেহারা।

সংবাদমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই আমরা মানুষের কষ্টের, জীবনযাত্রার নাভিশ্বাস সম্পর্কিত প্রতিবেদন, পর্যালোচনা লক্ষ করছি। মানুষ যে কত অসহায় হয়ে পড়েছে তা টিসিবির ট্রাকের অপেক্ষায় মানুষের দীর্ঘ লাইন দেখে কিছুটা অনুমান করা গেলেও একে দূরাবস্থার খণ্ডিত চিত্র বলা চলে। এ নিয়ে আমি চর্বিত-চর্বণ করতে চাই না। আমার আজকের লেখার বিষয় হচ্ছে রেশন। দ্রব্যমূল্যের চাপে সমাজে যে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে তা সামাল দিতে সর্বজনীন রেশনিং ব্যবস্থা চালুর পক্ষে আমার এই লেখা।

করোনাকালীন সময়ে যখন পুরোদেশ স্থবির হয়ে পড়েছিল তখন খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে সর্বজনীন রেশনিং ব্যবস্থা চালুর নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তখন সেটি খুবই কার্যকর একটা পদক্ষেপ ছিল, যদিও এটি ছিল সাময়িক ব্যবস্থা। সামনে আসছে পবিত্র রমজান মাস। দ্রব্যমূল্যে উর্ধ্বগতিতে হিমশিম খাওয়া স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য এক কোটি বিশেষ কার্ড প্রদানের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। যাতে কার্ডধারীরা কম দামে ভোগ্যপণ্য কিনতে পারেন। সেই ধারাবাহিকতায় এখন স্থায়ীভাবে সর্বজনীন রেশনিং ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতের আওয়াজটি এখন উঠেছে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছ থেকে। এটি এখন সময়ের দাবি বলা চলে।

স্বাধীনতার পূর্বে ও পরে বাংলাদেশে সর্বজনীন রেশনিং ব্যবস্থা চালু ছিল। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে গঠন করা হয়েছিল ভোগ্যপণ্য সরবরাহ কর্পোরেশন। যা কসকর নামেই পরিচিত ছিল। বিভাগীয় শহরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহরে কসকরের দোকান ছিল। মানুষ সেখান থেকে চাহিদামত তার প্রয়োজনীয় পণ্য ন্যায্যমূল্যে কিনতে পারতেন। চট্টগ্রামে কোতোয়ালী থানার মোড়ে সিডিএ বিল্ডিংয়ের ডান গেটের বিপরীতে ছিল কসকরের দোকান। বিশ্বব্যাংক, এডিবি প্রমুখ দাতা সংস্থার চাপে পরবর্তীতে রেশনিং ব্যবস্থা বাতিল এবং কসকর বিলুপ্ত করা হয়। কল্যাণমুখী সমাজব্যবস্থার ধারণাটি অনেক আগে থেকেই আমাদের উপমহাদেশে চালু ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪৩ সাল থেকে ভারতবর্ষে রেশনিং ব্যবস্থা চালু ছিল, যা বাংলাদেশেও চালু ছিল। এ কারণে বাংলাদেশে সেই তখন থেকেই খাদ্যশস্য বন্টনব্যবস্থা চালু রয়েছে।

বিশ্বযুদ্ধের সময় দুর্ভিক্ষ ঠেকাতেই রেশনিং ব্যবস্থা যেটা চালু হয়েছিল তা পাকিস্তান আমলে এবং পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশেও চালু ছিল। ১৯৭২ সালে দেশের চারটি প্রধান শহরে অগ্রাধিকার গ্রুপে বিধিবদ্ধ রেশনিং (Statutory Retioning-SR) ব্যবস্থা চালু ছিল। এ চারটি শহর হচ্ছে ঢাকা, নারায়নগঞ্জ, চট্টগ্রাম ও খুলনা। ১৯৭৩ সালে রাজশাহীকে এবং ১৯৭৬ সালে রাঙ্গামাটিকে এসআর-এর আওতায় আনা হয়। এই ছয়টি শহরের সকল বাসিন্দা এবং অগ্রাধিকার গ্রুপ প্রতি সপ্তাহে একবার করে মাসে চারবার রেশন পেতেন। নির্দিষ্ট তারিখে নির্ধারিত রেশন ডিলারের কাছ থেকে তারা রেশন তুলতেন। কম দামে কার্ডধারীরা চাল, ডাল, তেল, লবন, গম, চিনি, ঘি ইত্যাদি পেতেন। প্রত্যেক ব্যক্তি একটি রেশন কার্ড পাওয়ার অধিকারী ছিলেন। এর বাইরে কতিপয় অগ্রাধিকার গ্রুপকে সরকারি বিতরণ ব্যবস্থায় রেশন সরবরাহ বাধ্যতামূলক হয়। এদের মধ্যে আছে সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ, রাষ্ট্র পরিচালিত হাসপাতাল কারাগার এবং ছাত্রাবাস। এসব ক্ষেত্রে পৃথকভাবে রেশন কার্ড দেয়া হত না। প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের প্রধান তাদের মাসিক বরাদ্দের বিবরণ খাদ্য মন্ত্রণালয়ে পেশ করলে সে অনুযায়ী রেশন বরাদ্দ করা হত। বিধিবদ্ধ রেশনিং (এসআর) এলাকাভুক্ত ছ’টি শহরের বাইরে অন্যান্য শহর ও গ্রামাঞ্চলে চালু ছিল সংশোধিত রেশনিং (Modified Retioning-MR) ব্যবস্থা। এতে সবপর্যায়ের সরকারি কর্মচারী, স্কুল শিক্ষক ও সরকারি খাতের শ্রমিকদের রেশনের পুরো কোটা সরবরাহ করা হয়।

তবে এমআরভূক্ত শহর ও গ্রামে রেশন দেয়া হত মাসে দু’বার। সে হিসেবে তা ছিল এসআরভূক্ত ছয় শহরের বাসিন্দাদের তুলনায় অর্ধেক। ক, খ, গ এবং ঘ এই চার ক্যাটাগরির রেশন কার্ড ইস্যু করা হত স্থানীয় কর প্রদানের ভিত্তি বিবেচনায়। ক ক্যাটাগরি ছিল সবচেয়ে দরিদ্রতম, যারা ন্যূনতম স্থানীয় কর প্রদানেও অসমর্থ ছিলেন। স্বাধীনতাপরবর্তীকালে রেশন ব্যবস্থার কারণে খাদ্য বিভাগের রমরমা অবস্থা আমরা দেখেছি। নগরীকে একাধিক রেশনিং জোনকে এরিয়া ও সাব এরিয়ায় বিভক্ত করে খাদ্য বিভাগের তৎপরতা চালানো হত। চট্টগ্রাম মহানগরীর দেওয়ান বাজারে যে এলাকাটি সাব এরিয়া নামে এখনও পরিচিত সেখানে খাদ্য বিভাগের রেশনিং সাব এরিয়া অফিস ছিল। ১৯৭৪ সালে দেশে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের অন্যতম কারণ হিসেবে মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশমুখী খাদ্যশস্যবাহী জাহাজ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়াকে মনে করা হয়। কিউবায় পাট রফতানি করায় যুক্তরাষ্ট্র এই প্রতিহিংসামূলক ব্যবস্থা নিয়েছিল বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। এই দুর্ভিক্ষ বহু মানুষ মারা যায়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ ছিল এটা। গবেষকরা জানিয়েছেন, দেশে যদি তখন সর্বজনীন রেশনিং ব্যবস্থা চালু না থাকত তাহলে দুর্ভিক্ষে মৃতের সংখ্যা আরও অনেক বেড়ে যেত।

সর্বজনীন রেশনিং ব্যবস্থা যে সমাজে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে তা প্রমাণিত হলেও বিশ্বব্যাংক, এশিয়ান ডেভলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) ইত্যাদি দাতা সংস্থাসমূহ বাংলাদেশের উপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করে সর্বজনীন রেশনিং ব্যবস্থা বাতিল করাতে সক্ষম হয়। তাদের যুক্তি ছিল রেশনিং ব্যবস্থায় ব্যাপক দুর্নীতি ও খাদ্যশস্যের অপচয় হয়। রেশন নিয়ে কেলেঙ্কারির খবর তখন প্রকাশিত হত। খাদ্য বিভাগের কিছু কর্মকর্তা- কর্মচারী এবং রেশন ডিলার রাতারাতি অঢেল বিত্ত-বৈভবের মালিক হয়ে যান। নামে-বেনামে শত শত রেশন কার্ড বানিয়ে শহরে অনেকে বড়লোক হয়ে যান।  তখন সঠিক-ভূয়া যাচাই করার মত অবস্থা ছিল না। কিন্তু এখন সেই অবস্থা নেই। জাতীয় পরিচয়পত্র ও জন্মনিবন্ধন ব্যবস্থার কারণে তখনকার সময়ের মত ভূয়া রেশন কার্ড তৈরির সুযোগ এখন আর মিলবে না। সমাজ থেকে ক্ষুধা দূর করে একটি বৈষম্যহীন ভারসাম্যমূলক সমাজ-রাষ্ট্র গঠনে সর্বজনীন রেশনিং ব্যবস্থার কোন বিকল্প নেই। এ ব্যবস্থা চালু করতে গেলে যে পরিমাণ ভর্তুকি রাষ্ট্রকে দিতে হবে তার সংস্থান খুবই সহজে হয়ে যায় বিভিন্ন প্রকল্পে নানা অজুহাতে অপচয়-দুর্নীতি এবং বিদেশে টাকা পাচার বন্ধ করা গেলে।

ভারতে সর্বজনীন রেশনিং ব্যবস্থা চালু রয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যবস্থাপনায়। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে ডিজিটাল রেশন কার্ডকে ই-রেশন কার্ডে পরিণত করে খাদ্যনিরাপত্তা ব্যবস্থায় আরও স্বচ্ছতা আনা হয়েছে। বিশ্বব্যাংককে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বাংলাদেশ যেভাবে পদ্মা সেতু নির্মাণ করেছে ঠিক সেভাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পারেন দাতাদের অযাচিত পরামর্শকে দূরে ঠেলে সর্বজনীন রেশনিং ব্যবস্থা পুনর্প্রবর্তনের আর একটি সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে।

লেখক: জসীম চৌধুরী সবুজ সিনিয়র সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক

 

পূর্বকোণ/সাফা/পারভেজ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট